দেশে সার নিয়ে অস্থিরতা, কৃষকের আন্দোলন ও গুদাম ভাঙচুরের মধ্যেই সার পাচার হচ্ছে মিয়ানমারে, আর বিপরীতে আসছে ইয়াবা, আইসের মতো মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র। দেশ রূপান্তরের কক্সবাজার প্রতিনিধি তুষার তুহিনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থা সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে প্রতিবেদন দিয়ে বলেছে, ভর্তুকির কারণে ভারতের তুলনায় সার সস্তা হওয়ায় ডিলার ও পরিবহন ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর ও সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে সার পাচার হচ্ছে; চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক, কর্ণফুলীর মোহনা ও উপকূল দিয়ে মিয়ানমারে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
কোস্ট গার্ড ও বিজিবির তথ্যে, চলতি বছরের জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯০৮ কেজি সার জব্দ এবং ১১৭ জনকে আটক করে মামলা হয়েছে। কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, আটকদের অধিকাংশই শ্রমিক; মূল হোতাদের আসামি করার চেষ্টা হয়। টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান জানান, হাতেনাতে ধৃতদের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যে পাওয়া নামও আসামি করা হয়েছে। উখিয়ার ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, স্থলপথে নজরদারি কঠোর হওয়ায় পাচারকারীরা জলপথ বেছে নিয়েছে।
১ হাজার ৩৫০ টাকা বস্তার ইউরিয়া মিয়ানমারে চক্রটি বিক্রি করছে ৮ হাজার টাকায়। চলতি মাসে কক্সবাজারের জন্য ১ হাজার ৮৪৩ টন ইউরিয়ার চাহিদার বিপরীতে ২ হাজার ৩৪৩ টন, ডিএপি ৭৮৯ টনের বিপরীতে ৮৮৯ টন, টিএসপি ৪৭৫ ও এমওপি ৩৬৮ টন বরাদ্দ দিলেও প্রান্তিক কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না। হোয়াইক্যংয়ের চাষি সাইফুদ্দিন মোবারক বলেন, ডিলারদের দ্বারে ঘুরেও প্রয়োজনমতো সার পাননি, অথচ প্রায় প্রতিদিন পাশের ইউনিয়ন দিয়ে সার পাচার হচ্ছে; কচুবনিয়ার কার্ডধারী কৃষক আবদুল গফুর বলেন, ডিলাররা কৃষক নয় এমন লোকদের খুচরা সার দিচ্ছে, যা মজুত করে পাচার হয়।
কৃষি অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, চক্রটি প্রান্তিক কৃষকদের দিয়ে ডিলারের সার সংগ্রহ করে উপকূলে মজুত করে, পরে মাঝি, সীমান্তের চাষি বা রাখালদের দিয়ে ওপারে পাঠায়—অনেক ক্ষেত্রে ডিলারের যোগসাজশে। উখিয়া ও টেকনাফের অন্তত ১৫টি পয়েন্ট, বিশেষত পালংখালীর আনজুমানপাড়া, হোয়াইক্যংয়ের উলুবনিয়া-ঝিমংখালী-কানজরপাড়া, হ্নীলার লেদা-দমদমিয়া খাল এবং নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্ত পাচারের রুট হিসেবে চিহ্নিত। পালংখালীর চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী ও আইনজীবী শাহীন শাহ বলেন, ইয়াবা ও মানবপাচারের চক্রই সার পাচারে অর্থ লগ্নি করে।
টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ন কবির বলেন, সীমান্তের মানুষ সচেতন না হলে পাচার রোধ প্রায় অসম্ভব, তবু বিতরণে কর্মকর্তা উপস্থিত থাকছেন; উখিয়ার কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিস সরকার জানান, বস্তা খুলে সার দেওয়া হচ্ছে এবং দুই ডিলারসহ ১২টি মামলা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তারা সীমান্ত এলাকার ১০-১২ জন ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছেন; ডিএইর কক্সবাজার উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, অনিয়মে জড়িত ডিলারদের বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং কালো তালিকায় জেলার কয়েকজনের নাম আছে। কৃষি সচিব যোগাযোগে সাড়া দেননি।
সিটওয়েতে বাংলাদেশের সাবেক কনস্যুলেট প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, রাখাইনের অধিকাংশ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে এবং জান্তা সেখানে সার সরবরাহ বন্ধ করায় চাহিদা তৈরি হয়েছে; আরাকান আর্মি সমঝোতা ও চোরাই—দুই পথেই সার সংগ্রহের চেষ্টা করছে, আর বাহিনীগুলো আংশিক উদ্ধার করতে পারছে। কৃষকের জন্য প্রশ্ন সোজা: বাড়তি বরাদ্দের পরও ভর্তুকির সার খেতের বদলে সীমান্ত পেরোলে সংকট থাকবেই।
সূত্র: দেশ রূপান্তর — প্রতিবেদন: তুষার তুহিন, কক্সবাজার





মন্তব্য
(০)