বাগেরহাট শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার পশ্চিমে সুন্দরঘোনায় দাঁড়িয়ে আছে মধ্যযুগীয় বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ষাটগম্বুজ মসজিদ। পোড়া ইটের বিশাল আয়তাকার এই মসজিদ আজও নামাজের জায়গা, একই সঙ্গে সংরক্ষিত প্রত্ননিদর্শন আর দেশের বড় পর্যটন আকর্ষণ। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদের শহরকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় নেয়।
মসজিদটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরত খানজাহান আলীর নাম, যিনি উলুঘ খান-ই-জাহান নামেও পরিচিত ছিলেন। পঞ্চদশ শতকে তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলায় গড়ে তোলেন খলিফাতাবাদ নামে একটি পরিকল্পিত মুসলিম নগর, যেখানে মসজিদের পাশাপাশি ছিল রাস্তা, সেতু, জলাধার, পুকুর আর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা। ইউনেস্কোর তথ্যে নগরটি প্রায় ৫০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে ছিল; ১৪৫৯ সালে প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর এর বড় অংশ জঙ্গলে ঢেকে যায়।
নাম ষাটগম্বুজ হলেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের হিসাবে মসজিদে গম্বুজ ৮১টি। ছাদ দাঁড়িয়ে আছে ছয় সারিতে ১০টি করে মোট ৬০টি স্তম্ভের ওপর, তাই ‘ষাট’ সংখ্যাটি গম্বুজের চেয়ে স্তম্ভের সঙ্গেই বেশি মেলে বলে একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা আছে, যদিও নামের উৎস নিয়ে একক কোনো ব্যাখ্যা নেই। অধিদপ্তরের মাপে বাইরের দিকে মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৬০ ফুট আর পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ১০৪ ফুট, দেয়াল প্রায় সাড়ে আট ফুট পুরু। পশ্চিম দেয়ালে প্রধান মেহরাবের পাশে একটি দরজাসহ মোট দরজা ২৬টি।
স্থাপত্যে বাংলার স্থানীয় নির্মাণরীতির সঙ্গে দিল্লির তুঘলক স্থাপত্যের প্রভাব দেখা যায়: মোটা দেয়াল, চার কোণে চারটি শক্ত বুরুজ, নিচু ও ভারী কাঠামো। ইউনেস্কো একে স্বতন্ত্র খানজাহানী রীতি বলে উল্লেখ করেছে। দক্ষিণের একটি মিনারের মাথায় রোশনাই কুঠির নামে একটি অংশ আছে। খানজাহান চট্টগ্রাম বা উড়িষ্যার রাজমহল থেকে জলপথে পাথর ভাসিয়ে এনেছিলেন, এমন জনশ্রুতিও প্রচলিত, তবে তা প্রমাণিত ইতিহাস নয়।
এখন এই মসজিদের বড় দীর্ঘমেয়াদি হুমকি লবণাক্ততা আর আর্দ্রতা। ইউনেস্কো অনেক দিন ধরেই মাটি ও বাতাসের লবণকে বাগেরহাটের প্রত্নস্থলের জন্য বড় হুমকি বলে চিহ্নিত করছে; সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমস্যার পুরো সমাধান হয়নি। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে ইটের গায়ে লবণের স্ফটিক, দেয়ালে আর্দ্রতা আর সবুজাভ আস্তরণের কথা এসেছে। ইটে লবণ ঢুকে শুকানোর সময় স্ফটিক তৈরি হয়, বারবার ভেজা-শুকানোয় গাঁথুনিতে চাপ পড়ে ক্ষয় বাড়ে। উপকূলের কাছে হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনে এ ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। অতীতের কিছু সংস্কারে মূল বৈশিষ্ট্য বদলে গেছে বলেও ইউনেস্কোর নথিতে উল্লেখ আছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জানায়, ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে পাহাড়পুর-বাগেরহাট প্রকল্পে মসজিদ সংস্কার আর পাঁচ কক্ষের, ২ হাজার ৫৫ বর্গফুটের বাগেরহাট জাদুঘর গড়া হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মসজিদ ও জাদুঘরে ই-টিকিটিং চালু হয়েছে। আশপাশে আছে সিঙ্গাইর, নয়গম্বুজ, চুনাখোলা, বিবিবেগনী, রেজাখোদা ও রণবিজয়পুর মসজিদ এবং খানজাহানের সমাধিসৌধ, যেগুলো মিলেই মসজিদের শহর বাগেরহাট।
ছবি: Belayet (Bellayet) / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: ডেইলি অবজারভার




মন্তব্য
(০)