পাবদা বাংলাদেশের জনপ্রিয় ও সুস্বাদু ছোট মাছ। একসময় নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর ও বাঁওড়ে এ মাছ প্রচুর পাওয়া যেত, কিন্তু প্রাকৃতিক জলাশয়ে এখন তা অনেক কমে গেছে। জাগো নিউজ ২৪-এর এক নির্দেশিকায় তাই পুকুরে নিজেই পাবদা চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) পাবদার কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন ও চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। সেই নির্দেশিকার সঙ্গে মিলিয়ে চাষের ধাপগুলো এখানে দেওয়া হলো।
পাবদা কেন কমে গেছে, কেন চাষ লাভজনক
বিএফআরআইয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী নদীর উজানে চর জেগে নাব্যতা কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ, ধানক্ষেতে কীটনাশকের ব্যবহার এবং বিল-ঝিল শুকিয়ে মাছ ধরার ফলে পাবদার প্রজনন ও চারণক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। আইইউসিএনের সমীক্ষায় পাবদাকে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় রাখা হয়েছে। এশিয়ান ফিশারিজ সায়েন্স সাময়িকীতে ২০১০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, আইইউসিএন বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালেই পাবদাকে দেশের বিপন্ন মাছের তালিকায় রাখে।
বাজারে সরবরাহ কম আর চাহিদা বেশি বলে পাবদার দাম রুইজাতীয় মাছের চেয়ে অনেক বেশি। মাছটি পুষ্টিকরও: ওই গবেষণায় উদ্ধৃত হিসাবে প্রতি ১০০ গ্রাম পাবদায় ১৯.২ গ্রাম আমিষ, ২.১ গ্রাম চর্বি ও ৩১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে।

স্ত্রী ও পুরুষ মাছ চেনার উপায়
পাবদা সাধারণত মে থেকে জুলাই মাসে প্রজনন করে এবং এক বছরের মধ্যেই প্রজননক্ষম হয়। প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী ও পুরুষ মাছ সহজেই আলাদা করা যায়:
- পুরুষ মাছ সাধারণত স্ত্রী মাছের চেয়ে আকারে ছোট।
- পরিপক্ব পুরুষের বুকপাখনার কাঁটার (পেক্টোরাল স্পাইন) ভেতরের দিকে খাঁজ থাকে, স্ত্রী মাছের থাকে না।
- স্ত্রী মাছের পেট ডিমে ভরা থাকায় ফোলা ও নরম দেখায়, পুরুষের পেট চ্যাপ্টা থাকে।
বিএফআরআই শীত মৌসুমে নদী, বিল বা হাওর থেকে সুস্থ ও রোগমুক্ত মাছ সংগ্রহ করে ব্রুড বা মা-বাবা মাছ হিসেবে লালনের পরামর্শ দেয়। মজুদের আগে ব্রুড মাছ ১.৫ থেকে ২.০ পিপিএম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বা লবণ পানিতে ধুয়ে নিতে হয়। হরমোন ইনজেকশন দিয়ে কৃত্রিম প্রজনন হ্যাচারিতে প্রশিক্ষিত কর্মীদের কাজ; সাধারণ চাষি হ্যাচারি থেকে পোনা সংগ্রহ করবেন।

পুকুর নির্বাচন ও প্রস্তুতি
জাগো নিউজের নির্দেশিকায় এমন পুকুর বেছে নিতে বলা হয়েছিল, যেখানে বছরে অন্তত সাত-আট মাস পানি থাকে, যা বন্যামুক্ত এবং যেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পৌঁছায়। রুইজাতীয় মাছের সঙ্গে মিশ্রচাষের জন্য বিএফআরআই ৪০ থেকে ৬০ শতাংশের পুকুরের কথা বলে, যেখানে বছরে কমপক্ষে আট-নয় মাস চার থেকে ছয় ফুট পানি থাকে।
শুকনো মৌসুমে জলজ আগাছা পরিষ্কার করে পাড় মেরামত করতে হবে। রাক্ষুসে ও অবাঞ্ছিত মাছ সরাতে মিহি ফাঁসের জাল বারবার টানতে হবে। বিএফআরআইয়ের মিশ্রচাষ পদ্ধতিতে এরপর প্রতি শতাংশে ১ কেজি চুন দিতে হয়; তিন-চার দিন পর শতাংশে ৬ থেকে ৮ কেজি পচা গোবর, ৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম টিএসপি পানিতে গুলে ছিটিয়ে দিতে হয়। সার দেওয়ার তিন থেকে পাঁচ দিন পর পানি সবুজাভ হলে পোনা ছাড়ার সময় হয়। মাটি ও পানির ধরন অনুযায়ী মাত্রা বদলাতে পারে, তাই উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া ভালো।
পোনা মজুদ ও খাবার
বিএফআরআইয়ের মিশ্রচাষ পদ্ধতিতে প্রতি শতাংশে ৫ থেকে ৭ সেন্টিমিটারের ৫০টি পাবদা ও ৮০টি গুলশা, সঙ্গে ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটারের ৮টি কাতলা, ১২টি রুই, ১০টি মৃগেল ও ২টি গ্রাস কার্পের সুস্থ পোনা মজুদ করা হয়। পানির তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তন এড়াতে পোনা ধীরে ধীরে পুকুরের পানির সঙ্গে খাপ খাইয়ে ছাড়তে হবে। পোনা জীবাণুমুক্ত করার দ্রবণ ও মাত্রা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নিন।
- পোনা ছাড়ার পরদিন থেকে চালের কুঁড়া (৪০%), গমের ভুসি (২৫%), সরিষার খৈল (২০%) ও ফিশমিল (১৫%) মিশিয়ে মাছের দেহ ওজনের ৩ থেকে ৮ শতাংশ হারে খাবার দেওয়া যায়।
- প্রতি ১৫ দিন অন্তর শতাংশে ৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম টিএসপি এবং ৪ কেজি গোবর পর্যায়ক্রমে দিতে হয়।
- সপ্তাহে একবার হররা টানতে হবে, পানি কমে গেলে বাইরে থেকে পানি দিতে হবে।
- পানির স্বচ্ছতা ২০ সেন্টিমিটারের মধ্যে থাকলে সার দেওয়া বন্ধ রাখতে হবে।

আহরণ ও ফলন
বিএফআরআইয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী পাবদা ৪০ থেকে ৫০ গ্রাম এবং গুলশা ৬০ থেকে ৮০ গ্রাম ওজনের হলে বিক্রির জন্য ধরা যায়। পোনা মজুদের আট-নয় মাস পর সব মাছ আহরণ করতে হয়। এ পদ্ধতিতে হেক্টরে ২৫০ থেকে ৩২৫ কেজি পাবদা, ৮০০ থেকে ৯০০ কেজি গুলশা এবং ৪,৫০০ থেকে ৫,০০০ কেজি রুইজাতীয় মাছ পাওয়া যায় বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
বিএফআরআই সতর্ক করেছে, পানির গুণাগুণ চাষের উপযোগী না থাকলে মাছের বৃদ্ধি আশানুরূপ হয় না এবং পুকুরে মাছ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাই নিয়মিত পানির গুণাগুণ দেখা এবং ১৫ দিন পরপর জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা জরুরি। মাছ অসুস্থ মনে হলে নিজে ওষুধ না দিয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নিন।
ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই), এশিয়ান ফিশারিজ সায়েন্স




মন্তব্য
(০)