জাপানি বিজ্ঞানী ইয়ুইচি মোরি ফলমূল আর সবজি মাঠে ফলান না; তার চাষে মাটিই নেই। বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, তিনি গাছ বড় করেন স্বচ্ছ ও সহজভেদ্য এক পলিমারের ঝিল্লি বা ফিল্মের ওপর, যে প্রযুক্তি এসেছে মানুষের কিডনি চিকিৎসার ডায়ালাইসিস থেকে। এই ঝিল্লি পানি ও পুষ্টি ধরে রাখে, আর গাছের শিকড় সেখান থেকেই খাবার টেনে নেয়। জমি আর কৃষিশ্রমিকের ঘাটতিতে থাকা জাপান কীভাবে প্রযুক্তি দিয়ে কৃষি বদলে দিচ্ছে, মোরির উদ্ভাবন তার একটি উদাহরণ।
ডায়ালাইসিসের ঝিল্লি থেকে চাষের ফিল্ম
"কিডনি ডায়ালাইসিসে রক্ত ছাঁকার কাজে যে উপকরণ ব্যবহার করা হতো, আমি সেগুলোই এখানে ব্যবহার করছি," বিবিসিকে বলেছিলেন মোরি। বিবিসির হিসাবে এই পদ্ধতিতে প্রচলিত চাষের তুলনায় ৯০ শতাংশ কম পানি লাগে। কীটনাশকও লাগে না, কারণ পলিমারের ছিদ্র ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াকে ঢুকতে দেয় না। তার প্রতিষ্ঠান মেবাইওল প্রায় ১২০টি দেশে এই উদ্ভাবনের পেটেন্ট নিশ্চিত করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
জাপান সরকারের প্রকাশনা "হাইলাইটিং জাপান"-এর ২০১৫ সালের শরৎ সংখ্যায় প্রযুক্তিটির বিস্তারিত বর্ণনা আছে। সেখানে বলা হয়, "আইমেক" নামের এই "ফিল্ম ফার্মিং" ব্যবস্থার ফিল্মটি হাইড্রোজেলে তৈরি, যা ডিসপোজেবল ডায়াপারে ব্যবহৃত এক ধরনের পানিগ্রাহী পলিমার জেল। এর ন্যানো আকারের ছিদ্র (এক মিলিমিটারের দশ লাখ ভাগের এক ভাগ) পানি ও পুষ্টি শুষে নেয়, কিন্তু জীবাণু ও ভাইরাস আটকে দেয়। ফিল্ম পানি আঁকড়ে ধরে রাখে বলে গাছকে পানি টানতে বেশি পরিশ্রম করতে হয়; তাতে গাছে অ্যামিনো অ্যাসিড ও চিনি বেশি তৈরি হয়, ফলের স্বাদ ও পুষ্টিমান বাড়ে।
মেবাইওলের প্রধান নির্বাহী মোরি পলিমার পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় রাসায়নিক ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ বছর ক্যাথেটার, কৃত্রিম রক্তনালি ও ডায়ালাইসিসের ঝিল্লি নিয়ে কাজ করার পর তিনি ১৯৯৫ সালে কানাগাওয়া জেলার হিরাৎসুকায় মেবাইওল প্রতিষ্ঠা করেন। একই প্রকাশনা অনুযায়ী ২০১৫ সাল নাগাদ জাপানের ১৫০টি খামার এই পদ্ধতি নিয়েছিল; প্রতিষ্ঠানটি ১৩৪টি দেশে পেটেন্টের আবেদন করে ১১৬টিতে তা পেয়েছিল।

মরুভূমি থেকে সুনামি-বিধ্বস্ত উপকূল
ফিল্মটি নিচের মাটি থেকে ফসলকে আলাদা রাখে বলে মরুভূমি, কংক্রিট বা দূষিত জমিতেও চাষ সম্ভব। "হাইলাইটিং জাপান" জানায়, জাপানের নানা জায়গার পাশাপাশি সাংহাই, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে এই পদ্ধতিতে টমেটো চাষ হচ্ছিল। ২০১১ সালের পূর্ব জাপান ভূমিকম্পের পর সুনামিতে তেল, কাদা ও লবণে দূষিত তোহোকু উপকূলের খামার ফেরাতেও এটি কাজে লাগে; ক্ষতিগ্রস্ত রিকুজেনতাকাতা শহরে ১.৬ হেক্টরের একটি টমেটো খামার ফিল্ম ফার্মিং নিয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার ফার্মার'স উইকলির প্রতিবেদনেও দুবাই ও চীনের খামারে এর ব্যবহারের কথা আছে।

জমি ও কৃষকের ঘাটতিতে জাপান
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী জাপানের প্রায় ৮৫ শতাংশ ভূখণ্ড পাহাড়ি, আর প্রায় এক দশকে দেশটির কৃষি উৎপাদকের সংখ্যা ২২ লাখ থেকে কমে ১৭ লাখে নেমেছিল; কৃষকের গড় বয়স ছিল ৬৭ বছর। জাপানের কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২০১৫ সালের শুমারির তথ্য তুলে নিপ্পন ডটকম জানায়, মূলত কৃষিকাজে যুক্ত মানুষ তখন ছিলেন ১৭ লাখ ৫০ হাজার, যাদের ৬৩.৫ শতাংশের বয়স ৬৫ বা তার বেশি। দেশটির মাত্র ১২ শতাংশ জমি চাষের উপযোগী। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ২০২৩ অর্থবছরে ক্যালরির ভিত্তিতে জাপানের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা ছিল ৩৮ শতাংশ, যেখানে ২০৩০ সালের লক্ষ্য ৪৫ শতাংশ।
এই ঘাটতির মধ্যে জাপানের মাঠ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট ও আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে প্রযুক্তিকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিল বলে বিবিসি জানায়। ফিল্ম ফার্মিংয়ে মাটি তৈরির কৌশল শিখতে হয় না বলে অভিজ্ঞতা ছাড়াই তরুণেরা চাষে নামতে পারেন, যা বয়স্ক কৃষক ও উত্তরসূরির অভাবের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে বলে "হাইলাইটিং জাপান" উল্লেখ করে।

পানির সংকট কেন জরুরি
জাতিসংঘের বিশ্ব পানি উন্নয়ন প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বিবিসি জানায়, পরিবেশের ক্ষতি আর পানির ওপর অস্থিতিশীল চাপ বর্তমান হারে চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ শস্য উৎপাদন এবং ৪৫ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়বে। ইউনেসকোর ২০১৮ সালের প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়, বিশ্বে পানির চাহিদা বছরে প্রায় ১ শতাংশ হারে বাড়ছে এবং কৃষি সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী থাকবে। প্রায় ৩৬০ কোটি মানুষ এমন এলাকায় থাকেন, যেখানে বছরে অন্তত এক মাস পানির অভাব হতে পারে; ২০৫০ সালে এই সংখ্যা ৪৮০ থেকে ৫৭০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে।
ছবি: এরিয়াফটো / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, বিবিসি মুন্দো (লা ওপিনিয়ন), জাপান সরকারের "হাইলাইটিং জাপান", ফার্মার'স উইকলি (দক্ষিণ আফ্রিকা), নিপ্পন ডটকম, ফুডনেভিগেটর, ইউনেসকোর বিশ্ব পানি উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১৮, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)