জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার বিনধারা মাঠে এবার চোখে পড়ে এক অচেনা দৃশ্য। বাঁশের খুঁটি আর তারের জালে তৈরি মাচার ওপর ছড়িয়ে আছে সবুজ লতা, আর তার নিচে ঝুলছে কালো খোসার ছোট ছোট গোল তরমুজ। মাঠজুড়ে এবার চাষ হচ্ছে চায়না জাতের তরমুজ, স্থানীয়ভাবে যার পরিচিতি ‘ব্ল্যাকবেবি’ নামে।
উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের কৃষক রফিকুল ইসলাম শাহিন এবং কয়েকজন প্রান্তিক কৃষক মিলে বিনধারা মাঠে প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে এই ব্ল্যাকবেবি তরমুজের চাষ করছেন। যে মাঠে সাধারণত ধান আর মৌসুমি সবজিই দেখা যেত, সেখানে মাচায় ঝোলানো তরমুজ দেখতে আশপাশের গ্রামের মানুষও আসছেন। কৃষকদের হিসাবে এই তরমুজের চাষ অন্য ফসলের তুলনায় বহুগুণ লাভজনক।
প্রান্তিক কৃষক বলতে বোঝানো হয় যাঁদের নিজের জমি খুব কম, অনেক সময় এক-দুই বিঘা বা তারও কম, আর যাঁরা পুঁজির অভাবে ঝুঁকি নিতে ভয় পান। এমন কৃষকেরা যখন একজোট হয়ে নতুন ফসলে হাত দেন, তখন তার ফলাফলের দিকে নজর থাকে পুরো এলাকার।
ছোট আকার, কালো খোসা
আকারে ছোট, খেতে সুস্বাদু এই জাতের তরমুজের গায়ের রং কালচে হওয়ায় একে সবাই ‘ব্ল্যাকবেবি’ নামেই চেনে। আমাদের চেনা বড় আকারের ডোরাকাটা তরমুজের মতো এক একটি তরমুজ কয়েক জনে মিলে খেতে হয় না; ছোট পরিবারের জন্য একটি তরমুজই যথেষ্ট। শহরের ক্রেতাদের কাছে এই আকারটাই এর বড় আকর্ষণ। ফ্রিজে রাখতেও জায়গা কম লাগে, কেটে ফেলে রাখার ঝামেলাও থাকে না।
দেশে এই জাতের তরমুজ খুব পুরোনো নয়। ঢাকা ট্রিবিউনের ২০২০ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্ল্যাকবেবি তরমুজের চাষ প্রথম শুরু হয় চুয়াডাঙ্গায়। পরে জয়পুরহাট, মেহেরপুর আর ঢাকার ধামরাইয়ের কৃষকেরাও এর চাষে নামেন। প্রচলিত জাতের তুলনায় এটি কম সময়ে ফল দেয়, আর এই স্বল্প সময়ের কারণেই কৃষকদের কাছে এর কদর বাড়ছে।
বাংলাদেশে তরমুজ বলতে এতদিন মূলত বোঝাত গ্রীষ্মের ফল, যার বড় অংশ আসে দক্ষিণের উপকূলীয় জেলা আর নদীর চরাঞ্চল থেকে, মাটিতে লতা ছড়িয়ে যার চাষ হয়। মাচায় তোলা ছোট জাতের তরমুজ সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে। এখন উত্তরের জেলাতেও, ধানের জমিতে, প্রায় সারা বছর তরমুজ ফলানো যাচ্ছে।
মাচায় কেন তরমুজ
মাচা পদ্ধতিতে বারোমাসি তরমুজ চাষ এখন সম্ভাবনাময় একটি কৃষিপণ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মাচা হলো বাঁশ আর জিআই তার দিয়ে বানানো উঁচু কাঠামো, যার ওপর লতা তুলে দেওয়া হয়। জিআই তার মানে দস্তার প্রলেপ দেওয়া লোহার তার, যাতে তাড়াতাড়ি মরিচা ধরে না। গ্রামে লাউ, শিম বা করলার মাচা সবার চেনা; তরমুজের মাচাও মূলত সেরকমই, শুধু ভারী ফলের ভার বইতে পারে এমন মজবুত করে বানাতে হয়।
মাটিতে লতা ছড়িয়ে দিলে তরমুজ মাটির সংস্পর্শে থাকে। বৃষ্টি হলে বা মাটি ভেজা থাকলে ফলের নিচের দিক পচে যেতে পারে, পোকা আর ইঁদুরের আক্রমণও বাড়ে। মাচায় ঝুলন্ত তরমুজ সেই ঝুঁকি থেকে অনেকটা মুক্ত। লতা ওপরে থাকায় পাতায় রোদ-বাতাস বেশি লাগে, আর একই জমিতে ঘন করে গাছ লাগানো যায়। ফলগুলো যেন নিজের ভারে ছিঁড়ে না পড়ে, সে জন্য অনেক জায়গায় কৃষকেরা ফলকে জালের থলেতে ভরে মাচার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখেন।
এই তরমুজের জীবনকাল মাত্র ৬০ দিন। অর্থাৎ বীজ বোনার দুই মাসের মধ্যে ফসল ঘরে তোলা যায়। এক বিঘা জমির জন্য দরকার হয় মাত্র ৫০ গ্রাম বীজ। এখানে বিঘা বলতে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় প্রচলিত ৩৩ শতাংশের মাপ ধরা হয়।
ষাট দিনের পথচলা
দুই মাসের এই ফসলের যাত্রাটা মোটামুটি এরকম। প্রথমে ট্রে বা পলিব্যাগে চারা তৈরি হয়, তারপর সেই চারা বসানো হয় মালচিং করা বেডের ছিদ্রে। কয়েক দিনের মধ্যে চারা মাটি ধরে নেয় আর লতা বাড়তে শুরু করে। লতা একটু লম্বা হলেই তাকে দড়ি বা কাঠির সাহায্যে মাচার দিকে তুলে দেওয়া হয়, যাতে মাটিতে না ছড়িয়ে ওপরে ওঠে।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ অনুযায়ী চারা রোপণের মোটামুটি ৩০ দিন পর থেকে গাছে ফুল আসতে শুরু করে। এরপর ফুল থেকে ফল ধরে আর দ্রুত বড় হতে থাকে। এই সময়টায় গাছের সবচেয়ে বেশি খাবার আর পানি দরকার হয়, তাই সার আর সেচের দিকে বাড়তি নজর দিতে হয়। ফল বড় হতে শুরু করলে জালের থলেতে ভরে মাচায় বেঁধে দেওয়া হয়, যাতে ভারে লতা ছিঁড়ে না যায়।
ফসল তোলার পর মাচা আর মালচিং পেপার ঠিকঠাক থাকলে সেই বেডেই আবার নতুন চারা বসানো যায়। বিনধারার কৃষকেরা যে এক শেডে তিনবার তরমুজ তোলার কথা বলছেন, তার পেছনে এই ব্যবস্থাই কাজ করে।
মালচিং পেপার: মাটির ওপর পলিথিনের চাদর
সরেজমিনে বিনধারা মাঠে দেখা যায়, তরমুজের বীজ বোনার জন্য সারি বেঁধে বেড তৈরি করা হয়েছে, আর সেই বেড ঢাকা পলিথিনে। এই পলিথিনকে বলা হয় মালচিং পেপার। বেডের মাটি ঢেকে দিয়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে ছিদ্র করে সেখানে বীজ বা চারা বসানো হয়।
মালচিং পেপারের কাজ কয়েকটি। এটি মাটির ওপর রোদ পড়তে দেয় না, ফলে আগাছা গজাতে পারে না, আর আগাছা পরিষ্কারের শ্রম ও খরচ বাঁচে। মাটির রস বা আর্দ্রতা বাতাসে উড়ে যেতে পারে না, তাই সেচ কম লাগে। বৃষ্টির ছিটায় মাটি থেকে পাতায় রোগজীবাণু ছড়ানোর সুযোগও কমে। বাণিজ্যিক তরমুজ চাষিরা সারা বিশ্বেই এই কারণগুলোর জন্য কালো প্লাস্টিকের আচ্ছাদন ব্যবহার করেন।
বিঘাপ্রতি খরচের খাত
কৃষকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে মাচা পদ্ধতিতে ব্ল্যাকবেবি তরমুজ চাষের খরচ মোটামুটি এরকম:
- বীজ: ৫০ গ্রাম, দাম ৩ হাজার ৮০০ টাকা
- মালচিং পেপার: ৭ হাজার ৫০০ টাকা
- মাচা তৈরির বাঁশ আর মজুরি: ১০ হাজার টাকা
- সার, মাটি আর বালাইনাশক স্প্রে: ৭ হাজার ৫০০ টাকা
- পরিচর্যার মজুরি: ৬ হাজার টাকা
- পরিবহন: ২ হাজার টাকা
কৃষকদের হিসাবে সব মিলিয়ে বিঘাপ্রতি খরচ দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। তবে ওপরের খাতগুলো যোগ করলে অঙ্কটা ৩৭ হাজার টাকার কাছাকাছি যায়, আর কৃষক রফিকুল ইসলাম নিজে বিঘাপ্রতি প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচের কথা বলেছেন। অর্থাৎ বাস্তবে খরচ ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে ওঠানামা করে, নির্ভর করে বাঁশ, শ্রম আর উপকরণের স্থানীয় দামের ওপর।
এর মধ্যে বীজের দামটা চোখে পড়ার মতো। মাত্র ৫০ গ্রাম বীজের দাম প্রায় চার হাজার টাকা। এগুলো সংকর জাতের আমদানি করা বীজ, তাই দাম বেশি, আর প্রতিটি বীজ যত্ন করে বোনা দরকার।
সংকর বা হাইব্রিড বীজের একটি সীমাবদ্ধতাও জানা দরকার। দুটি ভিন্ন জাতের মিলনে তৈরি এই বীজ থেকে ভালো ফলন আসে ঠিকই, কিন্তু সেই ফসলের বীজ রেখে পরের বার বুনলে একই মানের গাছ পাওয়া যায় না। তাই প্রতি মৌসুমেই কৃষককে নতুন করে বীজ কিনতে হয়, আর এই খরচটা প্রতিবারের হিসাবে ধরে রাখতে হয়।
ফলন আর বিক্রির হিসাব
এক বিঘা জমিতে ৬০ দিনে উৎপাদন হয় প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০টি তরমুজ, যার মোট ওজন দাঁড়ায় প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ মেট্রিক টন। হিসাব করলে প্রতিটি তরমুজের গড় ওজন দাঁড়ায় তিন কেজির কাছাকাছি।
প্রতি কেজি ৩০ টাকা দরে বিক্রি করলে ৪ টন তরমুজের দাম হয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিলে বিঘাপ্রতি নিট লাভ থাকে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। দুই মাসের একটি ফসলে এই লাভ তুলনামূলকভাবে অন্য অনেক ফসলের চেয়ে বেশি। একই জমিতে ধান চাষ করে একজন কৃষক পুরো মৌসুমে এর ধারেকাছে লাভ করতে পারেন, এমন উদাহরণ খুব কম।
হিসাবের আরেকটি দিক আছে, যা প্রথম দেখায় চোখে পড়ে না। একবার মাচা বা শেড তৈরি হলে সেই শেডে অন্তত তিনবার তরমুজ আবাদ করা যায়। বাঁশ আর মাচা তৈরির মজুরির মতো স্থায়ী খরচটি পরের দুইবার আর লাগে না। ফলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় উৎপাদন খরচ কমে আসে, আর লাভের ভাগ আরও বাড়ে।
একটু অঙ্ক কষলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়। মাচার বাঁশ আর মজুরির ১০ হাজার টাকা যদি তিনটি ফসলে ভাগ করা হয়, তাহলে প্রতি ফসলে এই খাতের খরচ দাঁড়ায় সাড়ে তিন হাজার টাকার কম। বাকি খাতগুলো, যেমন বীজ, সার আর পরিচর্যার মজুরি, প্রতিবারই লাগে, কিন্তু সবচেয়ে বড় একক খরচটি তিন ভাগে ভাগ হয়ে যায়।
সরকারি নির্দেশিকায় চাষের ধাপ
মাচায় তরমুজ চাষের ধাপগুলো নিয়ে কৃষি তথ্য সার্ভিস ‘অমৌসুমে তরমুজ চাষ’ শিরোনামে একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে ব্ল্যাকবেবি, ব্ল্যাক প্রিন্স, ব্ল্যাক বক্স এবং জেসমিন-১, ২ ও ৩ জাতের নাম এসেছে, যেগুলো অমৌসুমে চাষের উপযোগী। নির্দেশিকা অনুযায়ী এক বিঘার জন্য ৫০ গ্রাম বীজ লাগে, যা বিনধারার কৃষকদের হিসাবের সঙ্গে মিলে যায়, আর এক বিঘায় প্রায় ১ হাজার ৪০০টি চারা বসানো হয়।
বীজ সরাসরি জমিতে না বুনে পলিব্যাগ বা প্লাস্টিকের ট্রেতে চারা তৈরি করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে; একটি ট্রেতে ১০০টি চারা তোলা যায়। এতে দামি বীজের প্রতিটি থেকে চারা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। জমিতে ৫০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার চওড়া বেড বানিয়ে জোড়ায় জোড়ায় সাজানো হয়, দুই জোড়া বেডের মাঝে থাকে আড়াই মিটারের ফাঁকা জায়গা। বেডে এক গাছ থেকে আরেক গাছের দূরত্ব রাখা হয় ৪৫ সেন্টিমিটার বা প্রায় ১৮ ইঞ্চি। প্রতি বিঘায় এক মিটার চওড়া প্রায় ১১ কেজি কালো পলিথিন মালচিং হিসেবে লাগে।
সারের ক্ষেত্রে নির্দেশিকায় বিঘাপ্রতি ২০০ কেজি কেঁচো সার বা ভার্মিকম্পোস্ট, ৪০ কেজি ইউরিয়া, ৪০ কেজি টিএসপি, ৪০ কেজি এমওপি, ২০ কেজি জিপসাম, ১ কেজি জিংক সালফেট আর দেড় কেজি বোরনের কথা বলা হয়েছে। মাচা বানাতে হয় দোচালা ঘরের চাল বা নৌকার ছইয়ের মতো করে, বাঁশের কাঠামোর ওপর নাইলনের দড়ি বা জিআই তার টেনে। লতা মাচায় তোলার সময় একবার, তারপর পাঁচ থেকে সাত দিন পরপর আরও দুবার, মোট তিনবার ডালপালা ছাঁটাই করতে হয়; জালের নিচের দিকের শাখাগুলো কেটে দিলে গাছের শক্তি ফলের দিকে যায়।
রোগ-পোকা আর পাকার লক্ষণ
নির্দেশিকা অনুযায়ী এই তরমুজে প্রধান রোগ হলো অ্যানথ্রাকনোজ, ঢলে পড়া বা উইল্ট এবং কাণ্ড থেকে আঠা বের হওয়া রোগ। পোকার মধ্যে আছে ফলের মাছি, মাকড়, সাদা মাছি আর থ্রিপস। ফলের মাছি দমনে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এই ফাঁদে একটি বিশেষ গন্ধ ব্যবহার করে পুরুষ মাছিকে আকৃষ্ট করে আটকানো হয়, ফলে বংশবৃদ্ধি কমে এবং কীটনাশকের ব্যবহারও কমানো যায়। কৃষকেরা যে পোকার আক্রমণ তুলনামূলক কম বলছেন, তা মানে এই নয় যে নজর রাখার দরকার নেই।
তরমুজ পেকেছে কি না, তা বোঝারও কিছু প্রচলিত লক্ষণ আছে, যা কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শেও উল্লেখ আছে। ফলের বোঁটার কাছের আকর্ষি শুকিয়ে বাদামি হয়ে যায়, খোসার ওপরের সূক্ষ্ম লোম ঝরে গিয়ে খোসা চকচকে দেখায়। মাচায় ঝোলানো ফলে এই লক্ষণ চোখে পড়ে আরও পরিষ্কারভাবে। কাঁচা অবস্থায় তুললে মিষ্টতা আসে না, আবার বেশি দেরি করলে ফল ফেটে যেতে পারে। তাই ঠিক সময়ে তোলা বাজারদামের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
নির্দেশিকায় ভালো ব্যবস্থাপনায় বিঘাপ্রতি ৬ থেকে ৮ টন পর্যন্ত ফলনের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। বিনধারার কৃষকেরা তাঁদের হিসাব করছেন ৪ থেকে সাড়ে ৪ টন ধরে, যা তুলনামূলক সতর্ক অনুমান।
বারো মাসের চাহিদা
এই তরমুজ বারো মাসই পাওয়া যায় বলে এর চাহিদাও বেশি। সাধারণ তরমুজ বাজারে আসে মূলত গ্রীষ্মে, বছরের বাকি সময় তরমুজ কম মেলে। সেই ফাঁকা সময়ে যে কৃষক তরমুজ তুলতে পারেন, তিনি ভালো দাম পান। ছোট আকারের কারণে দোকানি থেকে সুপারশপ, সবার কাছেই এর বিক্রি অল্প পরিশ্রমে হয়।
কৃষকেরা জানান, তাইওয়ানের জেসমিন-১, জেসমিন-২ আর ব্ল্যাক প্রিন্স জাতের তরমুজে পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম, তাই ফসলে মার খাওয়ার ঝুঁকিও কম। তাঁদের ভাষায়, গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকা ছাড়া এই জাতের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আর তেমন কোনো কারণ নেই।
জলাবদ্ধতার কথাটা তাই গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার। তরমুজের শিকড় ভেজা, স্যাঁতসেঁতে মাটিতে দ্রুত পচে যায়। উঁচু বেড, বেডের মাঝে নালা আর বৃষ্টির পর দ্রুত পানি সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। নিচু জমি, যেখানে বর্ষায় পানি জমে থাকে, সেখানে এই চাষ না করাই ভালো।
তরমুজ অনেক সুস্বাদু আর পুষ্টিকর। এর বেশির ভাগই পানি, তাই গরমে শরীরের পানির ঘাটতি মেটাতে এটি উপকারী। লাল শাঁসে রয়েছে লাইকোপেন নামের রঞ্জক, যা টমেটোতেও থাকে, আর রয়েছে ভিটামিন সি।
বোরো আর আমনের মাঝে বাড়তি ফসল
এই চাষের সবচেয়ে আশা জাগানো দিক হলো জমির সময়ের সদ্ব্যবহার। উত্তরের জেলাগুলোতে বোরো ধান কাটার পর প্রায় দুই থেকে আড়াই মাস জমি পতিত পড়ে থাকে, আমন রোপণের আগ পর্যন্ত। এই ফাঁকা সময়ে জমি থেকে কোনো আয় আসে না। অথচ ব্ল্যাকবেবি তরমুজের জীবনকাল মাত্র ৬০ দিন। তাই দুটি ধান চাষের মাঝখানে অনায়াসে একবার তরমুজের ফলন তোলা সম্ভব।
উত্তরাঞ্চলে বোরো ধান সাধারণত কাটা হয় বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে, আর আমনের চারা রোপণ চলে আষাঢ়-শ্রাবণে। মাঝের এই সময়টুকু বর্ষার শুরু, তাই এই ফাঁকে তরমুজ চাষ করলে উঁচু বেড আর নালার ব্যবস্থা আরও জরুরি হয়ে ওঠে। মাচা আর মালচিং এখানে বাড়তি সুরক্ষা দেয়, কারণ ফল মাটি ছোঁয় না আর বেডের মাটি বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় না।
এতে জমির সঠিক ব্যবহার যেমন নিশ্চিত হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে কৃষকের আয়। ধানের জমিতে ভিন্ন ফসল এলে মাটির স্বাস্থ্যের জন্যও তা ভালো, কারণ একই ফসল বারবার চাষ করলে একই ধরনের রোগ-পোকা জমতে থাকে। এসব কারণেই এলাকায় তরমুজ চাষে আগ্রহী কৃষকের সংখ্যা বাড়ছে।
মাঠে যা দেখা গেল
বিনধারা মাঠে গিয়ে দেখা যায়, পলিথিনে ঢাকা বেড সারি বেঁধে চলে গেছে মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বাঁশ আর জিআই তারে তৈরি ঝাংলা বা মাচার ওপর তরমুজ গাছের সবুজ পাতা ছড়িয়ে আছে, আর সেই সবুজের ফাঁকে ঝুলছে কালো তরমুজ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন একটা সবুজ চাঁদোয়া টানানো।
কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, তাঁর পরিচিত এক বন্ধু এই জাতের তরমুজ চাষ করে লাভবান হয়েছেন। বন্ধুর কাছ থেকে শুনেই তিনি নিজেও চাষ শুরু করেছেন। তাঁর হিসাবে বিঘাপ্রতি প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হলেও এক থেকে দেড় লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি হবে বলে তিনি আশা করছেন। চায়না তরমুজের পাশাপাশি তিনি টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি সবজিরও চাষ করেছেন।
রফিকুলের কথায়, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যে পরিমাণ চাহিদা আসছে, তা তাঁর উৎপাদনের চেয়ে বেশি। একাধিক ফসলের এই মিশ্র চাষ তাঁকে ঝুঁকি ভাগ করে নিতেও সাহায্য করে; একটি ফসলের দাম পড়লে অন্যটি দিয়ে কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যায়।
রফিকুলের মতো কৃষকদের ক্ষেত্রে যা ঘটছে, গ্রামীণ কৃষিতে তা খুব পরিচিত একটি ধারা। নতুন ফসল সাধারণত ছড়ায় এক কৃষক থেকে আরেক কৃষকে, হাতে-কলমে দেখে আর লাভের খবর শুনে। একজন সফল হলে পাশের জমির মালিকও পরের মৌসুমে চেষ্টা করেন।
নতুন চাষির জন্য কিছু সতর্কতা
লাভের হিসাব আকর্ষণীয় হলেও শুরুর আগে কয়েকটি দিক ভেবে নেওয়া দরকার। প্রথমত, শুরুর পুঁজি। বীজ, মালচিং পেপার আর মাচার জন্য বিঘাপ্রতি কয়েক হাজার টাকা আগেভাগেই খরচ করতে হয়, ফসল বিক্রির আগে যার কোনো ফেরত নেই। দ্বিতীয়ত, দাম। ওপরের হিসাব কেজিপ্রতি ৩০ টাকা ধরে করা। বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে বা ভরা গ্রীষ্মে সাধারণ তরমুজের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামলে দাম কমতে পারে, তখন লাভও কমবে।
তৃতীয়ত, বীজের মান। দামি সংকর বীজ কেনার সময় নির্ভরযোগ্য বিক্রেতা বেছে নেওয়া জরুরি, কারণ খারাপ বীজে পুরো মৌসুমের পরিশ্রম নষ্ট হতে পারে। চতুর্থত, জমি বাছাই। উঁচু, পানি জমে না এমন জমি না হলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থেকেই যায়। প্রথমবার চাষের আগে উপজেলা কৃষি অফিস বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া, আর আগে থেকে চাষ করছেন এমন কারও মাঠ ঘুরে দেখা, দুটোই কাজে দেয়।
বিনধারার মাচা থেকে বড় সম্ভাবনা
কম সময়ের ফসল, ভালো দাম আর বাঁশ ও তার দিয়ে যেকোনো কৃষক বানাতে পারেন এমন একটি পদ্ধতি; এই তিনের মিলনেই পাঁচবিবির মাঠে ব্ল্যাকবেবি তরমুজ জায়গা করে নিচ্ছে। বোরো কাটার পর যে জমি এতদিন খালি পড়ে থাকত, সেখানে এখন দুই মাসে একটি বাড়তি ফসল উঠছে। যে কৃষক আগে বছরে দুটি ধান তুলতেন, তিনি এখন একই জমি থেকে তৃতীয় একটি ফসল তুলছেন, আর সেই ফসলটি এমন যে তার দাম নগদে হাতে আসে দুই মাসের মাথায়। কৃষকের পরিবারে নগদ টাকার এই প্রবাহ ধানের মৌসুমের খরচ মেটাতেও কাজে লাগে।
বিনধারা মাঠের ১৫ বিঘার এই উদ্যোগ হয়তো ছোট, কিন্তু এর হিসাব অনেক কৃষকের জন্য শিক্ষণীয়। একই জমি থেকে বছরে বেশি আয়, কম পরিশ্রমে আগাছা নিয়ন্ত্রণ আর বারো মাসের চাহিদা মিলে মাচার তরমুজ উত্তরের কৃষিতে নতুন একটি পথ খুলে দিতে পারে, যদি জমি, বীজ আর বাজার বুঝে এগোনো যায়।
ছবি: কক্সবাজার সৈকতের কাছে তরমুজ খেতে সূর্যোদয়, Milli Tami / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)





মন্তব্য
(০)