নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের দুই মাসের মাথায় 'কৃষক কার্ড' চালু করছে বিএনপি সরকার। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে বীজ, সার ও কীটনাশক কেনা, ফসল বিক্রি, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও বিমাসহ বেশ কিছু সুবিধা পাবেন, আর দরিদ্র কৃষকরা বছরে নির্দিষ্ট অঙ্কের আর্থিক সহায়তা পাবেন। মঙ্গলবার বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কৃষকদের হাতে কার্ড তুলে দিয়ে কর্মসূচির উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।
সরকারি তথ্যমতে দেশে কৃষক পরিবার এক কোটি ৬৫ লাখ। তাদের পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করে কার্ড দেওয়া হবে: পাঁচ শতকের কম জমি যাদের তারা ভূমিহীন, পাঁচ থেকে ৪৯ শতক প্রান্তিক, ৫০ থেকে ২৪৯ শতক ক্ষুদ্র, ২৫০ থেকে ৭৪৯ শতক মাঝারি, আর ৭৫০ শতকের বেশি জমির মালিক বড় কৃষক। প্রি-পাইলটিং ধাপে ১০ জেলার ২২ হাজার ৬৫ জন কার্ড পাচ্ছেন — রোববার সচিবালয়ের সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী জানান, তাদের দুই হাজার ২৪৬ জন ভূমিহীন; বাকিদের মধ্যে প্রায় নয় হাজার ৪৫৮ জন প্রান্তিক, আট হাজার ৯৬৭ জন ক্ষুদ্র, এক হাজার ৩০৩ জন মাঝারি ও ৯১ জন বড় কৃষক।
নামে 'কৃষক' থাকলেও কার্ড কেবল ভূমিচাষিদের জন্য নয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে প্রথম দফার কার্ডধারীদের মধ্যে ফসল উৎপাদনকারী ২১ হাজার ১৪১ জন, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও দুগ্ধ খামারি প্রায় ৮৫৫ জন, মৎস্যজীবী ৬৬ জন এবং লবণচাষি তিন জন। কর্মসূচি হবে তিন ধাপে: এখন চলছে প্রি-পাইলটিং, যেখানে দরিদ্র কৃষক বেশি এমন ১০ জেলার ১১ উপজেলা রয়েছে; এ ধাপ শেষে অগাস্টের মধ্যে শুরু হবে পাইলট, যেখানে কার্ড উদ্দেশ্যমতো কাজ করছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। মন্ত্রীর ভাষায়, পাইলটিংয়ের অভিজ্ঞতার আলোকে আগামী চার বছরে সারা দেশে কার্ড বিতরণ ও ডাটাবেজ তৈরির কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম ধাপের ১১টি কৃষি ব্লক: টাঙ্গাইল সদরের সুরুজ, বগুড়ার শিবগঞ্জের উথলি, পঞ্চগড় সদরের কমলাপুর ও বোদার পাঁচপীর, ঝিনাইদহের শৈলকূপার কৃপালপুর, পিরোজপুরের নেছারাবাদের রাজাবাড়ি, কক্সবাজারের টেকনাফের রাজারছড়া, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের তেনাপচা, মৌলভীবাজারের জুড়ীর ফুলতলা এবং জামালপুরের ইসলামপুরের গাইবান্ধা ব্লক — এসব জায়গায় ১৪ এপ্রিল বিতরণ শুরু হওয়ার কথা। কুমিল্লার আদর্শ সদরের অরণ্যপুর ব্লকে কার্ড দেওয়া শুরু হবে ১৭ এপ্রিল।
কার্ডধারীরা ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ ও সেচ, স্বল্পমূল্যে যন্ত্রপাতি, সহজ শর্তে ঋণ, মোবাইলে বাজার ও আবহাওয়ার তথ্য, রোগবালাই দমনের পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও কৃষি বিমার সুবিধা পাবেন; সরকারের কাছে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি এবং ভর্তুকি-প্রণোদনার অর্থ পাওয়াও সহজ হবে। এলাকার বীজ-সার ডিলারের কাছে সরকার ডিজিটাল পিওএস মেশিন রাখার ব্যবস্থা করবে, যাতে কার্ডে লেনদেন করা যায়। নগদ সহায়তা — বছরে অন্তত আড়াই হাজার টাকা — পাবেন কেবল ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা; প্রথম দফার ২০ হাজার ৬৭১ জন এই শ্রেণিতে পড়ায় সবাই তা পাবেন। সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখায় প্রত্যেকের নামে হিসাব খোলা হয়েছে, কার্ডটি কার্যত ডেবিট কার্ড হিসেবে চলবে। প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ের বাজেট প্রায় আট কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
কৃষকরা উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও অতীতের অভিজ্ঞতায় সংশয়ও আছে। কুমিল্লার কৃষক রহমত উল্লাহ বলছেন, কার্ডে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার-বীজ মিললে বা সরকারের কাছে ধান বিক্রি করা গেলে তা অবশ্যই ভালো খবর; মুন্সিগঞ্জের কৃষক নাহিদ খানের প্রশ্ন, বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের 'কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড' এবং পরে আওয়ামী লীগ সরকারের দশ টাকার কৃষক ব্যাংক হিসাব ও জেলে কার্ড — কোনোটাই সেভাবে কাজে আসেনি বলে বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, যার বড় কারণ অনিয়ম-দুর্নীতি ও 'রাজনৈতিক বিবেচনায়' তালিকা তৈরি। গবেষক গওহার নঈম ওয়ারার মতে, যাদের জন্য উদ্যোগ তাদের সঙ্গে আলোচনা না হলে এবং তারা সুফল না পেলে এটি কাজ করবে না। কৃষিমন্ত্রীর আশ্বাস: "এই কৃষক কার্ড শতভাগ রাজনৈতিক মুক্ত। অতীতে যা হয়েছে, তা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই।"
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)