যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরের কাগজপত্রে মাছগুলো ভারতীয় ইলিশ। কিন্তু বন্দর পেরিয়ে যশোরের বাজারে পৌঁছানোর পর এর একটি অংশ বিক্রি হচ্ছে ‘মিয়ানমারের ইলিশ’ নামে। একই মাছের উৎস নিয়ে সরকারি তথ্য ও বাজারের পরিচয়ের এই ফারাক প্রশ্ন তুলেছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের তথ্যে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বেনাপোল দিয়ে ভারত থেকে এসেছে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ, আমদানি করেছে ২২টি প্রতিষ্ঠান। জুলাইয়ে তিনটি প্রতিষ্ঠান এনেছে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি, আর আগস্টে ১৯টি প্রতিষ্ঠান ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি—দুই মাসের মোট আমদানির ৯১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে আমদানি বেড়েছে ২ লাখ ৯৩ হাজার ৯০৬ কেজি বা প্রায় ১০ দশমিক ৯৮ গুণ।
ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম এই পরিমাণ ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন। দুই মাসে আমদানি করা ইলিশের ঘোষিত মূল্য ৬ কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার ৫১০ ডলার; জুলাইয়ে প্রতি কেজির ঘোষিত গড় মূল্য ছিল প্রায় ১২০ ডলার, আগস্টে প্রায় ২০৩ ডলার, দুই মাসের গড় প্রায় ১৯৬ ডলার।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর দাবি, বড় আকারের কম দামের ইলিশের একটি অংশ মিয়ানমারের, যা ভারত হয়ে দেশে ঢুকছে। মেসার্স শেখ পিয়ারু ফিসের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ পিয়ারু বলেন, এসব মাছ মিয়ানমার থেকে ভারত হয়ে আসছে। তবে বেনাপোল ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বেনাপোল দিয়ে আসা ইলিশ ভারতীয়; মিয়ানমারের ইলিশ আসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এর মধ্যে গত ২২ জুলাই সাদা মাছের ঘোষণা দিয়ে ১২ কার্টনে প্রায় ৩৬০ কেজি ইলিশ আনার ঘটনায় বেনাপোল কাস্টমস মাছ জব্দ করে—যা দুই মাসের বৈধ আমদানির মাত্র শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ।
যশোরের বাজারে ১ কেজি ২০০-৩০০ গ্রামের দেশি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকায়, আর ১ কেজি ৩০০-৪০০ গ্রামের বিদেশি ইলিশ প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকায়—ব্যবধান প্রায় ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকা। বেনাপোল, শার্শা, বাগআঁচড়া ও নাভারণের বাজার হয়ে এই মাছ যশোর বড় বাজারের পদ্মা ফিস, গৌরব ফিস, মেসার্স তিতাস ফিস ও মেসার্স জামান ফিসসহ কয়েকটি আড়তে উঠছে। দেশি ইলিশ ব্যবসায়ী সত্যপদ, এরশাদ ও আলমগীর বলেন, বিদেশি ইলিশের কারণে দেশি ইলিশের বিক্রি কমেছে।
বেনাপোলের কাগজপুকুরের বাসিন্দা ওহেদুজ্জামান দেশি ভেবে মাছ কিনে খাওয়ার পর স্বাদ ও গন্ধে পার্থক্য টের পান; দেখতে প্রায় একই হওয়ায় সাধারণ ক্রেতার পক্ষে আলাদা করা কঠিন বলে জানান তিনি। যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, আমদানি করা মাছ দেশি বলে বিক্রি করা মৎস্য আইনের আওতায় পড়ে না। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যশোরের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান বলেন, আমদানি করা ইলিশ ঘোষণা দিয়ে বিক্রি করতে হবে এবং ভারত থেকে আনা মাছকে স্পষ্টভাবে ভারতীয় ইলিশ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে; বাজার পরিদর্শন ও প্রয়োজনে অভিযান চালানো হবে।
ভরা মৌসুমে দেশি ইলিশের অর্ধেকেরও কম দামে বিদেশি ইলিশ বাজারে ঢোকায় জেলে ও আড়তদারের আয়ে চাপ পড়ছে, আর উৎস লুকিয়ে বিক্রি হলে ক্রেতার আস্থাও ভাঙছে—দুই দিক থেকেই লেবেলিং জরুরি হয়ে উঠেছে।
সূত্র: বাংলানিউজ২৪





মন্তব্য
(০)