সাত দিন সাগরে কাটিয়ে সোমবার সকালে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছটা ঘাটে ফিরেছে মাছ ধরার ট্রলার এফভি কুলসুমা। পাঁচ দিন জাল ফেলে ইলিশের দেখা পাননি ১২ জেলে; ষষ্ঠ দিনে মহেশখালী উপকূলে জাল ফেলতেই উঠে আসে ২ হাজার ২০০ ইলিশ। পাশের ফিশারিঘাটের পাইকারি মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে সেই ইলিশ কয়েকজন ব্যবসায়ী কিনে নেন ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায়। প্রতিটির ওজন ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম। বরফমিশ্রিত কার্টনে ভরে দুপুরেই মাছ রওনা হয় ঢাকার পথে।
ট্রলারের মালিক নুনিয়াছটার আমান উল্লাহ (৫৪) জানান, গত তিন মাস কক্সবাজারের জেলেরা ইলিশের দেখা পাননি; বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন নিম্নচাপ ও লঘুচাপের কারণে দুই মাস সাগরে নামাই যায়নি। মহেশখালীর তাজিয়াকাটা থেকে পশ্চিমে ১০–১২ কিলোমিটার দূরে জাল ফেলে তাঁর জেলেরা এই ইলিশ পেয়েছেন। তাঁর ভাষায়, গভীর সাগরে ইলিশ আছে, কিন্তু ছোট ট্রলার নিয়ে ৮০–৯০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে মাছ ধরা ঝুঁকির কাজ।
জেলে মো. আলমগীর জানান, খরচ বাদ দিয়ে ১২ জেলের প্রত্যেকে ৫০ হাজার টাকার মতো পাবেন—এক মৌসুমের খোরাকির জন্য যথেষ্ট না হলেও এক দিনের হিসাবে অনেক। ফিশারিঘাটে সোমবার পাইকারিতে এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা, ৮০০–৯০০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার ৭০০ টাকা, ৫০০–৭০০ গ্রামের ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা এবং ৩০০–৪০০ গ্রামের ইলিশ ৬৫০–৭৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাঝারি আকারের বেশির ভাগ ইলিশের পেটে ডিম ছিল বলে জানান জেলে ও ব্যবসায়ীরা।
ঘাটে থাকা ২৭ জন মাছ ব্যবসায়ী জানান, গত কয়েক দিনে তিন শতাধিক ট্রলার ফিশারিঘাটে ফিরেছে, প্রতিটিতে ২০০ থেকে ৩০০ ইলিশ। কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুই মাস জেলেরা সাগরে নামতে পারেননি; গত পাঁচ-ছয় দিন ধরে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পেয়েছে এফভি কুলসুমা।
এক ট্রলারের সাফল্যের আড়ালে জেলার মৎস্য খাতের সংকট স্পষ্ট। কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, জেলার ছোট-বড় ৬ হাজার ট্রলারের মধ্যে ৪ হাজার ঘাটেই পড়ে আছে। সাত দিনের এক ট্রিপে ৬–৭ লাখ টাকা খরচ হলেও মাছ বিক্রি করে মেলে ১ থেকে ৩ লাখ টাকা। লোকসানে বহু মালিক ট্রলার বিক্রি করে দিচ্ছেন; জেলার ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি জেলে সবচেয়ে বেশি বিপদে।
কক্সবাজার মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বাজারে ৫ হাজার ৬৫৮ টন মাছ অবতরণ হয়েছিল, যার মধ্যে ইলিশ ১ হাজার ৬২৮ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট অবতরণ নেমে আসে ২ হাজার ৩৯ টনে, ইলিশ ৫২২ টন। জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাবে গত অর্থবছরে জেলায় ২০ হাজার টনের বেশি ইলিশ ধরা পড়লেও চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই-আড়াই মাসে ৫০০ টনও হয়নি।
কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশরাফুল হক এর কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন, সামুদ্রিক দূষণ, উপকূলে ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক ও ছেঁড়া জাল এবং ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বৃদ্ধির কথা বলছেন। তাঁর মতে, সাগরে যে পরিমাণ মাছ মজুত আছে, আহরণ হচ্ছে তার চেয়ে বেশি—সেখান থেকেই মাছের সংকটের শুরু।
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)