বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা বিলুপ্তপ্রায় ৪০ প্রজাতির দেশি মাছের সফল কৃত্রিম প্রজনন সম্পন্ন করেছেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাগো নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়, এর মধ্যে ১২ প্রজাতির মাছের পোনা দেশের বিভিন্ন হ্যাচারিতে ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হচ্ছিল। ফলে মাছগুলো চাষের আওতায় এসেছে, বাজারে সরবরাহ বেড়েছে এবং দামও কমেছে।
কেন বিলুপ্তির মুখে পড়েছিল দেশি মাছ
দেশে মিঠাপানির প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ১৪৩ প্রজাতিই ছোট মাছ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলাশয় সংকোচন ও অতি আহরণসহ নানা কারণে এসব মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র নষ্ট হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের লাল তালিকায় মূল্যায়ন করা ২৫৩ প্রজাতির মিঠাপানির মাছের মধ্যে ৬৪ প্রজাতিকে হুমকির মুখে বলে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ৯টি মহাবিপন্ন, ৩০টি বিপন্ন এবং ২৫টি সংকটাপন্ন।
বিএফআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, যেসব মাছের সফল প্রজনন হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে পাবদা, গুলশা, ট্যাংরা, কৈ, মাগুর, শিং, গুজি আইড়, দেশি সরপুঁটি, জাতপুঁটি, বাটা, বালাচাটা, কুচিয়া, কুর্শা, খলিশা, ভেদা, গুতুম, ঢেলা, গজার, ফলি, চিতল, গনিয়া, মহাশোল, বৈরালি, ভাগনা, আঙ্গুস, বাতাসি, পুঁইয়া, কাকিলা, পিয়ালী ও রাণী। এর মধ্যে শিং, মাগুর, কৈ, ট্যাংরা, পাবদা, গুলশা ও বৈরালিসহ ১২ প্রজাতি হ্যাচারিতে ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হচ্ছিল।

লাইভ জিন ব্যাংক ও শাল বাইমের প্রজনন
বিলুপ্তপ্রায় মাছ খাবার টেবিলে ফেরাতে দেশের নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ও পুকুর থেকে ৮৮ প্রজাতির মাছ সংগ্রহ করে ময়মনসিংহে বিএফআরআইয়ের ‘লাইভ জিন ব্যাংক’-এ সংরক্ষণ করা হয়েছে। ঢাকা ট্রিবিউনের তথ্যমতে, এই জীবন্ত জিন ব্যাংক ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। যেসব মাছের কৃত্রিম প্রজনন সফল হয়েছে, সেগুলোর বিপুল পোনা উৎপাদনের চেষ্টা চলছিল।
সর্বশেষ ২০২২ সালে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে শাল বাইমের কিছু পোনা উৎপাদনে সাফল্য আসে। সাপের মতো লম্বা, নলাকার ও আঁশহীন এই মাছটি জনপ্রিয় হওয়ায় এর পোনা বড় পরিসরে উৎপাদনে বিজ্ঞানীরা আলাদা সময় দিচ্ছিলেন। বিএফআরআইয়ের মহাপরিচালক ড. অনুরাধা ভদ্র জাগো নিউজকে জানান, শাল বাইমের কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে মাছটি চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং পর্যায়ক্রমে সব দেশি মাছ লাইভ জিন ব্যাংকে সংরক্ষণ করা হবে।
ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মশিউর রহমান জানান, আগে শুধু ময়মনসিংহের স্বাদুপানি গবেষণা কেন্দ্রে এ গবেষণা হতো। পরে বগুড়ার সান্তাহার, নীলফামারীর সৈয়দপুর ও যশোর উপকেন্দ্রেও বিলুপ্তপ্রায় মাছ সংরক্ষণের গবেষণা শুরু হয়।

পুষ্টিতে ছোট মাছের গুরুত্ব
বিজ্ঞানীরা জানান, দেশি ছোট মাছে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ও আয়োডিনের মতো খনিজ প্রচুর থাকে, যা রক্তশূন্যতা, গলগণ্ড ও অন্ধত্ব প্রতিরোধে সহায়তা করে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশের গবেষণায় দেখা গেছে, কাঁটাসহ পুরো খাওয়া ছোট মাছ লৌহ, দস্তা, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ ও বি১২-এর ভালো উৎস; মলা মাছের প্রতি ১০০ গ্রাম খাওয়ার উপযোগী অংশে ২,৫০০ মাইক্রোগ্রামের বেশি রেটিনল সমতুল্য ভিটামিন এ থাকে।
উৎপাদনেও এর প্রভাব দেখা যায়। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ছোট মাছের উৎপাদন ২০০৯ সালের ৬৭ হাজার টন থেকে ২০২১ সালে বেড়ে ২ লাখ ৬১ হাজার টনে দাঁড়ায়।
ময়মনসিংহের বাজারে সরবরাহ বেড়ে দাম কমেছে
ময়মনসিংহ শহরের মেছুয়া বাজারে বড় মাছের পাশাপাশি একসময় বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকা নানা দেশি ছোট মাছ বিক্রি হতে দেখা যায়। বিক্রেতা ইদ্রিস আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিভিন্ন ফিশারিতে এখন গুলশা, পাবদা, শিং, মাগুর, কৈ, টেংরা, বৈরালিসহ বিভিন্ন দেশীয় ছোট মাছ চাষ করা হচ্ছে।’ ক্রেতা জাহিদ হোসেন জানান, প্রতি কেজি পাবদা তখন ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, অথচ কয়েক বছর আগেও বাজারে এ মাছ তেমন পাওয়া যেত না।

ছবি: JIBON / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, আইইউসিএন বাংলাদেশ (রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ, খণ্ড ৫: মিঠাপানির মাছ, ২০১৫), ঢাকা ট্রিবিউন, সমকাল, ওয়ার্ল্ডফিশ





মন্তব্য
(০)