বেকার তরুণ এবং গ্রামের নারী-পুরুষের আয়ের পথ হিসেবে বাণিজ্যিক ফুল চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল ২০২৫ সালের মার্চে জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শুরুতে খুব বেশি পুঁজির দরকার হয় না, খরচ জমির আকারের ওপর নির্ভর করে কম-বেশি হয়। দেশের প্রায় সব এলাকায় এখন বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ করা যায়: গ্রামের বিলে, বাড়ির পাশের জমিতে, এমনকি বাড়ির ছাদেও।
পানিসারা থেকে ২৪ জেলায়
দেশে বাণিজ্যিক ফুল চাষের শুরু ১৯৮৩ সালে, যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামে। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর কৃষক শের আলী ৩০ শতক জমিতে রজনীগন্ধা চাষ করে এই যাত্রা শুরু করেন। পরে পাশের গদখালী ও পানিসারা এলাকা দেশের ফুল চাষের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
কৃষি তথ্য সার্ভিসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে দেওয়ান আশরাফুল হোসেন ও মো. রশিদুল ইসলাম জানান, দেশের ২৪টি জেলায় প্রায় ৩,৫২০ হেক্টর জমিতে ফুল উৎপাদন হয়। এর মধ্যে খুলনা বিভাগেই প্রায় ২,৬০০ হেক্টর (৭৪ শতাংশ) এবং ঢাকা বিভাগে ৬৯০ হেক্টর (২০ শতাংশ)। নিবন্ধ অনুযায়ী, প্রায় ১৫ হাজার কৃষক ফুল উৎপাদনে যুক্ত, প্রায় দেড় লাখ মানুষ সরাসরি এ খাতে কাজ করেন এবং প্রায় ৭ লাখ মানুষের জীবিকা ফুলের সঙ্গে জড়িত। ২০১৪-১৫ সালে দেশে প্রায় ৫৭ হাজার টন ফুল উৎপাদন হয়, যার বিক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ৮০০ কোটি টাকা।

কোন ফুল, কখন বপন
জাগো নিউজের তালিকায় ছিল লাল ও সাদা গোলাপ, রজনীগন্ধা, গাঁদা, বেলি, কামিনী, সূর্যমুখী, জারবেরা, জিপসি, ডালিয়া, কসমস, পপি, গাজানিয়া, স্যালভিয়া, ডায়ান্থাস, ক্যালেন্ডুলা, পিটুনিয়া, ডেইজি, ভারবেনা, হেলিক্রিসাম, অ্যান্টিরিনাম, ন্যাস্টারশিয়াম, লুপিন, কারনেশন, প্যানজি, অ্যাস্টার ও চন্দ্রমল্লিকাসহ নানা জাতের ফুল। কৃষি তথ্য সার্ভিসের ওই নিবন্ধের হিসাবে বাজারে সবচেয়ে বড় অংশ গ্লাডিওলাসের (প্রায় ৩১ শতাংশ), এরপর গোলাপ (২৪ শতাংশ), রজনীগন্ধা (১৭ শতাংশ) ও গাঁদা (৮ শতাংশ)।
প্রতিবেদনে বীজ বপনের উপযুক্ত সময় বলা হয়েছিল অক্টোবর-নভেম্বর। কৃষি তথ্য সার্ভিসের আরেক নিবন্ধে কৃষিবিদ সিলমিন জাহান ইলমা সেপ্টেম্বর-অক্টোবরকে শীতকালীন ফুল চাষের উপযুক্ত সময় বলেছেন। ২০২৪ সালে প্লস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, দেশের বেশির ভাগ ফুল চাষ হয় শীত মৌসুমে, ডিসেম্বর থেকে মার্চে; বিয়ে ও উৎসবের চাহিদা এর বড় কারণ।
টবে ও জমিতে পরিচর্যা
প্রতিবেদন ও কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ মিলিয়ে চাষের মূল ধাপগুলো এরকম:
- টবসহ চারা কিনতে পাওয়া যায়; সাধারণত ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি মাপের টবই যথেষ্ট। ছাদবাগানের জন্য কৃষি তথ্য সার্ভিস ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি টব বা জিও ব্যাগের কথা বলেছে।
- টবের মাটিতে পর্যাপ্ত জৈব সার বা কম্পোস্ট মেশাতে হয়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ, অর্ধেক কোকোপিট আর অর্ধেক কম্পোস্ট, বালু ও মাটির মিশ্রণ।
- সাবধানে চারা রোপণের পর ঝাঁঝরি দিয়ে ওপর থেকে বৃষ্টির মতো পানি দিতে হয়, যাতে গাছ ও পাতা দুটোই ভেজে। শীতে কুয়াশা কেটে রোদ উঠলে সেচ দেওয়া ভালো।
- হেলে পড়া গাছের পাশে লাঠি পুঁতে বেঁধে সোজা রাখতে হয় এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা রাখতে হয়।
- ফোটা ফুল শুকিয়ে যাওয়ার আগেই কেটে দিলে গাছে ফুলের সংখ্যা বাড়ে।
- প্রয়োজনে কৃষিবিদের পরামর্শ নেওয়া যায়।
বিক্রি, লাভ ও কর্মসংস্থান
শহরে গিয়ে ফুল বিক্রি করতে ঝামেলা হয় এবং অনেক সময় ঠিকমতো দাম মেলে না। তাই প্রতিবেদনে উৎপাদিত ফুল বিক্রির জন্য নিজের এলাকাতেই ফুলের দোকান গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। গদখালীতে চাষিরা খোলা পাইকারি বাজারে ফুল বিক্রি করেন।
প্রতিবেদনের দাবি ছিল, অন্য ফসলের চেয়ে ফুল চাষে লাভ অনেক বেশি। প্লস ওয়ানের গবেষণায় উদ্ধৃত এক পুরোনো সমীক্ষায় রজনীগন্ধার নিট আয় কলার চেয়ে ৬৫ শতাংশ এবং পেঁপের চেয়ে ৭১ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়, যদিও এর উৎপাদন খরচও কলার চেয়ে ২৬ শতাংশ এবং পেঁপের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি।
ফুল চাষে বেকার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়। খেতের আগাছা পরিষ্কার, ফুল তোলা, মালা গাঁথাসহ নানা কাজে নারী ও পুরুষ দুজনেই যুক্ত হতে পারেন।


ছবি: Muhammad Amdad Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, কৃষি তথ্য সার্ভিস, দ্য ডেইলি স্টার, প্লস ওয়ান





মন্তব্য
(০)