গ্রামের পুকুরপাড়ের ঝোপে অমাবস্যার রাতে জ্বলা-নেভা আলোর বিন্দু—এক প্রজন্ম আগেও যা ছিল সাধারণ দৃশ্য, এখন অনেক গ্রামেই তা বিরল। ‘আমরাই শেষ প্রজন্ম, যারা জোনাকি দেখেছি’—ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া এই কথা পুরোপুরি সত্য না হলেও জোনাকি যে অনেক জায়গায় কমে যাচ্ছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের দুশ্চিন্তা আছে। কারণগুলোর প্রায় সবই কৃষি ও গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গে জড়িত।
জোনাকি নিজের শরীরেই আলো তৈরি করে—জীবন্ত প্রাণীর এই ক্ষমতাকে বলে জৈবদ্যুতি। লুসিফেরিন নামের রাসায়নিক ও লুসিফারেজ নামের এনজাইম অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে আলো জ্বলে ওঠে; আলোটি বৈদ্যুতিক বাতির মতো গরম নয়, আর অক্সিজেনের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে জোনাকি ইচ্ছেমতো তা জ্বালায়-নেভায়। এই আলো তাদের ভাষা: পুরুষ জোনাকি নির্দিষ্ট ছন্দে আলো জ্বালিয়ে স্ত্রী জোনাকির দৃষ্টি আকর্ষণ করে, আর লার্ভা আলো দিয়ে শিকারিকে সতর্ক করে। কিছু প্রজাতি আলোর বদলে গন্ধ ব্যবহার করে।
জোনাকির জীবনচক্র দীর্ঘ। পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওড়ার আগে অনেক প্রজাতির লার্ভা এক থেকে কয়েক বছর মাটির নিচে, ঝরা পাতার স্তূপে বা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় কাটায়। কীটনাশকে মাটি ও গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আর লার্ভার খাবার—ছোট শামুক, কেঁচো ও অন্যান্য পোকা—কমে যাচ্ছে। পুকুর, নদী ও জলাভূমির পাশের ঝোপঝাড় কেটে বাড়িঘর তোলায় হারাচ্ছে নিরাপদ আবাস। বাগানের সব ঝরা পাতা ঝাড়ু দিয়ে সাফ করার অভ্যাসও লার্ভার আশ্রয় নষ্ট করছে।
কৃত্রিম আলো আরেক বড় সমস্যা। বাড়ির আলো, রাস্তার বাতি ও গাড়ির হেডলাইটের দাপটে জোনাকির ছোট্ট আলোর সংকেত চোখেই পড়ে না, ফলে সঙ্গী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয় এবং নতুন প্রজন্ম আসে না। জলবায়ু পরিবর্তনও ভূমিকা রাখছে—অতিরিক্ত গরম, খরা ও দীর্ঘ সময় মাটি শুকিয়ে থাকায় জোনাকি প্রয়োজনীয় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ পাচ্ছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও ইতালির পাদোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করা নিলয় হাওলাদারের মতে, জোনাকি বাঁচাতে বড় কিছু করতে হবে না: বাড়ির আশপাশে কিছু গাছপালা ও ঝোপঝাড় থাকতে দেওয়া, অকারণ কীটনাশক ব্যবহার না করা, রাতের অপ্রয়োজনীয় আলো কমানো এবং ঝরা পাতার সবটুকু পরিষ্কার না করে কিছু জায়গা স্বাভাবিকভাবে পড়ে থাকতে দেওয়া। এতে জোনাকির লার্ভাসহ আরও অনেক ছোট প্রাণী আশ্রয় পাবে।
খেতের চারপাশের ঝোপ, পতিত জমি আর সংযত কীটনাশক—যে অভ্যাসগুলো জোনাকি ফেরাবে, সেগুলোই ফসলের মাঠে পরাগায়নকারী ও উপকারী পোকার টিকে থাকার শর্ত।
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)