সৌদি আরব দেশের লাখ লাখ উটের জন্য পাসপোর্ট ইস্যু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশটির পরিবেশ, পানি ও কৃষি মন্ত্রণালয় সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে নথিটির ছবি দেখিয়েছে: সবুজ রঙের একটি পাসপোর্ট, যার প্রচ্ছদে দেশের প্রতীক ও সোনালি রঙের একটি উটের ছবি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এর মাধ্যমে মূল্যবান এই প্রাণীগুলোর ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে এবং উটের পরিচয় ও মালিকানার একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি হবে।
সংখ্যাটা ছোট নয়। ২০২৪ সালের সরকারি হিসাবে সৌদি আরবে প্রায় ২২ লাখ উট রয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতিতে বছরে দুই বিলিয়ন রিয়ালের বেশি অবদান রাখে। আরব নিউজের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে উটের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি, যার এক কোটি সত্তর লাখই আরব বিশ্বে; আরব দেশগুলোর মধ্যে সংখ্যায় শীর্ষে সোমালিয়া, তারপর সুদান, মৌরিতানিয়া, সৌদি আরব ও ইয়েমেন।
পশুপালন খাতের জন্য এমন নিবন্ধন ব্যবস্থার তাৎপর্য স্পষ্ট। উটের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীতে সেরা প্রাণীর দাম ওঠে অনেক, আর দুধ, চামড়া ও লোমের বাণিজ্য বাড়ছে। 'স্বানি' নামের একটি প্রতিষ্ঠান উটের দুধ ও গুঁড়া দুধ শিল্পে বিনিয়োগ করে ইতোমধ্যে ২৫টি দেশে পণ্য রফতানি করছে এবং উটের দুধের আইসক্রিমও তৈরি করছে। 'আবেল' ব্র্যান্ড উটের লোম ও চামড়া দিয়ে পোশাক, ব্যাগ ও জুতা বানায়; কুমিরের চামড়ার পর উটের চামড়াকেই সবচেয়ে শক্ত ও টেকসই ধরা হয়।
উট বিশেষজ্ঞদের মতে জাতভেদে গুণ আলাদা: ওমান ও সুদানের উট দৌড়ের জন্য পরিচিত, আর সৌদি আরবের উপকূলীয় অঞ্চলের উট বেশি দুধ দেয়। রঙের ভিত্তিতে বাদামি থেকে লালচে পর্যন্ত উটকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। একটি উট ৪০০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত বোঝা বহন করতে পারে, যে কারণে এর নাম 'মরুভূমির জাহাজ'।
ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয়। বিশ শতকের শুরুতে মক্কা ও মদিনায় যাতায়াতের একমাত্র বাহন ছিল উট; চারশ বছর আগে 'ইকলাত' নামে পরিচিত ব্যবসায়ীরা ভারত, তুরস্ক, মরক্কো ও নাইজেরিয়া পর্যন্ত উটের বাণিজ্য করতেন। সৌদি আরবে পাথরে খোদাই করা উটের ভাস্কর্য ২০১৮ সালে খননের সময় দুই হাজার বছরের পুরোনো ভাবা হলেও ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় এর বয়স সাত থেকে আট হাজার বছর নির্ধারণ করা হয়, অর্থাৎ উট গৃহপালিত হওয়ারও আগের।
রিয়াদ পত্রিকার কলাম লেখক ও ইতিহাসবিদ বদর বিন সৌদ বলেন, "উট ছাড়া এই শুষ্ক ও প্রচণ্ড গরম মরুভূমিতে টিকে থাকা অসম্ভব হতো।" আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজের 'আল-রামাআত' নামে উটের পাল ছিল, বাদশাহ সালমানও উটের ভক্ত, আর যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের রয়েছে 'আল-শরফ' নামের একটি উন্নত জাতের উট।
ভিশন ২০৩০-এর আওতায় উট শিল্পকে সৌদি আরবের তেলবহির্ভূত প্রধান আয়ের উৎসগুলোর একটি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। পশুসম্পদের সরকারি নিবন্ধন সেই পরিকল্পনার ভিত্তি; বাংলাদেশসহ যে দেশগুলো গবাদিপশুর তথ্যভাণ্ডার নিয়ে ভাবছে, তাদের জন্য সৌদি উদ্যোগটি একটি উদাহরণ হয়ে থাকল।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)