রমনা উদ্যানের নার্সারির ভেতরে, খিলানের মতো একটি কাঠামোর ওপর, ইয়েলো ট্রাম্পেট ভাইনের একটিমাত্র গাছ আছে—দেশে আর কোথাও এটি চোখে পড়েনি। এ দেশে দুষ্প্রাপ্য এই লতানো উদ্ভিদে শরতেও ফুল ফুটছে।
ব্রিটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী জন সিমস ১৮২০ সালে কার্টিসের বোটানিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রথম এ উদ্ভিদের প্রজাতিগত নাম ও আনুষ্ঠানিক বর্ণনা দেন এবং একে বিগনোনিয়া চেম্বারলেইনি (Bignonia chamberlaynii) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেন। পরে ফরাসি উদ্ভিদবিজ্ঞানী এদুয়ার ব্যুরো ও জার্মান উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্ল মরিটজ শুমান প্রজাতিটিকে অ্যানিমোপেগমা (Anemopaegma) গণে স্থানান্তর করেন; এর স্বীকৃত আধুনিক দ্বিপদ নাম অ্যানিমোপেগমা চেম্বারলেইনি (Anemopaegma chamberlaynii)। গণের নামটি গ্রিক, আভিধানিক অর্থ ‘পবন-খেলুড়ে’; প্রজাতির নাম রাখা হয় বার্মিংহামের উল্লেখযোগ্য ইংরেজ অর্কিড চাষি রেভারেন্ড অনারেবল জোসেফ চেম্বারলেইনের সম্মানে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইংল্যান্ডে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হলেও বাংলাদেশে এটি কবে এসেছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। উদ্ভিদবিদ্যার নথি ও কোনো কোনো লেখকের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ বলছে, বিশ শতকের মাঝামাঝির আগে কোনো এক সময় এটি এ দেশে আসে, তবে তখন তথ্য রাখা বা নথিভুক্ত করা হয়নি। ঔপনিবেশিক আমলে ও পরে কয়েকজন উদ্ভিদবিদ ও ধনাঢ্য ব্যক্তি বিভিন্ন দেশ থেকে পছন্দের গাছ এনে পার্কে, বাগানে ও বাড়িতে লাগাতেন; সম্ভবত রমনা উদ্যানে রোপিত গাছটির কারণেই ২০১৪ সালে একে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়।
এর আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা—বিশেষ করে ব্রাজিল, বলিভিয়া ও প্যারাগুয়ে। বাংলাদেশের উচ্চ তাপমাত্রা ও অধিক আর্দ্রতার আবহাওয়ায় ব্রাজিলের এ গাছ বেশ ভালোভাবে টিকে গেছে।
ইয়েলো ট্রাম্পেট ভাইন একটি চিরসবুজ বহুবর্ষজীবী আরোহী কাষ্ঠল লতা; কাণ্ড অশাখ, লতা পাঁচ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। লতার গিঁট থেকে সরু ও দীর্ঘ সুতার মতো সবুজ আকর্ষী বের হয়ে সহায়ককে আঁকড়ে ধরে। পাতা পক্ষল যৌগিক, দুটি পত্রক নিয়ে গঠিত, সঙ্গে পত্রসদৃশ ছদ্ম-উপপত্র। ফুল ফানেল বা চোঙার মতো, বড় ও খোলা মুখের নলাকার; মুখের কাছে পাপড়ি পাঁচ খণ্ডে বিভক্ত ও সাদাটে, গোড়ার নলাকার অংশ হলদে এবং বোঁটার কাছে সামান্য বাঁকানো। আলংকারিক উদ্ভিদ হিসেবে অনেক দেশের বাগানে এর চাষ হয়।
দীর্ঘদিন এ দেশে থাকলেও গাছটি খুব বেশি বিস্তার লাভ করেনি। অথচ আধা-শক্ত কাঠের, দুই-তিনটি গিঁটযুক্ত কাণ্ডের কাটিং বা কলম করে গ্রীষ্মের শেষ থেকে বর্ষাকাল পর্যন্ত এর চারা তৈরি করা যায়; গুটিকলমেও চারা হয়। রোদে লাগানো গাছে বেশি ও ভালো ফুল ফোটে, আর সুন্দর গড়ন ও বেশি ফুলের জন্য মাঝেমধ্যে ছাঁটাই দরকার—নার্সারি ও শৌখিন বাগানির জন্য এটি তাই সহজেই বাড়ানোর মতো একটি দুর্লভ ফুলগাছ।
লেখাটি সমকালে প্রকাশ করেছেন কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মৃত্যুঞ্জয় রায়।
সূত্র: সমকাল





মন্তব্য
(০)