আমন মৌসুম শুরুর মুহূর্তে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় সার নিয়ে অস্থিরতা চলছে। সরকার বলছে দেশে সারের কোনো সংকট নেই, মজুত পর্যাপ্ত; অথচ রাজশাহী, ঝিনাইদহ ও কুড়িগ্রামের কৃষকেরা বলছেন, অনুমোদিত ডিলারের কাছে চাহিদামতো সার মিলছে না এবং খুচরা দোকান থেকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। কুড়িগ্রামে একটি ডিলারের গুদাম ভেঙে সার লুটের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরও বেড়েছে।
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার কৃষক তোরাপ শেখ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "পাঁচ বিঘা জমিতে সার লাগবে পাঁচটা, দেয় একটা। লাগবে সকালে, দেয় দুপুরে। এই ভাবে খেত করতে পারবে কেউ?" ঝিনাইদহের কৃষক মোহাম্মদ জনির অভিযোগ, খুচরা দোকানে সার মিললেও বস্তাপ্রতি দুইশ থেকে পাঁচশ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ডিলাররা আবার বলছেন, তারাও চাহিদার তুলনায় কম সার পাচ্ছেন। রাজশাহীর এক ডিলারের হিসাবে এ মাসে তিনি টিএসপি ৬০ বস্তা, বিএডিসির ডিএপি ৬০ বস্তা, বাংলা ডিএপি ৭০ বস্তা ও পটাশ ৮০ বস্তা পেয়েছেন; ইউরিয়া থাকলেও বাকিগুলোয় টানাটানি।
সরকারের হিসাব ভিন্ন। মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, দেশে বর্তমানে ১৩ দশমিক ৬৫ লাখ মেট্রিক টন সার মজুত রয়েছে: ইউরিয়া ৪ দশমিক ৮২২ লাখ, টিএসপি ৩ দশমিক ৬৯ লাখ, ডিএপি ৩ দশমিক ৬৮ লাখ এবং এমওপি ১ দশমিক ৪৬ লাখ মেট্রিক টন। এর বাইরে আমদানি পর্যায়ে আছে ২ লাখ ১০ হাজার টন টিএসপি, ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিএপি ও ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন এমওপি। ২৪শে অগাস্ট সরকারি ক্রয় কমিটি ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে; তার এক সপ্তাহ আগে কানাডা, রাশিয়া ও সৌদি আরব থেকে আরও ১ লাখ ১৫ হাজার টনের অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিতরণে কিছু অনিয়ম আছে, তা উপদেষ্টাও স্বীকার করেছেন এবং বিপণন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার কথা বলেছেন। সার উত্তোলন, বিতরণ ও ডিলার নিয়োগ পর্যালোচনার জন্য তিন সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটির সদস্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, বিদ্যমান ডিলারশিপ বাতিল না করে ডিলারদের কমিশন বাড়ানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আরেক সদস্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর মতে, বাস্তব সংকটের চেয়ে রটনা বেশি; বিতরণ গতিশীল করতে প্রতিটি ইউনিয়নে আরও একজন করে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে।
আমদানিনির্ভরতাই বাংলাদেশের সার সরবরাহের বড় দুর্বলতা। বিসিআইসি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট চাহিদার প্রায় ৮৩ শতাংশ আমদানি করতে হয়েছে; গ্যাস সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি ও কাঁচামালের অভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো বছরের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন রাসায়নিক সারের চাহিদা, যার প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টনই ইউরিয়া।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা সরকারের 'বিতরণ সমস্যা' ব্যাখ্যা মানতে রাজি নন। অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের মতে, মাঠের সংকট মজুত ঘাটতিরই প্রতিফলন; আমন মৌসুমে আরও দেড় থেকে দুই মাস নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ লাগবে, তার আগেই এই অবস্থা উদ্বেগজনক। কয়েক দিন আগের জ্বালানি তেল সংকটের সঙ্গে তিনি এর মিল দেখছেন, যখন সরকার ঘাটতি নেই বললেও পাম্পে তেল মেলেনি। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, সরবরাহ অপ্রতুল হলেও যতটুকু সার আছে তা মাঠে যাচ্ছে না কেন, সেটিই প্রশ্ন; রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিপণনে নতুন মধ্যস্বত্বভোগী চক্র ঢুকেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
কৃষকের জন্য ঝুঁকিটা স্পষ্ট। পিক মৌসুমে সময়মতো সার না পেলে ফলন কমে, আর অনিশ্চয়তা থেকে অনেকে ভবিষ্যতের জন্য সার মজুত করতে শুরু করলে সংকট আরও বাড়ে। অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ, কোন উপজেলায় কত বরাদ্দ তা স্বচ্ছভাবে ঘোষণা করা হলে এবং সেই অনুযায়ী সরবরাহ হলে ডিলার পর্যায়ে মজুতদারির অভিযোগ উঠবে না।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)