মরক্কোর প্রাচীন শহর ফেজের কেন্দ্রে সবুজ টালির ছাদের নিচে সাড়ে এগারো শ বছরের বেশি সময় ধরে জ্ঞানচর্চা চলছে আল কারাউইয়্যিনে। ৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটিকে ইউনেস্কো ও গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এখনো চালু থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রাচীনতম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এর প্রতিষ্ঠাতা এক মুসলিম নারী, ফাতিমা আল-ফিহরির কথা।
তুলনা হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় ইতালির বোলোনিয়া চালু হয় ১০৮৮ সালে, তারও পরে অক্সফোর্ড, আর কেমব্রিজ ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে। স্বীকৃতিটি অবশ্য চালু থাকা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে; তক্ষশীলা বা নালন্দার মতো প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্র এখন আর চালু নেই।
চতুর্দশ শতকের ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জারের ‘রাওয আল-কিরতাস’ গ্রন্থের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, কুরাইশ বংশের বণিক পরিবারে আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দে তিউনিসিয়ার কাইরুয়ানে ফাতিমার জন্ম। বাবা মুহাম্মদ আল-ফিহরি ভাগ্য ফেরাতে মরক্কোয় গিয়ে ফেজে ধনী ব্যবসায়ী হন এবং সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা দেন। অল্প বয়সে স্বামী, পরে বাবা ও ভাইকে হারিয়ে ফাতিমা ও বোন মারিয়াম বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন।
দুই বোন সিদ্ধান্ত নেন, সম্পদ খরচ হবে মানুষের কল্যাণে। মারিয়াম গড়েন আল আন্দালুস মসজিদ। ফাতিমা গড়েন মসজিদের সঙ্গে বড় একটি মাদরাসাসহ কমপ্লেক্স; হিজরি ২৪৫ সালের পহেলা রমজান, অর্থাৎ ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে কাজ শুরু হয়। মূল ভবন দুই বছরে দাঁড়ালেও পুরো কমপ্লেক্সে ১২ থেকে ১৮ বছর লেগেছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় আছে। ইবনে আবি জার লিখেছেন, ফাতিমা নিজে নির্মাণ তদারক করতেন এবং কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত রোজা রেখেছিলেন। জন্মস্থান কাইরুয়ানের নামে নাম রাখা হয় আল কারাউইয়্যিন।
শুরুতে ১০০ ফুট দৈর্ঘ্যের মসজিদটি ৯৫৬ সালে কর্ডোভার শাসক তৃতীয় আব্দুর রহমানের উদ্যোগে প্রথম সম্প্রসারিত হয়, পরে দ্বাদশ ও ষোড়শ শতকে আরও দুবার। এখন দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭২ ফুট, একসঙ্গে প্রায় ২২ হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। ১৩৫৯ সালে মারিনিদ শাসনামলে সম্প্রসারিত গ্রন্থাগারে মধ্যযুগের ২০ হাজারের বেশি হাতে লেখা বই আছে, যার প্রায় চার হাজার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি; এর মধ্যে ইমাম মালিকের আল-মুওয়াত্তা, ইবনে ইসহাকের সিরাত এবং ইবনে খালদুনের মুকাদ্দিমাহর পাণ্ডুলিপি রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আল কারাউইয়্যিনকে ঘিরে ফেজ হয়ে ওঠে আফ্রিকায় ইসলামী শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। নারীরাও আলাদা জায়গায় পড়তে পারতেন, ফাতিমা নিজেও সেখানে পড়তেন বলে জানা যায়। শুরুতে ইসলামী শিক্ষায় জোর থাকলেও পরে ভাষা, ব্যাকরণ, আইন ও গণিতের মতো বিষয়ও পড়ানো শুরু হয়।
প্রতিবেদনটি নয়া দিগন্তে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে।
ছবি: Younesberrada / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: নয়া দিগন্ত





মন্তব্য
(০)