মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জ্বালানি ও সারের বৈশ্বিক সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন সংকটে পড়ে কি না, সেই শঙ্কা বাড়ছে। বোরো মৌসুমে চাহিদামতো জ্বালানি তেল না পেয়ে অনেক কৃষক সেচে সমস্যায় পড়েছেন, আর আসন্ন আমন মৌসুমের সার নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে — কারণ দেশের সার আমদানির বড় অংশ আসে সৌদি আরব ও কাতার থেকে, আর দেশীয় কারখানাগুলোর বড় ভরসা আমদানি করা এলএনজি। সরকারের দাবি, বর্তমান মজুত দিয়ে অন্তত এক বছর চালানো যাবে।
যুদ্ধ শুরুর পর গ্যাস সাশ্রয়ে মার্চের শুরু থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সার কারখানার চারটি বন্ধ রেখেছে সরকার; বেসরকারি কাফকোর উৎপাদনও বন্ধ। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলছেন, মজুত পর্যাপ্ত থাকায় জ্বালানি রেশনিংয়ের অংশ হিসেবে কারখানা আপাতত বন্ধ, শিগগিরই চালু হবে: "বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, উনি বলেছেন এরই মধ্যে চালু করে দেবেন। অন্তত ঘোড়াশালও যদি চালু করে দেয় তাহলেও আমরা প্রতিদিন ২৮শ টনের ওপর পেয়ে যাব।" জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে মজুত আছে ইউরিয়া চার লাখ ৯৩ হাজার টন, টিএসপি তিন লাখ ৮২ হাজার টন, ডিএপি পাঁচ লাখ নয় হাজার টন এবং এমওপি তিন লাখ ৪২ হাজার টন। বাংলাদেশে বছরে সারের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন; বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে এর প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টন ইউরিয়া, যার মাত্র ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদিত হয়। মন্ত্রীর যুক্তি, বোরো এখন শেষ পর্যায়ে, আমনেও ইউরিয়ার চাহিদা তুলনামূলক কম, তাই আগামী বছরের বোরোকে লক্ষ্য করেই আমদানির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্য-নির্ভরতা কমাতে চীন ও মিশরের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলামও মনে করেন এই মৌসুমে সারের প্রয়োজন কম — ধান শেষের দিকে, কেবল দেরিতে রোপণ করা কিছু জমিতে সার লাগতে পারে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কেবল মজুতে সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলে তিনি চীন, মিশর বা রাশিয়ার মতো বিকল্প বাজার থেকে দ্রুত আমদানি নিশ্চিত করা এবং বন্ধ কারখানা চালুর তাগিদ দিচ্ছেন; বিকল্প উৎসে গেলে দামও কিছুটা বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন। মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্রও আছে: কোনো কোনো এলাকায় ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি দাম রাখছেন বলে অভিযোগ। তার কথায়, "বাংলাদেশে কোনো একটা সংকট তৈরি হওয়ার আগেই একটা কৃত্রিম সংকট আমরা তৈরি করে ফেলি, এটা মূল সমস্যা।"
আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। বৈশ্বিক জ্বালানির পাঁচ ভাগের এক ভাগ ও সারের তিন ভাগের এক ভাগ যায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে, যা প্রায় এক মাস ধরে ইরান অবরুদ্ধ করে রেখেছে। বাজার বিশ্লেষক সংস্থা CRU Group-এর তথ্যে, যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে ইউরিয়ার দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে টনপ্রতি ৪৯০ ডলার থেকে ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে। সরবরাহ ঘাটতিতে ভারত ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ কৃষি উৎপাদন নিয়ে সংকটে; যুক্তরাজ্যের National Farmers' Union-এর সভাপতি Tom Bradshaw বলেছেন, জ্বালানি ও সারের বাড়তি ব্যয়ে শস্য, পশুপালন ও দুগ্ধ খামারিরা এরই মধ্যে চাপে।
Kiel Institute-এর গবেষকরা সতর্ক করেছেন, হরমুজ বন্ধের প্রভাব সারের দামে সীমাবদ্ধ থাকবে না — বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় বড় আঘাত হানতে পারে; তাদের অনুমানে বিশ্বব্যাপী গমের দাম ৪.২ শতাংশ এবং ফল-সবজির দাম ৫.২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিশ্বের মোট সার রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে রাশিয়া থেকে, আর মধ্যপ্রাচ্যের উৎস বন্ধ হওয়ায় রাশিয়া বড় যোগানদাতা হিসেবে অবস্থান শক্ত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ — আগামী বোরোর সার কোন দামে আসবে, সেটাই এখন কৃষি খাতের বড় প্রশ্ন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)