একই প্রজাতির মাছ পদ্মা বা মেঘনায় ধরা পড়লে স্বাদে অন্য রকম, অথচ সমুদ্র বা অন্য নদীর ইলিশে সেই স্বাদ মেলে না—কেন? চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের একদল গবেষক কয়েক বছর আগে এ নিয়ে কাজ করেন, যার ফলাফল বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারের একটি লেখায় প্রকাশিত হয়। তাঁদের গবেষণা বলছে, রহস্যটা মাছের গায়ে নয়; সে কী খায় আর কোথায় খায়, তার মধ্যে।
ইলিশ মূলত সমুদ্রের মাছ। ডিম ছাড়ার সময় এলে সে স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে মিঠাপানিতে, নদীর দিকে ফিরে আসে। এই দীর্ঘ যাত্রায় প্রচুর শক্তি লাগে, আর সেই শক্তির জোগান আসে খাবার থেকে। পদ্মা ও মেঘনার মোহনা অঞ্চলে হিমালয়ের বরফগলা পানি আর দুই অববাহিকার পলিমাটি মিশে পানিকে পুষ্টিতে ভরপুর করে তোলে; সেখানে জন্মায় অসংখ্য ক্ষুদ্র শৈবাল ও প্রাণিকণা—প্ল্যাঙ্কটন—যা ইলিশের প্রিয় খাবার। মোহনার দিকে উঠে আসার পথে ইলিশ পেট ভরে এসব খায়, শরীরে চর্বি জমে, মাংস নরম হয় আর তৈরি হয় সেই চেনা গন্ধ।
গবেষকদের হিসাবে, বাংলাদেশে যত ইলিশ ধরা পড়ে, তার মাত্র ২ শতাংশের মতো আসে সরাসরি পদ্মা থেকে, এবং সেগুলো আকারেও ছোট। দেশের বেশির ভাগ বড় ও সুস্বাদু ইলিশ ধরা পড়ে মেঘনার অববাহিকায়, বিশেষ করে চাঁদপুরের কাছাকাছি, যেখানে পদ্মা ও মেঘনা মিশেছে। বাজারে ‘পদ্মার ইলিশ’ নামে যা বিক্রি হয়, তার অনেকটাই আসলে মেঘনার মোহনার। মৎস্য গবেষকদের একাংশের মতে, দুই নদী একই বাস্তুতন্ত্রের অংশ বলে তাদের ইলিশে বৈজ্ঞানিকভাবে তেমন পার্থক্য নেই।
তবে সব নদীর ইলিশ সমান নয়। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সম্প্রতি মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর ইলিশ তুলনা করে দেখেছেন, তেঁতুলিয়ার ইলিশের স্বাদ কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেঘনার চেয়েও এগিয়ে। অর্থাৎ নদীর নাম নয়—পানির গুণ, খাদ্যের বৈচিত্র্য ও স্রোতের বেগ মিলিয়েই ঠিক হয় একটি এলাকার ইলিশ কতটা সুস্বাদু হবে।
সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। আগস্ট থেকে নভেম্বরে ধরা ইলিশ পুষ্টি ও স্বাদে সবচেয়ে ভালো বলে ধরা হয়, কারণ তখন শরীরে ডিমের প্রস্তুতি চলে এবং চর্বি জমে সবচেয়ে বেশি। সাগরে থাকা অবস্থায় খাবারের জোগান তুলনামূলক কম বলে চর্বি কম জমে, স্বাদও সাদামাটা থাকে; লোনাপানি থেকে মিঠাপানিতে ঢোকার পরই শুরু হয় বদল।
জেলে ও ব্যবসায়ীর জন্য এর মানে স্পষ্ট: মোহনার প্ল্যাঙ্কটনসমৃদ্ধ পানি ও ডিমওয়ালা মৌসুমের ইলিশই বাজারে সবচেয়ে দামি, আর সেই পানির গুণ রক্ষা করাই ইলিশের স্বাদ ও দাম দুটোই ধরে রাখার শর্ত।
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)