কালো ও সাদার সংমিশ্রণে প্রকাণ্ডদেহী। হাতির সঙ্গে তুলনা করলে খুব বেশি বেমানান হবে না। গোল মাথায় ছোট শিং। তাতে কী! যে কেউ সামনে গেলেই ভড়কে যাবেন। তবে ছোট শিং দিয়ে কারও দিকে তেড়ে আসে না। গলার ঝুল নেই, তবে লেজ মাটি ছুঁই ছুঁই। বিশাল দুটি কান নেমে গেছে ঘাড়ের কাছে। চলনবলনে রাজার মতো। বিশাল দেহে সাদা কালোর সংমিশ্রণ হলেও চারটি পা সাদা। সাদা পায়ে হাঁটলে মনে হবে যেন হাতি হেঁটে আসছে। পশুর হাটে বিশাল দেহী পশুটিকে ঘিরে ধরেছে উৎসুক জনতা।
মঙ্গলবার (৫ জুলাই) নগরীর একমাত্র স্থায়ী পশুর হাট গাবতলী ঘুরে জানা যায়, বিশাল আকারের গরুটি মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার চেংগাড়া গ্রাম থেকে হাটে তুলেছেন আসমা বেগম। ৩০ বছর আগে স্বামী আমিরুল ইসলামকে হারান আসমা বেগম। তার মেয়ে নাজমা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে গরুটি বড় করেছেন আসমা। নিজের জমি জায়গা বলতে কিছুই নেই।
চার বছর আগে ধার-দেনা করে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ করে রাজাকে কেনেন আসমা। আসমার নিজের সংসারই চলে না। তার ওপরে গরুর খাবার। ফলে অধিকাংশ সময় আসমার দিন কাটে অন্যের বাড়িতে কাজ করে। এই টাকা দিয়ে প্রধান কাজ রাজার খাবার কেনা। এমনকি গো-খাদ্যের দাম বাড়ার কারণে বিপাকে পড়েন আসমা। ফলে মা ও মেয়েকে এক সঙ্গে কষ্ট করতে হয়েছে রাজার খাদ্য জোগান দিতে।
মা ও মেয়ের পরিচর্যায় বেড়ে উঠেছে রাজা। রাজার দৈনিক আট কেজি গম, ভুট্টা, খেসারির ভুসি মিশিয়ে খেতে দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি খাবার মেন্যুতে রাখা হয় ঘাস ও খড়। শুধু তিনবেলা নয়, যখনই বোঝা যায় রাজার খাই মেটেনি তখনই খাবার দেওয়া হতো। দৈনিক ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকার খাবার খায় রাজা। ঘুমানোর স্থান সবসময় পরিষ্কার রাখা হয়। ২৪ ঘণ্টা সিলিং ফ্যান ঘোরে মাথার উপরে। এছাড়া বিদ্যুৎ চলে গেলে মা ও মেয়ে মিলে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করে। যতক্ষণ বিদ্যুৎ না আসে ততক্ষণ মা ও মেয়ে হাত পাখার শীতল বাতাস দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেন রাজাকে।
কোরবানি উপলক্ষে হাটে তোলা রাজার মোট মাংস ৩০ মণ হবে বলে দাবি করা হচ্ছে। বয়স সাড়ে তিন বছর। চারটি দাঁত উঠেছে রাজার। দাম হাঁকা হচ্ছে ১৫ লাখ টাকা। তবে কোনো ক্রেতা এখনো কেনার মতো দাম বলেননি। গরুটি হাটে তুলে বিপাকে পড়েছেন আসমা। কারণ গরুর জন্য পরিবহণ ভাড়া ১৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে তার।
রাজা প্রসঙ্গে আসমা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, গত ২ জুলাই গরু হাটে নিয়ে আসছি। রাজার মাংস হবে ৩০ মণ, দাম চাইছি ১৫ লাখ টাকা। তবে একজন বলেছে নয় লাখ টাকা। আমি ও আমার মেয়ে হাটে এসেছি রাজাকে নিয়ে। আমার স্বামী মারা গেছেন, আমি নিজেই পালছি। সাড়ে তিন বছর নিজের হাতে রাজাকে পালছি।
তিনি বলেন, দিন ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকার খাবার লাগে। পরের বাড়িতে কাজ কাম কইরে গরুর খাবার জোগাড় করি। নিজের কোনো আঁধার (সম্পদ) নেই। চক্ষু লজ্জা কইরি কী করবো? রাজাকে খাবার তো দিতে হবে।
রাজার মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করার প্রত্যয় নিয়ে আসমা বলেন, সারা জীবন কেউ চায় গরিব মানুষ থাকতে। আর কত কাল কষ্ট করবো। টাকা পয়সা জোগাড় কইরে রাজাকে পালছি। আশা করছি রাজা ভালো দামে বিক্রি হবে। রাজাকে ভালো দামে বিক্রি করতে পারলে একটু ভালো থাকতে পারবো (দারিদ্র দূর হওয়া)। আর কত কাল গরিব মানুষ থাকবো! আমার নিজের কোনো জমি জায়গা নাই, রাজাই সম্বল।
তিনি আরও বলেন, রাজাকে ঢাকায় নিয়ে আসতে ১৪ হাজার টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়েছি। হাট খরচ আরও ১০ হাজার টাকা দিতে হবে। নিজেদের খরচসহ ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। রাজাকে ধার-দেনা করে পালা। গ্রামের মানুষের কাছে দুই লাখ টাকা দেনা হয়েছে। গরুর খাবারের দোকানেও বাকি লাখ টাকা। রাজাকে বিক্রি করে সব ধার-দেনা পরিশোধ করবো। রাজার সঠিক দাম না পাইলে পথে বইসে যাবো।
এমওএস/আরএডি/জিকেএস





মন্তব্য
(০)