সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ৯ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৯°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৬৫%বাতাস ২ কিমি/ঘ

ডালিমের ছাতরা পোকা: চেনার উপায় ও নিরাপদ দমন পদ্ধতি

ডালিমের পাতা, ডাল ও ফলে তুলার মতো সাদা দাগ মানে ছাতরা পোকা গাছের রস চুষে খাচ্ছে। ছাঁটাই, কাণ্ডে বাধা, উপকারী পোকা ও নিমজাত বালাইনাশক দিয়ে কীভাবে এই পোকা দমন করবেন, আর কেন রাসায়নিক কেবল শেষ উপায়, জেনে নিন।

ডালিমের ছাতরা পোকা: চেনার উপায় ও নিরাপদ দমন পদ্ধতি
ফল

প্রথম লক্ষণটি সহজে চোখ এড়িয়ে যায়: ডালিম গাছের পাতা আর ডালে তুলার মতো ছোট ছোট সাদা দাগ। কিছুদিনের মধ্যে সেই দাগ কচি ফলেও ছড়িয়ে পড়ে, আর একই জায়গায় দেখা যায় পিঁপড়ার আনাগোনা। এটিই ছাতরা পোকা, ইংরেজিতে মিলিবাগ। ২০২১ সালের ২৩ অক্টোবর দ্য এগ্রো নিউজ চাষিদের জন্য তুলে ধরে, এই পোকা কীভাবে গাছের ক্ষতি করে এবং কীভাবে তা ঠেকানো যায়।

ছাতরা পোকা পাতা ও ডালের রস চুষে খায়, ফলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে; আক্রমণ বেশি হলে পাতা ঝরে যায় এবং ডাল মরে যায়। এই লেখায় থাকছে পোকাটি আসলে কী, ডালিমে কোন কোন প্রজাতি আক্রমণ করে, বাংলাদেশে ছাতরা পোকা নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) জরিপ কী পেয়েছে, আর দমনের পদ্ধতিগুলো কোন ক্রমে ব্যবহার করতে হবে: আগে ছাঁটাই, বাধা ও হাতে বাছাই, তারপর উপকারী পোকা ও নিমজাত বালাইনাশক, আর রাসায়নিক কেবল শেষ উপায় হিসেবে।

বাংলাদেশে ডালিম: দেশে চাষ হয়, আমদানিও হয়


ডালিম বা আনার (Punica granatum) একটি গুল্ম বা ছোট গাছ, যা ৬ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইনে প্রকাশিত জুলিয়া মর্টনের ‘ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস’ (১৯৮৭) গ্রন্থ অনুযায়ী, ইরান থেকে হিমালয় পর্যন্ত অঞ্চল এর আদি নিবাস; প্রাচীনকাল থেকে এর চাষ হয়ে আসছে, আর খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের দিকে এটি ইরান থেকে ভারতের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে পৌঁছায়। এর ফুল প্রায় ৩ সেন্টিমিটার চওড়া, বৃতি পুরু ও লাল, পাপড়ি তিন থেকে সাতটি, কোঁচকানো। ফল ৬.২৫ থেকে ১২.৫ সেন্টিমিটার চওড়া, আর ফলের ওজনের প্রায় ৫২ শতাংশই বীজ।

মর্টনের বর্ণনায় ডালিম আধা-শুষ্ক জলবায়ুর উপযোগী এবং খরা খুব ভালো সহ্য করে; চুনযুক্ত ক্ষারীয় মাটি থেকে গভীর অম্লীয় দোআঁশ মাটি পর্যন্ত নানা ধরনের মাটিতে জন্মায়। বাছাই করা জাতের বংশবিস্তার হয় ২৫ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার লম্বা পরিপক্ব ডালের কাটিং দিয়ে। রোপণের এক বছর পরেই গাছে ফল আসতে পারে, তবে সাধারণত লাগে আড়াই থেকে তিন বছর, আর ফুল ফোটার ছয় থেকে সাত মাস পর ফল পাকে।

জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার ২০২১ সালের জুনের সংস্করণে ডালিমকে বাংলাদেশের বহুল চাষ হওয়া ফলের তালিকায় রাখা হয়েছে, আবার কমলা, আপেল, আঙুর, খেজুর ও ম্যান্ডারিনের সঙ্গে সাধারণ আমদানি করা ফলের তালিকাতেও এর নাম আছে। মধুমাসের বাইরে অন্য মাসগুলোতে যেসব ফল পাওয়া যায়, ডালিম তার একটি। ইন্টারন্যাশনাল ফুড রিসার্চ জার্নালে ২০১৮ সালে প্রকাশিত কে. সুমাইয়া, মো. জহুরুল হক আকন্দ ও ডব্লিউ. জামানের এক গবেষণায় বাংলাদেশে পাওয়া তিনটি জাত বিশ্লেষণ করা হয়: দেশি ডালিম, ভারতের মৃদুলা জাত এবং মিসরের ডালিম। গবেষণায় দেখা যায়, খাওয়ার দানার চেয়ে খোসায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান বেশি।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ডালিম উৎপাদন করে ভারত। বাংলাদেশ জার্নাল অব বোটানিতে ২০২০ সালে প্রকাশিত এক নিবন্ধ অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ সালে ভারতে ডালিম উৎপাদন হয় ২৭ লাখ ৯৫ হাজার টন, আর বিশ্ব রপ্তানিতে দেশটির অবস্থান তৃতীয়।

ডালিমের ফুল। ছবি: Sd Raihan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ডালিমের ফুল। ছবি: Sd Raihan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ছাতরা পোকা কী, চিনবেন কীভাবে


ছাতরা পোকা সিউডোকক্সিডি গোত্রের ছোট, ডিম্বাকার, নরম দেহের রস চোষা পোকা। ডিএইর উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের জন্য ২০১৭ সালে তৈরি একটি বালাই ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরা দেখতে তুলার মতো এবং সাদা গুঁড়া মোমে ঢাকা থাকে, তাই এদের নির্মূল করা কঠিন। এরা কাণ্ড ও পাতায় দল বেঁধে থাকে, দলগুলো ক্রমে ঘন সাদা মোমের স্তূপে পরিণত হয়, আর ছিদ্র করে চোষার উপযোগী মুখাংশ দিয়ে প্রচুর রস শুষে নেয়।

ডালিম গাছে লক্ষণগুলো মেলে দ্য এগ্রো নিউজের বর্ণনার সঙ্গে: পাতা, ফল ও ডালে তুলার মতো সাদা দাগ, প্রায়ই সঙ্গে পিঁপড়া। ডিএইর প্রতিবেদনে আক্রান্ত গাছের ক্ষতির তালিকা দেওয়া আছে। গাছের বাড়ন্ত ডগা খর্বাকার হয়ে যায়, পাতা নেতিয়ে হলুদ হয়, আর ফল আগেভাগে ঝরে পড়ে অথবা শুকিয়ে কুঁচকে গাছেই থেকে যায়। আক্রমণ বেশি হলে গাছ পাতাশূন্য হয়ে যেতে পারে, এমনকি মরেও যেতে পারে; সাদা মোমে ঢাকা ফল বাজারে বিক্রির অনুপযোগী।

বিভিন্ন প্রজাতির ছাতরা পোকা দেখতে প্রায় একই রকম, তবে ওই প্রতিবেদনে চেনার কিছু সহজ চিহ্ন দেওয়া আছে। ডোরাকাটা ছাতরা পোকার (Ferrisia virgata) দেহ ধূসর, গায়ে খুব লম্বা মোমের সুতা, লম্বা লেজ আর পিঠে দুটি কালো ডোরা। সাইট্রাস ছাতরা পোকা (Planococcus citri) হলদে থেকে গোলাপি, পিঠের মাঝ বরাবর একটি ডোরা, লেজের সুতা ছোট। আর গোলাপি জবা ছাতরা পোকা (Maconellicoccus hirsutus) চাপ দিয়ে পিষলে গোলাপি থেকে লাল রস বের হয়।

ডালিমে কোন কোন ছাতরা পোকা আক্রমণ করে


ডিএইর জরিপে এই তিন প্রজাতিই বাংলাদেশে পাওয়া গেছে, আর তিনটিই ডালিমে আক্রমণ করে বলে জানা। জার্নাল অব হর্টিকালচারাল সায়েন্সেসে ২০১১ সালে প্রকাশিত ভারতের বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব হর্টিকালচারাল রিসার্চের এম. মণি, এ. কৃষ্ণমূর্তি ও সি. শিবরাজুর এক পর্যালোচনায় সাইট্রাস ছাতরা পোকাকে সম্ভবত এই গোত্রের সবচেয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়ানো ও ক্ষতিকর প্রজাতি বলা হয়েছে। এটি লেবুজাতীয় ফল, আঙুর, ডালিম, কুল, আতা ও জবার প্রধান শত্রু। এর পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী পোকা প্রায় ৩০০টি অ্যাম্বার রঙের ডিম পাড়ে, যা পাঁচ থেকে আট দিনে ফোটে।

একই পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালের এক গবেষণায় ভারতে প্রথমবার গোলাপি জবা ছাতরা পোকাকে ডালিমের গুরুতর শত্রু হিসেবে শনাক্ত করা হয়, আর ওরিয়েন্টাল ছাতরা পোকা (Planococcus lilacinus) ডালিমের আরেকটি গুরুতর শত্রু। তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল সুরক্ষা বিষয়ক পাতায় লেজওয়ালা ছাতরা পোকা Ferrisia virgata-কে ডালিমের শত্রুর তালিকায় রাখা হয়েছে এবং এর লক্ষণ হিসেবে বলা হয়েছে, ফল অকালে ঝরে পড়ে।

ডালিমের আরও শত্রু আছে, তবে তাদের ক্ষতির ধরন আলাদা। বাংলাপিডিয়া ডালিমের প্রজাপতি Virachola isocrates-কে বাংলাদেশে লাইকিনিডি গোত্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। মর্টন লিখেছেন, এই প্রজাপতি ফুলের কুঁড়ি ও বাড়ন্ত ফলের বৃতিতে ডিম পাড়ে, আর কয়েক দিনের মধ্যে কীড়া ফলের ভেতরে ঢুকে যায়। এর লক্ষণ ফলে ছিদ্র, সাদা মোমের দল নয়।

বাংলাদেশে ডিএইর জরিপে যা পাওয়া গেছে


বালাই ঝুঁকি বিশ্লেষণটি করা হয় ডিএইর উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের ‘স্ট্রেংদেনিং ফাইটোস্যানিটারি ক্যাপাসিটি ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের অধীনে; কাজটি করে হাউস অব কনসালট্যান্টস লিমিটেড ও সিআরডিপি কনসাল্টিং সার্ভিসেসের যৌথ উদ্যোগ। কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি, প্রতিবেদনের তারিখ ২০১৭ সালের মে। দলটি দেশের প্রধান ফসল উৎপাদনকারী ২৬টি জেলার ৬১টি উপজেলায় কাজ করে, ৬ হাজার ১০০ কৃষকের সাক্ষাৎকার নেয়, ২৬টি দলগত আলোচনা ও ৩৫টি মূল তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার করে এবং ফসলের মাঠ পরিদর্শন করে।

জরিপে বাংলাদেশে ক্ষতিকর ১৪ প্রজাতির ছাতরা পোকা এবং ১০৩টি পোষক উদ্ভিদ পাওয়া যায়: ১৪টি মাঠ ফসল, ১০টি আগাছা, ২৪টি সবজি, ২১টি ফলগাছ, ৯টি কাঠ জাতীয় গাছ, ৫টি ঔষধি গাছ, ১৬টি শোভাবর্ধনকারী গাছ ও ৪টি বেড়ার গাছ। ফলগাছের মধ্যে নয়টি প্রধান পোষক: কুল, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লেবুজাতীয় ফল, নারকেল, কলা, আঙুর ও স্ট্রবেরি। ডালিম ছিল বারোটি অপ্রধান ফল পোষকের একটি।

অপ্রধান মানে নিরাপদ নয়। ডালিমের ক্ষেত্রে জরিপে দেখা যায়, চারা, বাড়ন্ত গাছ ও ফলধরা গাছ সবই ঝুঁকিতে; পাতা, কাণ্ড, ফুল ও ফল সবখানেই আক্রমণ হয়; আক্রমণের তীব্রতা মাঝারি এবং ক্ষতি আংশিক। প্রতিবেদনে আরও ১৩ প্রজাতির ছাতরা পোকা শনাক্ত করা হয়, যেগুলো সংগনিরোধের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং আমদানি করা গাছ ও গাছের অংশের মাধ্যমে দেশে ঢুকতে পারে।

কৃষকেরা জরিপকারীদের জানান, তাঁরা কীভাবে এই পোকা সামলান। তাঁরা কীটনাশক ছিটান, আক্রান্ত ডাল ছেঁটে পুড়িয়ে দেন, হাতে বেছে পোকার দল সরান, খেতের আশপাশের আগাছা পরিষ্কার করেন এবং সাবান পানি ছিটান। বাগানে ও ফলবাগানে কেউ কেউ পেঁপে ও পেয়ারার মতো আক্রান্ত গাছে হোস পাইপ দিয়ে জোরে পানি ছিটান, কেউ কেউ সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) অনুসরণ করেন।

ছাতরা পোকা কীভাবে বাড়ে ও ছড়ায়


ডিএইর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছাতরা পোকা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মিলন ছাড়াই বংশবৃদ্ধি করে, যদিও গোলাপি জবা ছাতরা পোকার মতো কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে স্ত্রী ও পুরুষ দুটিই লাগে। পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী পোকা সাদা মোমের থলিতে ডিম পাড়ে, সাধারণত ডাল, শাখা বা বাকলে গুচ্ছ আকারে, কখনো পাতায়। একটি থলিতে ৬০০টি পর্যন্ত ডিম থাকতে পারে, যার বেশির ভাগ থেকে স্ত্রী পোকা হয়; এ কারণেই হঠাৎ ব্যাপক আক্রমণ দেখা দেয়। ডিম মাত্র ০.৩ থেকে ০.৪ মিলিমিটার লম্বা, ফুটতে লাগে তিন থেকে নয় দিন।

ডিম ফুটে বের হয় খুব চলনশীল বাচ্চা, যাদের বলে ক্রলার। স্ত্রী পোকা তিনটি এবং পুরুষ পোকা চারটি নিম্ফ দশা পার হয়, সময় লাগে ২২ থেকে ২৫ দিন; একটি পোকার পূর্ণবয়স্ক হতে ৩০ দিন পর্যন্ত লাগতে পারে। বছরে ১৫টি পর্যন্ত প্রজন্ম হতে পারে, আর উষ্ণ আবহাওয়ায় পোকাগুলো সারা বছর সক্রিয় থাকে ও বংশবৃদ্ধি করে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (ইউসি আইপিএম) ২০১৬ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, বেশির ভাগ প্রজাতির একটি স্ত্রী পোকা ১০০ থেকে ২০০ বা তারও বেশি ডিম পাড়ে।

ছড়িয়ে পড়ে মূলত ক্রলার দশায়। ডিএইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাতাস এদের কয়েক মিটার থেকে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বয়ে নিতে পারে, গায়ের মোমের আবরণের কারণে এরা পশুর গায়ে ও মানুষের কাপড়ে লেগে যায়, আর আক্রান্ত চারা ও কৃষি যন্ত্রপাতির মাধ্যমে নতুন জায়গায় পৌঁছায়। এ জন্যই দ্য এগ্রো নিউজ ডিম ও বাচ্চার গাদা সংগ্রহ করে ধ্বংস করার পরামর্শ দিয়েছিল: একটি ডিমের থলি সরানো মানে ভবিষ্যতের শত শত পোকা সরানো।

পিঁপড়া ও কালো ঝুল: পোকাকে রক্ষা করে যে সম্পর্ক


আক্রান্ত গাছে যে পিঁপড়া দেখা যায়, সেটিও সমস্যার অংশ। ছাতরা পোকা প্রচুর মিষ্টি রস বা মধুরস নিঃসরণ করে। ডিএইর প্রতিবেদন ব্যাখ্যা করেছে, পিঁপড়া এই রস সংগ্রহ করে নিজেদের বাচ্চাদের খাওয়ায়, বিনিময়ে পোকার দল পরিষ্কার রাখে এবং লেডিবার্ড বিটল, পরজীবী বোলতা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক শত্রুর হাত থেকে ছাতরা পোকাকে রক্ষা করে। পিঁপড়া ক্রলারকে সুস্থ গাছে ছড়িয়ে দিতেও সাহায্য করে। ইউসি আইপিএমের নির্দেশিকাতেও বলা হয়েছে, পিঁপড়া ছাতরা পোকাকে প্রাকৃতিক শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করে।

নিচের পাতায় ঝরে পড়া মধুরসে কালো ঝুলের মতো ছত্রাক জন্মায়। ডিএইর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কালো ঝুল গাছের খাদ্য তৈরির ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তাই যে ডালিম গাছের কাণ্ড বেয়ে পিঁপড়া ওঠানামা করছে আর পাতায় কালো আস্তর পড়েছে, তার ওপরের দিকে কোথাও ছাতরা পোকার দল থাকার সম্ভাবনা বেশি।

তাই ছাতরা পোকা দমনের একটি অংশ হলো পিঁপড়া দমন। ডিএইর প্রতিবেদন বলছে, পিঁপড়া না থাকলে ছাতরা পোকার সংখ্যা কম থাকে এবং ধীরে ছড়ায়। ক্রলার ও পিঁপড়া যাতে গাছে উঠতে না পারে, সে জন্য প্রতিবেদনে কাণ্ডে আঠালো ফিতা, পলিথিন (অ্যালকাথিন) শিট বা কীটনাশকের বেষ্টনী দেওয়ার কথা বলা হয়েছে; আমের ছাতরা পোকার ক্ষেত্রে কাণ্ডে ২৫ সেন্টিমিটার চওড়া ৪০০ গেজের পলিথিন শিট বেঁধে দেওয়ার পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে।

স্পেনের আলিকান্তেতে একটি লেবু গাছে সাইট্রাস ছাতরা পোকার পরিচর্যা করছে পিঁপড়া। ছবি: Katja Schulz / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
স্পেনের আলিকান্তেতে একটি লেবু গাছে সাইট্রাস ছাতরা পোকার পরিচর্যা করছে পিঁপড়া। ছবি: Katja Schulz / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

প্রথম ধাপ: ছাঁটাই, কাণ্ডে বাধা ও হাতে বাছাই


দ্য এগ্রো নিউজ প্রথমে যে পদক্ষেপগুলোর পরামর্শ দিয়েছিল, তাতে কোনো রাসায়নিক লাগে না, আর ডিএইর পর্যালোচনাতেও একই ধরনের ব্যবস্থার কথা আছে:

  • আক্রান্ত পাতা ও ডগা ছেঁটে ধ্বংস করুন; ডিএইর প্রতিবেদন আক্রান্ত ডাল ছেঁটে পুড়িয়ে ফেলার পরামর্শ দেয়।
  • কাণ্ডের গোড়ার দিকে স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে মুড়ে দিন, যাতে ছাতরা পোকা গাছে উঠতে না পারে; ডিএইর প্রতিবেদনে এই উদ্দেশ্যে কাণ্ডে আঠালো ফিতা বা পলিথিন শিট দেওয়ার কথা আছে।
  • সম্ভব হলে হাত দিয়ে ডিম বা বাচ্চার গাদা সংগ্রহ করে ধ্বংস করুন; ডিএইর প্রতিবেদন অনুযায়ী ছোট বাগানে অল্প আক্রান্ত গাছ থেকে হাতে বেছে পোকা সরানো যায়, অথবা গাছের ক্ষতি না করে জোরে পানি ছিটানো যায়।
  • গাছের চারপাশ আগাছামুক্ত রাখুন এবং ডিএইর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা অন্য পোষক গাছ, যেমন জবা, ঢেঁড়স, আতা, পেয়ারা ও পার্থেনিয়াম সরিয়ে ফেলুন।
  • আক্রান্ত এলাকা থেকে চারা বা কলম আনবেন না, আর আক্রান্ত গাছে কাজের পর যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করে তবেই সুস্থ গাছে যান।
  • নিয়মিত গাছ পরীক্ষা করুন, যাতে পোকার দল ছোট থাকতেই চোখে পড়ে।

কেন এই ধাপগুলো আগে, ডিএইর প্রতিবেদন তার ব্যাখ্যাও দিয়েছে: ছাতরা পোকা ফাটলে লুকিয়ে থাকে এবং দেহ মোমে ঢাকা, তাই বালাইনাশক এদের ওপর সীমিত কাজ করে। বেঙ্গালুরুর পর্যালোচনায় ছাতরা পোকাকে ‘সহজে মারা যায় না এমন পোকা’ বলা হয়েছে এবং জানানো হয়েছে, বেশ কিছু কীটনাশক এদের বিরুদ্ধে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

উপকারী পোকা ও নিমজাত বালাইনাশক


ডিএইর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান জৈবিক দমন, কারণ পরজীবী ও শিকারি পোকা টিকে থাকে এবং ছাতরা পোকার সংখ্যা কম থাকলেও আক্রমণ চালিয়ে যায়। Cheilomenes sexmaculata, Rodolia fumida, Scymnus coccivora ও Nephus regularis-এর মতো লেডিবার্ড বিটল ছাতরা পোকার বাচ্চার গুরুত্বপূর্ণ শিকারি।

সবচেয়ে পরিচিত শিকারি হলো অস্ট্রেলীয় লেডিবার্ড বিটল Cryptolaemus montrouzieri, যাকে বলা হয় ‘মিলিবাগ ডেস্ট্রয়ার’। ডিএইর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি প্রায় দুই মাস বাঁচে, ৪০০টি পর্যন্ত ডিম পাড়ে এবং ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার ছাতরা পোকা খেতে পারে। এর কীড়া ১.৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং পশমের মতো মোমে ঢাকা থাকে, ফলে দেখতে ছাতরা পোকার মতোই লাগে। ছাড়ার ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে গাছপ্রতি ১০টি বা হেক্টরপ্রতি ৫ হাজার বিটলের কথা বলা হয়েছে। ইউসি আইপিএমের নির্দেশিকাতেও একে অনেক এলাকায় ছাতরা পোকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিকারি বলা হয়েছে।

ছাতরা পোকাখেকো লেডিবার্ড বিটল Cryptolaemus montrouzieri-এর পূর্ণবয়স্ক পোকা। ছবি: gbohne / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
ছাতরা পোকাখেকো লেডিবার্ড বিটল Cryptolaemus montrouzieri-এর পূর্ণবয়স্ক পোকা। ছবি: gbohne / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)

ডালিমেই এর জোরালো প্রমাণ আছে। বেঙ্গালুরুর পর্যালোচনা জানায়, ডালিম বাগানে C. montrouzieri ছাড়ার ফলে গোলাপি জবা ছাতরা পোকা খুব কার্যকরভাবে দমন হয়েছে। পরজীবী বোলতা Leptomastix dactylopii ও আরেকটি পরজীবী পোকার কার্যক্রম শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে ডালিমে সাইট্রাস ছাতরা পোকার সংখ্যা জুনে গাছপ্রতি ১৮০.৩ থেকে আগস্টে গাছপ্রতি ৪.৫-এ নেমে আসে। আর ডালিম বাগানে কীটনাশক ছিটানো বন্ধ করার পর Spalgis epeus ও C. montrouzieri-এর মতো শিকারি পোকা ব্যাপক হারে দেখা দেয় এবং ওরিয়েন্টাল ছাতরা পোকার সংখ্যা কমিয়ে আনে।

এ কারণেই প্রথম সাদা দাগ দেখেই বহু ধরনের পোকা মারে এমন কীটনাশক ছিটালে হিতে বিপরীত হতে পারে; ইউসি আইপিএম সতর্ক করেছে, এ ধরনের বালাইনাশক ছাতরা পোকা নিয়ন্ত্রণকারী প্রাকৃতিক শত্রুদের কমিয়ে দেয়। ডিএইর প্রতিবেদনের পরামর্শ, প্রাকৃতিক শত্রুর তৎপরতা দেখা না গেলে প্রথম পছন্দ হওয়া উচিত উদ্ভিদজাত বালাইনাশক: ১ থেকে ২ শতাংশ নিম তেল, ৫ শতাংশ নিম বীজের নির্যাস, অথবা প্রতি লিটার পানিতে ২৫ গ্রাম ফিশ অয়েল রোজিন সাবান। দ্য এগ্রো নিউজ নিমভিত্তিক জৈব বালাইনাশক নিমবিসিডিনের কথা বলেছিল; এর মাত্রার জন্য মোড়কের নির্দেশনা ও স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শ মেনে চলুন।

পরজীবী বোলতা Leptomastix dactylopii-এর আক্রান্ত একটি সাইট্রাস ছাতরা পোকা; এই বোলতা ছাতরা পোকার প্রাকৃতিক শত্রুদের একটি। ছবি: Whitney Cranshaw, Colorado State University / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
পরজীবী বোলতা Leptomastix dactylopii-এর আক্রান্ত একটি সাইট্রাস ছাতরা পোকা; এই বোলতা ছাতরা পোকার প্রাকৃতিক শত্রুদের একটি। ছবি: Whitney Cranshaw, Colorado State University / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

রাসায়নিক কেবল শেষ উপায়, আগে কৃষি অফিসের পরামর্শ


আক্রমণ বেশি হলে দ্য এগ্রো নিউজ ডাইমেথোয়েটভিত্তিক রগর ও টাফগরের মতো কীটনাশক এবং সুমিথিয়ন ও মিপসিনের কথা বলেছিল। ভারতের র‍্যালিস ইন্ডিয়ার তৈরি টাফগর হলো ডাইমেথোয়েট ৩০% ইসি; প্রস্তুতকারকের বর্ণনায় এটি অন্তর্বাহী, স্পর্শ ও পাকস্থলী বিষ হিসেবে কাজ করে এবং জাবপোকা, থ্রিপস ও স্কেল পোকাসহ বিভিন্ন পোকা দমন করে। সুমিথিয়ন হলো ফেনিট্রোথিয়নের একটি বাণিজ্যিক নাম।

ডিএইর পর্যালোচনায় ছাতরা পোকার বিরুদ্ধে কেবল শেষ উপায় হিসেবে ব্যবহারের জন্য যেসব কীটনাশকের তালিকা দেওয়া আছে, তার মধ্যে রয়েছে প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলিলিটার ডাইমেথোয়েট ৩০ ইসি, যা দ্য এগ্রো নিউজের দেওয়া মাত্রার সঙ্গে মেলে। মূল লেখায় সুমিথিয়ন ও মিপসিনেরও মাত্রা দেওয়া ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের কোনো কর্তৃপক্ষের সূত্রে সেগুলো নিশ্চিত করা যায়নি, তাই এখানে বাদ রাখা হলো।

ডিএইর প্রতিবেদনে কয়েকটি সতর্কতাও আছে। রাসায়নিক দমন কেবল আংশিক কার্যকর এবং বারবার প্রয়োগ করতে হয়। মাঠে কয়েকটি গাছে ছাতরা পোকা দেখামাত্র শুধু আক্রান্ত জায়গায় কীটনাশক দিতে হবে। একই কীটনাশক বারবার ব্যবহার করা যাবে না, কারণ পোকার মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে পারে; প্রতিরোধক্ষমতা ও উপকারী পোকার ক্ষতির কারণে রাসায়নিক দমন কম কাঙ্ক্ষিত পথ।

বাংলাদেশে বালাইনাশক (পেস্টিসাইডস) আইন, ২০১৮ (২০১৮ সনের ২৪ নং আইন, ২৯ জুলাই ২০১৮) অনুযায়ী, এই আইনের অধীনে ব্র্যান্ড নিবন্ধন ছাড়া কেউ কোনো বালাইনাশক আমদানি, উৎপাদন, বিক্রি, মজুত বা বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবেন না। নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ ডিএইর উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের পরিচালক। তাই যেকোনো স্প্রে কেনার আগে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা কৃষি অফিসের কাছে জেনে নিন, ডালিমে কোন নিবন্ধিত কীটনাশক কত মাত্রায় দিতে হবে এবং ফল তোলার আগে কত দিন অপেক্ষা করতে হবে।

ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং, ছাতরা পোকার বালাই ঝুঁকি বিশ্লেষণ, ২০১৭), জার্নাল অব হর্টিকালচারাল সায়েন্সেস (মণি, কৃষ্ণমূর্তি ও শিবরাজু, ২০১১), ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া স্টেটওয়াইড আইপিএম প্রোগ্রাম, তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পারডু বিশ্ববিদ্যালয় (মর্টন, ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস), বাংলাপিডিয়া, ইন্টারন্যাশনাল ফুড রিসার্চ জার্নাল, বাংলাদেশ জার্নাল অব বোটানি, বালাইনাশক আইন ২০১৮ (এফএওলেক্স), র‍্যালিস ইন্ডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

ফল

মধুপুরের ঝড়ে ক্ষতি প্রায় ১০০ কোটি টাকা, ৬০ গ্রামের ৭০০ কৃষকের কলা-পেঁপে মাটিতে

এ সপ্তাহের মাত্র ১০ মিনিটের আকস্মিক ঝড়ে টাঙ্গাইলের মধুপুরের চার ইউনিয়নে প্রায় ৭০০ কৃষকের কলা, পেঁপেসহ অন্যান্য ফসল নষ্ট হয়েছে; কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতি প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

দৈনিক বাংলা৯ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফল

৪০ লাখ টাকার আনারস চিপস কারখানা বন্ধ, পথের ধারে পচছে ছোট আনারস

রাঙামাটির নানিয়ারচর হর্টিকালচার সেন্টারে ২০২১ সালে উদ্বোধন হওয়া ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতেই পারেনি; যন্ত্রপাতিতে ধুলা, ছাদ চুইয়ে পানি।

প্রথম আলো৯ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
গ্যালারি

ছবিতে রংপুরের সাগর কলা: বাগান থেকে ট্রাক, চাঙা গ্রামের অর্থনীতি

কয়েক বছরে রংপুরের সদর, মিঠাপুকুর, পীরগাছা ও পীরগঞ্জে সাগর কলার আবাদ দ্বিগুণ হয়েছে; বদরগঞ্জের শ্যামপুরে কাঁদি কাটা থেকে ট্রাকে তোলা পর্যন্ত কর্মযজ্ঞের ছবির গল্প।

প্রথম আলো৯ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)