মাছেরও নানা রোগবালাই আছে, আর মাছ চাষে এগুলো বড় সমস্যা। নদী-বিলের মতো উন্মুক্ত জলাশয়ের চেয়ে পুকুর ও দিঘির মতো বদ্ধ জলাশয়ে চাষ করা মাছে রোগ বেশি দেখা দেয়। বাংলাদেশে চাষিদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত রোগগুলো হলো ক্ষত রোগ, পেট ফোলা, পাখনা ও লেজ পচা, উকুন এবং পুষ্টির অভাবজনিত রোগ। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে চাষের মাছের উৎপাদন ছিল ২৫ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন, আর অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছ চাষে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম। তাই রোগ চিনে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া চাষির আয়ের জন্য জরুরি।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০২০ সালে নরসিংদী জেলার ৯০টি খামারসহ হ্যাচারি, নার্সারি ও ওষুধের দোকানে জরিপ চালান। ২০২২ সালে হেলিয়ন সাময়িকীতে প্রকাশিত সেই জরিপে চাষিরা ক্ষত রোগ, পাখনা ও লেজ পচা, পেট ফোলা, সাদা দাগ রোগ ও আরগুলাস উকুনকে সবচেয়ে সাধারণ রোগ বলে জানান; ক্ষত রোগের কথা বলেছেন ৯০ শতাংশ উত্তরদাতা।
ক্ষত রোগ (ইইউএস): লক্ষণ, কারণ ও প্রতিরোধ
ক্ষত রোগের বৈজ্ঞানিক নাম এপিজুটিক আলসারেটিভ সিনড্রোম বা ইইউএস। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএওর ২০০১ সালের রোগ নির্ণয় নির্দেশিকা অনুযায়ী এর মূল কারণ ছত্রাকসদৃশ জীবাণু Aphanomyces invadans। শুরুতে মাছের গায়ে লাল দাগ দেখা দেয়, পরে সেগুলো গভীর ঘায়ে পরিণত হয়ে মাংসপেশি পর্যন্ত ছড়ায়। ক্ষতে প্রায়ই ব্যাকটেরিয়ার দ্বিতীয় সংক্রমণ হয় এবং প্রাদুর্ভাবে অনেক মাছ মারা যায়। আক্রান্ত মাছ খাওয়া কমিয়ে দেয়, দুর্বল হয়ে পড়ে।
২০২৩ সালে প্লস ওয়ানে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী রোগটি ১৬০টির বেশি প্রজাতির মিঠা ও আধা-লোনা পানির মাছে হয়; ১৯৭১ সালে জাপানে প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর ২৬টির বেশি দেশে ছড়িয়েছে। এফএও জানায়, বাংলাদেশ ও ভারতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বড় প্রাদুর্ভাব হয়েছে এবং কম তাপমাত্রার সময়ে প্রকোপ বাড়ে। শোল, গজার ও টাকির মতো চ্যানা গোত্রের মাছ এ রোগে বিশেষভাবে সংবেদনশীল; ময়মনসিংহের এক জরিপে মৃগেল, রুই ও কাতলায় রোগটি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে তেলাপিয়া ও চীনা কার্প সাধারণত প্রতিরোধী।
বুনো জলাশয়ে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রায় অসম্ভব। খামারে প্রতিরোধের জন্য এফএও যেসব ব্যবস্থার কথা বলে:
- পোনা ছাড়ার আগে পুকুর শুকিয়ে চুন প্রয়োগ
- বাইরের বুনো মাছ পুকুরে ঢুকতে না দেওয়া
- হ্যাচারিতে উৎপাদিত, প্রতিরোধমূলক পরিচর্যা করা পোনা ব্যবহার
- লবণ পানিতে গোসল করানো (সল্ট বাথ)
- জাল ও সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত রাখা

পেট ফোলা এবং পাখনা ও লেজ পচা
পেট ফোলা (ড্রপসি) আসলে একটি লক্ষণ: মাছের পেটে বা দেহকোষে পানি জমে। এর পেছনে ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবীর সংক্রমণ, যকৃতের সমস্যা, খারাপ পানি, পানির হঠাৎ পরিবর্তন বা দীর্ঘ চাপ থাকতে পারে। পেট ফুলে যায়, চোখ ফুলে বেরিয়ে আসে, আঁশ খাড়া হয়ে যায়, ফুলকা ফ্যাকাশে হয়, মাছ নিস্তেজ হয়ে পড়ে। নরসিংদীর জরিপে তেলাপিয়া ও ক্যাটফিশে এবং ময়মনসিংহের জরিপে পাঙাশ, তেলাপিয়া ও পাবদায় রোগটি বেশি পাওয়া গেছে।
পাখনা ও লেজ পচা রোগে পাখনার কিনারা থেকে ক্ষয় শুরু হয়ে গোড়ার দিকে এগোয়; গোড়া পর্যন্ত পৌঁছালে নষ্ট অংশ আর গজায় না। এর কারণ ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের সংক্রমণ, যা সাধারণত খারাপ পানি, আঘাত, দুর্বল খাবার বা চাপের কারণে শুরু হয়। নরসিংদীর জরিপে তেলাপিয়া, কার্প ও ক্যাটফিশে এ রোগ পাওয়া গেছে। এফএওর পরামর্শ, অসুস্থ মাছ সুস্থ মাছ থেকে যতটা সম্ভব আলাদা রাখা এবং মৃত্যু বাড়তে থাকলে নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে কারণ নিশ্চিত করা।

উকুন রোগ ও পুষ্টির ঘাটতি
মাছের উকুন বলতে মূলত আরগুলাস গণের পরজীবীকে বোঝায়, যার প্রায় ১৪০টি প্রজাতি আছে। এরা মাছের গায়ে শক্ত করে লেগে থাকে; কম বয়সে মাছের শ্লেষ্মা ও চামড়ার কোষ খায়, বড় হয়ে রক্ত খায়। নরসিংদীর জরিপে কার্প এবং ময়মনসিংহের জরিপে পাঙাশ ও রুই মাছে উকুন রোগ পাওয়া গেছে।

খাবারে আমিষ, ভিটামিন বা খনিজের ঘাটতি থাকলে মাছের বৃদ্ধি থেমে যায় এবং রোগ সহজে ধরে। এফএওর ১৯৯২ সালের পুষ্টিজনিত রোগবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী ভিটামিন এ-র অভাবে কার্প মাছের খাবারে অরুচি, রং ফ্যাকাশে হওয়া, পাখনা ও চামড়ায় রক্তক্ষরণ এবং চোখ ফুলে বেরিয়ে আসা দেখা যায়। মেরুদণ্ড বেঁকে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত মূলত ভিটামিন সি-র অভাব, আর ভিটামিন কে-র অভাবে রক্ত জমাট বাঁধতে দেরি হয়, রক্তশূন্যতা ও রক্তক্ষরণ হয়। তাই পুকুরে প্রাকৃতিক খাবার তৈরি করা এবং নিয়মিত সুষম খাবার দেওয়া জরুরি।
নরসিংদীর জরিপে প্রায় ১৪০ ধরনের ওষুধ ও রাসায়নিক এবং ৩০ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার পাওয়া যায়। গবেষকেরা দেখেছেন, অনেক চাষি সঠিক মাত্রা, প্রয়োগের নিয়ম ও মাছ বিক্রির আগে অপেক্ষার সময় না জেনেই এগুলো ব্যবহার করেন, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগের। তাঁরা চাষিদের ওষুধ ব্যবহারে সঠিক প্রশিক্ষণের সুপারিশ করেছেন।
ছবি: Khalid Mahmood / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, এফএও (এশিয়া ডায়াগনস্টিক গাইড টু অ্যাকুয়াটিক অ্যানিমেল ডিজিজেস, ২০০১; নিউট্রিশনাল ফিশ প্যাথলজি, ১৯৯২), হেলিয়ন (কাওসার ও অন্যান্য, ২০২২), ভেটেরিনারি মেডিসিন অ্যান্ড সায়েন্স (রসুল ও অন্যান্য, ২০২৫), প্লস ওয়ান (২০২৩), ভেটেরিনারি ওয়ার্ল্ড (২০১৫), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)