জারবেরা বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় কাট ফ্লাওয়ার বা কাটা ফুল; ফুলদানিতে অনেক দিন সতেজ থাকে বলে ফুলের বাজারে এর কদর বেশি। বাংলাদেশে শীতকালে খোলা মাঠে এবং গ্রীষ্মকালে পলিশেডের নিচে জারবেরার চাষ হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ২০০৯ সালে দেশে চাষের উপযোগী দুটি জাত অবমুক্ত করে। জারবেরা চাষের জলবায়ু, মাটি, বেড তৈরি ও বংশবিস্তারের পদ্ধতি নিয়ে এই প্রতিবেদন।
জারবেরা কী ধরনের ফুল
জারবেরা সূর্যমুখীর পরিবার অ্যাস্টারেসি (Asteraceae) গোত্রের একটি গণ, যাতে ২২টি স্বীকৃত প্রজাতি আছে। জার্মান উদ্ভিদবিদ ও চিকিৎসক ট্রাউগট গারবারের (১৭১০-১৭৪৩) নামে এর নামকরণ; তিনি রাশিয়ায় ব্যাপক ভ্রমণ করেছিলেন এবং কার্ল লিনিয়াসের বন্ধু ছিলেন।
বাণিজ্যিক চাষের মূল প্রজাতি দক্ষিণ আফ্রিকার জারবেরা জ্যামেসোনি (Gerbera jamesonii), যা ট্রান্সভাল ডেইজি বা বার্বারটন ডেইজি নামেও পরিচিত। ১৮৮৯ সালে উদ্ভিদবিদ জে. ডি. হুকার প্রজাতিটির বৈজ্ঞানিক বিবরণ দেন। আজকের বেশির ভাগ চাষের জাত জারবেরা জ্যামেসোনি ও দক্ষিণ আফ্রিকার আরেক প্রজাতি জারবেরা ভিরিডিফোলিয়ার সংকর, যাকে Gerbera × hybrida বলা হয়। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কাট ফ্লাওয়ারের তালিকায় গোলাপ, কার্নেশন, চন্দ্রমল্লিকা ও টিউলিপের পরেই, পঞ্চম স্থানে রয়েছে জারবেরা।

বারির দুই জাত ও দেশে বাণিজ্যিক চাষ
বারির জয়দেবপুরের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র ২০০৯ সালে বারি জারবেরা-১ ও বারি জারবেরা-২ জাত দুটি অবমুক্ত করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল হার্বেরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, দুটি জাতেরই চাষের মৌসুম শুরু অক্টোবরে, জীবনকাল ১৮০ থেকে ২৪০ দিন এবং হেক্টরপ্রতি ফলন ৯ থেকে ১০ লাখ ফুলের স্টিক।
দেশে বাণিজ্যিক ফুল চাষের শুরু ১৯৮৩ সালে, যশোরের গদখালীতে শের আলী সরদারের ৩০ একর জমিতে রজনীগন্ধা চাষের মধ্য দিয়ে। দ্য ডেইলি স্টারের ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন দেশের ২৪টি জেলায় প্রায় ১২ হাজার একর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ হতো। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার নিশিন্দা গ্রামে নিউ এশিয়া গ্রুপ ২০১৭ সালের আগস্টে নেট হাউস তৈরি শুরু করে ১০টি জাতের জারবেরা চাষ করছিল এবং প্রতিদিন ১১ থেকে ১২ হাজার জারবেরা ঢাকার আগারগাঁও ও শাহবাগের ফুলের বাজারে পাঠাচ্ছিল; চারা ও কারিগরি সহায়তা আসছিল ভারত থেকে।

জলবায়ু, তাপমাত্রা ও আলো
জারবেরা কষ্টসহিষ্ণু গাছ, কমবেশি সব ধরনের জলবায়ুতে জন্মায়। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে খোলা জায়গায় বা পলিশেডে এবং নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে গ্রিনহাউসে এর চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে খরচ বেশি পড়লেও ফুলের মান ও ফলন বাড়ে এবং রোগ ও পোকামাকড় থেকে গাছ রক্ষা পায়।
উজ্জ্বল রোদ গাছের বৃদ্ধি ও ভালো মানের ফুলের জন্য সহায়ক, তবে গ্রীষ্মে প্রায় ৩০ শতাংশ হালকা ছায়া দিতে হয়। নিজস্ব প্রতিনিধির প্রতিবেদনে দিনের অনুকূল তাপমাত্রা ১৬ থেকে ২০ এবং রাতের ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলা হয়েছিল। ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দিনে ২২ থেকে ২৫ এবং রাতে ১২ থেকে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে আদর্শ ধরে ৫০ শতাংশ ছায়ার শেড হাউস বা প্রাকৃতিকভাবে বায়ু চলাচলের পলিহাউসে চাষের পরামর্শ দেয়। বেশি তাপমাত্রায় গাছে ফুল আসে ঠিকই, কিন্তু ফুলের মান ততটা ভালো হয় না।

মাটি ও বেড তৈরি
সুনিষ্কাশিত, উর্বর দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি জারবেরার জন্য উত্তম, মাটির পিএইচ থাকা উচিত ৫.৫ থেকে ৭.০ এর মধ্যে। জমিতে প্রচুর জৈব পদার্থ দরকার, তাই পরিমিত পরিমাণে গোবর সার, পাতাপচা সার ও কোকোডাস্ট দিতে হয়। তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশিকায় ১ থেকে ২ মিটার চওড়া ও ৩০ সেন্টিমিটার উঁচু বেড, গোবর সার, বালু ও কোকোপিট বা ধানের তুষ ২:১:১ অনুপাতে মিশিয়ে তৈরি মাধ্যম এবং ৪০x৩০ বা ৩০x৩০ সেন্টিমিটার দূরত্বে চারা রোপণের কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশনের পরামর্শ, চারার ক্রাউন বা গোড়ার মাথা থাকবে মাটির সমান উচ্চতায়; স্যাঁতসেঁতে মাটিতে শিকড় পচে যায়।
বংশবিস্তারের পদ্ধতি
- বীজ: পদ্ধতিটি সহজ এবং বীজের মাধ্যমে রোগ ও পোকা ছড়ানোর আশঙ্কা কম, তবে এভাবে পাওয়া গাছে মাতৃগাছের সব গুণ বজায় থাকে না।
- ক্লাম্প ভাগ করা: মাঠের সুপ্রতিষ্ঠিত, পূর্ণবয়স্ক গাছের ঝাড় ধারালো ছুরি দিয়ে ছোট ছোট ভাগে কাটা হয়; এই সাকারগুলোর পাতা ও শিকড় হালকা ছেঁটে নতুন বেডে লাগানো হয়।
- টিস্যু কালচার: তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে, বাণিজ্যিক চাষে সাকার ভাগ করা চারা এবং টিস্যু কালচারের চারাই ব্যবহৃত হয়।
একই নির্দেশিকা অনুযায়ী, ফুল পুরোপুরি ফুটলে তোলা হয়; পলিহাউসে প্রতি গাছ থেকে মাসে গড়ে ২টি স্টিক এবং বছরে প্রতি বর্গমিটারে ১৭৫ থেকে ২০০টি ফুল পাওয়া যায়। জারবেরার প্রধান শত্রু জাবপোকা, সাদা মাছি, থ্রিপস ও লাল মাকড়; রোগের মধ্যে ফুলের কুঁড়ি পচা ও পাউডারি মিলডিউ উল্লেখযোগ্য।
ছবি: Johann.rademeyer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিনিধি), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ডিজিটাল হার্বেরিয়াম (বারির অবমুক্ত জাত), তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (টিএনএইউ অ্যাগ্রিটেক পোর্টাল), নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন, দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)