দেশের ইতিহাসে সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে ডেঙ্গু। ফলে রোগীদের সেবায় বেড়েছে ফলের চাহিদা। আবার সর্বকালের সবচেয়ে বেশি দাম উঠেছে ডলারের। এ কারণে আমদানিতে খরচ বাড়ছে হু হু করে। বাড়তি চাহিদা আর আমদানির চড়া খরচ, দুয়ে মিলে প্রায় সব ফলই রেকর্ড গড়েছে দামে। ফলের চড়া দামে অসহায় সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হলেও ফলের দোকানে যারা যেতে পারছেন না দামের কারণে, তারা ভিড় জমাচ্ছেন রাস্তার পাশের ফলের দোকানে। সদরঘাট এলাকায় রাস্তার পাশে এমন কিছু ফলের দোকান রয়েছে, যেগুলোতে পচা ফল থেকে বাছাই করা বা আধপচা ফল বিক্রি হয়। দুর্মূল্যের এ বাজারে এখন ভিড় দেখা যাচ্ছে সেসব দোকানে।
দোকানিরা বলছেন, তারা ট্রাক থেকে নিলামে কিনে নেন এসব ফল। পরে বাছাই করে মানভেদে ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি করেন। ক্রেতারা বলছেন, দোকানে যাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় তারা এসেছেন এসব দোকানে।
'ছেলে ডেঙ্গু আক্রান্ত। মিটফোর্ডে ভর্তি। ফলের দোকানে অনেক দাম। ৩০০-৪০০ টাকার নিচে কোনো ফল পাই না। হাসপাতালের সামনে ভ্যানে ফলের দাম আরও বেশি। অনেকে নিরুপায় হয়ে ওখান থেকে কেনে। পাশের বেডের মানুষের কাছ থেকে শুনে বাদামতলীতে এলাম। এখানে দাম অনেক কম। মাল্টা নিয়েছি ২৫০ টাকা দিয়ে। দু-একটা মাল্টা নরম। তবে পচা না'
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর বাদামতলীর আহসান মঞ্জিলের রাস্তার সামনে থেকে ওয়াইজঘাট পর্যন্ত অস্থায়ী ফল বিক্রেতাদের লম্বা লাইন। ফুটপাতে বসে ফলের ঝুড়ি ও পেপারের মধ্যে রেখে ফল বিক্রি করছেন তারা। ফলের দাম তুলনামূলক অনেক কম হওয়ায় সব শ্রেণিপেশার মানুষ ফল কিনছেন এই ভাসমান বাজার থেকে।
বিক্রেতারা জানিয়েছেন, তাদের দোকানগুলোতে মানভেদে লাল আঙুর ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, কমলা ১৪০ থেকে ১৬০, আপেল ১৮০-২০০, ঝরা সাদা আঙুর ১৫০ থেকে ২০০, আনার ২৫০ থেকে ৩৫০, ড্রাগন ফল ১৮০ থেকে ২২০ এবং মাল্টা ১৮০ থেকে ২২০ টাকা কেজি হিসেবে বিক্রি হচ্ছে।
আরও পড়ুন: 'আমাগো ঘরই নাই, মশারি টাঙামু কই'
তবে একই ফল মানে সামান্য কিছু তফাৎ থাকায় রাজধানীর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে অনেক বেশি ব্যবধানে। সদরঘাটে স্থায়ী দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কমলা ২২০ টাকা, মাল্টা ২৮০ থেকে ৩২০ ও ড্রাগন ২৬০ থেকে ৩২০ টাকা কেজি হিসেবে বিক্রি হচ্ছে।
কিছুটা নষ্ট থাকলেও এসব ফল কেনে মানুষ-ছবি জাগো নিউজ
রায়সাহেব বাজারে ফলের দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লাল আঙুর বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়, কমলা ২২০ থেকে ২৫০, বড় আনার ৫০০, ছোট আনার ৩৫০, আপেল ৩২০ ও ড্রাগন ২৫০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
'আগে রমজান এলে ফলের মূল্যবৃদ্ধি পেত। গত রমজানের পর থেকে এখন দিন দিন ফলের দাম বাড়ছে। দুই মাস থেকে ফল কেনা হয় না। বাসায় আমাদের খাওয়ার চাহিদা না থাকলেও বাচ্চাদের জন্য নেওয়া লাগে'
বাদামতলীতে ফল কিনতে এসেছেন মনিরুল। পেশায় চা দোকানি। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আগে রমজান এলে ফলের মূল্যবৃদ্ধি পেত। গত রমজানের পর থেকে এখন দিন দিন ফলের দাম বাড়ছে। দুই মাস থেকে ফল কেনা হয় না। বাসায় আমাদের খাওয়ার চাহিদা না থাকলেও বাচ্চাদের জন্য নেওয়া লাগে।
তিনি বলেন, অন্য দোকানের সঙ্গে এখানে ফলের দামের অনেক তফাৎ। ঝরা আঙুর এক কেজি নিয়েছি ১৭০ টাকায়। আধপচা আঙুর আছে, সেগুলো ১০০ টাকা কেজি। আপেল দোকানে ২৮০ থেকে ৩০০, এখানে দর-দাম করে ১৮০ টাকায় কিনেছি।
মিটফোর্ড থেকে ফল কিনতে এসেছেন দুলাল। তিনি বলেন, ছেলে ডেঙ্গু আক্রান্ত। মিটফোর্ডে ভর্তি। ফলের দোকানে অনেক দাম। ৩০০-৪০০ টাকার নিচে কোনো ফল পাই না। হাসপাতালের সামনে ভ্যানে ফলের দাম আরও বেশি। অনেকে নিরুপায় হয়ে ওখান থেকে কেনে। পাশের বেডের মানুষের কাছ থেকে শুনে বাদামতলীতে এলাম। এখানে দাম অনেক কম। মাল্টা নিয়েছি ২৫০ টাকা দিয়ে। দু-একটা মাল্টা নরম। তবে পচা না। কমলা কিনেছি ১৮০ টাকা দিয়ে।
আরও পড়ুন: 'আমাগো ঈদ নদীতে গেছে'
রাস্তার পাশের এসব হকারের কাছে পাওয়া যাচ্ছে চারভাগের একভাগ বা অর্ধেক পচা আছে এমন ফলও। এমন ফল পাওয়া যাচ্ছে আরও অনেক কম দামে।
বাজারমূল্যের চাইতে কম দামে পাওয়া যায় ফল-ছবি জাগো নিউজ
ফল বিক্রেতারা জানান, নিলামে যখন ট্রাক থেকে ফল কেনেন তখন চেক করার সুযোগ থাকে না। কিছু ফলের ঝুড়িতে উপরে সব ভালো দেখালেও নিচে অনেক নষ্ট থাকে। এগুলো আমরা ধুয়ে-মুছে বিক্রি করি নামমাত্র মূল্যে।
কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা থেকে এসেছেন ক্রেতা লিজা আক্তার। পেশায় একজন দর্জি।
'বাজারের অন্য দোকানের থেকে আমরা কম দামে ফল বিক্রি করি। শুধু গরিব মানুষ নয়, এখন সব পেশার মানুষ এসে ফল কিনে নেয়। কম দামে পাওয়া যায়। এখানে দুই ধরনের আপেল আছে, ১৮০-২০০ টাকা। ফলের দোকানে গেলে সেটা ২৫০-২৮০ টাকা। ফলের দোকানে আরও বেশিও রাখে। ঝরা আঙুর বিক্রি করছি ১৫০-২০০ টাকায়'
তিনি বলেন, এখানে ঝরা ফল ছাড়াও অনেক ফল আছে, যেগুলো চারভাগের একভাগ বা অর্ধেক পচা। বাসায় নিয়ে নষ্ট অংশ কেটে বাকিটুকু খাওয়া যায়।
তিনি কিনেছেন এমন কিছু ফল। দাম জানতে চাইলে বলেন, মাল্টা ১৫০ টাকা, আপেল কিনেছি ৯০ টাকা করে।
'আমরা খুবই কম লাভে বিক্রি করি। কারণ দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল এসব খরচ লাগে না। প্রায় সব পেশার কাস্টমার আসে। রাস্তার পাশে শরবত বিক্রেতারা এসেও কেনে। দৈনিক ৫০০০ থেকে ৬০০০ টাকা বিক্রি করলে ১০০০ টাকার মতো লাভ থাকে'
আহসান মঞ্জিলের সামনে২০ বছর ধরে ফল বিক্রি করেন মো. হাফিজ। তার সঙ্গে সহযোগিতা করছেন স্ত্রী শান্তি আক্তার।
আরও পড়ুন: শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণাতেই বেড়েছে বিদেশি ফলের দাম
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, বাজারের অন্য দোকান থেকে আমরা কম দামে ফল বিক্রি করি। শুধু গরিব মানুষ না, এখন সব ধরনের মানুষ এসে ফল কিনে নেয়। কম দামে পাওয়া যায়। এখানে দুই ধরনের আপেল আছে, ১৮০-২০০ টাকা। ফলের দোকানে গেলে সেটা ২৫০-২৮০ টাকা। তারা আরও বেশিও রাখে। ঝরা আঙুর বিক্রি করছি ১৫০-২০০ টাকায়।
বেছে বেছে ফল কেনেন ক্রেতারা-ছবি জাগো নিউজ
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ফল এলে ট্রাক থেকে নিলামে কিনে নেই। এরপর আমার স্ত্রীসহ ভালো খারাপ ফল সব আলাদা করি। সকাল থেকে দিনভর বিক্রি করে বাসায় যাই।
বাদামতলীতে ফল বিক্রেতা আশিক জানান, আমরা খুবই কম লাভে বিক্রি করি। কারণ দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল এসব খরচ লাগে না। প্রায় সব পেশার কাস্টমার আসে। রাস্তার পাশে শরবত বিক্রেতারা এসেও কেনে। দৈনিক ৫০০০ থেকে ৬০০০ টাকা বিক্রি করলে ১০০০ টাকার মতো লাভ থাকে।
আরএ/এমএইচআর/এসএইচএস/এএসএম





মন্তব্য
(০)