বিদেশি ফুল হলেও বাংলাদেশে জারবেরার চাহিদা ব্যাপক। ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জাগো নিউজ ২৪-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের প্রথম সারির ১০টি ফুলের মধ্যে জারবেরা অন্যতম; ফুলটি বহুবর্ষজীবী এবং ফুলদানিতে অনেক দিন সতেজ থাকে। বিয়ে, গায়ে হলুদ, পহেলা বৈশাখসহ বড় অনুষ্ঠানে এর কদর বাড়ছিল। সেই সময় যশোরের গদখালী থেকে ময়মনসিংহের ভালুকা পর্যন্ত চাষিরা বাণিজ্যিকভাবে জারবেরা চাষ করছিলেন।
জারবেরা কোন ধরনের ফুল
জারবেরা সূর্যমুখীর পরিবার অ্যাস্টারেসি গোত্রের একটি গণ, যাতে ২২টি স্বীকৃত প্রজাতি আছে; এর আদি নিবাস আফ্রিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল। জার্মান উদ্ভিদবিদ ট্রাউগট গারবারের (১৭১০-১৭৪৩) নামে এর নামকরণ। বাণিজ্যিক জাতগুলোর মূলে দক্ষিণ আফ্রিকার জারবেরা জ্যামেসোনি, যা বার্বারটন ডেইজি বা ট্রান্সভাল ডেইজি নামেও পরিচিত; একে জারবেরা ভিরিডিফোলিয়ার সঙ্গে সংকর করে হাজারো জাত তৈরি হয়েছে। গোলাপ, কার্নেশন, চন্দ্রমল্লিকা ও টিউলিপের পরেই জারবেরা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পঞ্চম কাট ফ্লাওয়ার।
ফুলটি দেখতে অনেকটা সূর্যমুখীর মতো; সাদা, হলুদ, কমলা, লাল ও গোলাপি রঙের জাত আছে। পাতা গাছের গোড়ায় গোলাকারে সাজানো থাকে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র ২০০৯ সালে বারি জারবেরা-১ ও বারি জারবেরা-২ জাত অবমুক্ত করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল হার্বেরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, দুটি জাতেরই রোপণের সময় অক্টোবর, জীবনকাল ১৮০ থেকে ২৪০ দিন এবং হেক্টরপ্রতি ফলন ৯ থেকে ১০ লাখ ফুলের স্টিক।

মাটি, জমি ও যত্ন
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুনিষ্কাশিত, উর্বর দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি জারবেরার জন্য উত্তম, মাটির পিএইচ থাকা উচিত ৫.৫ থেকে ৭.০ এর মধ্যে। জমিতে প্রচুর জৈব পদার্থ দরকার, তাই পরিমিত গোবর সার, পাতাপচা সার ও কোকোডাস্ট দিতে হয়। একটু উঁচু জমি ভালো; নিয়ম করে গাছ পরিষ্কার, সেচ ও সার দিতে হয়, আর একটি গাছ ৫ থেকে ৬ বছর বাঁচে।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশনও জৈব পদার্থসমৃদ্ধ, আর্দ্র কিন্তু সুনিষ্কাশিত মাটির পরামর্শ দেয়। তাদের নির্দেশনায় যত্নের মূল কথাগুলো এমন:
- চারা লাগানোর সময় গাছের ক্রাউন বা গোড়ার মাথা মাটির সমান উচ্চতায় রাখতে হবে।
- জলাবদ্ধ মাটিতে শিকড় পচে যায়, তাই পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
- গরম আবহাওয়ায় বিকেলের ছায়া গাছের জন্য উপকারী।
- গ্রে মোল্ড, পাউডারি মিলডিউ ও অ্যানথ্রাকনোজ রোগ এবং থ্রিপস, মাকড়, জাবপোকা, সাদা মাছি ও লিফ মাইনার পোকার দিকে নজর রাখতে হবে।
- গাছের ঝাড় ভাগ করে বা বীজ থেকে বংশবিস্তার করা যায়।

বাজার, দাম ও আয়
জাগো নিউজের হিসাবে জারবেরা চাষ শুরু করতে প্রাথমিকভাবে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত পুঁজি লাগে। একটি গাছ থেকে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি ফুল পাওয়া যায়, প্রতিটি ফুলের দাম ৩০ থেকে ৫০ টাকা, আর মাসে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দেশে বাণিজ্যিক ফুল চাষের শুরু ১৯৮৩ সালে, গদখালীতে শের আলী সরদারের রজনীগন্ধা চাষ দিয়ে। দ্য ডেইলি স্টারের ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তখন ২৪টি জেলার প্রায় ১২ হাজার একর জমিতে ফুল চাষ হতো, যুক্ত ছিলেন প্রায় ২০ লাখ মানুষ। ময়মনসিংহের ভালুকায় নিউ এশিয়া গ্রুপের নেট হাউসে তখন ১০টি জাতের জারবেরা চাষ হচ্ছিল এবং প্রতিদিন ১১ থেকে ১২ হাজার ফুল যাচ্ছিল ঢাকার আগারগাঁও ও শাহবাগের বাজারে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা মেহেদী হাসান তখন বলেন, চীন থেকে জারবেরা আসা বন্ধ হয়ে গেছে।

ছবি: Alias 0591 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ডিজিটাল হার্বেরিয়াম, নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)