দেশে বছরে দেড় কোটি মেট্রিক টনের বেশি সবজি উৎপাদিত হলেও রপ্তানি হয় এর শূন্য দশমিক ৩ শতাংশেরও কম। আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ ও মানসম্মত সবজির নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করতে তাই উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছেন সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা। কীটনাশক ব্যবস্থাপনা, ট্রেসঅ্যাবিলিটি, পরীক্ষা ও সনদায়ন, মোড়কীকরণ, লজিস্টিকস এবং অর্থায়ন—এই ছয় জায়গায় উন্নতির তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুমে ‘রপ্তানি প্রস্তুতির পথে: বাংলাদেশের সবজি রপ্তানি খাতের প্রতিবন্ধকতা ও অঙ্গীকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা উঠে আসে। বৈঠকের আয়োজক সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশ; সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান।
আলোচনায় রপ্তানির বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, পরীক্ষা ও সনদায়নের জটিলতা, দুর্বল ট্রেসঅ্যাবিলিটি, উচ্চ পরিবহন ব্যয়, বিমানবন্দর ও কাস্টমসে বিলম্ব, দুর্বল মোড়কীকরণ এবং মূল্যশৃঙ্খলে সমন্বয়ের ঘাটতি। এসজিএস বাংলাদেশের একটি বাজার সমীক্ষার ফলাফল ধরে রপ্তানিকারক ও অংশীজনেরা চালানের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও কমপ্লায়েন্সের প্রতিবন্ধকতা বিশ্লেষণ করেন। বিশেষ করে গার্ডজাতীয় সবজির চালান ইউরোপের বাজারে প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় রপ্তানিকারকের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে প্রসঙ্গ আসে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আমিরুল বাহরাইন বলেন, কীটনাশকের বিষাক্ততার মাত্রা অনুযায়ী রঙভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস থাকলেও খেত পর্যায়ে সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ; আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা পেতে ভালো পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক মোড়ক ও উপস্থাপনাও জরুরি। পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক মো. আব্দুল মজিদ প্রামানিক দুর্বল বাজারতথ্য, আকাশপথের উচ্চ ও অনিশ্চিত ভাড়া, অপর্যাপ্ত লজিস্টিকস ও সীমিত সমন্বয়কে বড় প্রতিবন্ধকতা বলে চিহ্নিত করেন এবং রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্য ও খেত পর্যায়ে ট্রেসঅ্যাবিলিটি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফভিএপিইএ) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোবাশ্বেরুর রহমান জুয়েল জানান, আকাশপথে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ায় রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়ছে। আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির চিফ অব ব্রাঞ্চ বিজনেস অ্যান্ড হেড অব অপারেশনস হেলাল আহমেদ বলেন, কৃষি রপ্তানি খাতের রপ্তানিকারক, কৃষক ও পরামর্শকদের প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা দিতে ব্যাংক প্রস্তুত।
সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর ইশরাত ফাতেমার পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশের জমি, অনুকূল জলবায়ু ও কৃষক থাকলেও ক্রেতা পণ্য হাতে পাওয়ার পরও আস্থা রাখতে পারেন—এমন পূর্ণাঙ্গ কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি; মূল্যশৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে সমন্বিতভাবে তা শক্ত করতে হবে। অংশগ্রহণকারীরা খেত পর্যায়ে সঠিক কীটনাশক ব্যবহার, সহজ ও কার্যকর পরীক্ষা-সনদায়ন, বাজার বৈচিত্র্য, উন্নত লজিস্টিকস, বাজারতথ্য এবং রপ্তানিকারকবান্ধব আর্থিক সেবার সুপারিশ করেন।
বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বিএসটিআই, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বিএফভিএপিইএর সদস্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সবজিচাষির জন্য বার্তাটি সরল: খেতে কোন কীটনাশক কখন দেওয়া হলো, তার হিসাব রাখা এখন রপ্তানির প্রথম শর্ত। প্রতিবেদনটি সমকাল প্রতিবেদকের।
সূত্র: সমকাল





মন্তব্য
(০)