সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ২ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা৩৩°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৫০%বাতাস ৮ কিমি/ঘ

খামার বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির পদ্ধতি: পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক কৃষি উদ্যোগ

গোবর, মুরগির বিষ্ঠা, খড়, সবজির খোসা আর ঝরা পাতা ফেলে না দিয়ে বানানো যায় কম্পোস্ট ও কেঁচো সার। জায়গা বাছাই, স্তর সাজানো, আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা ঠিক রাখা, স্তূপ উল্টে দেওয়া থেকে জমিতে প্রয়োগ পর্যন্ত পুরো পদ্ধতি, আর মাটি ও কৃষকের খরচে এর প্রভাব।

খামার বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির পদ্ধতি: পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক কৃষি উদ্যোগ
জৈব

গোয়ালঘরের পাশে গোবরের স্তূপ, উঠানের কোণে জমে থাকা খড় আর ঝরা পাতা, রান্নাঘরের পেছনে সবজির খোসা। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে এগুলো প্রতিদিন জমে, আর বেশির ভাগই হয় পুড়িয়ে ফেলা হয়, নয়তো নালায় ফেলে দেওয়া হয়। অথচ ঠিকভাবে সাজিয়ে পচাতে পারলে এই বর্জ্যই হয়ে ওঠে মানসম্পন্ন জৈব সার, যা মাটির উর্বরতা বাড়িয়ে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে। গোবর, মুরগির বিষ্ঠা, ঝরা পাতা, শস্যের খোসা ও অন্যান্য জৈব উপাদান থেকে জৈব সার তৈরি তাই একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব, কম খরচের এবং লাভজনক একটি উদ্যোগ।

ক্ষুধার্ত মাটি


জৈব সারের প্রয়োজন কতটা, তা বোঝা যায় আমাদের মাটির অবস্থা দেখলে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বেশির ভাগ জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ দেড় শতাংশের কম, অথচ ভালো মাটিতে অন্তত আড়াই শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা দরকার। বছরে দুই-তিনটি ফসল ফলানোর চাপে মাটি থেকে যা বেরিয়ে যাচ্ছে, তা ফেরত যাচ্ছে না।

রাসায়নিক সার গাছকে দ্রুত খাবার জোগায়, কিন্তু মাটির জৈব পদার্থ ফেরত দেয় না। জৈব পদার্থই মাটিকে ঝুরঝুরে রাখে, পানি ধরে রাখে, আর মাটির ভেতরের অসংখ্য উপকারী জীবাণু ও কেঁচোর খাবার জোগায়। এই ঘাটতি পূরণের সবচেয়ে হাতের কাছের উপায় হলো খামারের বর্জ্য থেকে তৈরি জৈব সার।

একটা প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে: গোবর বা মুরগির বিষ্ঠা তো এমনিতেই সার, তাহলে এত আয়োজন করে পচানোর দরকার কী? দরকার আছে। কাঁচা গোবর বা বিষ্ঠা সরাসরি জমিতে দিলে তা মাটিতে পচতে গিয়ে তাপ ও গ্যাস ছাড়ে, যা কচি শিকড়ের ক্ষতি করতে পারে। এতে আগাছার বীজ ও রোগজীবাণুও থেকে যায়, আর পুষ্টির একটা অংশ গন্ধের সঙ্গে বাতাসে মিলিয়ে যায়। নিয়ম মেনে পচানো সার এসব সমস্যা থেকে মুক্ত, গাছ তার পুষ্টি ধীরে ধীরে ও নিরাপদে পায়।

অন্যদিকে যে খড়, পাতা বা খোসা পুড়িয়ে ফেলা হয়, তার সঙ্গে পুড়ে যায় মাটিতে ফেরত যাওয়ার মতো জৈব পদার্থও, আর বাড়ে ধোঁয়া ও দূষণ। একই বর্জ্য গর্তে বা স্তূপে জমালে তা আবর্জনা থেকে সম্পদে পরিণত হয়।

জৈব সার তৈরির লাভ


খামার বা ঘরের জৈব বর্জ্য থেকে সার তৈরির উপকারিতা কয়েক দিক থেকে দেখা যায়।

প্রথমত, মাটির উর্বরতা বাড়ে। জৈব সার মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করে, পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি পূরণ করে এবং মাটিকে দীর্ঘমেয়াদে উর্বর রাখে। এতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের মতো প্রধান পুষ্টি উপাদান থাকে। দ্বিতীয়ত, মাটির গঠন ভালো হয়। জৈব সার মাটির দানাগুলোকে মজবুতভাবে বাঁধে, পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায়, মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং শিকড় ঠিকমতো ছড়াতে সাহায্য করে।

তৃতীয়ত, ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়ে। জৈব সার ফসলকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে, গাছের শিকড় শক্তিশালী করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। চতুর্থত, মাটির জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হয়। মাটির উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও কেঁচোর সংখ্যা বাড়ে, মাটির প্রাকৃতিক পুষ্টি পুনরুদ্ধার হয় এবং ফসলের গুণগত মানও উন্নত হয়।

পঞ্চমত, খরচ সাশ্রয়। খামারেই পাওয়া বর্জ্য দিয়ে জৈব সার তৈরি করা যায়, যা কেনা রাসায়নিক সারের চেয়ে অনেক সস্তা। ষষ্ঠত, পরিবেশ রক্ষা। রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমলে মাটি ও পানির দূষণ কমে, আর খামারের বর্জ্য অপচয় না হয়ে কাজে লাগে। রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদে মাটির অম্লতা ও ক্ষারত্বের ভারসাম্য, অর্থাৎ পিএইচ নষ্ট হতে পারে; জৈব সার সেই ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে এবং মাটির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য বজায় রাখে। প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি বলে এটি ফসলের জন্যও নিরাপদ।

কচুরিপানার কথাও আলাদা করে বলা দরকার। দেশের পুকুর, খাল ও বিলে এটি প্রচুর জন্মায় এবং অনেক সময় জলাশয়ের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কেটে তুলে কিছুটা শুকিয়ে গোবরের সঙ্গে স্তরে স্তরে সাজালে কচুরিপানা ভালো কম্পোস্টের উপাদান হয়।

কী কী লাগবে


জৈব সার তৈরির উপকরণ খুঁজতে দূরে যেতে হয় না। প্রায় সবই খামারে, বাড়িতে বা স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায়। মোটা দাগে উপকরণগুলো এরকম:

  • পশুর মলমূত্র: গরু, মুরগি বা ভেড়ার মল ও মূত্র।
  • শস্যের অবশিষ্টাংশ: ধান, গম, ভুট্টা বা অন্য ফসল কাটার পর থেকে যাওয়া অংশ।
  • খড় বা শুকনো ঘাস, যা স্তূপে কার্বন জোগায়।
  • খাদ্য বর্জ্য: বাসি খাবার, পচা ফল, শাকসবজির খোসা, আলুর খোসা, কলার খোসা।
  • পাতা ও গাছের অংশ: নিম, বকাইন বা অন্য গাছের শুকনো পাতা, গাছের ছাল বা বাকল।
  • প্রাকৃতিক সহায়ক উপাদান: পিএইচ নিয়ন্ত্রণের জন্য চুন, পচন দ্রুত করার জন্য এপসম লবণ, আর কেঁচো সারের জন্য কেঁচো।
  • মাটির উপাদান: অল্প বালি বা মাটির পাতলা স্তর, ওপরের মাটি।
  • অন্যান্য: কাঠের গুঁড়া বা করাতের গুঁড়া, প্রয়োজনে কাগজ বা কার্ডবোর্ড।
  • পরিষ্কার পানি, স্তূপের আর্দ্রতা ধরে রাখতে।

উপকরণগুলোকে দুই দলে ভাগ করে ভাবলে কাজ সুবিধাজনক হয়। শুকনো, বাদামি উপাদান, যেমন খড়, শুকনো পাতা, গাছের বাকল ও কাঠের গুঁড়া, মূলত কার্বন জোগায়। আর তাজা, ভেজা উপাদান, যেমন গোবর, মুরগির বিষ্ঠা, সবজি ও ফলের খোসা, নাইট্রোজেন জোগায়। পচনের কাজ করে যে জীবাণুরা, তাদের দুটোই দরকার: কার্বন তাদের শক্তি, নাইট্রোজেন তাদের দেহ গড়ার উপাদান।

অনুপাতের হিসাব: ৩০ ভাগ কার্বনে ১ ভাগ নাইট্রোজেন


কম্পোস্টের সাফল্যের বড় রহস্য এই অনুপাতে। কার্বন ও নাইট্রোজেনের অনুপাত ৩০:১ হওয়া উচিত। শুকনো উপাদান বেশি হলে পচন ধীর হয়ে যায়, স্তূপ মাসের পর মাস প্রায় একই রকম পড়ে থাকে। আবার নাইট্রোজেন বেশি হলে, অর্থাৎ শুধু গোবর বা খোসা দিয়ে স্তূপ বানালে, সেখান থেকে দুর্গন্ধ বের হয় এবং পুষ্টি গ্যাস হয়ে উড়ে যায়।

মাঠের কাজে ওজন মেপে অনুপাত মেলানো সম্ভব নয়, তাই চোখের আন্দাজই ভরসা। শুকনো ও তাজা উপাদানের স্তর পালাক্রমে সাজানো, আর স্তূপ থেকে দুর্গন্ধ এলে শুকনো উপাদান বাড়ানো, পচন ধীর মনে হলে তাজা উপাদান বাড়ানো, এই নিয়ম মেনে চললেই অনুপাত মোটামুটি ঠিক থাকে।

ধাপে ধাপে কম্পোস্ট


খামার বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যায়।

প্রথম ধাপ স্থান নির্বাচন। ছায়াযুক্ত ও শুকনো একটি জায়গা বেছে নিতে হবে। মাটিতে একটি চৌবাচ্চা বা ৩ থেকে ৫ ফুট গভীর গর্ত তৈরি করতে হবে। জায়গাটি এমন উঁচু হওয়া চাই, যেখানে বর্ষায় পানি জমে না। সরাসরি রোদে স্তূপ দ্রুত শুকিয়ে যায়, আর পানি জমলে স্তূপ পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়; ছায়া আর উঁচু জমি এই দুই বিপদ থেকে বাঁচায়।

গর্ত না স্তূপ, সেটি ঠিক করতে হয় এলাকার পানির অবস্থা দেখে। শুকনো মৌসুমে বা উঁচু জমিতে গর্তে কম্পোস্ট ভালো হয়, কারণ গর্তে আর্দ্রতা বেশি দিন থাকে। কিন্তু নিচু এলাকায়, যেখানে বর্ষায় মাটির নিচের পানি ওপরে উঠে আসে, সেখানে গর্তে পানি জমে যায়। তখন মাটির ওপরে উঁচু জায়গায় স্তূপ করে কম্পোস্ট বানানোই নিরাপদ, আর স্তূপের ওপর চালা বা পলিথিনের ছাউনি দিলে ভালো হয়।

দ্বিতীয় ধাপ উপকরণ সংগ্রহ ও প্রস্তুতি। পশুর মলমূত্র, শস্যের অবশিষ্টাংশ, পাতা, ঘাস, বাসি খাবার, সবজির খোসা, খড়, শুকনো পাতা, নিমপাতা ও গাছের বাকল জোগাড় করে মেশানোর জন্য প্রস্তুত করতে হবে। বড় ডালপালা বা লম্বা খড় কেটে ছোট করে নিলে পচন দ্রুত হয়।

তৃতীয় ধাপ স্তর সাজানো। গর্ত বা চৌবাচ্চার একদম নিচে শুকনো উপাদান, যেমন খড় বা শুকনো পাতা বিছিয়ে দিতে হবে। এর ওপর জৈব বর্জ্য ছড়িয়ে দিতে হবে। এভাবে একের পর এক স্তর তৈরি করতে হবে, প্রতিটি স্তর প্রায় ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি পুরু। স্তরের মাঝে মাঝে অল্প মাটি বা ওপরের মাটির পাতলা আস্তরণ দিলে তাতে থাকা জীবাণু পচন শুরু করতে সাহায্য করে।

স্তূপের আকারও গুরুত্বপূর্ণ। খুব ছোট স্তূপ ভেতরের তাপ ধরে রাখতে পারে না, ফলে পচন ধীর হয় এবং জীবাণু ও আগাছার বীজ মরে না। আবার অতিরিক্ত বড় ও উঁচু স্তূপের মাঝখানে বাতাস পৌঁছায় না, ভেতরটা দম বন্ধ হয়ে পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। তাই একবারে একটি মাঝারি আকারের স্তূপ বা গর্ত ভরাট করে, তারপর পাশে নতুন গর্ত শুরু করাই ভালো। এতে একটি স্তূপ যখন পাকছে, আরেকটিতে তখন নতুন বর্জ্য জমা হতে থাকে, আর সারা বছর হাতে কিছু না কিছু সার থাকে।

চতুর্থ ধাপ আর্দ্রতা ধরে রাখা। প্রতিটি স্তরে পর্যাপ্ত পানি দিতে হবে, যাতে পুরো মিশ্রণের আর্দ্রতা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ থাকে। মিশ্রণ বেশি শুকনো হলে পচন ধীর হয়ে যায়; আবার অতিরিক্ত ভেজা হলে শুকনো উপাদান যোগ করতে হয়। আর্দ্রতা পরীক্ষার ঘরোয়া পদ্ধতি হলো এক মুঠো মিশ্রণ হাতে নিয়ে চেপে ধরা: হাত ভিজে যাবে, কিন্তু পানি গড়িয়ে পড়বে না, তাহলে বুঝতে হবে আর্দ্রতা ঠিক আছে।

পঞ্চম ধাপ স্তূপ উল্টে দেওয়া। প্রতি ১০ থেকে ১৫ দিন অন্তর স্তূপ উল্টে দিতে হবে। এতে ভেতরে বাতাস চলাচল করে, আর বাইরের কম পচা অংশ ভেতরে চলে গিয়ে সমানভাবে পচে। পচন প্রক্রিয়া চলার সময় স্তূপের ভেতরের তাপমাত্রা ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে থাকা উচিত। এই উষ্ণতাতেই জীবাণুরা সবচেয়ে সক্রিয় থাকে, আর আগাছার বীজ ও অনেক রোগজীবাণু মরে যায়। স্তূপে একটি লোহার রড বা লাঠি ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ পর বের করে হাতে ছুঁয়ে দেখলে ভেতরের গরম ভাব আন্দাজ করা যায়।

স্তূপের ভেতরে এই সময়টায় আসলে কী ঘটে, তা জানলে কাজটা বোঝা আরও সুবিধাজনক হয়। প্রথম কয়েক দিনে জীবাণুরা দ্রুত বংশ বাড়ায় এবং তাদের কাজের ফলে স্তূপ গরম হতে থাকে। এরপর আসে সবচেয়ে গরম পর্ব, যখন তাপ সহ্য করতে পারে এমন জীবাণুরা নরম উপাদানগুলো ভেঙে ফেলে। নরম খাবার ফুরিয়ে এলে তাপ ধীরে ধীরে কমে, তখন ছত্রাক, কেঁচো ও ছোট ছোট প্রাণী শক্ত অংশগুলো ভাঙার কাজ শেষ করে। স্তূপ উল্টে দেওয়ার পর আবার গরম হয়ে ওঠা মানে পচন ঠিকঠাক চলছে; উল্টানোর পরও আর গরম না হলে বুঝতে হবে সার পরিপক্ব হওয়ার পথে।

ষষ্ঠ ধাপ পচন সম্পন্ন হওয়া। দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সারের রং কালচে হয়ে আসে, দুর্গন্ধ চলে যায়, মিশ্রণ ঝুরঝুরে হয় এবং আলাদা করে কোনো উপাদান চেনা যায় না। তখন জৈব সার জমিতে ব্যবহারের উপযোগী হয়।

বায়োগ্যাসের স্লারিও সার


যেসব বাড়িতে গোবর দিয়ে বায়োগ্যাস প্লান্ট চলে, সেখানে রান্নার গ্যাস বের হওয়ার পর যে তরল বা আধা তরল অংশ বেরিয়ে আসে, তাকে স্লারি বলা হয়। এটিও একটি ভালো জৈব সার। গ্যাস তৈরির সময় গোবরের জৈব পদার্থের একটা অংশ ভেঙে যায়, কিন্তু পুষ্টির বড় অংশ স্লারিতে থেকে যায়। স্লারি সরাসরি জমিতে দেওয়া যায়, আবার খড়, পাতা বা কচুরিপানার সঙ্গে মিশিয়ে কম্পোস্টের স্তূপে দিলে শুকনো উপাদানগুলো দ্রুত পচে। স্লারি খোলা জায়গায় ফেলে রাখলে তা নালায় গিয়ে পানি দূষিত করে, তাই একে সার হিসেবে কাজে লাগানোই সবচেয়ে ভালো ব্যবহার।

ট্রাইকো-কম্পোস্ট: সারের সঙ্গে রোগের পাহারা


কম্পোস্টের একটি উন্নত রূপ দেশে উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)। এর নাম ট্রাইকো-কম্পোস্ট। ট্রাইকোডার্মা নামের একটি উপকারী ছত্রাকের স্পোর বা বীজকণা মিশিয়ে এতে গোবর, মুরগির বিষ্ঠা, কচুরিপানা, সবজির বর্জ্য, করাতের গুঁড়া, ভুট্টার ভুসি ও চিটাগুড় পচানো হয়। এই ছত্রাক মাটিবাহিত কয়েকটি ক্ষতিকর ছত্রাকের বিরুদ্ধে কাজ করে, ফলে সার একই সঙ্গে মাটির পুষ্টি জোগায় এবং চারাকে কিছু রোগ থেকেও সুরক্ষা দেয়।

এই পদ্ধতি নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, গ্রীষ্মে গড় তাপমাত্রা যখন ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি, তখন ট্রাইকো-কম্পোস্ট তৈরি হতে মোটামুটি ৪৫ দিন লাগে; শীতে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রিতে নেমে গেলে সময় লাগে ৭০ দিন পর্যন্ত। দেশে এখন বাণিজ্যিকভাবেও ট্রাইকো-কম্পোস্ট উৎপাদন ও বিক্রি হয়।

কেঁচো সার: আরও দ্রুত, আরও সমৃদ্ধ


কম্পোস্টের আরেকটি রূপ হলো কেঁচো সার বা ভার্মিকম্পোস্ট। এতে আধা পচা উপাদান, বিশেষ করে গোবর, কেঁচোকে খেতে দেওয়া হয়। ছায়াযুক্ত বেড, চাড়ি বা রিংয়ে আইসেনিয়া ফেটিডা প্রজাতির লাল কেঁচো ছেড়ে দিলে তারা উপাদান খেয়ে যে দানাদার মল ছাড়ে, সেটিই কেঁচো সার। মোটামুটি ৪৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে এই সার সংগ্রহ করা যায়।

কেঁচো সার তৈরিতে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হয়। কাঁচা গোবর সরাসরি কেঁচোকে দিলে তার গরম ভাব ও গ্যাসে কেঁচো মারা যেতে পারে, তাই গোবর কয়েক দিন রেখে ঠান্ডা ও আধা পচা করে নিতে হয়। বেড বা চাড়ি রাখতে হয় ছায়ায়, যেখানে সরাসরি রোদ ও বৃষ্টির পানি পড়ে না। মিশ্রণ ভেজা থাকবে, কিন্তু পানি জমবে না। পিঁপড়া, ইঁদুর, মুরগি ও পাখি কেঁচোর শত্রু, তাই বেড ঢেকে রাখা এবং চাড়ির পায়ার নিচে পানি রেখে পিঁপড়া ঠেকানো ভালো অভ্যাস। সার তৈরি হলে ওপরের স্তর থেকে তুলে ছেঁকে কেঁচো আলাদা করা হয়, আর সেই কেঁচো দিয়ে আবার নতুন বেড শুরু করা যায়।

দেশে কেঁচো সার এখন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের আয়ের উৎসও হয়ে উঠছে। দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী, এই পাঁচ জেলায় বছরে প্রায় ৫৫ হাজার টন কেঁচো সার উৎপাদন হচ্ছে, যেখানে চাহিদা প্রায় ৭৫ হাজার টন। ওই পাঁচ জেলায় প্রায় ১০ হাজার কৃষক কেঁচো সার তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। চাহিদা আর উৎপাদনের এই ফারাক বলছে, বাজারে জায়গা এখনো ফাঁকা।

একই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এর অর্থনীতির হিসাবও। নিজের গোবর থাকলে কেজিপ্রতি কেঁচো সার তৈরির খরচ ৪ টাকায় নামিয়ে আনা যায়, গোবর কিনলে খরচ পড়ে প্রায় ৭ টাকা, আর বাজারে বিক্রি হয় কেজিপ্রতি প্রায় ১২ টাকায়। বাড়তি আয় আসে কেঁচো বিক্রি থেকেও, যার কেজি ৯০০ থেকে ১,২০০ টাকা। একজন কৃষক বছরে ১০ টন পর্যন্ত কেঁচো সার উৎপাদন করতে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। শুধু কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলাতেই প্রায় ৬০০ প্রান্তিক কৃষক এ কাজে যুক্ত। আরডিআরএস বাংলাদেশ ও কর্ডএইডের যৌথভাবে বাস্তবায়িত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্প কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং নতুন উৎপাদকদের কেঁচো বিতরণ করছে।

যেসব ভুল এড়াতে হবে


জৈব সার তৈরির সময় কয়েকটি করণীয় ও সতর্কতা মনে রাখা জরুরি:

  • পচন দ্রুত করতে নিমপাতা, চুন বা এপসম লবণ যোগ করা যায়।
  • মিশ্রণে কোনো ধরনের রাসায়নিক সার বা কীটনাশক দেবেন না; এতে সারের প্রাকৃতিক গুণ ও উপকারী জীবাণু নষ্ট হয়।
  • বৃষ্টির সময় গর্ত বা স্তূপ পলিথিন বা ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখুন, নইলে পুষ্টি ধুয়ে যায় আর স্তূপ অতিরিক্ত ভিজে যায়।
  • সঠিক অনুপাতে কার্বন (শুকনো উপাদান) ও নাইট্রোজেন (তাজা বর্জ্য) মেশান।
  • প্রয়োজন অনুযায়ী সারের পরিমাণ তৈরি করুন; অতিরিক্ত সার দীর্ঘদিন জমিয়ে রাখলে এর গুণগত মান কমে যেতে পারে।

কাজের মাঝে কিছু সংকেত দেখে বোঝা যায় স্তূপে কী সমস্যা হচ্ছে, আর তার প্রতিকারও হাতের কাছেই:

  • পচা ডিমের মতো দুর্গন্ধ: স্তূপ বেশি ভেজা বা নাইট্রোজেন বেশি। শুকনো খড় বা পাতা মিশিয়ে স্তূপ উল্টে দিন।
  • অ্যামোনিয়ার ঝাঁঝালো গন্ধ: তাজা বর্জ্য বেশি হয়ে গেছে। কার্বনসমৃদ্ধ শুকনো উপাদান বাড়ান।
  • স্তূপ ঠান্ডা ও শুকনো, কিছুই পচছে না: পানি ও তাজা উপাদানের ঘাটতি। পানি ছিটিয়ে গোবর মিশিয়ে উল্টে দিন।
  • মাছি বা পোকার উপদ্রব: খাদ্য বর্জ্য খোলা পড়ে আছে। বর্জ্য স্তূপের ভেতরে ঢুকিয়ে ওপরে মাটি বা শুকনো পাতার আস্তরণ দিন।

খাদ্য বর্জ্য দেওয়ার আগে তা থেকে পলিথিন, প্লাস্টিক, কাচ ও ধাতব টুকরা বেছে ফেলতে হবে। এগুলো পচে না, বরং সারের মান নষ্ট করে এবং পরে জমিতে গিয়ে মাটির ক্ষতি করে।

তৈরি সার জমিতে দেওয়ার সময়ও নিয়ম আছে। জমি তৈরির সময় হেক্টরপ্রতি ৩ থেকে ৫ টন জৈব সার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়। তবে কোন ফসলে কতটা লাগবে এবং রাসায়নিক সার কতটা কমানো যাবে, সে বিষয়ে মাটি পরীক্ষার ফল ও উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই নিরাপদ।

তৈরি সার শুধু মাঠের ফসলে নয়, বাড়ির সবজি বাগান, ফলগাছের গর্ত ও টবের গাছেও কাজে লাগে। সবজির বেড তৈরির সময় মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া, ফলের চারা লাগানোর আগে গর্তের মাটির সঙ্গে মেশানো, কিংবা টবের মাটির একটা অংশ হিসেবে ব্যবহার, সবখানেই জৈব সার মাটিকে ঝুরঝুরে ও প্রাণবন্ত রাখে। নিজের প্রয়োজনের বাড়তি সার প্রতিবেশীর কাছে বিক্রি করাও সম্ভব।

সময়ের হিসাবও মাথায় রাখা দরকার। একটি কম্পোস্ট স্তূপ পাকতে দুই থেকে তিন মাস লাগে, তাই যে মৌসুমে সার লাগবে, তার অন্তত তিন মাস আগে কাজ শুরু করতে হয়। যেমন রবি মৌসুমের সবজি বা আলুর জমি তৈরির সময় সার চাইলে বর্ষার শেষ দিকেই স্তূপ সাজানো শুরু করা ভালো। আগে থেকে পরিকল্পনা না থাকলে ঠিক প্রয়োজনের সময় হাতে সার থাকে না, আর তখন আবার কেনা সারের দিকেই ঝুঁকতে হয়।

খামারের আবর্জনা থেকে মাঠের পুঁজি


খামার বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির মাধ্যমে কৃষিতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি ফসল উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি খরচ কমায়, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে এবং পরিবেশ দূষণ কমায়। রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সার ব্যবহার করলে কৃষি হয়ে ওঠে আরও পরিবেশবান্ধব ও টেকসই।

গোয়ালঘরের পাশের যে গোবরের স্তূপ দিয়ে এই লেখা শুরু হয়েছিল, সঠিক জায়গা, সঠিক স্তর, পরিমিত পানি আর কয়েক মাসের ধৈর্য পেলে সেটিই হয়ে ওঠে জমির সবচেয়ে সস্তা ও টেকসই খাবার।

ছবি: কম্পোস্টের কেঁচো (Eisenia fetida), Toby Hudson / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

জৈব

সম্পর্কিত খবর

জৈব

ইউরোপের জৈব কৃষিতে জাত উদ্ভাবনের নতুন নিয়মে কৃষকের পছন্দ কমতে পারে: ইউরোসিডস

ইইউর জৈব উৎপাদন বিধি সংশোধন নিয়ে অবস্থানপত্রে বীজশিল্পের সংগঠন ইউরোসিডস সংশোধনী ১৪ বাদ দিতে বলেছে, যা জৈব জাত কীভাবে উদ্ভাবন হবে সে বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনকে বাড়তি নিয়ম করার ক্ষমতা দিত।

Seed World Europe২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফসল

আচ্ছাদন ফসলে পশু চরালে আর সরকারি সহায়তা নিলে লাভ আসে দ্রুত

আচ্ছাদন ফসল লাগাতে একরপ্রতি ৪২ থেকে ১২০ ডলার খরচ হয়, কিন্তু সাউথ ডাকোটার গবেষণায় তাতে পশু চরিয়ে প্রথম বছরে একরপ্রতি ১৭.২৩ ডলার আর দ্বিতীয় বছরে ৪৩.৬১ ডলার নিট লাভ হয়েছে।

All Ag News২ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফসল

আগাছার নির্যাসে ভুট্টার ফলন বেড়েছে ৫৪ শতাংশ: মাঠ পরীক্ষা

সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ১:৫০ ঘনত্বে মাঠের আগাছার নির্যাস দিলে ভুট্টার মোচার ঘনত্ব ৬৪.৬ শতাংশ আর দানার ফলন ৫৪.৩ শতাংশ বেড়েছে।

AgroPages২ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)