সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ৯ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৭°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৫%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

পোল্ট্রি ফিডের বস্তায় ৩৫০ টাকা কমানোর দাবি খামারিদের সংগঠনের

সয়াবিন মিল রপ্তানি বন্ধের পর ভুট্টা ও সয়াবিন মিলের দাম কমেছে, এই যুক্তিতে ২০২১ সালের ২৩ অক্টোবর ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ফিডের দাম ৩৫০ টাকা কমানোর দাবি জানায় বাংলাদেশ পোল্ট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদ।

পোল্ট্রি ফিডের বস্তায় ৩৫০ টাকা কমানোর দাবি খামারিদের সংগঠনের
লাইভস্টক

২০২১ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে দেশের একটি বড় ফিড কোম্পানির ৫০ কেজির এক বস্তা ব্রয়লার ফিডের দাম ছিল ২ হাজার ৬১০ টাকা। কয়েক হাজার মুরগি পালন করা একজন ছোট খামারির কাছে পুরো ব্যাচের সবচেয়ে বড় খরচ এই ফিডের বস্তা। ২০২১ সালের ১৪ অক্টোবর দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানিয়েছিল, ডিম, মাছ ও মুরগি উৎপাদনের মোট খরচের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই যায় খাদ্য কেনায়।

এমন বাস্তবতায় ২০২১ সালের ২৩ অক্টোবর পোল্ট্রি খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোল্ট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদ (বিপিকেআরজেপি) ৫০ কেজির প্রতি বস্তা পোল্ট্রি ফিডের দাম ৩৫০ টাকা কমানোর দাবি জানায়। সংগঠনটির বক্তব্য ছিল, সে মাসের শুরুতে সরকার সয়াবিন মিল রপ্তানি বন্ধ করার পর ফিডের প্রধান দুই উপকরণ সয়াবিন মিল ও ভুট্টার দাম কমতে শুরু করেছে, তাই ফিডের দামও কমা উচিত।

এই প্রতিবেদনে থাকছে খামারিদের সংগঠন কী দাবি করেছিল এবং কোন যুক্তিতে, সেদিন বাজারে ফিডের দাম কত ছিল, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের আগে ও পরে ফিডের দাম কীভাবে বেড়েছিল, সরকার কেন সয়াবিন মিল রপ্তানি বন্ধ করেছিল, পোল্ট্রি শিল্পের নেতারা কী জবাব দিয়েছিলেন এবং করোনা মহামারির পর খাতটি কোন অবস্থায় ছিল।

খামারিদের দাবি: ৫০ কেজির বস্তায় ৩৫০ টাকা কম


বিপিকেআরজেপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মহসিন এগ্রিকেয়ার২৪.কমকে বলেন, পোল্ট্রি খাদ্যের প্রতি কেজিতে ৬ থেকে ৭ টাকা কমানো এখন সময়ের দাবি। প্রতি কেজিতে ৬ থেকে ৭ টাকা কমলে ৫০ কেজির এক বস্তায় কমে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, সংগঠনটি এই অঙ্কই সামনে আনে।

তিনি দাবির ভিত্তি হিসেবে কাঁচামালের দামের কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সয়াবিন মিল রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার এক দিনের মধ্যে গাজীপুরে পৌঁছানো পর্যন্ত সয়াবিন মিলের দাম প্রতি কেজি ৪৯ টাকা ২০ পয়সা থেকে কমে ৪৪ টাকা ৬০ পয়সা হয়েছে। ভুট্টার দাম তাঁর হিসাবে কেজিপ্রতি ৪ টাকা কমে ৩২ টাকা থেকে ২৮ টাকায় নেমেছে। সে হিসাবে ফিডের দাম কেজিতে ৬ থেকে ৭ টাকা কমানো উচিত বলে তিনি মনে করেন এবং দাম কমাতে ফিড মিলারদের প্রতি আহ্বান জানান।

মহসিন আরও বলেন, ক্রমাগত ফিডের দাম বাড়ায় খামারিরা বিপাকে পড়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ফিড মিলাররা সংঘবদ্ধ হয়ে খামারিদের ওপর চাপ তৈরি করছেন। তাঁর মতে, মিলাররা যদি লাভের সামান্য অংশ খামারিদের দেন, তাহলে প্রতি বস্তায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কমানো সম্ভব। এগুলো সংগঠনটির দাবি ও অভিযোগ; ফিড উৎপাদকেরা নিজেদের খরচের যে ব্যাখ্যা এক মাস আগে সংবাদ সম্মেলনে দিয়েছিলেন, তা নিচে তুলে ধরা হলো।

অক্টোবরের শেষে এক বস্তা ফিডের দাম


দাবি জানানোর দিন বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন কোম্পানির ফিডের দাম আগের মতোই রয়েছে। সেদিন ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের যে দাম পাওয়া যায়, তা ছিল এমন:

  • নারিশ: লেয়ার ফিড ২ হাজার ২২০ টাকা, ব্রয়লার ফিড ২ হাজার ৬১০ টাকা, সোনালি মুরগির ফিড ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং স্টার্টার ফিড ২ হাজার ৪০০ টাকা।
  • সিপি: ব্রয়লার ফিড ২ হাজার ৫২৬ টাকা, সোনালি মুরগির ফিড ২ হাজার ৩৪০ টাকা এবং লেয়ার ফিড ২ হাজার ১৪০ টাকা।
  • সগুণা: ব্রয়লার ফিড ২ হাজার ৫৪০ টাকা, সোনালি মুরগির ফিড ২ হাজার ৩৪০ টাকা এবং লেয়ার ফিড ২ হাজার ১৬০ টাকা।
  • বিশ্বাস: ব্রয়লার ফিড ২ হাজার ৫৭০ টাকা, সোনালি মুরগির ফিড ২ হাজার ৩৪০ টাকা এবং লেয়ার ফিড ২ হাজার ১৭৫ টাকা।
  • আমান: ব্রয়লার ফিড ২ হাজার ৭৫০ টাকা এবং সোনালি মুরগির ফিড ২ হাজার ৫২৫ টাকা।

প্রতিটি কোম্পানিতেই তিন প্রধান ধরনের মধ্যে ব্রয়লার ফিডের দাম ছিল সবচেয়ে বেশি, লেয়ার ফিডের দাম সবচেয়ে কম। ব্রয়লার দ্রুত বাড়ে এমন মাংসের মুরগি, লেয়ার ডিম পাড়ার মুরগি। আর সোনালি মুরগি দেশে তৈরি একটি সংকর জাত, যা রোড আইল্যান্ড রেড মোরগ ও ফাউমি মুরগির সংকরায়ণে উৎপাদিত। গবেষকেরা লিখেছেন, বেশি ডিম দেওয়া এবং গ্রামীণ পরিবেশে ভালোভাবে খাপ খাওয়ানোর জন্য এই জাতটি বিশেষভাবে সমাদৃত।

দামের এই উচ্চতা নতুন ছিল না। এক মাস আগে, ২০২১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, ফিড বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪৯ থেকে ৫০ টাকায়, যা দুই মাস আগে ছিল ৪২ থেকে ৪৪ টাকা। অর্থাৎ ৫০ কেজির এক বস্তার দাম তখন ২ হাজার ৪৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা।

২০২১-২২ বাজেটের আগে ও পরে দাম বাড়ার হিসাব


বিপিকেআরজেপি জানায়, ২০২১-২২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে পোল্ট্রি খাদ্যের দাম কমানোর পদক্ষেপের কথা বলা হলেও বাজারে তা মানা হয়নি। সংগঠনটির হিসাবে, বাজেটের পর তিন দফায় ফিডের দাম বাড়ানো হয়: প্রথমে বস্তায় ৫০ টাকা, এরপর ৭৫ টাকা এবং সর্বশেষ ১০০ টাকা। বাজেটের আগে বাড়ানো হয়েছিল আরও ২৭৫ টাকা। সব মিলিয়ে এক বস্তা ফিডের দাম ৫০০ টাকা বেড়েছে বলে সংগঠনটি জানায় এবং দ্রুত দাম কমানোর দাবি তোলে।

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হয় ২০২১ সালের জুনে। ২০২১ সালের ২৩ জুন প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড লেখে, প্রস্তাবিত বাজেটে পোল্ট্রি, ডেইরি ও মাছের খাদ্যের আমদানি করা কাঁচামালে কর অবকাশ দেওয়া হয়েছে। পত্রিকাটির মূল্যায়ন ছিল, এতে দাম কমবে এবং দেশীয় খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্প সহায়তা পাবে।

বাজেটের আগে শিল্পের দাবি ছিল আরও বেশি। ২০২১ সালের ২ জুন পোল্ট্রি ওয়ার্ল্ড জানায়, বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য কর হ্রাস ও অব্যাহতি চেয়েছিল। এর মধ্যে ছিল বিদ্যমান কর সুবিধা আরও ১০ বছর বাড়ানো এবং দেশি উৎস থেকে কেনা কাঁচামালে উৎসে কর তুলে দেওয়া। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পোল্ট্রি ফিড খাতের ক্ষতি প্রায় ৯ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার এবং পোল্ট্রি খাতে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ কাজ করেন।

আমদানি করা খাদ্য উপকরণে কর ছাড় অবশ্য ওই বাজেটের আগেও ছিল। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস তখন জানিয়েছিল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২০২০ সালের ২৫ মার্চ থেকে পোল্ট্রি, মৎস্য ও প্রাণিখাদ্য তৈরির উপকরণ আমদানিতে অগ্রিম কর মওকুফ করে। এর মধ্যে ছিল সয়াবিন মিল, কর্ন গ্লুটেন মিল ও রেপসিড এক্সট্রাকশন।

সয়াবিন মিল, সয়াবিন থেকে তেল বের করার পর থেকে যাওয়া আমিষসমৃদ্ধ অংশ, যা পোল্ট্রি ফিডের অন্যতম প্রধান উপকরণ। ছবি: ইউনাইটেড সয়বিন বোর্ড / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সয়াবিন মিল, সয়াবিন থেকে তেল বের করার পর থেকে যাওয়া আমিষসমৃদ্ধ অংশ, যা পোল্ট্রি ফিডের অন্যতম প্রধান উপকরণ। ছবি: ইউনাইটেড সয়বিন বোর্ড / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

২০২১ সালের অক্টোবরে সয়াবিন মিল রপ্তানি বন্ধ


খামারিদের দাবির পেছনে ছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সিদ্ধান্ত। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, পোল্ট্রি ও গবাদিপশুর খাদ্যের এই মূল উপকরণের ঊর্ধ্বমুখী দাম নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের ডেইরি ও পোল্ট্রি খাত রক্ষায় সরকার ২০২১ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে সয়াবিন মিল রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রককে নির্দেশ দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

যেসব রপ্তানিকারক ১৩ অক্টোবরের মধ্যে ঋণপত্র (এলসি) বা টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার নিষ্পত্তি করেছিলেন, তাঁদের ২০ অক্টোবর পর্যন্ত পণ্য পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ১৫ অক্টোবর জানায়, সয়াবিন মিল রপ্তানির জন্য নতুন কোনো এলসি আর নেওয়া হবে না। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি) হাফিজুর রহমান পত্রিকাটিকে বলেন, সয়াবিন মিল রপ্তানির কারণে দেশে পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্য এবং গরুর খাদ্যে সংকট দেখতে চান না তাঁরা।

সয়াবিন বীজ থেকে তেল বের করার পর যা থাকে, সেটিই সয়াবিন মিল। পোল্ট্রি, মাছ ও গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, বাংলাদেশ মূলত ভারত ও নেপালে সয়াবিন মিল রপ্তানি করত। কর্মকর্তারা সতর্ক করেছিলেন, রপ্তানি চলতে থাকলে দেশে ডেইরি ও পোল্ট্রি খাদ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দুধ, ডিম ও মাংসের দাম বাড়বে।

দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ টন সয়াবিন মিলের চাহিদা ছিল। এর ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ আসত দেশের সয়াবিন তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে, বাকি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ আমদানি হতো মূলত ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা থেকে। বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন এই নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করে সতর্ক করেছিল যে তা না হলে দুধ ও সংশ্লিষ্ট খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে।

ভারতে রপ্তানি যেভাবে শুরু হয়েছিল


রপ্তানি শুরু হয়েছিল মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। ভারতের পোল্ট্রি শিল্প সয়াবিন মিলের তীব্র সংকটে পড়লে দেশটি ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২ লাখ টন ভাঙা ও তেলমুক্ত জিনগতভাবে পরিবর্তিত (জিএম) সয়াবিন মিল আমদানির অনুমতি দেয়। ২০২১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, বাংলাদেশ থেকে প্রথম চালানের ৫০ হাজার টন পশ্চিমবঙ্গের পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে গেছে।

দেশের ফিড উৎপাদকেরা সঙ্গে সঙ্গেই আপত্তি তোলেন। ২০২১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফিআব) অবিলম্বে রপ্তানি বন্ধের দাবি জানায়। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. আহসানুজ্জামান বলেন, কৃষি, খাদ্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় আগেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এই কাঁচামাল রপ্তানির অনুমতি না দিতে অনুরোধ করেছিল।

তিনি জানান, রপ্তানির সিদ্ধান্তের পর ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে সয়াবিন মিলের দাম কেজিতে ১০ থেকে ১২ টাকা বেড়েছে। ফিডের দাম বাড়ায় মাছ, মুরগি ও ডিমের দামও বাড়তে শুরু করেছে, যা সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ফিআব সভাপতি এহতেশাম বি শাহজাহান বলেন, সয়াবিন তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শূন্য শুল্কে সয়াবিন বীজ আমদানি করে। তাদের উপজাত সয়াবিন মিল দেশের ফিড শিল্পকে সরবরাহ করার কথা, কিন্তু এ নিয়ে সংকট তৈরি হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

পোল্ট্রি শিল্পের নেতারা যা বলেছিলেন


পোল্ট্রি শিল্পের সম্মিলিত সংগঠন এই নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানায়। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, "দেরিতে হলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই ও ধন্যবাদ জানাই।" তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে শিল্পের স্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করবে। তাঁর অভিযোগ, পোল্ট্রি সংগঠনগুলো, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতামত উপেক্ষা করে সয়াবিন মিল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

এতে ফিডের দাম কমবে কি না, এমন প্রশ্নে বিপিআইসিসি সভাপতি বলেন, তাঁরা আশা করছেন ফিডের দাম সহনীয় পর্যায়ে নামানো যাবে, তবে কিছুটা সময় লাগবে। আন্তর্জাতিক বাজারে ফিড তৈরির অন্যান্য কাঁচামালের দাম আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে কমবে বলে তিনি আশা করেন। তাঁর কথায়, কাঁচামালের দাম কমলে তাঁরা "অবশ্যই" ফিডের দাম কমিয়ে সমন্বয় করবেন, কারণ "ব্যবসার পাশাপাশি খামারি ও ভোক্তার স্বার্থ দেখাও আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।"

রপ্তানি সীমিত করার কথা তিনি আগেও বলেছিলেন। ২০২১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, দাম স্থিতিশীল রাখতে সয়ামিল, সরিষার খৈল, ভোজ্যতেলের উপজাত ও ভুট্টার রপ্তানি সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন মসিউর রহমান।

দামের প্রশ্নে ফিড উৎপাদকদের অবস্থান উঠে এসেছিল ফিআবের সংবাদ সম্মেলনে। সংগঠনের সভাপতি এহতেশাম বি শাহজাহান বলেন, আগের এক বছরে ফিডের কাঁচামালের দাম গড়ে ৩৪ দশমিক ২২ শতাংশ বেড়েছে। এতে ফিডের দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়ার কথা, কিন্তু কোম্পানিগুলো বাড়িয়েছে মাত্র ৬ থেকে ৮ শতাংশ। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক ছোট ও মাঝারি ফিড মিল বন্ধের পথে বলেও তিনি জানান।

ভুট্টা ও সয়াবিন মিল: এক বস্তা ফিডে কী থাকে


দেশে পোল্ট্রি ফিডের প্রধান উপকরণ দুটি। ২০২০ সালের নভেম্বরে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ফিড তৈরির কাঁচামালের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ভুট্টা, আর এই ফিডের বেশির ভাগই খায় পোল্ট্রি খামার। সয়াবিন মিল আমিষের প্রধান উৎস; ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ফিআব জানায়, ফিডে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সয়াবিন মিল ব্যবহৃত হয়। এই দুই উপকরণের দাম কমায় খামারিদের সংগঠন ফিডের দাম কমার আশা করছিল।

ধানের পর ভুট্টা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফসল। ২০২০ সালের ১৯ নভেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভুট্টার উৎপাদন সাড়ে ১২ শতাংশ বেড়ে ৪০ লাখ ১৫ হাজার টনে দাঁড়ায় এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫৬ লাখ ৯৩ হাজার টন। সেই বিপণন বছরে ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টার চাষ হয়, আর দেশের ফিড মিলগুলো প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের জন্য বছরে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ টন খাদ্য উৎপাদন করত।

একই প্রতিবেদনে মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২০ সালের অক্টোবরে ভুট্টার গড় খুচরা দাম ছিল কেজিপ্রতি ২২ টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ২৮ শতাংশ বেশি। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, ভুট্টার কেজি তখন ৩০ থেকে ৩২ টাকা, এক বছর আগে যা ছিল ২৪ টাকা। রপ্তানি বন্ধের আগের দাম হিসেবে মহসিন যে ৩২ টাকার কথা বলেছিলেন, তা এই সীমার সর্বোচ্চ অঙ্কের সঙ্গে মেলে।

মহামারির শুরুর দিকেই দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল। ২০২০ সালের ৬ ডিসেম্বর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, আগের ছয় মাসে ভুট্টার দাম কেজিপ্রতি ১৮ টাকা থেকে বেড়ে ২১ টাকা এবং সয়ামিলের দাম ৩১ টাকা থেকে বেড়ে ৩৬ টাকা হয়েছে। একই সময়ে ফিডের অন্য প্রচলিত উপকরণ তেলমুক্ত চালের কুঁড়া, রাইস পলিশ ও কর্ন গ্লুটেনের দামও বেড়েছিল।

বাংলাদেশের একটি ভুট্টাখেত; পোল্ট্রি ফিডের সবচেয়ে বড় একক উপকরণ ভুট্টা। ছবি: বলরাম মহলদার / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
বাংলাদেশের একটি ভুট্টাখেত; পোল্ট্রি ফিডের সবচেয়ে বড় একক উপকরণ ভুট্টা। ছবি: বলরাম মহলদার / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

২০২১ সালে বিশ্ববাজারে শস্যের দাম


দাম বাড়ার বড় অংশ এসেছিল বিশ্ববাজার থেকে। এশিয়া ফিন্যান্সিয়াল জানায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনের রেকর্ড পরিমাণ ভুট্টা কেনার ফলে ২০২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ভুট্টার ফিউচার্সের দাম ২০১৩ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে।

একই প্রতিবেদনে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের প্রধান উৎপাদন এলাকায় প্রতিকূল আবহাওয়া, কনটেইনার পরিবহন খরচ তিন থেকে চার গুণ বেড়ে যাওয়া এবং ২০২০-২১ মৌসুমে যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টার মজুতের প্রাক্কলন ইউএসডিএ কমাবে বলে বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার কথা বলা হয়। গম ও সয়াবিনের ফিউচার্সের দামও তখন বাড়ছিল।

বাংলাদেশ এসব ওঠানামার প্রভাবের বাইরে নয়, কারণ দেশের প্রয়োজনের ভুট্টা ও সয়াবিন মিলের একটি অংশ আমদানি করতে হয়। ইউএসডিএর তথ্য উদ্ধৃত করে ২০২০ সালের নভেম্বরে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, ২০২০-২১ বিপণন বছরে দেশের ভুট্টা আমদানি প্রায় ১৫ লাখ টন হতে পারে।

মহামারির ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টায় পোল্ট্রি খাত


ফিডের দাম কমানোর দাবি এমন সময় ওঠে, যখন করোনার বিধিনিষেধের ক্ষতি পোল্ট্রি খামারিরা তখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, প্রাণিসম্পদ সেবা কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক এবিএম খালেদুজ্জামানের তথ্যমতে চালু ব্রয়লার খামারের সংখ্যা করোনার আগের ৮২ হাজার থেকে কমে প্রায় ৬৮ হাজারে নেমেছে। পত্রিকাটি আরও জানায়, চালু ফিড কারখানার সংখ্যা ২১৭ থেকে কমে ১৪০টিতে দাঁড়িয়েছে।

ক্ষতির মাত্রা নিয়ে সরকারি ও শিল্পের হিসাব মেলেনি। ২০২১ সালের ২৮ আগস্ট দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) হিসাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন ৩২১ কোটি পিস এবং মাংসের উৎপাদন ৭ লাখ ৬৬ হাজার টন বেড়েছে। বিপিআইসিসি এই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলে; তাদের মতে আগের দেড় বছরে ডিম উৎপাদনকারী খামারের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ এবং মাংস উৎপাদনকারী ইউনিটের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। ডিএলএসের পরিচালক ডা. দেবাশীষ দাস বলেন, টিকে থাকা বড় খামারগুলো উৎপাদন বাড়িয়ে বন্ধ খামারের ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছে।

ডিএলএসের প্রাণিসম্পদ অর্থনীতি প্রতিবেদন ২০২০-২১ অনুযায়ী, মাথাপিছু বছরে ডিমের প্রাপ্যতা ১০৪টি থেকে বেড়ে ১২১টি হয় এবং মাথাপিছু দৈনিক মাংসের প্রাপ্যতা দাঁড়ায় ১৩৬ দশমিক ১৮ গ্রাম, যেখানে চাহিদা ১২০ গ্রাম। একই প্রতিবেদনে দেশে নিবন্ধিত পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা বলা হয় ৯০ হাজার, যদিও বেসরকারি হিসাবে তা এক লাখের বেশি।

পোল্ট্রি খাতের খরচের বড় অংশই যায় খাদ্যে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ফিড উৎপাদকেরা ৬৫ লাখ ৬৭ হাজার টন প্রাণিখাদ্য তৈরি করেন, যার ৬৩ শতাংশই ব্যবহার করে পোল্ট্রি খাত। ২০২১ সালের জুনে পোল্ট্রি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই খাতে কাজ করেন প্রায় ৬০ লাখ মানুষ।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ভোক্তার দিক থেকে দামের চিত্র উল্টে যায়। ২৪ সেপ্টেম্বর দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, ঢাকায় ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা; ডিমের ডজন ১১৫ থেকে ১২০ টাকা। এক দিনের ব্রয়লার বাচ্চার দাম তখন প্রতিটি ৮৪ থেকে ৯৫ টাকা, আগে যা ছিল ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। ক্ষুদ্র খামারি আদিল হোসেন পত্রিকাটিকে বলেন, দাম বাড়ানোর পরও ফিডের লাগামহীন দামের কারণে তাঁদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

পুরান ঢাকার একটি বাজারে বিক্রির জন্য রাখা জীবিত মুরগি। ছবি: ডেভিড ব্রুয়ার / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
পুরান ঢাকার একটি বাজারে বিক্রির জন্য রাখা জীবিত মুরগি। ছবি: ডেভিড ব্রুয়ার / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)

ছবি: তানভীর রাহাত / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: এগ্রিকেয়ার২৪, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, পোল্ট্রি ওয়ার্ল্ড, এশিয়া ফিন্যান্সিয়াল, লাইভস্টক রিসার্চ ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

মতামত

ডিম উৎপাদন ১৫ বছরে চার গুণ, তবু শিশুর পাতে পৌঁছায়নি: হুমায়ুন কবিরের কলাম

বিশ্ব ডিম দিবসে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এ কে এম হুমায়ুন কবির লিখেছেন, দেশে ডিম উৎপাদন ২০১০-১১ সালের ৬০৮ কোটি থেকে ২০২৪-২৫ সালে ২,৪৪১ কোটিতে উঠেছে, কিন্তু শিশুদের পুষ্টিতে সেই সাফল্য কাজে লাগাতে হবে।

প্রথম আলো১০ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

গবাদিপশুর যক্ষ্মায় বন্য হরিণের ভূমিকা খুঁজতে নজরদারি চান যুক্তরাজ্যের পশুচিকিৎসকেরা

ব্রিটিশ ক্যাটল ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশন তাদের হালনাগাদ নীতিতে ২০২৭ সালের মধ্যে হরিণের ওপর সমন্বিত নজরদারির পাইলট চেয়েছে, যদিও ঝুঁকি স্থানীয় বলেই মনে করা হয়।

Farmers Weekly১০ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

পাঁচ বছর পর স্কটল্যান্ডে গরুর সংখ্যা বাড়ল, জানাল কৃষিশুমারি

২০২৬ সালের জুনের কৃষিশুমারিতে গরু ০.৭ শতাংশ বেড়ে ১৬ লাখ ৭০ হাজার হয়েছে, শূকরও বেড়েছে। তবে ভেড়া ও পোলট্রি কমেছে, নরম ফলের আবাদ দশ বছরে সর্বনিম্ন এবং বসন্তকালীন বার্লি কমেছে।

Farmers Weekly১০ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)