টাঙ্গাইলের মধুপুরের লাল মাটিতে ২০২১ সালের আনারস মৌসুম শেষ হয়েছিল ভালো খবর দিয়ে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানায়, জেলায় ৭ হাজার ১৮৬ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৬৬ হাজার ৭৬৮ টন। চাষিরা দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেছিলেন, অনুকূল আবহাওয়ায় এবার ফলন ভালো হয়েছে, দামও মিলেছে। তবু মধুপুর, শ্রীমঙ্গল কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের চাষিরা প্রতি বছর ফল হারান পচন, পোকামাকড় আর খেত থেকে বাজার পর্যন্ত দীর্ঘ পথের ধকলে।
কৃষক ভাই ও কৃষিবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য দ্য এগ্রো নিউজে ২০২১ সালের অক্টোবরে প্রথম প্রকাশিত এই নির্দেশিকায় বাংলাদেশে আনারসের প্রধান রোগ ও প্রধান পোকার কথা বলা হয়েছে: ফল ও পাতা পচা, কাণ্ড ও শিকড় পচা এবং ছাতরা পোকা ও তার ছড়ানো ঢলে পড়া রোগ। এখানে জানবেন মাঠে প্রতিটি সমস্যা কীভাবে চিনবেন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ বিভাগ প্রতিরোধে কী পরামর্শ দেয় এবং ফল তোলার পর ক্ষতি কীভাবে কমানো যায়। কোনো রাসায়নিক লাগলে তার নাম ও মাত্রা জেনে নিতে হবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে।
বাংলাদেশে আনারস: কোথায় কতটা চাষ হয়
বিশ্বের বাণিজ্যিক ফলগুলোর মধ্যে আনারস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সৌন্দর্যের জন্য এই ফলকে "স্বর্ণকুমারী" বলা হয়, আর আকর্ষণীয় সুগন্ধ ও অম্লমধুর স্বাদের জন্য ফলটি সবার কাছে সমাদৃত। বারির কৃষি প্রযুক্তি হাতবইয়ের নবম সংস্করণ (জানুয়ারি ২০২০) অনুযায়ী দেশে প্রায় ১৪ দশমিক ৪ হাজার হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হয় এবং মোট উৎপাদন প্রায় ২ লাখ ১২ হাজার মেট্রিক টন। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ১৪ থেকে ১৫ টন।
একই হাতবই বলছে, সিলেট, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইল জেলায় আনারসের ব্যাপক চাষ হয়; ঢাকা, নরসিংদী, কুমিল্লা ও দিনাজপুরেও এর চাষ হয়ে থাকে। মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকায় আনারস একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। বারির ভাষায়, আনারস ভিটামিন এ, বি ও সি-এর একটি উত্তম উৎস।
রাঙামাটিতে ডিএইর উপপরিচালক ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, আগের মৌসুমে জেলার দশ উপজেলায় ২ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে ৫৫ হাজার ৮৫০ টন আনারস উৎপাদিত হয়েছিল, আর আগাম চাষ ছড়িয়েছিল ৭৩০ হেক্টরে।
মধুপুরের আনারসের নিজস্ব ইতিহাসও আছে। সেখানে আনারস চাষের শুরু ধরা হয় ১৯৪২ সালকে, যখন গারো সম্প্রদায়ের মিজি দয়াময়ী সাংমা ভারতের মেঘালয় থেকে ৭৫০টি আনারসের চারা এনে ইদিলপুর গ্রামে লাগান।

কৃষকেরা কোন জাত চাষ করেন, চারা কেন গুরুত্বপূর্ণ
বারির হাতবইয়ে দেশের চারটি জাতের বর্ণনা আছে। হানিকুইন জাতের পাকা আনারসের শাঁস হলুদ, চোখ সুচালো ও উন্নত, পাতা কাঁটাযুক্ত এবং গড় ওজন প্রায় ১ কেজি। বারি একে সবচেয়ে মিষ্টি আনারস বলেছে; হেক্টরপ্রতি ফলন ২৫ থেকে ৩০ টন। সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে এর চাষ বেশি, আর জাতটি রপ্তানিযোগ্য।
জমি ও উৎপাদন দুই দিক থেকেই প্রথম অবস্থানে জায়েন্ট কিউ, স্থানীয়ভাবে যার নাম ক্যালেন্ডার। পাকা ফল সবুজাভ, শাঁস হালকা হলুদ, চোখ প্রশস্ত ও চ্যাপ্টা, গড় ওজন প্রায় ২ কেজি; পাতা প্রায় কাঁটাহীন, স্বাদ টক-মিষ্টি। বারির হিসাবে হেক্টরপ্রতি ফলন ৩০ থেকে ৪০ টন, আর সিলেট, মৌলভীবাজার ও টাঙ্গাইলে এর চাষ বেশি। লালচে খোসা ও ঘিয়ে-সাদা শাঁসের ঘোড়াশাল জাতের চাষ ঢাকা ও নরসিংদীতে সীমিত, আর জলডুপি জাতটি প্রক্রিয়াজাতকরণের উপযোগী বলে বারি জানিয়েছে।
চারার ধরনও ফলনে প্রভাব ফেলে। সিলেটের জৈন্তাপুরে বারির ফল গবেষণা কেন্দ্রে ১৯৮৬ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৮৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত চালানো এবং ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ জার্নাল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চে প্রকাশিত এক পরীক্ষায় দেখা যায়, স্লিপ থেকে জন্মানো গাছে হেক্টরপ্রতি ফলন মাত্র ৬ দশমিক ৬০ টন, যেখানে মুকুট থেকে ২২ দশমিক ২৯ টন এবং কাণ্ডের সাকার থেকে ২০ দশমিক ৩৯ টন। সাকার, স্লিপ বা মুকুটে লেগে থাকা রোগ বা পোকা সরাসরি নতুন খেতে চলে যায়; তাই নিচের বেশির ভাগ দমন ব্যবস্থা শুরু হয় সুস্থ চারা দিয়ে।
ফল ও পাতা পচা: লক্ষণ ও দমন
প্রথম সমস্যাটি ফল ও গাছ দুটোকেই আক্রমণ করে। ফলের ওপর প্রথমে পানিভেজা দাগ পড়ে, পরে তা হলুদ হয়ে গাঢ় বাদামি ও কালচে রং ধারণ করে। আক্রান্ত অংশের কোষ নরম হয়ে পচে যায়, আর পাকা ফল আক্রান্ত হলে একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গন্ধ পাওয়া যায়। পাতা আক্রান্ত হলে পুরো গাছ কালো হয়ে পচে যেতে পারে।
ভারতের ন্যাশনাল হর্টিকালচার বোর্ড একই ধরনের লক্ষণ বর্ণনা করেছে পাতা ও ফল পচা রোগ হিসেবে, যার কারণ সিরাটোসিস্টিস প্যারাডক্সা নামের ছত্রাক, যা থিয়েলাভিওপসিস প্যারাডক্সা নামেও পরিচিত। বোর্ডের তথ্যমতে, চারা না শুকিয়ে বাতাস চলাচলহীনভাবে গাদা করে রাখলে এই ছত্রাক চারার গোড়া পচিয়ে দেয়; নিড়ানির সময় গাছের গোড়ায় ক্ষত হলে সেখান দিয়ে বড় গাছেও ঢোকে; আর তীব্র আক্রমণে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পুরো গাছ কালো হয়ে পচে যেতে পারে।
তোলা ফলের কালো পচা বা নরম পচাও এই ছত্রাকেরই কাজ। ভারতের কেরালা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আনারস গবেষণা কেন্দ্রের (২০১২) তথ্য অনুযায়ী, ছত্রাকটি মূলত ভাঙা বোঁটা, থেঁতলানো জায়গা ও ফাটল দিয়ে ঢোকে, উষ্ণ ও ভেজা আবহাওয়ায় সবচেয়ে সক্রিয় থাকে এবং ফল তোলার তিন থেকে চার দিন পর রোগ দেখা দেয়। তাজা আনারসের এটিই প্রধান সংগ্রহোত্তর রোগ; হিমায়িত ব্যবস্থা ছাড়া দূরের বাজারে ফল পাঠালে ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়।
দমন ব্যবস্থা:
- বাগান পরিষ্কার রাখুন; পচা ফল, আনারসের আবর্জনা ও বাতিল ফল খেত ও প্যাকিংয়ের জায়গা থেকে সরিয়ে ফেলুন।
- রোপণের জন্য সুস্থ গাছের সাকার ব্যবহার করুন এবং আক্রান্ত এলাকা থেকে কখনো সাকার সংগ্রহ করবেন না (ন্যাশনাল হর্টিকালচার বোর্ড)।
- রোপণের আগে সাকার হালকা রোদে শুকিয়ে নিন। কেরালা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চারা এক স্তরে বিছিয়ে কাটা গোড়া রোদের দিকে রেখে সংরক্ষণের পরামর্শ দেয় এবং বলে, এভাবে গোড়া শুকিয়ে নিলে ক্ষতি অনেক কমে। রোপণের মুকুটের সঙ্গে ফলের কোনো অংশ লেগে থাকতে দেবেন না।
- ফল তোলার সময় সাবধানে নাড়াচাড়া করুন, যাতে থেঁতলে বা ছড়ে না যায়; রোদে পোড়া বা আঘাত পাওয়া ফল আলাদা করুন, কারণ এদের ছোট ফাটল দিয়ে সহজেই সংক্রমণ হয়।
- ফল প্যাকিংয়ের আগে ঝুড়ি, ক্রেট ও প্যাকিং ঘর পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করুন। কেরালা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সপ্তাহে একবার অনুমোদিত জীবাণুনাশক দিয়ে প্যাকিং ঘর শোধনের পরামর্শ দেয়।
- তোলা ফলের কাটা বোঁটা দ্রুত শোধন করুন। ওই বিশ্ববিদ্যালয় ফল তোলার পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে ফলের গোড়া অনুমোদিত ছত্রাকনাশকে ডোবানোর পরামর্শ দেয়, বিশেষ করে উষ্ণ ও ভেজা আবহাওয়ায়। কোন ওষুধ অনুমোদিত এবং কত মাত্রায়, তা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নিন।
ফাইটোফথোরাজনিত কাণ্ড পচা ও শিকড় পচা
দ্বিতীয় রোগ কাণ্ড পচা, যা ফাইটোফথোরা প্যারাসাইটিকা নামের জীবাণুর কারণে হয়। মাঠে প্রথমে পাতা হলুদ ও পরে বাদামি হয়ে যায়, কাণ্ডের গোড়া ও শিকড় কালো হয়ে পচতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে পুরো গাছ মরে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব ট্রপিক্যাল এগ্রিকালচার অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্সেস (সিটিএএইচআর) ২০১৫ সালের প্রকাশনা "হার্ট অ্যান্ড রুট রটস অব পাইনঅ্যাপল"-এ এর কারণ ব্যাখ্যা করেছে। ফাইটোফথোরা ও পিথিয়াম মাটিতে বাস করা পানি-ছত্রাক বা ওয়াটার মোল্ড, যারা দেখতে ছত্রাকের মতো হলেও ঠিক ছত্রাক নয়; আনারসে সবচেয়ে বেশি পাওয়া প্রজাতিগুলোর একটি ফাইটোফথোরা প্যারাসাইটিকা। ভেজা মাটিতে এরা দ্রুত বাড়ে: সাঁতারু রেণু মাটির পানিতে ভেসে শিকড়ের দিকে যায়, যন্ত্রপাতি, জুতা ও গাড়ির চাকায় লেগে থাকা মাটি কিংবা বৃষ্টির ছিটায় রেণু গাছের মাথায় পৌঁছায়, আর সুপ্ত রেণু মাটিতে বছরের পর বছর টিকে থাকে।
সিটিএএইচআর দুই ধরনের রোগের কথা বলেছে। হার্ট রটে সবচেয়ে কচি পাতার গোড়ার সাদা অংশ নরম হয়ে পচে যায়, আক্রান্ত পাতা টান দিলেই উঠে আসে, আর সংবেদনশীল জাতে পচন বোঁটা বেয়ে ফলেও পৌঁছাতে পারে। শিকড় পচায় গাছের বৃদ্ধি ধীর হয়, পাতা হলুদ, বাদামি বা লালচে-বেগুনি হয়ে পরে কুঁকড়ে মরে যায়, আর শিকড় মরে যাওয়া গাছ মাথা ধরে টানলে সহজেই উঠে আসে। কেরালা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় যোগ করেছে, তিন থেকে চার মাস বয়সী মুকুট থেকে লাগানো গাছ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়।

বেশি বৃষ্টি আর পানি না সরা মাটিতে দুটি রোগই সবচেয়ে বেশি হয়, তাই পানি নিষ্কাশনই প্রথম প্রতিরোধ। দমন ব্যবস্থা:
- বাগান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন এবং পচে যাওয়া গাছ খেতে ফেলে না রেখে সরিয়ে ফেলুন।
- বাগানে যেন পানি না জমে সে ব্যবস্থা করুন। বারির হাতবই জমি এমনভাবে সমান করতে বলে যাতে কোথাও বৃষ্টির পানি না জমে; জমি থেকে ১৫ সেন্টিমিটার উঁচু ও ১ মিটার চওড়া বেড বানিয়ে দুই বেডের মাঝে ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার নালা রাখতে হবে, আর বর্ষায় গাছের গোড়ায় পানি জমতে না দিতে নালা কেটে পানি বের করে দিতে হবে।
- কেরালা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শমতো চারা খুব গভীরে লাগাবেন না এবং রোপণের সময় গাছের মাথার ভেতরে মাটি ঢুকতে দেবেন না।
- অন্য খেতের মাটি লেগে থাকা যন্ত্রপাতি ও পাত্র পরিষ্কার করে নিন এবং আক্রান্ত জায়গার মাটি সুস্থ জায়গায় নেবেন না (সিটিএএইচআর)।
- রোগমুক্ত খেত থেকে সুস্থ চারা বেছে নিন। সিটিএএইচআর জানায়, এখনো কোনো আনারস জাতের এই পানি-ছত্রাকের বিরুদ্ধে ভালো প্রতিরোধক্ষমতা নেই; এমডি-২ হাইব্রিড গাছের অনুকূল পরিবেশে সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ দেখায়, কিন্তু রোগের অনুকূল পরিবেশে নয়।
- সিটিএএইচআরের মতে রোপণের আগে চারা ছত্রাকনাশকে ডোবানোই প্রচলিত রাসায়নিক পদক্ষেপ, বিশেষ করে যেখানে আগে রোগ হয়েছে। তবে ওষুধের নাম ও মাত্রা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে নিন, কারণ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের পরামর্শ আলাদা: যেমন ভারতের ন্যাশনাল হর্টিকালচার বোর্ড সতর্ক করেছে, তামাযুক্ত ছত্রাকনাশক আনারসের পাতা পুড়িয়ে দিতে পারে।

ছাতরা পোকা বা মিলিবাগ ও ঢলে পড়া রোগ
নির্দেশিকায় উল্লিখিত প্রধান ক্ষতিকর পোকা ছাতরা পোকা বা মিলিবাগ। এই পোকা গাছের পাতা, কাণ্ড ও ফল থেকে রস চুষে খায় এবং সেখানে ক্ষত তৈরি করে। শিকড়ে বা কাণ্ড ও শিকড়ের সংযোগস্থলে আক্রমণ হলে গাছ নেতিয়ে পড়ে, আক্রান্ত ফল পচে যায়, আর আক্রান্ত স্থান দিয়ে ভাইরাস ঢুকে আনারসের ঢলে পড়া বা উইল্ট রোগ সৃষ্টি করে।
প্রধানত দায়ী প্রজাতিটি গোলাপি আনারস মিলিবাগ, বৈজ্ঞানিক নাম ডিসমাইকোকাস ব্রেভিপেস। সিটিএএইচআরের ক্রপ নলেজ মাস্টার অনুযায়ী, পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী পোকা মোটাসোটা, উত্তল ও গোলাপি রঙের; এরা থাকে গাছের গোড়ায়, কাণ্ডের নিচের অংশে এবং খোলা শিকড়ে। এই পোকা দুই ধরনের ঢলে পড়া ঘটায়: বড় কলোনি অল্প সময় রস খেলে দ্রুত ঢলে পড়া, যাতে পাতা হলুদ বা লাল হয়; আর কলোনি বড় হওয়ার পর ধীরে ঢলে পড়া, যাতে পাতার ডগা বাদামি হয় ও বাইরের পাতা ঝুলে পড়ে। রোগ সাধারণত খেতের কিনারা থেকে ভেতরের দিকে ছড়ায়।
কেরালা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (২০১২) মিলিবাগ উইল্টকে মিলিবাগবাহিত একটি ভাইরাস রোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রথম লক্ষণ গাছের মাঝামাঝি উচ্চতার পাতায় হালকা লালচে ভাব; এরপর পাতা গোলাপি হয়, শক্ত ভাব হারায়, কিনারা নিচের দিকে গুটিয়ে যায় এবং ডগা মরে যায়। কচি গাছে পোকা রস খাওয়ার দুই থেকে তিন মাস পর, আর বয়স্ক গাছে ১২ মাস পর্যন্ত সময় নিয়ে লক্ষণ দেখা দেয়। রোগটি সম্ভবত এমন চারার মাধ্যমে খেতে আসে, যাতে তখনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
মিলিবাগের নিঃসৃত মিষ্টি রস বা হানিডিউ খেতে আসে পিঁপড়া; তারা মিলিবাগকে শত্রু পোকা থেকে রক্ষা করে এবং এক গাছ থেকে আরেক গাছে নিয়ে যায়। সিটিএএইচআর হাওয়াইয়ে মিলিবাগ পালনকারী প্রধান পিঁপড়া হিসেবে বড় মাথার পিঁপড়া ফিডোল মেগাসেফালার নাম দিয়েছে এবং বলেছে, পিঁপড়া পাহারা দিলে ক্রিপ্টোলেমাস মন্ট্রোজিয়েরির মতো উপকারী লেডিবার্ড বিটলও তেমন দমন করতে পারে না। পিঁপড়া না থাকলে মিলিবাগের সংখ্যা কম থাকে।

দমন ব্যবস্থা:
- শুধু ঢলে পড়া রোগমুক্ত খেত থেকে সাকার নিন। কেরালা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শ, যে খেতে ১০ শতাংশের বেশি গাছে উইল্টের লক্ষণ আছে, সেই খেত চারার উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
- আক্রান্ত গাছ ৩ শতাংশের কম থাকলে সেগুলো হাতে তুলে নষ্ট করে ফেলুন; এর বেশি হলে মিলিবাগ ও পিঁপড়া দুটোর বিরুদ্ধেই কীটনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দেয় বিশ্ববিদ্যালয়টি।
- খেতের কিনারা আগাছা ও আবর্জনামুক্ত রাখুন, কারণ সেখানে পিঁপড়া ও মিলিবাগ আশ্রয় নেয়; মিলিবাগ পালনকারী পিঁপড়াও দমন করুন।
- ফল সংগ্রহের পর খেত পরিষ্কার করুন। মূল নির্দেশিকায় শুকনো লতাপাতা পুড়িয়ে ফেলার পরামর্শ ছিল; সিটিএএইচআরও আগে আক্রান্ত খেত চাষ দিয়ে উল্টে ফেলা এবং ফসলের সব অবশিষ্টাংশ সরিয়ে পুড়িয়ে ফেলার পরামর্শ দেয়।
- কীটনাশক দরকার হলে বাংলাদেশে আনারসের জন্য কোনটি অনুমোদিত এবং কত মাত্রায়, তা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নিন, আর লেবেলের নির্দেশনা ও ফল তোলার আগের অপেক্ষার সময় মেনে চলুন।
ফল তোলা, পরিবহন ও সংরক্ষণে ক্ষতি কমানো
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ক্ষতির বড় অংশ ঘটে ফল পাকার পর: সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সময়। বারির হাতবই এর কারণ ব্যাখ্যা করেছে। দেশের বেশির ভাগ আনারস ওঠে মধ্য-জ্যৈষ্ঠ থেকে মধ্য-ভাদ্র অর্থাৎ জুন থেকে আগস্টে, ঠিক যখন আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা ও জামেরও মৌসুম। ফলে দাম পড়ে যায়, আর বৃষ্টির দিনে পরিবহনের অভাবে অনেক ফল পচে যায়।
বারির তথ্যমতে, মৌসুমের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ আনারস দেশের ভেতরে বিক্রি হয়, মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ শিল্প কারখানায় জ্যাম, জেলি, স্কোয়াশ ও জুস তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, আর সঠিক পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ আনারস নষ্ট হয়। বারির সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত পরিবহন, প্যাকেটজাতকরণ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে আনারস তিন থেকে চার সপ্তাহ সতেজ রাখা যায়।
- পরিপক্ব, সতেজ ও সমান আকারের আনারস কাঠ বা বড় প্লাস্টিকের ক্রেটে সারি করে সাজান, যাতে আঘাত না লাগে। বারি জানায়, ৬০ × ৩৬ × ৩২ সেন্টিমিটারের একটি ক্রেটে ২০ থেকে ২৫টি আনারস ধরে, আর পাঁচ প্লাইয়ের একটি কার্টনে ১২ থেকে ১৫টি।
- দূরের বাজারে পাঠাতে ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ধরে রাখা হিমায়িত ট্রাক বা রিফার ভ্যান ব্যবহার করুন।
- বেশি দিন রাখতে বারির গবেষণা বলছে, জায়েন্ট কিউ জাতের দুটি আনারস ১ শতাংশ ছিদ্রযুক্ত ৩৪ মাইক্রনের পলিপ্রোপাইলিন প্যাকেটে ভরে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও প্রায় ৮৮ শতাংশ আর্দ্রতার হিমঘরে রাখলে চার সপ্তাহ পর্যন্ত সতেজ থাকে।
ফসল তোলার সময় ছড়িয়ে দিলেও ক্ষতি কমে। বারির হাতবইয়ে পছন্দমতো সময়ে ফুল আনার জন্য হরমোন প্রয়োগের পদ্ধতির বর্ণনা আছে। রাঙামাটিতে ইথ্রেল ব্যবহারকারী চাষিরা ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, আগাম ফল তুলে তাঁরা পাইকারদের কাছে প্রতিটি আনারস ৮ থেকে ৯ টাকায় বেচতে পারছেন, যেখানে ভরা মৌসুমে দাম থাকে ৪ থেকে ৫ টাকা। অন্যদিকে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জানায়, মধুপুরের কিছু চাষির বিরুদ্ধে ফল দ্রুত পাকাতে ও রং আনতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে; ডিএইর কর্মকর্তারা বলেন, তাঁরা চাষিদের অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার না করতে উৎসাহিত করছেন।
রোপণের মৌসুম: খেত তৈরির সময়ই প্রতিরোধ
এসব সমস্যার অনেকগুলোর শুরু চারা আর মাটি থেকে, তাই প্রতিরোধও শুরু হয় রোপণের সময়। বারির মতে মধ্য-আশ্বিন থেকে মধ্য-অগ্রহায়ণ (অক্টোবর থেকে নভেম্বর) আনারসের চারা লাগানোর উপযুক্ত সময়; সেচের সুবিধা থাকলে মধ্য-মাঘ থেকে মধ্য-ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারি) পর্যন্তও লাগানো যায়। দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি আনারসের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
বারি ১ মিটার চওড়া প্রতিটি বেডে দুই সারিতে চারা লাগানোর পরামর্শ দেয়; সারি থেকে সারির দূরত্ব ৫০ সেন্টিমিটার এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৩০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার। জমি সব সময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে। সাধারণত রোপণের ১৫ থেকে ১৬ মাস পর মধ্য-মাঘ থেকে মধ্য-চৈত্র (ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ) মাসে গাছে ফুল আসে এবং মধ্য-জ্যৈষ্ঠ থেকে মধ্য-ভাদ্র (জুন থেকে আগস্ট) মাসে আনারস পাকে।
পরামর্শ কোথায় পাবেন
খেতে পচন, ঢলে পড়া বা মিলিবাগের কলোনি দেখলে নমুনা বা স্পষ্ট ছবি নিয়ে ডিএইর উপজেলা কৃষি অফিসে বা কাছের বারি গবেষণা কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। কেরালা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় মনে করিয়ে দেয়, হার্ট রটে আক্রান্ত গাছ লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরপরই চিকিৎসা পেলে তবেই বাঁচানো যায়।
কর্মকর্তা সমস্যাটি নিশ্চিত করতে পারবেন, আদৌ রাসায়নিক লাগবে কি না তা বলবেন, এবং বাংলাদেশে আনারসের জন্য নিবন্ধিত ওষুধের নাম, মাত্রা ও ফল তোলার আগে কত দিন অপেক্ষা করতে হবে তা জানাবেন।
ছবি: Snsadat55 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (কৃষি প্রযুক্তি হাতবই, নবম সংস্করণ, ২০২০), বাংলাদেশ জার্নাল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ, হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিটিএএইচআর, কেরালা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের ন্যাশনাল হর্টিকালচার বোর্ড, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)