দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগানো মৎস্য খাতে উৎপাদন বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু প্রবৃদ্ধির গতি কমে পাঁচ বছরের সর্বনিম্নে নেমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দৈনিক বাংলা জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট মাছ উৎপাদন ৫১ লাখ ১৯ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছালেও প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
হিসাব অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৪৬ লাখ ২১ হাজার টন (প্রবৃদ্ধি ২.৬২ শতাংশ); ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৭ লাখ ৫৯ হাজার টন (২.৯৮ শতাংশ) এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪৯ লাখ ১৫ হাজার টন (৩.২৮ শতাংশ)। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ৫০ লাখ ১৮ হাজার টন হলেও প্রবৃদ্ধি নামে ২.১১ শতাংশে, আর সর্বশেষ অর্থবছরে ১.৮৫ শতাংশে। বদ্ধ জলাশয়ের বাণিজ্যিক চাষে মোট উৎপাদন বাড়লেও সামুদ্রিক আহরণ কমা ও মুক্ত জলাশয়ের অবক্ষয় প্রবৃদ্ধি টেনে নামাচ্ছে।
উৎপাদনে বড় ভূমিকা বাণিজ্যিক খামারের। ময়মনসিংহ জেলা একাই দেশের মোট মাছের প্রায় ১২ শতাংশ জোগায়—২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেখানে ৪ লাখ ১৮ হাজার ৬৪৫ টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। তবে আমদানিনির্ভর মাছের খাদ্যের কাঁচামাল, পোনা, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও শ্রমের বাড়তি খরচে প্রান্তিক চাষিদের মুনাফা কমছে। কোথাও কোথাও সৌরবিদ্যুৎচালিত স্বয়ংক্রিয় এয়ারেটর এবং দ্রুত বর্ধনশীল জি-থ্রি রুইয়ের মতো জাত দিয়ে উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
উল্টো চিত্র মুক্ত জলাশয়ে। রামসার এলাকা সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে আইইউসিএন ও মৎস্যবিজ্ঞানীদের ধারাবাহিক গবেষণায় মাছের প্রজাতি ২০০৭ সালে ১৪১টি থেকে ২০১৫ সালে ১৩৪টি, ২০২২ সালে ৯৩টি এবং ২০২৪ সালে মাত্র ৭৬টিতে নেমেছে। চিতল, নানীদ, মহাশোল ও বাঘাইড়ের মতো দেশীয় মাছ সেখানে এখন বিলুপ্তপ্রায়।
প্রতিবেদনে কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি ও কিরণমালা জালের অবাধ ব্যবহার, বিষ প্রয়োগ ও বৈদ্যুতিক শকে পোনা নিধন, অপরিকল্পিত বাঁধ ও সড়ক, নৌযান ও কয়লা পরিবহনের দূষণ এবং পলি জমে নদী-বিলের গভীরতা কমে যাওয়া। একই কারণে টাঙ্গুয়ার হাওরে এক দশকে পাখির বিচরণ প্রায় ৭৭ শতাংশ কমেছে; ২০২৫ সালের জরিপে পাখি মিলেছে সাড়ে ২২ হাজার।
বিশ্বে অবশ্য চাষের মাছই এখন প্রধান। এফএওর ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ অনুযায়ী ২০২৪ সালে মাছ ও জলজ খাদ্যের উৎপাদন রেকর্ড ১৮ কোটি ৮২ লাখ টন, যার ১০ কোটি ৩৩ লাখ টন চাষের; মাথাপিছু বার্ষিক মাছ খাওয়া ২০.৭ কেজি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, মূল বিলগুলোকে স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা, নদী-খাল ড্রেজিং, হাওরের জলজ বন পুনরুদ্ধার, দেশীয় পোনার জন্য বিল নার্সারি, গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান জোরদার, দেশে মাছের খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো এবং মধ্যস্বত্বভোগী কমিয়ে চাষি থেকে ভোক্তা পর্যন্ত টেকসই বাজার গড়ে তোলা।
প্রতিবেদন: দৈনিক বাংলা ডেস্ক।
ছবি: Munirul Hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দৈনিক বাংলা





মন্তব্য
(০)