ফল শুধু স্বাদ, পুষ্টি বা স্বাস্থ্যগুণের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; ইতিহাসের পাতায়ও কিছু ফল রেখে গেছে অবিশ্বাস্য ছাপ। কখনো একটি ফলের জন্য শুরু হয়েছে বাণিজ্যিক যুদ্ধ, কখনো একটি ফলের কারণে বদলে গেছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, আবার কখনো ফল দেখেই তৈরি হয়েছে বৈজ্ঞানিক সূত্র। চলুন জেনে নেওয়া যাক ইতিহাসের এমনই কিছু মজার ঘটনা।
ফলের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্প সম্ভবত আপেলকে ঘিরেই। কথিত আছে, ইংরেজ বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন একদিন গাছের নিচে বসে ছিলেন। তখন একটি আপেল গাছ থেকে মাটিতে পড়ে। এই ঘটনাই তাকে ভাবতে বাধ্য করে কেন বস্তু সবসময় নিচের দিকে পড়ে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় মহাকর্ষ সূত্রের ধারণা।
যদিও ইতিহাসবিদরা মনে করেন, গল্পটি কিছুটা অতিরঞ্জিত, তবে নিউটন নিজেই আপেল পড়ার ঘটনা থেকে অনুপ্রেরণা পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছিলেন। ফলে আপেল আজ শুধু একটি ফল নয়, বিজ্ঞানচর্চারও এক প্রতীক।
শুনতে অবাক লাগলেও কলাকে ঘিরে একসময় রাজনৈতিক অস্থিরতা পর্যন্ত সৃষ্টি হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মধ্য আমেরিকার কয়েকটি দেশে কলা ব্যবসার ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল মার্কিন কোম্পানি ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি।
কোম্পানিটির প্রভাব এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, কিছু দেশে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রেও তারা প্রভাব খাটাত। এ থেকেই জন্ম নেয় বানানা রিপাব্লিক শব্দটি, যা এমন দেশকে বোঝায় যেখানে একটি বিদেশি কোম্পানি অর্থনীতি ও রাজনীতিতে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করে।
আজ বাজারে সহজলভ্য হলেও ১৭শ ও ১৮শ শতাব্দীতে ইউরোপে আনারস ছিল অত্যন্ত বিরল ও দামি ফল। তখন এটি ধন-সম্পদ ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। ইংল্যান্ডের ধনীরা অতিথিদের সামনে আনারস সাজিয়ে রাখতেন নিজেদের সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য। এমনকি অনেক সময় একটি আনারস কেনার সামর্থ্য না থাকলে সেটি ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল। ভাবা যায়, একটি ফলও একসময় আভিজাত্যের প্রতীক ছিল!
দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় নাবিকদের মধ্যে স্কার্ভি নামের এক রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ত। ১৮শ শতাব্দীতে চিকিৎসকরা আবিষ্কার করেন, লেবু ও কমলার মতো সাইট্রাস ফলে থাকা ভিটামিন সি এই রোগ প্রতিরোধে কার্যকর। এরপর থেকে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজে নিয়মিত লেবু ও কমলা সরবরাহ করা শুরু হয়। ফলে হাজার হাজার নাবিকের জীবন রক্ষা পায় এবং দীর্ঘ সমুদ্র অভিযান আরও নিরাপদ হয়ে ওঠে। ইতিহাসে এটি ছিল ফলের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের অন্যতম বড় সাফল্য।
প্রাচীন মিশরের সমাধিগুলোতে তরমুজের বীজ পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগেও মানুষ তরমুজ চাষ করত। তবে সেই সময়ের তরমুজ আজকের মতো মিষ্টি ও রসালো ছিল না। বিজ্ঞানীদের মতে, বহু শতাব্দীর নির্বাচিত চাষাবাদের ফলে ধীরে ধীরে তরমুজের স্বাদ ও আকার বদলেছে। অর্থাৎ, আজ আমরা যে সুস্বাদু তরমুজ খাই, তা প্রকৃতির নয়, বরং হাজার বছরের কৃষি উন্নয়নের ফল।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে ফলের ভূমিকা অনেক সময়ই চোখ এড়িয়ে যায়। অথচ একটি আপেল বিজ্ঞানকে অনুপ্রাণিত করেছে, একটি কলা রাজনৈতিক অভিধানে নতুন শব্দ যোগ করেছে, একটি আনারস সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়েছে, আর কমলা ও লেবু বাঁচিয়েছে অগণিত প্রাণ। তাই ফল শুধু খাবার নয়; ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানব সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশও বটে। কেএসকে





মন্তব্য
(০)