নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সারা বছর ফসল ফলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজশাহী বিভাগের ১০২ জন চাষিকে বিনা মূল্যে ‘পলিনেট হাউস’ নির্মাণ করে দিয়েছিল কৃষি বিভাগ। তিন বছর পর দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ হাউসে ফসলই হচ্ছে না; পলিথিন ছিঁড়ে গেছে, সেচযন্ত্র অচল, আর চাষিরা ‘কিছু একটা হচ্ছে’ দেখাতে আঙুরগাছ লাগিয়ে রেখেছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই ১০২টি হাউস নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা—প্রতিটিতে গড়ে প্রায় ২৪ লাখ টাকা।
‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন’ শীর্ষক ১৮৭ কোটি টাকার এই প্রকল্প নিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। হাউসগুলোর মধ্যে রাজশাহীতে ২২টি, নাটোরে ২৯, নওগাঁয় ৭, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৬, পাবনায় ১৭, জয়পুরহাটে ৬, বগুড়ায় ১১ ও সিরাজগঞ্জে ৪টি। এক বিঘা জমির ২৫ শতাংশের ওপর পলিথিন, নেট ও লোহার কাঠামোয় তৈরি এই ঘরে ক্যাপসিকাম, টমেটো, ব্রকলি, স্ট্রবেরি, লেটুস থেকে গোলাপ, জারবেরা ও গাঁদা ফুল চাষের কথা বলা হয়েছিল। চাষিদের সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তি হয়েছে; হাউস ফেলে রাখলে নির্মাণব্যয় সাত দিনের মধ্যে কোষাগারে ফেরত দেওয়ার শর্তও আছে।
গত আগস্টে ১৬ জন হাউসপ্রাপ্ত চাষির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের ১০ জনই বড় লোকসানে আছেন। যে ছয়জন লোকসান হয়নি বলেছেন, তাঁদের চারজন চারা উৎপাদনে, একজন আঙুরে ও একজন ফুলে সাফল্য পেয়েছেন। সরেজমিনে দেখা সাতটি হাউসের চারটির পলিথিন ছেঁড়া, একটির পলিথিন পুরোপুরি খোলা। ঈশ্বরদীর বখতারপুরের নজরুল ইসলাম বলছেন, হাউসের ভেতরে এত গরম যে কর্মচারীরা কাজ করতে চান না; পলিথিন খুলে এখন পটোল চাষ করছেন। জমি ইজারা দিলে বছরে এক লাখ টাকা পেতেন বলে আক্ষেপ তাঁর।
চাষিদের অভিযোগ, নিম্নমানের সামগ্রীতে হাউস টেকসই হয়নি এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। নওগাঁর রানীনগরের মাসুদ রানা জানান, কারিগরেরা ২০০ মাইক্রোনের পলিথিন দেওয়ার কথা বললেও দেওয়া হয়েছে ১০০ মাইক্রোনের কম; বিশেষজ্ঞের পরামর্শে এক লাখ টাকায় বিদেশি ক্যাপসিকাম ও টমেটোর বীজ কিনে আরও তিন লাখ টাকা খরচ করে ফলন পেয়েছেন খোলা মাঠের অর্ধেকেরও কম, মোট লোকসান ১০ লাখ টাকা। পবার বড়গাছির মর্তুজা আহমেদও বলছেন, এক টাকাও লাভ হয়নি, খরচ হয়েছে ১০ লাখ। হাউসের ‘মিক্সড ইরিগেশন’ যন্ত্র বেশির ভাগই অচল; কর্মকর্তারা বলছেন বরেন্দ্র অঞ্চলের আয়রনযুক্ত খর পানিতে যন্ত্র নষ্ট হয়েছে, আর চাষিরা বলছেন এক বছরের মধ্যেই সব মেশিন বিকল হলেও মেরামত করে দেওয়া হয়নি।
নওগাঁর এক চাষি তিন বছরে ২৮ রকমের ফসল চেষ্টা করে একটিতেও সফল হননি। নাম প্রকাশ না করে তিনি জানান, প্রকল্পের এক বছর পর পাবনার হর্টিকালচার সেন্টারের মতবিনিময় সভায় সবাইকে সাফল্যের গল্প বানিয়ে বলতে বাধ্য করা হয়েছিল; একজন মুখ ফসকে সত্য বলে ফেলার পর সবাই ব্যর্থতার কথা ফাঁস করে দেন। বগুড়া সদরের যে চাষিকে কৃষি বিভাগ সফল বলে প্রচার করেছে, তিনিও বলছেন, এটি এখন লোকদেখানো প্রকল্প।
প্রকল্প পরিচালক ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক এস এম হাসানুজ্জামানের ভাষ্য, কৃষকেরা পরিশ্রম করতে চান না এবং পরামর্শ মানেন না বলে সফল হননি; কাউকে জোর করে হাউস দেওয়া হয়নি এবং আঙুরের জন্য এটি টেকসই প্রযুক্তি। তিনি জানান, ঠিকাদার এক বছর বিনা মূল্যে সেবা ও তিন বছর পলিথিন মেরামতের দায়িত্বে ছিলেন; সে সময় পেরিয়ে যাওয়ায় এখন চাষিদেরই চালাতে হবে। প্রকল্পের অধীনে ১০ হাজার ৭৩৩টি কৃষিযন্ত্র ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে বিতরণ এবং বগুড়া ও রাজশাহীতে সাড়ে ১১ কোটি টাকায় দুটি ভবন নির্মাণও হয়েছে।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মো. আহসানুল হক বলছেন, শীতপ্রধান দেশে গ্রিনহাউস স্বাভাবিক হলেও গ্রীষ্মপ্রধান বাংলাদেশে ভেতরের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ু চলাচল ফসলভেদে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা লাগে; দেশের পলিনেট হাউসগুলোতে সব ফসলের জন্য প্রায় একই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলেই প্রকল্প সফল হচ্ছে না।
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)