রুই, কাতলা, মৃগেল থেকে শিং, মাগুর, পাবদা, চিতল, ইলিশ আর মলা: দেশের খাল বিলের আঠারোটি ঐতিহ্যবাহী দেশীয় মাছ ছবিতে। অনেকগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে, কিছু টিকে আছে মাছচাষি ও গবেষকদের চেষ্টায়।
ভোরের আলো ফোটার আগেই বিলের পাড়ের হাটে জেলেরা ডালা সাজিয়ে বসেন। ডালায় লাফায় কই, কালো শরীর বাঁকিয়ে নড়ে শিং মাগুর, রুপালি আভায় চকচক করে পুঁটি আর মলা। এক সময় দেশের প্রায় প্রতিটি খাল, বিল, নদী আর ধানখেতে এমন মাছের ছড়াছড়ি ছিল; ভাতের পাতে দেশি মাছ ছিল প্রতিদিনের ব্যাপার। আজ সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আমাদের দেশের অনেক ঐতিহ্যবাহী দেশীয় মাছ হারিয়ে যেতে বসেছে, আর যেগুলো টিকে আছে, তার বড় একটি অংশ টিকে আছে মাছচাষিদের কল্যাণে। ছবির পর ছবিতে এখানে দেখা যাবে এমনই আঠারোটি দেশি মাছ, সঙ্গে তাদের পরিচয় আর টিকে থাকার লড়াইয়ের কথা।
মাছে ভাতে বাঙালি, এই প্রবাদ শুধু খাবারের কথা বলে না, একটি জীবনধারার কথাও বলে। নদী আর বিলের দেশে মানুষ বর্ষায় ধানখেতে পলো দিয়ে, খালে চাঁই পেতে, পুকুরে বড়শি ফেলে মাছ ধরেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। প্রতিটি মাছের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোনো না কোনো রান্না, কোনো উৎসব বা কোনো স্মৃতি। সেই মাছগুলো হারিয়ে গেলে হারায় সেই সংস্কৃতির একটি অংশও।
যে মাছে ভরা ছিল খাল বিল
বাংলাদেশ মিঠা পানির মাছের এক বিশাল ভান্ডার। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ, সংক্ষেপে আইইউসিএন, বাংলাদেশের ২০১৫ সালের লাল তালিকায় দেশের ২৫৩ প্রজাতির মিঠা পানির মাছের অবস্থা মূল্যায়ন করে। তাতে দেখা যায়, এর মধ্যে ৬৪টি প্রজাতি হুমকির মুখে, অর্থাৎ প্রায় প্রতি চারটির একটি। এদের ৯টি মহাবিপন্ন, ৩০টি বিপন্ন আর ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ। লাল তালিকা হলো কোন প্রাণী কতটা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে তার বৈজ্ঞানিক হিসাব।
কেন হারাচ্ছে দেশি মাছ, তার কারণ গবেষকেরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন। বিল ও জলাভূমি ভরাট হয়ে যাচ্ছে, নদী ও খালে পলি জমে গভীরতা কমছে, শুকনো মৌসুমে বিল সেচে মাছ ধরা হচ্ছে, ধানখেতের কীটনাশক গিয়ে মিশছে পানিতে। ডিম ছাড়ার মৌসুমে মা মাছ আর ছোট পোনা নির্বিচারে ধরা পড়ছে ঘন ফাঁসের জালে। বর্ষায় নদী থেকে বিলে আর প্লাবনভূমিতে মাছ চলাচলের যে প্রাকৃতিক পথ ছিল, রাস্তা ও বাঁধে অনেক জায়গায় তা বন্ধ হয়ে গেছে। মার্কিন পরিবেশ বিষয়ক সংবাদমাধ্যম মঙ্গাবে তাদের এক প্রতিবেদনে আবাসস্থল ধ্বংস আর জলবায়ু পরিবর্তনকে দেশি মাছের বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছে।
চাষির পুকুরে নতুন জীবন
দেশি মাছ কমে যাওয়ার এই সময়েই দেশের মোট মাছ উৎপাদন বেড়েছে, আর তার পেছনে আছে পুকুরে মাছ চাষ। একটি বিশ্লেষণে মৎস্য অধিদপ্তরের বার্ষিক পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৪৯ লাখ টন মাছ উৎপাদন হয়, যার ৫৮ শতাংশের বেশি এসেছে চাষ থেকে। অর্থাৎ আমাদের পাতের অর্ধেকের বেশি মাছ এখন আসে পুকুর ও খামার থেকে, নদী বা বিল থেকে নয়।
এই পরিবর্তনের একটি ভালো দিক হলো, প্রকৃতিতে কমে যাওয়া অনেক দেশি মাছ চাষির পুকুরে নতুন জীবন পেয়েছে। পাবদা, শিং, মাগুর, কই বা গুলশার মতো মাছ এখন বহু এলাকায় চাষ হয়। মৎস্য অধিদপ্তরও পুষ্টিসমৃদ্ধ এসব দেশি মাছের চাষকে উৎসাহ দেয়। তবে চাষের মাছ দিয়ে প্রকৃতির বৈচিত্র্য পুরোপুরি ফেরানো যায় না; অনেক দেশি মাছ এখনো শুধু প্রাকৃতিক জলাশয়েই জন্মায়।
ওপরের ছবিটি মুন্সীগঞ্জের আড়িয়াল বিলের মাছের। দেশের মধ্যাঞ্চলের এই বড় জলাভূমি বর্ষায় পানিতে ভরে যায়, আর তখন সেখানে নানা রকম দেশি মাছ জন্মায় ও বড় হয়। এমন বিলগুলোই দেশি মাছের প্রাকৃতিক আঁতুড়ঘর। বিল যত সুস্থ থাকে, আশপাশের নদী ও খালে মাছও তত বেশি পাওয়া যায়। এখান থেকে শুরু করে একে একে দেখা যাক আমাদের চেনা দেশি মাছগুলোকে।
রুই, কাতলা, মৃগেল: পুকুরের তিন চেনা মুখ
বাঙালির মাছের তালিকায় রুই, কাতলা আর মৃগেলের জায়গা সবার ওপরে। এই তিনটিকে একসঙ্গে বলা হয় কার্পজাতীয় বড় মাছ। প্রাকৃতিকভাবে এরা দেশের বড় নদীগুলোতে জন্মায়; বর্ষায় নদীতে ডিম ছাড়ে, আর সেই ডিম ও রেণু সংগ্রহ করে একসময় পুকুরে চাষ করা হতো। এখন কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে হ্যাচারিতে এদের পোনা উৎপাদন হয়, আর দেশের পুকুরে চাষ হওয়া মাছের বড় অংশই এই তিন মাছ।
চট্টগ্রামের হালদা নদী এই কার্পজাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হিসেবে বিখ্যাত। বর্ষার বিশেষ কিছু দিনে বজ্রবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের পর সেখানে মা মাছ ডিম ছাড়ে, আর স্থানীয় জেলেরা নৌকায় বসে সেই ডিম সংগ্রহ করেন।
একই পুকুরে তিনটি মাছ একসঙ্গে চাষ করার পেছনে একটি সুন্দর যুক্তি আছে। কাতলা খাবার খোঁজে পানির ওপরের স্তরে, রুই মাঝের স্তরে, আর মৃগেল তলার কাছাকাছি। ফলে তিনটি মাছ একে অপরের খাবারে ভাগ বসায় না, পুকুরের পুরো পানিই কাজে লাগে। মাছচাষিরা একে মিশ্র চাষ বলেন। নিচের ছবিগুলোতে প্রথমে রুই, তারপর কাতলা আর মৃগেল।
তিনটি মাছ দেখতে কাছাকাছি হলেও চেনার উপায় আছে। কাতলার মাথা শরীরের তুলনায় বেশ বড় আর মুখ ওপরের দিকে খোলা, যা ওপরের স্তর থেকে খাবার নেওয়ার উপযোগী। রুইয়ের শরীর লম্বাটে, আঁশে লালচে আভা থাকে। মৃগেলের শরীর সরু, রং রুপালি, আর লেজের পাখনায় অনেক সময় লালচে ভাব দেখা যায়।
হ্যাচারির পোনা চাষকে হাতের নাগালে এনেছে ঠিকই, কিন্তু গবেষকেরা একটি সতর্কতাও দেন। একই মা বাবা থেকে বারবার পোনা তৈরি করলে মাছের বংশগত গুণ দুর্বল হয়ে পড়ে, বৃদ্ধি কমে। তাই নদীর প্রাকৃতিক মাছ আর হালদার মতো প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র রক্ষা করা চাষের মাছের ভালো ভবিষ্যতের জন্যও জরুরি।
কই, শিং, মাগুর: বাতাস থেকে শ্বাস নেয় যারা
কই, শিং আর মাগুরকে গ্রামের মানুষ চেনেন শক্ত প্রাণের মাছ হিসেবে। এদের ফুলকার পাশাপাশি বাড়তি একটি শ্বাসযন্ত্র আছে, যা দিয়ে এরা পানির ওপরে মুখ তুলে সরাসরি বাতাস থেকে অক্সিজেন নিতে পারে। এ কারণেই অল্প পানির ডোবা, কাদাভরা নালা বা অক্সিজেন কম থাকা পানিতেও এরা বেঁচে থাকে। বাজার থেকে জীবিত অবস্থায় বাড়িতে আনা যায় বলে এই মাছের কদর বরাবরই বেশি।
কইকে ইংরেজিতে ক্লাইম্বিং পার্চ বলা হয়, কারণ বর্ষায় ভেজা মাটির ওপর দিয়ে এরা খানিকটা পথ চলতে পারে বলে প্রচলিত আছে। শিং মাছ ধরতে হয় সাবধানে; এর বুকের পাখনার কাঁটায় বিষ থাকে, আর কাঁটা ফুটলে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। মাগুরের মুখে লম্বা গোঁফ, শরীর পিচ্ছিল। শিং ও মাগুর দীর্ঘদিন ধরে রোগী ও প্রসূতির পথ্য হিসেবে পরিচিত।
চাষের পুকুরে এখন কই ও শিং বড় পরিসরে চাষ হয়। বাজারে বড় আকারের যে কই দেখা যায়, তার অনেকটাই বিদেশ থেকে আনা একই প্রজাতির দ্রুত বাড়ে এমন একটি ধরনের, যা থাই কই নামে পরিচিত। দেশি কই আকারে ছোট, রং গাঢ়, আর স্বাদের জন্য এর কদর আলাদা। মাগুরের ক্ষেত্রেও দেশি মাগুর আর বিদেশি আফ্রিকান মাগুরের পার্থক্য জানা দরকার; আফ্রিকান মাগুর রাক্ষুসে স্বভাবের বলে প্রাকৃতিক জলাশয়ের দেশি মাছের জন্য হুমকি, আর দেশে এর চাষ নিষিদ্ধ।
পাবদা ও টেংরা: ফিরে আসা স্বাদ
নরম, প্রায় কাঁটাহীন মাংস আর ঝোলের স্বাদের জন্য পাবদা বহুদিনের প্রিয় মাছ। কিন্তু প্রাকৃতিক জলাশয়ে এই মাছ কমতে কমতে আইইউসিএনের ২০১৫ সালের তালিকায় বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট পাবদার কৃত্রিম প্রজনন ও চাষের কৌশল উদ্ভাবন করে। এরপর থেকে দেশের নানা জায়গায় পুকুরে পাবদা চাষ ছড়িয়ে পড়েছে, আর বাজারে চাষের পাবদা আবার নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে।
পাবদার সাফল্য দেখিয়েছে, গবেষণাগারের একটি উদ্ভাবন কীভাবে মাঠে পৌঁছে একটি মাছকে বাঁচাতে পারে। হ্যাচারিতে পোনা তৈরি, চাষিদের প্রশিক্ষণ আর বাজারে ভালো দাম, এই তিনের মিলনে পাবদা এখন অনেক চাষির লাভজনক ফসল।
টেংরা ছোট আকারের একটি মাছ, শরীরের দুই পাশে লম্বা ডোরাকাটা দাগ থাকে, মুখে গোঁফ। বিল, খাল ও নদীতে এদের দেখা যায়। টেংরার ঝোল বা চচ্চড়ি গ্রামবাংলার পরিচিত খাবার। নিচের ছবিটি টেংরার।
টেংরার কয়েকটি কাছাকাছি প্রজাতি আছে, যাদের মধ্যে গুলশাও পড়ে। গুলশা এখন চাষের তালিকায় উঠে এসেছে, আর বাজারে চাষের গুলশা টেংরা নিয়মিত দেখা যায়।
সরপুঁটি ও চিতল
পুঁটির মধ্যে আকারে বড় সরপুঁটি। রুপালি শরীর, পাখনায় হালকা লালচে বা হলদে আভা। একসময় নদী ও বিলে প্রচুর পাওয়া যেত, এখন অনেক এলাকায় বিরল। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট যেসব দেশি মাছের প্রজনন কৌশল উদ্ভাবন করেছে বলে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, তার তালিকায় সরপুঁটিও আছে।
চিতল দেখলেই চেনা যায়। পিঠ উঁচু, শরীর ছুরির ফলার মতো চ্যাপ্টা, আর লেজের দিকে সারি সারি গোল দাগ। চিতলের পেটির মাংস আর কাঁটা ছাড়িয়ে তৈরি মুইঠ্যা বাংলার রান্নার এক বিখ্যাত পদ। আইইউসিএনের ২০১৫ সালের তালিকায় চিতল বিপন্ন প্রজাতি। এই মাছও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৃত্রিম প্রজননের তালিকায় আছে।
চিতল ও ফলি দুটোই মাংসাশী মাছ; ছোট মাছ, চিংড়ি ও জলজ পোকা খেয়ে বাঁচে। বড় আকারের চিতল বাজারে চড়া দামে বিক্রি হয়, তাই প্রাকৃতিক জলাশয়ে এর ওপর চাপও বেশি। হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় এখন কিছু চাষি পুকুরে অন্য মাছের সঙ্গে চিতল চাষ করছেন।
ইলিশ: জাতীয় মাছ
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ, আর দেশের মোট মাছ উৎপাদনে একক প্রজাতি হিসেবে সবচেয়ে বড় অবদান এই মাছের; গবেষণা ও সরকারি হিসাবে তা মোট উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালে ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পায়, অর্থাৎ বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে নিবন্ধিত হয়।
ইলিশ সাগরে বড় হয়, কিন্তু ডিম ছাড়তে উঠে আসে নদীতে। এই যাত্রাপথ রক্ষা করতেই ডিম ছাড়ার মৌসুমে নির্দিষ্ট সময় ইলিশ ধরা বন্ধ রাখা হয়, আর ছোট ইলিশ, যাকে জাটকা বলে, ধরা নিষিদ্ধ। মৎস্য অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশ যৌথভাবে উপকূলীয় জেলে সম্প্রদায়কে নিয়ে ইলিশ রক্ষার কাজ করেছে। অন্যান্য দেশি মাছের সঙ্গে ইলিশের পার্থক্য হলো, একে পুকুরে চাষ করা যায় না; এর ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ভর করে নদী ও সাগরের সুস্থতার ওপর।
ইলিশ রক্ষার এই উদ্যোগ অন্যান্য দেশি মাছের জন্যও একটি শিক্ষা। প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখা, ছোট মাছ না ধরা, আর মাছের চলাচলের পথ খোলা রাখা, এই নিয়মগুলো মেনে চললে প্রকৃতি নিজেই অনেকখানি সেরে ওঠে। ইলিশের ক্ষেত্রে জেলেদের নিষেধাজ্ঞার সময় খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা নিয়ম মানতে পারেন।
শোল ও টাকি: ধানখেতের মাছ
বর্ষায় ধানখেত আর ডোবায় যে মাছ সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তাদের মধ্যে শোল আর টাকি অন্যতম। দুটোই সাপের মতো মাথার মাছ, ইংরেজিতে এদের স্নেকহেড বলা হয়। কই মাগুরের মতো এরাও বাতাস থেকে শ্বাস নিতে পারে, তাই কম পানিতে টিকে থাকে। শোল আকারে বড়, শরীরে ডোরাকাটা দাগ। বাচ্চা হওয়ার পর শোল মাছের বাবা মা পোনার ঝাঁককে পাহারা দিয়ে রাখে, যা মাছের জগতে কম দেখা যায়। গ্রামে লাল রঙের এই পোনার ঝাঁক অনেকের চেনা দৃশ্য।
টাকি আকারে ছোট, শরীরে ছোপ ছোপ দাগ। টাকি মাছের ভর্তা গ্রামবাংলার অতি পরিচিত খাবার। নিচে প্রথমে শোল, তারপর নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে তোলা টাকির ছবি।
শোল ও টাকির একটি পরিবেশগত গুরুত্বও আছে। এরা ধানখেত ও ডোবার ছোট প্রাণী, ব্যাঙাচি ও পোকামাকড় খেয়ে জলাশয়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। ধানখেতে কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব মাছের বংশবৃদ্ধিও বাধা পেয়েছে, কারণ বর্ষায় এরা ধানখেতেই ডিম ছাড়ে ও পোনা বড় করে।
মলা: ছোট মাছ, বড় পুষ্টি
মলা যে দলের মাছ, গবেষকেরা তাকে বলেন ছোট দেশি মাছ। সাধারণত যেসব দেশি মাছ বড় হয়ে সর্বোচ্চ ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়, সেগুলোকে এই দলে ধরা হয়। মলা, ঢেলা, পুঁটি, চান্দা, বাতাসি, কাচকির মতো মাছ এই দলে পড়ে। গ্রামের দরিদ্র পরিবারের পুষ্টির বড় উৎস এই ছোট মাছ, কারণ দামে কম আর পুরোটাই খাওয়া যায়।
আকারে মলা হয়তো আঙুলের সমান, কিন্তু পুষ্টির হিসাবে এটি বড় মাছকেও ছাড়িয়ে যায়। ছোট দেশি মাছের পুষ্টি নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, মলার খাওয়ার উপযোগী কাঁচা অংশের প্রতি ১০০ গ্রামে ২ হাজার ৫০০ মাইক্রোগ্রামের বেশি রেটিনল সমতুল্য ভিটামিন এ থাকে, যেখানে অনেক ছোট মাছে তা ১০০ মাইক্রোগ্রামেরও কম। ভিটামিন এ চোখের দৃষ্টি ও রোগ প্রতিরোধের জন্য জরুরি।
মলা খাওয়া হয় মাথা ও কাঁটাসহ পুরোটা, তাই এর থেকে ক্যালসিয়াম, আয়রন ও জিংকও পাওয়া যায়। ওয়ার্ল্ডফিশের পুষ্টিবিজ্ঞানী শকুন্তলা হারাকসিং থিলস্টেড ও তাঁর সহকর্মীরা দেখিয়েছেন, বাড়ির পুকুরে মলা চাষ গ্রামের পরিবারে ভিটামিন এর ঘাটতি পূরণের একটি কম খরচের উপায় হতে পারে।
মলার মতো ছোট মাছ কাটার সময় মাথা ফেলে দেওয়ার অভ্যাস অনেকের আছে। কিন্তু পুষ্টিবিদেরা বলেন, মলার ভিটামিন এর বড় অংশ থাকে মাথা ও চোখে। তাই পুরো মাছ রান্না করে খাওয়াই পুষ্টির দিক থেকে সবচেয়ে ভালো। বাড়ির পুকুরে রুই কাতলার সঙ্গে মলা চাষ করলে বড় মাছের বৃদ্ধিতে তেমন ক্ষতি হয় না, অথচ পরিবার নিয়মিত ছোট মাছ খেতে পারে।
আইড় ও বাইম
আইড় বড় আকারের গোঁফওয়ালা মাছ, বড় নদীতে থাকে। আইইউসিএনের ২০১৫ সালের তালিকায় আইড় ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এই মাছেরও কৃত্রিম প্রজনন করতে পেরেছে বলে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। বাইম লম্বা, সাপের মতো দেখতে মাছ, শরীরে ঢেউখেলানো নকশা। কাদা আর জলজ আগাছার মধ্যে লুকিয়ে থাকে। ছবির এই বাইম, যাকে শাল বাইমও বলা হয়, আইইউসিএনের তালিকায় বিপন্ন প্রজাতি। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সফল প্রজননের তালিকায় শাল বাইমের নামও আছে।
বাইম মাছ দিনের বেলা কাদায় বা পাথরের ফাঁকে লুকিয়ে থাকে, রাতে খাবারের খোঁজে বের হয়। বিল শুকিয়ে গেলে বা জলাশয়ের তলার কাদা তুলে ফেললে এদের আশ্রয় নষ্ট হয়, তাই আবাসস্থল হারানো বাইমের জন্য বড় হুমকি। আইড় থাকে বড় নদীর গভীর অংশে; নদীর গভীরতা কমে যাওয়া আর মা মাছ ধরা পড়ায় এর সংখ্যাও কমেছে।
ফলি: রুপালি ছুরির মতো মাছ
চিতলের নিকটাত্মীয় ফলি, আকারে ছোট। শরীর চ্যাপ্টা, রং রুপালি ব্রোঞ্জ, দেখতে অনেকটা ছুরির ফলার মতো। আইইউসিএনের ২০১৫ সালের তালিকায় ফলি ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৃত্রিম প্রজননের তালিকায় ফলিও আছে।
হারিয়ে যাওয়া মাছ ফেরানোর চেষ্টা
দেশি মাছ ফেরানোর কাজে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি ৪১টি দেশি মাছের প্রজনন ও চাষের কৌশল উদ্ভাবন করেছে, যার ২০টি গত দশ বছরে। তালিকায় আছে পাবদা, বোয়ালি, বাটা, চিতল, মহাশোল, ফলি, ঢেলা, গজার, শিং, মাগুর, আইড়, গনিয়া, পুঁটি, বেদা, সরপুঁটি, তিতপুঁটি, পিয়ালি, বাতাসি, শাল বাইম, কাকিলা ও কুর্শার মতো মাছ। হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন হলে চাষিরা তা পুকুরে চাষ করতে পারেন, আর প্রাকৃতিক জলাশয়ে ছাড়ার সুযোগও তৈরি হয়।
২০২০ সালে ময়মনসিংহে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সদর দপ্তরে দেশের প্রথম জীবন্ত জিন ব্যাংক চালু হয়। এখানে বিপন্ন ও দেশি ছোট মাছ জীবিত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়, যাতে কোনো প্রজাতি প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেলেও তা আবার ফিরিয়ে আনা যায়। দ্য ডেইলি স্টারের তথ্য অনুযায়ী দেশের ১৪৩ প্রজাতির ছোট দেশি মাছের মধ্যে ১০২টি এই ব্যাংকে জায়গা পেয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ বছরে ছোট দেশি মাছের উৎপাদন ৭৩ শতাংশ বেড়েছে।
বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানো মাছগুলোকে আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজও চলছে। বিলে ও নদীর নির্দিষ্ট অংশে মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হয়, যেখানে মাছ ধরা নিষেধ। সেখানে মা মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়ে, আর বর্ষায় সেই পোনা আশপাশের জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় মানুষকে এই অভয়াশ্রম রক্ষার কাজে যুক্ত করা গেলে তার ফল সবচেয়ে ভালো হয়।
তবে গবেষণাগার আর পুকুর দিয়েই সব মাছ বাঁচানো যাবে না। বিল ও নদীর আবাসস্থল রক্ষা, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখা, ঘন ফাঁসের জাল ব্যবহার না করা, বিলের কিছু অংশকে মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে সংরক্ষণ করা, আর ধানখেতে কীটনাশকের ব্যবহার কমানো, এসব ছাড়া দেশি মাছের প্রাকৃতিক ভান্ডার ফিরবে না।
সাধারণ মানুষেরও এখানে ভূমিকা আছে। ডিমওয়ালা মা মাছ বা একেবারে ছোট পোনা বাজারে দেখলে না কেনা, বর্ষায় ধানখেত থেকে পোনা মাছ ধরে না ফেলা, আর বাড়ির আশপাশের ডোবা ও পুকুর ভরাট না করা, এই ছোট সিদ্ধান্তগুলোও দেশি মাছ রক্ষায় কাজে আসে। গ্রামে বিল সেচে শেষ মাছটি পর্যন্ত ধরে ফেলার প্রবণতা থামাতে না পারলে পরের বছর সেই বিলে মাছ ফিরবে না।
পাতে দেশি মাছ রাখার দায়
এই আঠারোটি ছবির প্রতিটি মাছ একসময় গ্রামের সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের খাবার ছিল। আজ তাদের অনেকগুলো আমরা বাজারে খুঁজে পাই চাষিদের পুকুর থেকে। মাছচাষিরা যখন দেশি মাছের চাষে ঝুঁকি নেন, আর ক্রেতারা যখন দেশি মাছের খোঁজ করেন, তখনই এই মাছগুলোর টিকে থাকার পথ চওড়া হয়। দেশি মাছ শুধু স্বাদের বিষয় নয়; এটি আমাদের পুষ্টি, জীবিকা আর নদীমাতৃক দেশের প্রকৃতির অংশ।
আশার কথা হলো, গবেষক, সরকার আর চাষিদের চেষ্টায় পাবদা, শিং, মাগুর, চিতল বা শাল বাইমের মতো মাছ আবার বাজারে দেখা যাচ্ছে। হারিয়ে যেতে বসা মাছ যে ফেরানো যায়, এটাই তার প্রমাণ। বাকি কাজ আমাদের সবার: বিল, নদী আর পুকুরকে এমনভাবে রাখা, যাতে ছবির এই মাছগুলো ছবিতে নয়, জলেই থাকে।
মন্তব্য
(০)