এল নিনোর প্রভাবে শ্রীলঙ্কার সাত জেলায় তীব্র শুষ্কতায় এক লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, আট থেকে সাড়ে আট হাজার একরের ফসল নষ্ট এবং কৃষকের ক্ষতিপূরণে প্রায় ৩০০ কোটি রুপি বরাদ্দ—দক্ষিণ এশিয়ার এই চিত্রকে বাংলাদেশের জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন কৃষি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাসে এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়ে আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত টিকতে পারে; ২১ আগস্টের বিবিসি ওয়েদারের প্রতিবেদনে এটিকে ‘জীবিত মানুষের স্মৃতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী’ এল নিনো হয়ে ওঠার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি এবং তা ৩ ডিগ্রি ছাড়াতে পারে।
বাংলাদেশে চলতি বছরের আবহাওয়া এমনিতেই অস্বাভাবিক। ২০২৫ সালের নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি হয়নি; মার্চে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৮ শতাংশ, এপ্রিলে ৭৮ ও মে-তে ৭.৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হলেও বর্ষার জুনে ৩০ শতাংশ কম, জুলাইয়ে ৩৭ শতাংশ বেশি এবং আগস্টে ৫.৭ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে সেপ্টেম্বরেও স্বাভাবিকের কম বৃষ্টি, দুই-তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ ও কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কেন্দ্রে চলতি আমনের শেষ ভাগ, শীতকালীন ফসল আর সবচেয়ে বেশি বোরো। মৌসুমি বৃষ্টি কমলে আমনের চারা রোপণ ও বাড়ে ওঠায় পানির টান পড়তে পারে; বেশি তাপে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমলে আলু, পেঁয়াজ, গম, ভুট্টা, সরিষা ও শীতকালীন সবজিতে সেচের চাহিদা বাড়বে, উষ্ণ শীত এসব ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে। বিবিএসের প্রাথমিক হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ধান উৎপাদন ২ কোটি ১৩ লাখ টন, যার প্রায় ৫৫ শতাংশ বোরো থেকে—ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে রোপণ, এপ্রিল-মে-তে কাটা এই শুষ্ক মৌসুমের ফসল সেচের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইআরআরআই) বাংলাদেশ কার্যালয়ের ক্রপিং সিস্টেমস এগ্রোনমিস্ট শরীফ আহমেদ বলেন, বোরোর জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ফুল আসার সময়ের তাপপ্রবাহ, বিশেষত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে: দিনে ৩৫ ডিগ্রি ও রাতে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা থাকলে ধানের ফুল বন্ধ্যা হয়ে শিষে দানা ফাঁকা থেকে যেতে পারে; তাপ বাড়লে সেচের চাহিদাও বাড়বে, আর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগের।
এই সতর্কতা এমন বছরে এল, যখন ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে-র টানা বৃষ্টি, উজানের ঢল ও বন্যায় হাওরের সাত জেলায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টরের ফসল, প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার টন বোরো নষ্ট হয়েছে ও ২ লাখ ৩৬ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত (সিপিডির হিসাবে ক্ষতি ৩ লাখ ৩৯ হাজার টন), আর জুলাইয়ের বন্যায় ডিএইর তথ্যে প্রায় ৮২ হাজার হেক্টরের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত। ডব্লিউএমওর মতে রেকর্ডের পাঁচটি শক্তিশালী এল নিনোর একটি ২০২৩-২৪-এর; আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ মনে করিয়ে দেন, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে টানা ৩৫ দিন তাপপ্রবাহ ছিল, শীতের বৃষ্টি ও দীর্ঘ ঠান্ডায়ও ফসলের ক্ষতি হয়েছিল।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদের মতে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এবার আরও জোরালো প্রভাবের পূর্বাভাস দিলেও সেই মাত্রায় সরকারের প্রস্তুতি নেই; অঞ্চলভেদে রোপণের সময় বদল, স্বল্পমেয়াদি ও তাপসহনশীল জাত, সময়মতো সেচ এবং অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (এডব্লিউডি) পদ্ধতির কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন বলেন, দুর্যোগের পর ক্ষতিপূরণের চেয়ে আগে ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থাই কার্যকর, বাংলাদেশে তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দরকার।
বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, অধিকাংশ কৃষক এল নিনো কী জানেন না, অথচ প্রভাব তাঁদেরই বইতে হবে; আবহাওয়া অধিদপ্তর, ডিএই, বারি ও ব্রির মধ্যে শক্ত সমন্বয় করে কৃষককে বলতে হবে কোন এলাকায় কত বৃষ্টি হতে পারে, কোন ফসল ঝুঁকিতে, কখন সেচ, কখন বীজ, কখন কাটা—উপকূলীয়, খরাপ্রবণ ও বন্যাপ্রবণ এলাকাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে। ডিএই মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম বলেন, জলবায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই, চেষ্টা ক্ষয়ক্ষতি কমানোর: বন্যাপ্রবণ হাওরে স্বাভাবিকের চেয়ে ১০–১৫ দিন আগে কাটা যায় এমন আগাম জাত ব্রি ধান-১১৮ চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং দুর্যোগের আশঙ্কা দেখা দিলে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
চাষাবাদের প্রতিবেদন অবলম্বনে। সূত্র: চাষাবাদ





মন্তব্য
(০)