খ্যাঁকশিয়াল মানুষের মুরগি ধরে খায়—এই পরিচয়েই প্রাণীটিকে চেনে গ্রামবাংলা। কিন্তু পঞ্চগড়ে করা একটি গবেষণা বলছে, পোকামাকড় ও ইঁদুর দমন করে ফসলের মাঠে ভারসাম্য রাখা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ছোট এই মাংসাশী প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। অথচ দ্রুত নগরায়ণ, বনভূমি ধ্বংস ও অকারণে পিটিয়ে মারার প্রবণতা প্রজাতিটিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনতাসির আকাশ, গবেষক মো. রোকনুজ্জামান, সুলতান আহমেদ ও মোহাম্মদ সামিউল আলম এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেইরি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ম্যাক্সিমিলিয়ান অ্যালেন ২০২৪ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার একটি কবরস্থানে খ্যাঁকশিয়ালের একটি গর্ত ঘিরে ক্যামেরা-ট্র্যাপ পেতে গবেষণাটি করেন। ১২ ঘণ্টা ১৮ মিনিটের ফুটেজে ৪ হাজার ৫০০-র বেশি ভিডিও ক্লিপ বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটি এ বছর এপ্রিলে ব্রিটিশ ইকোলজিক্যাল সোসাইটি ও উইলির ‘ইকোলজি অ্যান্ড ইভোল্যুশন’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলা খ্যাঁকশিয়াল বা বেঙ্গল ফক্সের ওজন মাত্র ১.৮ থেকে ৩.৬ কেজি, দৈর্ঘ্য ৩১ ইঞ্চি। একসময় সারা দেশে দেখা গেলেও এখন এর উপস্থিতি মূলত যমুনা-পদ্মার পশ্চিমে নথিবদ্ধ, এবং আইইউসিএনের বাংলাদেশ লাল তালিকায় প্রজাতিটি ‘বিপদাপন্ন’। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিতে উত্তরবঙ্গের তৃণভূমি ও শুষ্ক খোলা জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, আর বন্যা বাড়লে প্রজনন মৌসুমে গর্ত ডুবে শাবক মারা যায়।
৫৪০টি ভিডিওতে খ্যাঁকশিয়ালকে খেতে দেখা গেছে; শনাক্ত করা খাবারের মধ্যে ১৯ শতাংশ পোকামাকড়, ১৮ শতাংশ পাখি ও ৮ শতাংশ ইঁদুর। উইপোকার ঝাঁক বেরোলে শাবকেরা তা খায়—১৬টি ভিডিওতে তার প্রমাণ। সাপ, উদ্ভিদজাত খাবার বা মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার খাওয়ার প্রমাণ এই গবেষণায় মেলেনি। প্রাণীগুলো ভোর ৪টা ৩০ থেকে ৬টা ৩০ এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টায় সবচেয়ে সক্রিয়; একটি গর্তে সর্বোচ্চ ছয়টি খ্যাঁকশিয়াল একসঙ্গে দেখা গেছে। ৪২৫টি ক্লিপে খেলা, অভিবাদন, লোম পরিষ্কার ও দুধ খাওয়ানোর মতো সামাজিক আচরণ ধরা পড়েছে।
গর্তের আশপাশে সাত প্রজাতির পাখি, ছয়বার পাতিশিয়াল, পাঁচবার কুকুর আর ৩৪ বার মানুষ এসেছে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিক বাংলা গুইসাপের সঙ্গে দ্বন্দ্ব: ৪৪৭টি ক্লিপে দুই প্রাণীকে একসঙ্গে পাওয়া গেছে, যার ১৬টিতে খ্যাঁকশিয়াল গুইসাপকে তেড়ে গেছে, ৩১টিতে সতর্ক থেকেছে এবং মাত্র দুটিতে পিছু হটেছে। গুইসাপ শাবক শিকার করে এবং প্রজননকাল শেষে ফেলে যাওয়া গর্ত দখল করতে চায়। গর্ত থেকে মাত্র ২০ মিটার দূরে পাকা সড়ক থাকলেও মানুষের চলাচলে প্রাণীগুলো বিচলিত হয়নি।
গবেষকদের মতে, সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, স্থানীয় সচেতনতাও জরুরি; গ্রামের ছোট বন, পতিত জমি ও উইপোকার ঢিবি রক্ষা করা গেলে প্রজাতিটি টিকবে। বৈশ্বিক উষ্ণতায় ইঁদুরের প্রজনন বেড়েছে, আর ছোট মাংসাশী প্রাণী ও সাপ কমে যাওয়ায় ফসল বাঁচাতে কীটনাশকের মাত্রা বাড়ছে—খ্যাঁকশিয়াল সেই প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, যথাযথ সুযোগ ও নিরাপত্তা পেলে খ্যাঁকশিয়াল লোকালয়ের আশপাশেই শান্তিতে বসবাস করতে পারে; একটি প্রজাতি হারানো মানে বাস্তুসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিকল ভেঙে যাওয়া।
উপপ্রধান বন সংরক্ষক রাকিবুল হাসান মুকুল স্বীকার করেন, খ্যাঁকশিয়ালের আবাস সংকুচিত হচ্ছে এবং এ মুহূর্তে বন বিভাগের সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগ নেই; একটি প্রকল্প অনুমোদন পেলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজ শুরু হবে। বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী আদনান আজাদের পর্যবেক্ষণ, সরাসরি হুমকি না থাকলে মানুষের বসতি ও ব্যস্ত সড়কের কাছেও প্রাণীটি নির্বিঘ্নে থাকতে পারে—সহাবস্থান সম্ভব, যদি মানুষ সহনশীল হয়।
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)