নদী, খাল-বিল ও হাওরের দেশি মিঠাপানির মাছ রাজধানীর বাজারে এখন দুর্লভ; কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী মৎস্য আড়ত, গুলশান ডিএনসিসি, মহাখালী ও তেজগাঁও সমিতিবাজার ঘুরে দেখা গেছে, পুঁটি, মলা, গুতুম, চিংড়িগুঁড়া ও ট্যাংরার মতো অল্প কয়েকটি ছাড়া প্রায় ৫০–৬০ শতাংশ মাছই আমদানি করা বা চাষের; বড় বাইম, আইড় ও চিংড়িও আমদানিনির্ভর। ঢাকা থেকে কিনে সাভারে বিক্রি করা ছোট মাছ ব্যবসায়ী হায়দার আলী বলেন, নদী-খাল-বিলের দেশি মাছ খুব কম, ট্যাংরা-মলা-চিংড়ির বেশিরভাগই চাষের।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে মুক্ত জলাশয় থেকে মিঠাপানির মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়; দেশে মিঠাপানির ২৬০ প্রজাতির মধ্যে ছোট মাছ ১৪৩টি, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৩০ ভাগ, আর ৬৪ প্রজাতি হারিয়ে যেতে বসেছে। ১৯৮৩-৮৪ ও ২০২৩-২৪-এর বার্ষিক প্রতিবেদন মিলিয়ে প্রাকৃতিক জলাশয়ের উৎপাদন ৪ লাখ ৭১ হাজার ৫৯৫ টন থেকে ১৯৯৩-৯৪-এ ৫ লাখ ৭৩ হাজার ৩৭৬, ২০০৪-এ ৭ লাখ ৩২ হাজার ৬৭ ও ২০১৪-তে ৯ লাখ ৯৫ হাজার ৮০৫ টনে উঠেছে—অথচ বাজারে প্রাকৃতিক মাছ কম। গত ৪০ বছরে মুক্ত জলাশয় কমেছে ৩৪.৫ শতাংশ: ১৯৮৩-৮৪-এ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় ছিল ৬২.৫৯ শতাংশ, ২০২৩-২৪-এ ২৮.৯ শতাংশ।
বিভাগে বিভাগে একই চিত্র। ময়মনসিংহের পুরোনো ব্রহ্মপুত্র, কংস ও হাওর-বিলে জলাশয় ভরাট, দূষণ ও অতিরিক্ত আহরণে নান্দিনা, ভাঙনবাটা, পিয়ালী, নাপিত কৈ ও মহাশোল প্রায় বিলুপ্ত, যদিও বিএফআরআই কৃত্রিম প্রজননে পাবদা, গুলশা, ট্যাংরাসহ কয়েকটি প্রজাতি ফিরিয়ে আনছে। খুলনার তেরখাদার চিত্রা ও ভূতিয়ার বিলে ৪০–৫০ প্রজাতির অনেকগুলো হারাতে বসেছে; বরিশাল সদরের সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জামাল হোসাইন বলেন, রয়না, সরপুঁটি, বাইম ও পাবদা বিলুপ্তির পথে, কৈ-শিং-মাগুর-শোলও দুষ্প্রাপ্য। রংপুরে তিস্তা-ঘাঘটে শুষ্ক মৌসুমে পানি না থাকায় আবাস নষ্ট হচ্ছে, সুনামগঞ্জের হাওরে অতিরিক্ত রাসায়নিক, প্রজনন মৌসুমে নিধন ও চায়না দুয়ারি জালকে দুষছেন স্থানীয়রা।
উরুগুয়ে, দুবাই, ওমান, ইয়েমেন, ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে মাছ আসে; ভারত ও মিয়ানমার থেকে রুই-কাতলাসহ মিঠাপানির মাছ বেশি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যে ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হিমায়িত রুই-কাতলা আমদানি হয়েছে ৫৯ লাখ ৭৩ হাজার ১৭৩ কেজি, শুল্কায়ন মূল্য ৬৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বেশি। ডব্লিউডব্লিউএফ ও লন্ডন জুলজিক্যাল সোসাইটির ‘দ্য ওয়ার্ল্ডস ফরগটেন ফিশেস’ প্রতিবেদনে বিশ্বের মিঠাপানির এক-তৃতীয়াংশ মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে, ৮০ প্রজাতি বিলুপ্ত; বাংলাদেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ৬৫ শতাংশ মিঠাপানির।
ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. জাহাঙ্গীর আলম জানান, ২০১৫ সালে ২৫৩ প্রজাতির ওপর গবেষণায় ৬৪টি বিপন্ন, সংকটাপন্ন বা মহাবিলুপ্তির পথে পাওয়া যায়; ২০২৬-এ নতুন গবেষণা চলছে। মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ শাখার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মঈন উদ্দিন আহমদ আমদানিকে মুক্তবাজারের স্বাভাবিকতা বললেও শাখার উপপরিচালক মোল্লা ইমদাদুল্লাহর মতে মূল সমস্যা নদীতে প্রবাহ না থাকা—ফারাক্কা বাঁধে প্রবাহ কম, অনেক নদী শুকিয়ে গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, পানি সমস্যার সমাধানে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে; প্রজননের পরিবেশ নিশ্চিত না হলে উৎপাদন বাড়বে না।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের ফারুক আহমাদ আরিফের প্রতিবেদন (রংপুর, বরিশাল, খুলনা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও ধর্মপাশার প্রতিবেদকদের সহযোগিতায়) অবলম্বনে। সূত্র: প্রতিদিনের বাংলাদেশ





মন্তব্য
(০)