বাংলাদেশের কৃষির সফলতা এখন আর গল্প নয়, বাস্তব। ফলমূলভর্তি জীবন্ত এক বাস্কেট। একবিংশ শতাব্দীতে অভূতপূর্ব অর্জন দেশের অবস্থানকে বিশ্বের কাছে করেছে সুসংহত। ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনকে কয়েক গুণ বাড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছেন কৃষিবিজ্ঞানী, সম্প্রসারণকর্মী এবং কৃষি উন্নয়নবিষয়ক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
দেশে বর্তমানে ১৬০ ধরনেরও অধিক ফল ও সবজি সারা বছর উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ প্রকার ফল পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থ উপার্জন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে অবদান রেখে চলেছে। যদিও ফলের রপ্তানি বৃদ্ধিতে আশানুরূপ অর্জন এখনও সম্ভব হয়নি। কোল্ড চেইন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে সমুদ্রপথে রপ্তানিতে কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি হয়নি। তবে উৎপাদনের দিক থেকে আমে সপ্তম, কাঁঠালে দ্বিতীয়, পেয়ারায় অষ্টম, পেঁপেতে ১৪তম এবং সার্বিকভাবে বিশ্বে ফল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ।
বেশিরভাগ ফলের উৎপাদন মৌসুম মে মাস থেকে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতে থাকে। কিন্তু ভরা মৌসুমে একসঙ্গে বাজারে বিপুল পরিমাণ ফল আসায় সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে উৎপাদিত ফলের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
সতেজ অবস্থায় কোল্ড চেইন লজিস্টিকস অনুসরণ করে পরিবহন ও স্থানান্তরের সীমাবদ্ধতা, আকাশপথে কার্গো খরচ বেশি হওয়া, উপযুক্ত প্রযুক্তির স্বল্পতা, উত্তম কৃষি চর্চার সীমিত প্রয়োগ, কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স এবং কমপ্লায়েন্সভিত্তিক প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে রপ্তানিতে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এরপরও বর্তমানে ৪০টিরও বেশি দেশে ফল রপ্তানি হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে হালাল ও স্ন্যাকসজাতীয় ফলভিত্তিক পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রক্রিয়াজাত ব্যবস্থাপনার জন্য প্যাকহাউস ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের উপযোগী বিশেষায়িত হিমাগার নির্মাণে বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি পণ্যের গুণমান যাচাইয়ের জন্য অ্যাক্রেডিটেড ল্যাবরেটরি স্থাপন, গবেষণাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিশেষ সুবিধা, কার্গো ব্যয় হ্রাস, একক সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে ডকুমেন্টেশন সুবিধা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ জরুরি।
২০২৩ সালে তাজা ফল রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৭৪.৯ মেট্রিক টন, যেখানে ২০১৪ সালে তা ছিল ২৩৯.১৯ মেট্রিক টন। একইভাবে ২০২৫ সালে প্রক্রিয়াজাত ও হিমায়িত ফলের বাজারের আকার ছিল ৯.১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত এ খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে ১৪.৭৪ শতাংশ।
ফলের প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মধ্যে ডিহাইড্রেটেড পণ্য অন্যতম। আম, কলা, পেঁপে, আনারস, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলের ড্রাইড পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইন থেকে এসব পণ্য আমদানি করা হচ্ছে। অথচ দেশে উৎপাদন করা গেলে যেমন আমদানি কমবে, তেমনি রপ্তানিরও ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বর্তমানে ইউরোপে ২৯.৫ শতাংশ, এশিয়া-প্যাসিফিকে ৩৫.৫ শতাংশ, উত্তর আমেরিকায় ২০ শতাংশ এবং অন্যান্য দেশে ১৫ শতাংশ ড্রাইড পণ্যের বাজার রয়েছে। এক জরিপে দেখা গেছে, আলিবাবা প্ল্যাটফর্মে ২৭.৬৭ শতাংশ ক্রেতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ড্রাইড পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে আশার সঞ্চার করেছে। শুধু ড্রাইড আমের চাহিদাই যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে বুরকিনা ফাসো থেকে ৪ হাজার টন ড্রাইড আম এবং ঘানা থেকে ২ হাজার ৫০০ টন ড্রাইড আনারস ও আম ইউরোপে রপ্তানি হয়েছে।
বাজার সৃষ্টি করতে পারলে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ সম্ভব। বর্তমানে দেশে ড্রাইড পণ্যের বাজার চাহিদা ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অধিকসংখ্যক দেশে বিপণন সুবিধা তৈরির জন্য ফলভিত্তিক বিশেষজ্ঞ দল গঠন, সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় অত্যাবশ্যক।
দেশে প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ ২৪ ধরনের ফলের প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এসব প্রযুক্তি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে সীমিত পরিসরে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মধ্যে কাঁঠাল, কলা ও আলুর ভ্যাকুয়াম ফ্রাইড চিপস জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেক উদ্যোক্তা সফলভাবে এসব পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করছেন। উচ্চশিক্ষিত নারী-পুরুষের অংশগ্রহণও এ খাতে বাড়ছে। রপ্তানি পণ্য হিসেবে কলা ও কাঁঠালের চিপসের মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ২০২৪ সালে ইউরোপে ইকুয়েডর থেকে কলার চিপস আমদানির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার টন।
উল্লেখ্য, ড্রাইড পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত নগণ্য। ২০২৪ সালে মাত্র ৫৯৪ হাজার মার্কিন ডলারের ড্রাইড পণ্য রপ্তানি হয়েছে। অন্যদিকে ৬.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে।
বিশ্বে কৃষিজাত প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বর্তমান বাজার প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এশিয়ার মধ্যে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম এ খাতে অনেক এগিয়ে। ভিয়েতনাম তাদের কৃষি ইকোসিস্টেম আধুনিকীকরণের মাধ্যমে ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি তার তুলনায় ২ শতাংশেরও কম। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
সামগ্রিকভাবে দেশের কৃষি শিল্পের রপ্তানি আয় মাত্র ৯৮৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাজার। দেশে প্রাণ, বোম্বে সুইটস, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ৫২টি দেশে ডিউটি-ফ্রি বাজার সুবিধা পাচ্ছে।
তবে এই বিশাল বাজারে প্রবেশের জন্য রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। দেশে মাত্র ১২ শতাংশ উদ্যোক্তা আইএসও ও এইচএসিসিপি মানদণ্ড অনুসরণ করেন, যা অত্যন্ত অপ্রতুল। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, স্বল্পসুদে যন্ত্রপাতি, প্যাকেজিং উপকরণ, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য এবং অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা প্রদান জরুরি। পাশাপাশি রেজিস্ট্রেশন ও টেস্টিং সুবিধা সহজলভ্য করা প্রয়োজন।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং বাজার সম্প্রসারণের জন্য কোল্ড চেইন লজিস্টিকস উন্নয়ন, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, কার্গো সুবিধা বৃদ্ধি, কুল চেম্বার নির্মাণ, নদী ও সমুদ্রবন্দরভিত্তিক টার্মিনাল সম্প্রসারণ, ওয়্যারহাউস ও প্যাকহাউস স্থাপন, কোয়ারেন্টাইন সুবিধা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিশেষজ্ঞ পুল গঠন, ইউটিলিটি বিল হ্রাস, করকাঠামোর আধুনিকীকরণ এবং উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও বিজনেস ইনকিউবেশন সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়িত উত্তম কৃষি চর্চা (গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস) আম, কাঁঠাল, আনারস ও কলাসহ বিভিন্ন ফলের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথকে আরও প্রশস্ত করেছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং খাদ্য আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি।
বিভিন্ন পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের পণ্যের স্বীকৃতি ও নিবন্ধন ব্যয় কমানো এবং প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবেন। উন্নত ফলের জাত এবং মানসম্মত কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বছরব্যাপী ফল উৎপাদন নিশ্চিত করতে উন্নত চারা উৎপাদন এবং জাতভিত্তিক বাগান স্থাপন অপরিহার্য।
প্রক্রিয়াজাত ব্যবস্থাপনার জন্য প্যাকহাউস ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের উপযোগী বিশেষায়িত হিমাগার নির্মাণে বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি পণ্যের গুণমান যাচাইয়ের জন্য অ্যাক্রেডিটেড ল্যাবরেটরি স্থাপন, গবেষণাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিশেষ সুবিধা, কার্গো ব্যয় হ্রাস, একক সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে ডকুমেন্টেশন সুবিধা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ জরুরি।
সময়সাপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফলে আয় বৃদ্ধি পাবে এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
লেখক : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও খাদ্য প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষক পোস্ট-হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর। [email protected]





মন্তব্য
(০)