হাওর অঞ্চলে বোরো কাটার ভরা মৌসুমে টানা বৃষ্টিতে প্রতিদিনই বাড়ছে পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ, আর যেটুকু ধান তড়িঘড়ি কাটা হয়েছে তাও রোদ না থাকায় পচতে শুরু করেছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সুনামগঞ্জে এখনো ১৮ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে, নেত্রকোনায় শুক্রবার নাগাদ প্রায় সাড়ে ৯ হাজার হেক্টর তলিয়েছে, আর কিশোরগঞ্জে শনিবার নাগাদ নিমজ্জিত জমি সাত হাজার একর ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জে ইতোমধ্যে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং সামনে তার অবনতি ও নতুন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে।
সুনামগঞ্জ সদরের হালুয়ারগাঁওয়ের কৃষক আনোয়ার হোসেন দেড় কানি (প্রায় ৬০ শতাংশ) জমিতে ধান করেছিলেন, সামান্য পরিমাণও তুলতে পারেননি। তার কথায়, "সব তলায়া গেছে। কিছুই পাই নাই। ধার-দেনা কইরা সার বীজ কীটনাশক কিনছিলাম। কেমনে শোধ অইবো, আর কেমনে কী করবাম জানি না।" কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের গয়েশপুর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ জসিম জানাচ্ছেন, কমলা রঙ ধরা ধান সকালে দেখে এসে দুপুরে গিয়ে পেয়েছেন পানি — কাটার সময়ই মেলেনি, পরদিন পুরোটা তলিয়ে যায়।
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলছেন, শনিবার সারাদিন থেমে থেমে বৃষ্টিতে নিমজ্জিত জমি দ্রুত বাড়ছে, রোদ না থাকায় উঠানো ধান শুকানো যাচ্ছে না, তবু যেখানে সুযোগ আছে সেখানে ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার রোদ ওঠায় কিছুটা স্বস্তি এসেছিল এবং শুক্রবার পর্যন্ত অনেকে পাকা ধান কেটেছিলেন; কিন্তু শুক্রবার রাত থেকে আবার বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হওয়ায় যারা কাটেননি এবং যারা কেটে স্তূপ করে রেখেছেন — দুই পক্ষই বিপাকে।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন জানান, ভৈরবে মেঘনা ছাড়া জেলার বাকি নদীগুলোর পানি বেড়েছে, যদিও এখনো বিপদসীমার নিচে; কিছু এলাকায় পানি সরাতে বাঁধ কেটে দেওয়া হচ্ছে। সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদারের ভাষ্য, বাঁধগুলো সুরক্ষিত আছে, তবে ধান কাটা হয়ে যাওয়া এলাকায় বাঁধ কেটে পানি বের করার ব্যবস্থা হচ্ছে; আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টি আরও বাড়ার পূর্বাভাস আছে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি অফিসের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক হিসাব দিচ্ছেন, হাওর এলাকায় ৭১ শতাংশ জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে, হাওর ও হাওরের বাইরে মিলিয়ে গড়ে ৬০ শতাংশ — অর্থাৎ ৪০ শতাংশ ধান এখনো মাঠে। "কৃষকের সারা বছরের খোরাকি মাঠে। বৃষ্টির কারণে সময়মত ধান কাটা যায়নি," বলেন তিনি; ভারী বৃষ্টি না হলে কাটা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা তার। নেত্রকোনায় ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কংস ও উব্দাখালী বিপদসীমার ওপরে বইছে, সোমেশ্বরীসহ আরও কয়েকটি নদীর পানি বাড়ছে; জেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আমিরুল ইসলাম বলছেন, মার্চের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি, দুই দফা শিলাবৃষ্টি ও পরে টানা বৃষ্টিতে বোরো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে, যদিও নতুন বৃষ্টি না হলে অবনতির আশঙ্কা কম বলে জেলা প্রশাসনের ভাষ্য।
হাওরে বছরে একটিই ফসল — বোরো — এবং ১৫ এপ্রিল থেকে ১৫ মে তা কাটার সময়। এবার এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই বৃষ্টিতে কাটা শুরু করা যায়নি, আর মার্চের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি, শিলা ও অতি ভারী বর্ষণে কাটার প্রস্তুতিও ব্যাহত হয়েছে বলে কৃষি অফিসগুলো জানাচ্ছে। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাওরে ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার কথা জানিয়েছেন। মাঠে থাকা ৪০ শতাংশ ধানের ভাগ্য এখন নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের রোদের ওপর।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)