রমজান এলেই দেশের প্রায় প্রতিটি ইফতারের থালায় জায়গা করে নেয় ভুনা ছোলা। শুধু রোজার মাসেই নয়, সারা বছর ডাল, চটপটি, ঘুগনি কিংবা ভাজা ছোলা হিসেবে এই শস্যটি গ্রাম আর শহরের মানুষের খাবারে মিশে আছে। স্বাদের পাশাপাশি পুষ্টিগুণেও ছোলা অনন্য, আর কৃষকের জন্য এটি কম খরচে ভালো লাভ দেওয়া একটি ফসল। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছেও এর কদর দিন দিন বাড়ছে।
কিন্তু যে ছোলা আমরা এত খাই, তার বড় অংশই আসে বিদেশ থেকে। অস্ট্রেলিয়ার কৃষি সংবাদমাধ্যম গ্রেইন সেন্ট্রালের হিসাবে, ২০২৩-২৪ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ার রপ্তানি করা ছোলার সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল বাংলাদেশ, পরিমাণ ৩ লাখ ৩৬ হাজার টনের বেশি। অর্থাৎ দেশের মাঠে ছোলার উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ আছে, আর তা কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানির ওপর নির্ভরতাও কমাতে পারে। এই প্রতিবেদনে ছোলার পুষ্টিগুণ, উপকারিতা আর চাষের খুঁটিনাটি তুলে ধরা হলো।
এক মুঠো ছোলায় কী থাকে
ছোলা প্রোটিন বা আমিষ, আঁশ এবং খনিজ উপাদানের চমৎকার উৎস। মার্কিন কৃষি বিভাগের খাদ্য তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, সেদ্ধ করা ১০০ গ্রাম ছোলায় থাকে প্রায় ১৬৪ কিলোক্যালরি শক্তি, প্রায় ৮.৯ গ্রাম আমিষ, ৭.৬ গ্রাম খাদ্য আঁশ এবং প্রায় ২.৯ মিলিগ্রাম আয়রন। মাংস বা মাছের তুলনায় কম দামে এই আমিষ পাওয়া যায় বলে সাধারণ পরিবারের পুষ্টিতে ডালজাতীয় শস্যের ভূমিকা বড়।
- আমিষে সমৃদ্ধ: ছোলা শরীরের পেশি গঠনে সাহায্য করে।
- আঁশ: হজমশক্তি বাড়ায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।
- ভিটামিন ও খনিজ: এতে আছে আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক এবং ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স।
- পরিমিত ক্যালরি: আঁশ ও আমিষের কারণে অল্প খেলেই পেট ভরে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
ব্যবহারের দিক থেকেও ছোলা বহুমুখী। ডাল হিসেবে রান্না হয়, পবিত্র রমজান মাসসহ সারা বছর মুখরোচক খাবার হিসেবে খাওয়া হয়, আবার ছোলার ডাল গুঁড়া করে তৈরি হয় বেসন, যা দিয়ে বানানো হয় পেঁয়াজু, বেগুনি আর নানা ভাজাপোড়া।
ছোলার ইতিহাসও অনেক পুরোনো। এর বৈজ্ঞানিক নাম সিসার অ্যারিয়েটিনাম, আর গবেষকদের মতে প্রায় দশ হাজার বছর আগে পশ্চিম এশিয়ায়, আজকের তুরস্কের আশপাশে, মানুষ প্রথম ছোলার চাষ শুরু করে। সেখান থেকে এটি ছড়িয়ে পড়ে ভারতীয় উপমহাদেশসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে। বাংলাদেশের গ্রামে শীতের শুরুতে ছোলার কচি ডগা শাক হিসেবেও রান্না করে খাওয়ার চল আছে, যা ছোলা গাছকে আরও একটি খাদ্য উৎসে পরিণত করে।
শরীরের জন্য ছোলার উপকারিতা
পুষ্টিবিদেরা ছোলার কয়েকটি উপকারের কথা বিশেষভাবে বলেন। মনে রাখা দরকার, এগুলো সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে ছোলা খাওয়ার সুফল; কোনো একটি খাবার একা রোগ সারায় না।
- হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়ক: ছোলার আঁশ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: ছোলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স, অর্থাৎ খাওয়ার পর রক্তে শর্করা কত দ্রুত বাড়ে তার মাপকাঠি, কম হওয়ায় এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর।
- হাড়ের স্বাস্থ্য: ছোলার ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম হাড় মজবুত করে।
- ওজন কমাতে সহায়ক: আঁশ দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে, ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে।
- ত্বকের উজ্জ্বলতা: ছোলার ভিটামিন ই ত্বক ভালো রাখতে সাহায্য করে।
তবে ইফতারে ছোলা অনেক সময় প্রচুর তেলে ভুনা করা হয়। তেল কম দিয়ে রান্না করলে কিংবা সেদ্ধ ছোলা সালাদে মিশিয়ে খেলে এর পুষ্টিগুণ পুরোপুরি পাওয়া যায়।
মাঠের জন্যও ছোলা উপকারী
ছোলা শুধু মানুষের নয়, মাটিরও বন্ধু। ডালজাতীয় অন্য ফসলের মতো ছোলার শিকড়ে ছোট ছোট গুটি হয়, যেখানে রাইজোবিয়াম নামে এক ধরনের উপকারী জীবাণু বাস করে। এরা বাতাসের নাইট্রোজেন ধরে গাছের কাজে লাগায়। এ কারণেই ছোলা চাষে নাইট্রোজেন সার তুলনামূলক কম লাগে, আর ছোলার পর যে ফসল লাগানো হয়, সেটিও মাটির উর্বরতার কিছুটা সুফল পায়। আমন ধান কাটার পর শীতের মৌসুমে জমি পতিত না রেখে ছোলা লাগালে একই জমি থেকে বাড়তি একটি ফসল পাওয়া যায়।
কোন মাটি, কোন মৌসুম
ছোলা রবি বা শীতকালীন ফসল। দোআঁশ, বেলে-দোআঁশ এবং এঁটেল-দোআঁশ মাটিতে ছোলা ভালো জন্মে। চাষ সাধারণত নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে শুরু হয়, তবে ভালো ফলনের জন্য উপযুক্ত সময় আরও নির্দিষ্ট: অগ্রহায়ণ মাসের ৫ থেকে ২৫ তারিখ, অর্থাৎ ২০ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর। রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে বীজ বুনতে হয় কিছুটা আগে, কার্তিক মাসের দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় সপ্তাহে, অর্থাৎ অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে।
জমিতে পানি জমে থাকলে ছোলার গাছ টিকতে পারে না। তাই এমন জমি বাছাই করতে হবে যেখান থেকে বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি দ্রুত বের করে দেওয়া যায়।
বারি ছোলার পাঁচটি জাত
ভালো ফলনের প্রথম শর্ত ভালো জাত। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, সংক্ষেপে বারি, দেশের আবহাওয়া ও মাটির উপযোগী বেশ কয়েকটি ছোলার জাত উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবার তালিকায় বারি ছোলা-১ থেকে ৯, বিনা ছোলা-১ থেকে ৮সহ আরও কয়েকটি উন্নত জাতের নাম আছে। নিচে বহুল পরিচিত পাঁচটি বারি জাতের পরিচয় দেওয়া হলো। জাতের বিবরণে হাজার বীজের ওজন দেওয়া আছে, যা থেকে দানা কত বড় তা বোঝা যায়।
বারি ছোলা-২ (বড়াল): গাছের রং সবুজ। বীজ স্থানীয় জাতের চেয়ে বড়, রং হালকা বাদামি, হাজার বীজের ওজন ১৪০ থেকে ১৫০ গ্রাম। বড় দানার কারণে কৃষক ও ক্রেতা দুজনের কাছেই এ জাত বেশি গ্রহণযোগ্য। ডাল রান্না হতে সময় লাগে ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট, আমিষ ২৩ থেকে ২৭ শতাংশ। জীবনকাল ১২০ থেকে ১৩০ দিন, হেক্টরপ্রতি ফলন ১.৩ থেকে ১.৬ টন। জাতটি নুয়ে পড়া বা উইল্ট রোগ প্রতিরোধী।
বারি ছোলা-৩ (বরেন্দ্র): গাছ খাড়া প্রকৃতির, রং হালকা সবুজ, পাতার ফলক বেশ বড় এবং ডগা সতেজ। বীজ বেশ বড়, হাজার বীজের ওজন ১৮৫ থেকে ১৯৫ গ্রাম। রান্না হতে লাগে ৪০ থেকে ৪৪ মিনিট, আমিষ ২৩ থেকে ২৬ শতাংশ। সঠিক সময়ে বুনলে পাকতে ১১৫ থেকে ১২৫ দিন লাগে। জাতটি রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য বেশি উপযোগী, ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৮ থেকে ২.০ টন।
বারি ছোলা-৪ (জোড়াফুল): গাছ মাঝারি খাড়া, পাতা গাঢ় সবুজ, কাণ্ডে খয়েরি রঙের ছাপ। বীজের পাশ সামান্য চ্যাপ্টা, ত্বক মসৃণ, রং হালকা বাদামি, হাজার বীজের ওজন ১৩২ থেকে ১৩৮ গ্রাম। গাছের উচ্চতা ৫০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার। রান্না হতে লাগে ৩২ থেকে ৩৮ মিনিট, আমিষ ১৮ থেকে ২১ শতাংশ। জীবনকাল ১২০ থেকে ১২৫ দিন, ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৯ থেকে ২.০ টন। জাতটি ফিউজেরিয়াম উইল্ট রোগ প্রতিরোধী।
বারি ছোলা-৫ (পাবনাই): বীজ আকারে ছোট, রং ধূসর বাদামি, আর বীজের গায়ে যে জায়গাটি শুঁটির সঙ্গে যুক্ত থাকে, সেই হাইলাম দাগটি খুব স্পষ্ট। বীজের পাশ কিছুটা চ্যাপ্টা, ত্বক মসৃণ, হাজার বীজের ওজন ১১০ থেকে ১২০ গ্রাম। রান্না হতে লাগে ৩৫ থেকে ৪০ মিনিট, আমিষ ২০ থেকে ২২ শতাংশ। জাতটি ১২৫ থেকে ১৩০ দিনে পাকে, ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৮ থেকে ২.০ টন।
বারি ছোলা-৬ (নাভারুন): বীজ কিছুটা গোলাকার, ত্বক মসৃণ, রং উজ্জ্বল বাদামি-হলদে। দানা দেশি জাতের চেয়ে বড়, হাজার বীজের ওজন ১৫৫ থেকে ১৬৫ গ্রাম। রান্না হতে লাগে ৩২ থেকে ৩৭ মিনিট, আমিষ ১৯ থেকে ২১ শতাংশ। জীবনকাল ১২৫ থেকে ১৩০ দিন, ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৮ থেকে ২.০ টন। জাতটির বিশেষ গুণ হলো, দেরিতে বুনলেও অন্য জাতের চেয়ে বেশি ফলন দেয়।
হেক্টরের হিসাব অনেক কৃষকের কাছে অপরিচিত, তাই বিঘার হিসাবে একটু দেখে নেওয়া যাক। ৩৩ শতাংশের এক বিঘা জমি প্রায় ০.১৩৪ হেক্টর। সেই হিসাবে হেক্টরপ্রতি ১.৮ থেকে ২.০ টন ফলন মানে বিঘাপ্রতি প্রায় ২৪০ থেকে ২৭০ কেজি, অর্থাৎ মোটামুটি সাড়ে ছয় থেকে সাত মণ ছোলা। বারি ছোলা-২ এর মতো ১.৩ থেকে ১.৬ টন ফলনের জাতে বিঘাপ্রতি ফলন দাঁড়ায় প্রায় ১৭৫ থেকে ২১৫ কেজি। অবশ্য এই ফলন পেতে সময়মতো বপন, সুষম সার আর রোগ-পোকা দমন, সবকিছুই ঠিকঠাক হতে হয়।
জাত বাছাইয়ের সময় তাই নিজের এলাকা আর বপনের সময় মাথায় রাখা জরুরি। বরেন্দ্রের কৃষকের জন্য বারি ছোলা-৩, যেসব জমিতে উইল্ট রোগের ইতিহাস আছে সেখানে বারি ছোলা-২ বা ৪, আর আমন কাটতে দেরি হলে বারি ছোলা-৬ ভালো বিকল্প হতে পারে। জাত সম্পর্কে আরও জানতে স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া যায়।
জমি তৈরি ও বীজ শোধন
জমি কয়েকবার চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝরঝরে করে নিতে হবে। শেষ চাষের সময় জৈব সার ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার মিশিয়ে দিতে হয়। বপনের আগে বীজ অবশ্যই ছত্রাকনাশক দিয়ে শোধন করে নিতে হবে। বীজ শোধন মানে বীজের গায়ে লেগে থাকা রোগজীবাণু মেরে ফেলা, যাতে চারা অবস্থায় গোড়া পচা বা অন্য রোগ কম হয়। উচ্চ ফলনশীল জাতের পরিষ্কার, পুষ্ট বীজ বাছাই করাও সমান জরুরি।
বীজ বপন: সারিতে না ছিটিয়ে
ছোলার বীজ ছিটিয়ে এবং সারি করে, দুইভাবেই বোনা যায়। সারিতে বুনলে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৪০ সেন্টিমিটার রাখতে হবে; বামিসের পরামর্শ অনুযায়ী সারিতে বীজ থেকে বীজের দূরত্ব ৫ থেকে ৬ সেন্টিমিটার এবং গভীরতা ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার রাখা ভালো। সারিতে বুনলে বীজ লাগে হেক্টরপ্রতি ৪৫ থেকে ৫০ কেজি, আর ছিটিয়ে বুনলে কিছু বেশি, ৫০ থেকে ৬০ কেজি।
সারিতে বোনার সুবিধা অনেক। গাছগুলো সমান আলো-বাতাস পায়, আগাছা পরিষ্কার করা যায় সুবিধামতো, আর পোকা বা রোগ দেখা দিলে গাছের ফাঁক দিয়ে হেঁটে পরিদর্শন ও স্প্রে করা যায়।
সারের পরিমাণ
ছোলা চাষে সমুদয় সার শেষ চাষের সময় জমিতে দিয়ে দিতে হয়। বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবার পরামর্শ অনুযায়ী, হেক্টরপ্রতি সারের মাত্রা মোটামুটি এমন:
- জৈব সার: ৫ থেকে ৮ টন
- ইউরিয়া: ৪০ থেকে ৬০ কেজি
- টিএসপি: ৮০ থেকে ৯০ কেজি
- এমওপি: ৫০ থেকে ৬০ কেজি
- জিংক সালফেট: ৬ থেকে ৭ কেজি
- বোরন সার: ৫ থেকে ৬ কেজি
যেসব এলাকায় আগে ছোলার চাষ হয়নি, সেখানে সুপারিশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট অণুজীব সার বা জীবাণু সার ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি আসলে সেই রাইজোবিয়াম জীবাণু, যা বীজের সঙ্গে মিশিয়ে দিলে শিকড়ে দ্রুত গুটি তৈরি হয়। প্রতি কেজি বীজে ৮০ গ্রাম হারে অণুজীব সার প্রয়োগের কথা বলা হয়; বামিসের সাম্প্রতিক পরামর্শে এই হার ৯০ গ্রাম। অণুজীব সার বা ইনোকুলাম ব্যবহার করলে ইউরিয়া সার দেওয়ার দরকার হয় না। মাটি পরীক্ষা করে সারের মাত্রা ঠিক করে নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।
সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনা
ছোলা চাষে সেচ খুব বেশি লাগে না। তবে জমিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে বপনের পর হালকা সেচ দিতে হবে, আর খরার সময়েও হালকা সেচ উপকারী। উল্টো দিকে, অতিবৃষ্টিতে যাতে জলাবদ্ধতা না হয়, সেজন্য অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়ার নালা রাখতে হবে। বপনের ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে একবার আগাছা দমন করা প্রয়োজন। এরপরও নিয়মিত জমি আগাছামুক্ত রাখলে ছোলার গাছ মাটির পুষ্টি ও রস পুরোপুরি পায়।
পড বোরার: ফলের শত্রু
ছোলার ফসলে ব্লাইট, উইল্ট এবং কাটুই পোকার আক্রমণ দেখা যায়, আর সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে ক্ষতি অনেক। তবে সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকাগুলোর একটি হলো ফল ছিদ্রকারী পোকা, ইংরেজিতে যাকে পড বোরার বলা হয়।
ক্ষতির ধরন: এই পোকার কীড়া বা শুককীট কচি পাতা, ফুল ও ডগা খায়। ফল বড় হওয়ার সময় ছিদ্র করে ভেতরের নরম দানা খেয়ে ফেলে। একটি কীড়া পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগে ৩০ থেকে ৪০টি ফল নষ্ট করতে পারে। ফলে আক্রমণ বেশি হলে ছোলার উৎপাদন অনেক কমে যায়।
ব্যবস্থাপনা: কীড়া ছোট অবস্থায় থাকতেই হাত দিয়ে সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে ডেসিস ২.৫ ইসি, রিপকর্ড ১০ ইসি, সিমবুশ ১০ ইসি বা ফেসম ১০ ইসির যেকোনো একটি প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর এক থেকে দুইবার স্প্রে করতে হবে। কীটনাশক ব্যবহারের সময় মুখ ও হাত ঢেকে রাখা এবং বোতলের গায়ের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।
তিনটি প্রধান রোগ
উইল্ট বা নুয়ে পড়া রোগ: চারা অবস্থায় আক্রান্ত হলে গাছ মারা যায়, অথচ পাতার রঙে কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। বড় গাছ আক্রান্ত হলে পাতা ধীরে ধীরে হলদে হয়, গাছ ঢলে পড়ে ও শুকিয়ে যায়। আক্রান্ত কাণ্ড লম্বালম্বি কাটলে মাঝখানের অংশ কালো দেখা যায়। ব্যবস্থাপনা হিসেবে রোগ প্রতিরোধী জাত, যেমন বারি ছোলা-২ ও বারি ছোলা-৪ চাষ করতে হবে, ফসলের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং পর্যাপ্ত জৈব সার ব্যবহার করতে হবে।
গোড়া পচা রোগ: চারা গাছে বেশি দেখা যায়। আক্রান্ত গাছ হলদে হয়ে যায়, শিকড় ও কাণ্ডের সংযোগস্থলে কালো দাগ পড়ে, আর টান দিলে গাছ অনায়াসে উঠে আসে। গোড়ায় ছত্রাকের সাদা জালের মতো আবরণ আর সরিষার দানার মতো ছোট গুটি দেখা যায়, যাকে স্কেলেরোশিয়া বলে। ব্যবস্থাপনা হিসেবে ফসলের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে, সুষম হারে সার দিতে হবে, এবং প্রতি কেজি বীজে ২.৫ থেকে ৩ গ্রাম ভিটাভেক্স-২০০ মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।
বট্রাইটিস গ্রে মোল্ড বা ধূসর ছাতা রোগ: গাছের বৃদ্ধির সময় কিংবা ফল আসার শুরুতে এ রোগ দেখা দেয়। কাণ্ড, পাতা, ফুল ও ফলে লক্ষণ প্রকাশ পায়, আক্রান্ত জায়গায় ধূসর রঙের ছত্রাক দেখা যায়। জমিতে গাছ বেশি ঘন থাকলে আর বাতাসে আর্দ্রতা বেশি হলে রোগটি দ্রুত ছড়ায়। ব্যবস্থাপনা হিসেবে ফসলের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে, প্রতি কেজি বীজে ২.৫ থেকে ৩ গ্রাম বাভিস্টিন বা থিরাম মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে, আর আক্রমণ দেখা দিলে ০.২ শতাংশ হারে বাভিস্টিন ১০ থেকে ১২ দিন পরপর দুই থেকে তিনবার স্প্রে করতে হবে।
লক্ষ করার বিষয়, তিনটি রোগের ক্ষেত্রেই ফসলের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলার কথা বলা হয়েছে। কারণ রোগের জীবাণু পুরোনো গাছের অবশেষে বেঁচে থাকে এবং পরের মৌসুমে আবার ফসলে ছড়ায়। একই জমিতে বছরের পর বছর ছোলা না করে অন্য ফসলের সঙ্গে পালা করে চাষ করলেও রোগের চাপ কমে।
ফসল তোলা
বপনের ৯০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে ছোলা তোলা যায়, জাতভেদে কিছুটা আগে-পরে। সাধারণত চৈত্রের প্রথম সপ্তাহ থেকে মধ্য চৈত্র, অর্থাৎ মার্চের মাঝামাঝি থেকে মার্চের শেষ ভাগে ফসল সংগ্রহ করতে হয়। গাছ ও শুঁটি হলদে-বাদামি হয়ে শুকিয়ে এলে বুঝতে হবে ফসল তোলার সময় হয়েছে। দেরি করলে শুঁটি ফেটে দানা মাঠে ঝরে পড়তে পারে। গাছ কেটে রোদে শুকিয়ে মাড়াই করে দানা আলাদা করতে হয়, তারপর ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। মাড়াই ও শুকানোর কাজ সরাসরি মাটিতে না করে ত্রিপল, চট বা পরিষ্কার পাকা খোলার ওপর করলে দানায় মাটি, কাঁকর ও আর্দ্রতা কম লাগে। বীজের জন্য রাখা ছোলা আলাদা করে বাছাই করে রাখা ভালো, যাতে পরের মৌসুমে পুষ্ট ও সুস্থ বীজ হাতে থাকে।
গুদামে ছোলা রক্ষা
ছোলা তোলার পরও লড়াই শেষ হয় না। গুদামে রাখা ডালের সবচেয়ে বড় শত্রু ডালের পোকা, যার পূর্ণবয়স্ক পোকা ও কীড়া দুটোই ক্ষতি করে। এরা দানার খোসা ছিদ্র করে ভেতরে ঢুকে শাঁস খেতে থাকে, ফলে দানা হালকা হয়ে যায়। এতে বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা নষ্ট হয়, আর দানা খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে।
ব্যবস্থাপনা: গুদামজাত করার আগে দানা ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। দানা শুকিয়ে এর ভেতরের পানির পরিমাণ ১২ শতাংশের নিচে আনতে হবে; ভালোভাবে শুকানো দানা দাঁতে কাটলে কট করে শব্দ হয়। বীজ হিসেবে রাখা ছোলায় প্রতি টনে ৩০০ গ্রাম ম্যালাথিয়ন বা সেভিন ১০ শতাংশ গুঁড়া মিশিয়ে পোকার আক্রমণ ঠেকানো যায়। এছাড়া প্রতি ১০০ কেজি গুদামজাত ডালে ২টি ফসটক্সিন ট্যাবলেট ব্যবহার করা যায়, তবে এই বড়ি অবশ্যই বায়ুরোধী, আবদ্ধ পরিবেশে ব্যবহার করতে হবে। ফসটক্সিন থেকে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়, তাই এটি বসবাসের ঘরে কখনোই ব্যবহার করা যাবে না এবং শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে।
লাভের হিসাব ও বাজার
ছোলার অর্থনৈতিক গুরুত্ব কয়েকটি দিক থেকে স্পষ্ট। প্রথমত, সারা বছরই বাজারে ছোলার চাহিদা থাকে, আর রমজানের আগে তা অনেক বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, সঠিক পরিচর্যায় ছোলার উৎপাদন খরচ কম, কারণ সেচ কম লাগে এবং অণুজীব সার ব্যবহার করলে ইউরিয়া কেনার দরকার পড়ে না। তৃতীয়ত, দেশের চাহিদার বড় অংশ এখনো আমদানি করে মেটানো হয়, তাই দেশে উৎপাদন বাড়লে বিক্রির বাজার নিয়ে দুশ্চিন্তা কম। মানসম্মত উৎপাদন বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ছোলা শুধু একটি পুষ্টিকর খাবার নয়, কৃষকের জন্য একটি অর্থকরী ফসলও। সঠিক জাত, সময়মতো বপন, শোধন করা বীজ আর রোগ-পোকার দিকে নজর রাখলে শীতের এই ফসল থেকে ভালো আয় করা সম্ভব। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের জন্য ছোলা একটি উৎকৃষ্ট খাবার, আর মাঠে এটি মাটির উর্বরতাও বাড়ায়। আমন কাটার পর যাঁর জমি শীতে ফাঁকা পড়ে থাকে, তাঁর জন্য ছোলা হতে পারে একই জমি থেকে বাড়তি আয় আর পরিবারের পাতে পুষ্টি যোগ করার একটি কার্যকর পথ।
ছবি: ছোলা গাছ (Cicer arietinum), Carl Davies, CSIRO / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)





মন্তব্য
(০)