মেক্সিকো ও পেরু অঞ্চলের সবজি ক্যাপসিকাম বাংলাদেশে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং চাহিদা বাড়তে থাকায় জমিতে ও টবে এর চাষ ক্রমশ বাড়ছে বলে জানাচ্ছে কৃষি বিভাগ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪৭৫ টন, যেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে তা ছিল দেড়শ টনের কাছাকাছি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে গত কয়েক বছরে উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে এবং দেশের মোট উৎপাদনের ৫৫ শতাংশই আবাদ হয় ভোলা জেলায়।
ভোলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খায়রুল ইসলাম মল্লিক জানান, জেলার দুটি উপজেলায় প্রায় ১৮০ হেক্টর জমিতে ক্যাপসিকাম চাষ হচ্ছে। এর বাইরে সিলেট, নওগাঁ, চুয়াডাঙ্গা, কুড়িগ্রাম ও যশোর অঞ্চলের কিছু জেলা-উপজেলায় চাষ হচ্ছে, আর চলতি বছর কুমিল্লাসহ আরও কয়েকটি জায়গায় প্রথমবারের মতো চাষের তথ্য মিলেছে। কৃষি বিভাগ বলছে, ২০১৪-১৫ সালের দিকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ক্যাপসিকাম বাজারে আসতে শুরু করে, তারপর থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
কৃষি বিভাগের টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলছেন, সালাদ, পিৎজা, সাসলিকসহ ফাস্টফুডে অপরিহার্য উপাদান হওয়ায় শহরাঞ্চলসহ সর্বত্র এর স্থায়ী বাজার তৈরি হয়েছে; হলুদ, কমলা ও লাল ক্যাপসিকামের চাহিদা তুলনামূলক বেশি এবং বছরজুড়ে ভালো দাম মেলে। তার ভাষায়, "বর্তমানে দেশে এর চাহিদা দ্রুত বাড়লেও উৎপাদন এখনো সীমিত, ফলে বাজারে একটি বড় ঘাটতি বিদ্যমান এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে।"
যশোরের শার্শা ও ঝিকরগাছায় চাষ করা মানিক রাজা, যিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, জানান কয়েক বছর আগে ৬-৭ বিঘায় শুরু করতে খরচ হয়েছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকা; প্রথম বছরেই বিক্রি হয় প্রায় ৩৫ লাখ টাকার, এরপর প্রতি বছর গড়ে ৫০ লাখের মতো আসছে। পলি হাউস বা নেট হাউস একবার হয়ে গেলে পরের বছর আর বড় খরচ লাগে না। এবার তিনি প্রায় ১৪ বিঘায় চাষ করেছেন, যার বেশিরভাগ হলুদ জাত; হলুদ ও লাল ক্যাপসিকাম মাঠ থেকেই কেজিপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর সরকার পলি হাউসসহ আধুনিক ব্যবস্থাপনার উপকরণ দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
চাষের ধরনও উল্লেখযোগ্য। চারা লাগানোর দুই মাস পর ফল আসে, সবুজ থেকে অন্য রঙে যেতে লাগে প্রায় তিন মাস, আর একই গাছ থেকে অন্তত নয় মাস ফলন মেলে; পরিপক্ব একটি ক্যাপসিকামের ওজন প্রায় আড়াইশ গ্রাম। মানিক রাজা ক্যাপসিকামের মৌসুমের ফাঁকে জমিতে ধান বুনে নির্দিষ্ট সময়ে চাষ দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেন, যা জৈব সারের কাজ করে; একই জমিতে টমেটো, ব্রোকলি, রঙিন বাঁধাকপি ও শসাও করেন। ফসলটি মূলত পলিনেট বা গ্রিনহাউসের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চাষ হয়, যেখানে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও আলো নিয়ন্ত্রণ করে উন্নত মানের উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, নদীর পলি, সবুজ সার ও নিয়মিত সার ব্যবহারে হেক্টরপ্রতি ৩০-৩৫ টন ফলন সম্ভব এবং কৃষকরা সাধারণত হেক্টরপ্রতি ১৪-১৮ লাখ টাকা আয় করেন — তবে চাষটি ব্যয় ও কষ্টসাধ্য, চাষিদের মৌসুমজুড়ে মাঠেই পড়ে থাকতে হয়। চাষ বাড়ায় বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী বীজ আমদানি শুরু করেছে, আর কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত তিন ধরনের বীজ বিএডিসির মাধ্যমে কৃষকের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মতে ক্যাপসিকামে ভিটামিন এ, সি, কোলাজেন ও ক্যাপসিসিন থাকে, এবং টবে সহজে চাষ করা যায় বলে সাধারণ মানুষকে এই মিষ্টি মরিচ খেতে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)