রংপুরের কৃষকের কাছে আলু একসময় ছিল নগদ টাকার ফসল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় আর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বার্ষিক বাজার পর্যালোচনার তথ্য বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের ১২ বছরের মধ্যে ৭ বছরই আলুতে লোকসান হয়েছে: ২০১৪, ২০১৫, ২০১৭, ২০১৮, ২০২১, ২০২২ ও ২০২৫। লাভ হয়েছে ২০১৬, ২০১৯, ২০২০, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে।
স্থানীয় কৃষি কার্যালয় ও কৃষকদের হিসাবে ২০২৫-২৬ মৌসুমে কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ প্রায় ১৬ টাকা, মাঠ থেকে হিমাগারে নিতে আরও ২ টাকা, হিমাগার ভাড়া ৬ টাকা; সব মিলিয়ে ২৪ টাকা। অথচ হিমাগার গেটে আলু বিকোচ্ছে গড়ে ১২ টাকায়, অর্থাৎ কেজিতে ১২ টাকা লোকসান, যদিও সরকার হিমাগার গেটে দাম বেঁধে দিয়েছিল ২২ টাকা। খুচরায় এখন আলু ১৪ থেকে ১৫ টাকা কেজি।
জেলার ৪২টি হিমাগারে এ মৌসুমে আলু রাখা হয়েছিল ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ মেট্রিক টন, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খাওয়ার আলু ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৭ টন। গত মৌসুমে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ কৃষক ৬৬ হাজার ৪৫০ হেক্টরে আলু চাষ করে পেয়েছিলেন প্রায় ১৯ লাখ ৫৭ হাজার টন। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী জানান, গত বছর রংপুরের আট উপজেলার কৃষকেরা চার লাখ বস্তা আলু হিমাগার থেকে তোলেননি, তাতে তাঁদের প্রায় ৬০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।
বদরগঞ্জের আমরুলবাড়ি গ্রামের ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ২০১৪ সাল থেকে সাতবার আলুতে লোকসান দিয়েছেন; এবার হিমাগারে রাখা ৩০০ বস্তায় কেজিতে ১২ টাকা লোকসান। রংপুর বিভাগীয় আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যসচিব বিশ্বজিৎ বণিক জানান, গত বছর তাঁর প্রায় ৭০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে, আলু চাষ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। রংপুর আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সহসম্পাদক মোবারক হোসেন মনছুর উৎপাদন খরচের সঙ্গে ৩৩ শতাংশ যোগ করে দাম নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন।
ডিএইর রংপুর অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ আলু রংপুর অঞ্চলে হয়, অথচ উৎপাদনের মাত্র ২২ শতাংশ হিমাগারে রাখার সুযোগ আছে; আলুভিত্তিক শিল্প ও রপ্তানি না বাড়লে সংকট কমবে না। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট রংপুরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. খায়রুল ইসলাম সতর্ক করেন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি কাঠামো শক্ত না হলে কৃষকেরা আলু চাষ থেকে সরে যেতে পারেন। এর মধ্যেই এ মৌসুমের আগাম আলু লাগানো শুরু হয়েছে।
প্রতিবেদনটি করেছেন প্রথম আলোর রংপুর প্রতিনিধি আলতাফ হোসেন।
ছবি: Hridoye Mati O Manush / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)