সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ৯ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৫°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৯৩%বাতাস ৪ কিমি/ঘ

চাল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ

২০১৭-১৮ অর্থবছরের হিসাবে চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার পরেই বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম চাল উৎপাদক বাংলাদেশ, উৎপাদন ৩ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার টন। স্বাধীনতার পর উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণের বেশি। আউশ, আমন, বোরো আর হাওরের ধান মিলে কীভাবে এল এই অর্জন।

চাল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ
ফসল

পুরোনো একটা রসিকতা আছে। প্রশ্নটা এমন: পৃথিবীজুড়ে কবে দুর্ভিক্ষ হবে? উত্তর আসে চটজলদি: যেদিন চীনের মানুষ কাঠি ছেড়ে হাত দিয়ে ভাত খাওয়া শুরু করবে। রসিকতাটার জন্ম সম্ভবত চীনের বিপুল জনসংখ্যা থেকে। তবে দেশটিতে যেমন মুখ বেশি, তেমনি ধানের খেতও বিশাল। বছরের পর বছর ধরে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি চাল উৎপাদন করে চীন, আর সেই আসন তারা ধরে রেখেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের হিসাবে দেশটি উৎপাদন করেছে ১৪ কোটি ৮৮ লাখ ৭৩ হাজার টন চাল। সেই একই তালিকায় চতুর্থ স্থানে আছে আমাদের বাংলাদেশ, যে দেশটির আয়তন চীনের একটি প্রদেশের চেয়েও ছোট।

চীনের ঠিক পরেই আছে প্রতিবেশী ভারত। জনসংখ্যার দিক থেকে দেশটি তখন বিশ্বে দ্বিতীয়, চাল উৎপাদনেও দ্বিতীয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ভারতের চাল উৎপাদন ছিল ১১ কোটি ২৯ লাখ ১০ হাজার টন। চীন আর ভারত মিলে যে পরিমাণ চাল ফলায়, তা বাকি শীর্ষ আটটি দেশের মোট উৎপাদনের চেয়েও অনেক বেশি। এশিয়ার এই দুই দেশ মূলত নিজেদের বিশাল জনগোষ্ঠীর মুখে ভাত তুলে দিতেই এত ধান চাষ করে।

তালিকার তৃতীয় দেশটিও জনসংখ্যাবহুল, ইন্দোনেশিয়া। হাজারো দ্বীপের এই দেশ জনসংখ্যায় চীন ও ভারতের চেয়ে অনেক পিছিয়ে, চাল উৎপাদনেও। ইন্দোনেশিয়ার মোট উৎপাদন ওই দুই দেশের তুলনায় বেশ কম, ৩ কোটি ৭০ লাখ টন। এরপরেই আসে বাংলাদেশের নাম: উৎপাদন ৩ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার টন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ তখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ।

সংখ্যাটা শুধু একটা অবস্থান নয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক আগে যে দেশ স্বাধীন হয়েছিল ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ আর খাদ্য সাহায্যের ওপর নির্ভরতা নিয়ে, সেই দেশ আজ ধান উৎপাদনে বিশ্বের প্রথম সারিতে। দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর দেশে যে পরিমাণ চাল উৎপাদন হতো, এখন হয় তার তিন গুণেরও বেশি। চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে।

স্বাধীনতার পর তিন গুণ: কীভাবে সম্ভব হলো


১৯৭১-৭২ সালে দেশের চাল উৎপাদন ছিল মোটামুটি এক কোটি টনের ঘরে। তখন জনসংখ্যা ছিল আজকের অর্ধেকের মতো, তবু খাদ্যঘাটতি ছিল নিত্যসঙ্গী। বেশির ভাগ জমিতে চাষ হতো দেশি জাতের ধান। সেসব জাত স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় হলেও ফলন ছিল কম, আর একটি জমিতে বছরে একবারের বেশি ধান তোলা ছিল কঠিন।

পরিবর্তনের বড় একটি ভিত্তি তৈরি হয় ১৯৭০ সালের ১ অক্টোবর, যখন গাজীপুরে যাত্রা শুরু করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। স্বাধীনতার পর সংসদের আইনে এর নাম হয় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, সংক্ষেপে ব্রি। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত একশোটির বেশি উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। প্রথম দিকের বিআর১, বিআর৩ এর মতো জাত সারা দেশে কয়েক হাজার দেশি জাতের জায়গা নিয়েছিল। পরে এসেছে এমন সব জাত, যেগুলো লবণাক্ততা সইতে পারে, কয়েক দিন পানির নিচে ডুবে থেকেও টিকে থাকে, কিংবা খরার মধ্যেও ফলন দেয়। যেমন ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২ বন্যাপ্রবণ এলাকায় কৃষকের কাছে পরিচিত হয়েছে জলমগ্নতা সহনশীল জাত হিসেবে।

উচ্চফলনশীল জাত মানে এমন ধান, যা একই জমিতে একই পরিশ্রমে দেশি জাতের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দানা দেয়। তবে এসব জাত ঠিকমতো ফলন দিতে চায় নিয়মিত সেচ আর সুষম সার। তাই ধানের জাতের পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে অগভীর নলকূপ, পাওয়ার পাম্প আর সারের দোকান। একসময় যে শুকনো মৌসুমে মাঠ পড়ে থাকত, সেচের পানি পেয়ে সেই মাঠে সবুজ বোরো ধানের চারা দুলতে শুরু করে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠকর্মীদের পরামর্শ, টেলিভিশন ও বেতারের কৃষি অনুষ্ঠান, কৃষি ব্যাংকের ঋণ আর যন্ত্রের ব্যবহার। তবে সবকিছুর কেন্দ্রে আছেন দেশের কোটি কৃষক, যাঁরা নতুন জাত নিয়ে প্রথমে দ্বিধায় ভুগলেও ফলন দেখে ধীরে ধীরে তা গ্রহণ করেছেন। তাঁদের ঘামেই জমি না বাড়লেও উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণ।

আউশ, আমন আর বোরো: এক জমিতে তিনবার


বাংলাদেশে ধান চাষ হয় তিনটি মৌসুমে, আর প্রতিটি মৌসুমের ধানের আলাদা নাম। আউশ ধান সাধারণত বোনা হয় চৈত্র-বৈশাখে, মানে মার্চ-এপ্রিলে, প্রাক-বর্ষার বৃষ্টিকে কাজে লাগিয়ে; কাটা হয় গ্রীষ্মের শেষে। আমন হলো বর্ষার ধান: জুলাই-আগস্টে রোপণ, আর নভেম্বর-ডিসেম্বরে হেমন্তের সোনালি মাঠে কাটা। নবান্নের উৎসব এই আমন ঘিরেই। বোরো ধান লাগানো হয় শীতে, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে, আর কাটা হয় এপ্রিল থেকে জুনে। বৃষ্টি না থাকায় বোরো পুরোপুরি সেচনির্ভর।

দেখা গেছে, দেশের উৎপাদিত চালের ৫৫ ভাগই আসে বোরো ধান থেকে, বাকিটা আসে আউশ ও আমন থেকে। অর্থাৎ যে মৌসুমটি একসময় সবচেয়ে অবহেলিত ছিল, সেই শুকনো মৌসুমই এখন দেশের ভাতের থালা ভরাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। সেচ আর উচ্চফলনশীল জাতের জোড় মেলাতেই এটা সম্ভব হয়েছে।

এ দেশে অনেক জায়গায় বছরে একই জমিতে তিনবার ধান উৎপাদন করা হয়। একটি ফসল কাটার পরপরই জমি চাষ দিয়ে পরের ফসলের চারা রোপণ, এভাবে বারো মাসে তিনটি ফসল। কৃষকের জন্য এটি যেমন বাড়তি আয়ের সুযোগ, তেমনি মাটির ওপরও বাড়তি চাপ। তাই কৃষি বিজ্ঞানীরা জৈব সার, ফসলের অবশিষ্টাংশ জমিতে ফেরত দেওয়া এবং মাঝে মাঝে ডাল বা সরিষার মতো ভিন্ন ফসল চাষের পরামর্শ দেন, যাতে মাটির উর্বরতা টিকে থাকে।

তিন মৌসুমের মধ্যে আউশের গুরুত্ব আলাদা করে বলার মতো। বোরোর বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে একসময় আউশের জমি কমে গিয়েছিল। কিন্তু আউশ ধান মূলত বৃষ্টির পানিতে হয়, তাই এতে সেচের খরচ আর ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ দুটোই কম। এ কারণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিভিন্ন বছরে আউশ চাষে কৃষকদের বিনা মূল্যে বীজ ও সার দিয়ে প্রণোদনা দিয়েছে, যাতে আবার আউশের আবাদ বাড়ে।

অন্যদিকে গত কয়েক দশকে মাঠে জায়গা করে নিয়েছে হাইব্রিড ধান। হাইব্রিড বা সংকর জাত তৈরি হয় দুটি ভিন্ন মাতৃ ও পিতৃ সারির মিলনে, আর প্রথম প্রজন্মে এর ফলন সাধারণ উচ্চফলনশীল জাতের চেয়েও বেশি হতে পারে। তবে এর বীজ প্রতি মৌসুমে নতুন করে কিনতে হয়, কারণ ঘরে রাখা বীজ থেকে একই ফলন পাওয়া যায় না। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটও নিজস্ব হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন করেছে, আর বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলো বাজারে নানা হাইব্রিড বীজ বিক্রি করছে।

হাওরের বিস্তীর্ণ জলাভূমিতেও ধান


দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা বছরের প্রায় অর্ধেক সময় পানির নিচে থাকে। বর্ষায় হাওর হয়ে ওঠে সাগরের মতো, দিগন্তজোড়া জলরাশি। শুকনো মৌসুমে পানি নেমে গেলে সেই জমি জেগে ওঠে উর্বর পলি নিয়ে, আর তখনই শুরু হয় বোরো ধানের চাষ। হাওরের অনেক কৃষক পরিবারের সারা বছরের খোরাক আর আয় নির্ভর করে এই একটি ফসলের ওপর।

হাওর অঞ্চল ছড়িয়ে আছে সাতটি জেলায়: সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া। গামলার মতো নিচু এই জলাভূমিগুলোর কোনো কোনোটি দেশজুড়ে পরিচিত, যেমন সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর। এখানে ধানের পাশাপাশি আছে মাছ, পরিযায়ী পাখি আর নৌকার মাঝিদের জীবন। বর্ষায় মাছ ধরে সংসার চলে, আর শুকনো মৌসুমে ভরসা বোরো ধান।

একসময় হাওরের বড় অংশে ধান চাষ ছিল অনিশ্চিত। এখন সেখানেও উচ্চফলনশীল বোরো জাত, সময়মতো চারা রোপণ আর ধান কাটার যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে হাওর এলাকাতেও এখন চাল উৎপাদন হচ্ছে বড় পরিসরে। তবে ঝুঁকিও আছে। এপ্রিলের দিকে উজানের পাহাড়ি ঢল নামলে পাকা ধান তলিয়ে যেতে পারে। তাই হাওরের কৃষকের কাছে প্রতিটি মৌসুম একধরনের দৌড়: ঢল আসার আগেই ধান কেটে ঘরে তোলা। এই প্রতিবেদনের ছবিতেও দেখা যাচ্ছে সুনামগঞ্জের হাওরে ধান কাটার সেই ব্যস্ততা।

চাল উৎপাদনে শীর্ষ ১০ দেশ (২০১৭-১৮, হাজার মেট্রিক টন)


২০১৭-১৮ সালের হিসাবে চাল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দশটি দেশ ও তাদের উৎপাদন (হাজার মেট্রিক টনে) নিচে দেওয়া হলো:

  • চীন: ১৪৮,৮৭৩
  • ভারত: ১১২,৯১০
  • ইন্দোনেশিয়া: ৩৭,০০০
  • বাংলাদেশ: ৩২,৬৫০
  • ভিয়েতনাম: ২৮,৪৭১
  • থাইল্যান্ড: ২০,৩৭০
  • মিয়ানমার: ১৩,২০০
  • ফিলিপাইন: ১২,২৩৫
  • ব্রাজিল: ৮,২০৪
  • জাপান: ৭,৭৮৭

ধান আর চাল: সংখ্যাটা যেভাবে পড়তে হয়


তালিকার সংখ্যাগুলো পড়ার আগে একটা বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। মাঠ থেকে কৃষক যা ঘরে তোলেন, তা ধান: খোসাসহ দানা। সেই ধান সেদ্ধ, শুকানো আর চাতাল বা চালকলে ভাঙানোর পর পাওয়া যায় চাল। ভাঙানোর সময় খোসা আর কুঁড়া বাদ যায়, তাই এক মণ ধান থেকে মোটামুটি তিন ভাগের দুই ভাগ চাল মেলে। এই কারণে ধানের হিসাব আর চালের হিসাব কখনো এক হয় না।

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানেও এই পার্থক্য চোখে পড়ে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সাধারণত ধানের হিসাব প্রকাশ করে, আর যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ প্রকাশ করে ভাঙানো চালের হিসাব। ফলে একই বছরের জন্য দুই উৎসে দুই রকম সংখ্যা দেখা যেতে পারে, যদিও দেশগুলোর ক্রম মোটামুটি একই থাকে। এই প্রতিবেদনের তালিকাটি চালের হিসাবে, হাজার মেট্রিক টনে। অর্থবছর বা বিপণন বছর ধরে হিসাব করা হয় বলে কখনো একটি বছরের সঙ্গে পরের বছরের কিছু অংশও যুক্ত থাকে।

আরেকটি কথা মনে রাখা ভালো। বড় উৎপাদন মানেই বড় রপ্তানি নয়, আবার বড় উৎপাদক হলেও আমদানির প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। একটি দেশ কত চাল ফলায়, তার সঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই দেশে কত মানুষ ভাত খায় আর তারা মাথাপিছু কতটা খায়। বাংলাদেশের মতো ভাতপ্রধান দেশে চাহিদা বিশাল, তাই চতুর্থ বা তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক হয়েও দেশটি মূলত নিজের চাহিদা মেটাতেই সব ধান ব্যবহার করে।

তালিকার বাকি দেশগুলোর চিত্র


চাল উৎপাদনের শীর্ষ দশের বাকি দেশগুলো হচ্ছে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, ব্রাজিল ও জাপান। তালিকাটা খেয়াল করলে একটা বিষয় চোখে পড়ে: দশটির মধ্যে আটটিই এশিয়ার দেশ। ধান মূলত এশিয়ার মৌসুমি বায়ু, নদী আর বদ্বীপের ফসল। বর্ষার পানি, সমতল পলিমাটি আর শ্রমঘন কৃষির ঐতিহ্য এই অঞ্চলকে ধানের ঘর বানিয়েছে।

ভিয়েতনাম আর থাইল্যান্ডের কথা আলাদা করে বলতে হয়। উৎপাদনে এরা বাংলাদেশের পেছনে থাকলেও চাল রপ্তানিতে এরা বিশ্বের প্রধান দেশগুলোর মধ্যে, ভারতের সঙ্গে একই কাতারে। কারণ, তাদের জনসংখ্যা তুলনামূলক কম, ফলে উৎপাদনের বড় অংশ বিদেশে বিক্রি করা যায়। ভিয়েতনামের মেকং বদ্বীপ আর থাইল্যান্ডের মধ্যাঞ্চলের সমভূমি এই দুই দেশের ধানের প্রধান ভান্ডার।

মিয়ানমার একসময় বিশ্বের বড় চাল রপ্তানিকারক ছিল; ইরাবতী নদীর বদ্বীপ দেশটির ধানের প্রাণকেন্দ্র। ফিলিপাইন উৎপাদনে শীর্ষ দশে থাকলেও দেশটির চাহিদা এত বেশি যে বাইরে থেকে বিপুল চাল কিনতে হয়; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি বিশ্বের বড় চাল আমদানিকারকদের একটি। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল তালিকায় একমাত্র অ-এশীয় দেশ, যেখানে ভাত আর ডাল জাতীয় খাবারের অংশ। আর জাপানে ধান চাষ হয় উচ্চ প্রযুক্তি ও যন্ত্রের সাহায্যে, অল্প জমিতে উঁচু মানের চাল।

এই তুলনায় বাংলাদেশের জায়গাটা বিশেষ। আয়তনে তালিকার প্রায় সব দেশের চেয়ে ছোট, অথচ জনঘনত্বে অনেক এগিয়ে। প্রতি বছর নগরায়ণ, রাস্তা, ঘরবাড়ি আর কলকারখানার জন্য কিছু আবাদি জমি কমছে। এমন সীমিত জমিতে চতুর্থ স্থান ধরে রাখা মানে প্রতি শতাংশ জমি থেকে সর্বোচ্চ ফসল তুলে আনা। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যে দেখা যায়, দেশের মোট ফসলি জমির বড় অংশেই ধান চাষ হয়; ভাত যে এ দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য, তারই প্রতিফলন এটি।

সাম্প্রতিক হিসাব: চার কোটি টনের মাইলফলক


২০১৭-১৮ সালের পর উৎপাদন আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ১০ লাখ টন। ইতিহাসে এই প্রথম দেশের চাল উৎপাদন চার কোটি টন ছাড়িয়েছে। ওই বছর শুধু বোরো মৌসুম থেকেই এসেছে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টন চাল, যা আবারও দেখিয়ে দেয় শুকনো মৌসুমের ধান কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে কোনো চাল আমদানি হয়নি, যেখানে আগের অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ১০ লাখ টনের বেশি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান ওয়াইস কবির এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছেন, কৃষকেরা আধুনিক জাতের দিকে ঝুঁকেছেন; তাঁরা আরও বেশি উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ধান চাষ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) সাম্প্রতিক হিসাবে বাংলাদেশ এখন ইন্দোনেশিয়াকেও ছাড়িয়ে বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদক।

তবে এক বছরের রেকর্ড মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়। কোনো বছর বন্যা, কোনো বছর আগাম ঢল বা ঘূর্ণিঝড় উৎপাদনে বড় ধাক্কা দেয়, তখন আবার আমদানির প্রয়োজন পড়ে। তাই বিশেষজ্ঞরা উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মজুত, বিপণন আর কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

কৃষকের উঠান থেকে সরকারি গুদাম


এত চাল যাঁরা ফলান, তাঁরা কারা? বিবিএসের কৃষি শুমারি ২০১৯ অনুযায়ী দেশে কৃষিনির্ভর খানা বা পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ, যা ২০০৮ সালের শুমারির প্রায় দেড় কোটির চেয়ে বেশি। এঁদের বড় অংশই ছোট ও প্রান্তিক কৃষক, যাঁদের জমি অল্প, অনেকে আবার অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। দেশের চাল উৎপাদনের রেকর্ড আসলে এই কোটি পরিবারের ছোট ছোট খেতের যোগফল।

ফসল তোলার পর কৃষকের প্রথম চিন্তা দাম। ধান কাটার মৌসুমে বাজারে একসঙ্গে প্রচুর ধান আসে, তখন দাম পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই চাপ কমাতে সরকার প্রতি বোরো ও আমন মৌসুমে নির্ধারিত দামে কৃষকের কাছ থেকে ধান এবং চালকল মালিকদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করে। এই মজুত পরে খোলাবাজারে বিক্রি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও দুর্যোগের সময় ত্রাণে ব্যবহার করা হয়, যাতে বাজারে দাম হঠাৎ লাফিয়ে না ওঠে।

তবে সরকারি সংগ্রহ মোট উৎপাদনের তুলনায় ছোট অংশ, তাই বেশির ভাগ কৃষককে স্থানীয় ফড়িয়া, আড়তদার বা চালকলের কাছেই ধান বিক্রি করতে হয়। কৃষকের ঘরে ধান শুকানো ও রাখার জায়গার অভাবও বড় সমস্যা; ভেজা ধান বেশি দিন রাখা যায় না বলে অনেকে কম দামেই দ্রুত বিক্রি করে দেন। কৃষি অর্থনীতিবিদেরা তাই গ্রামে শুকানো ও সংরক্ষণের সুবিধা বাড়ানোর কথা বলে আসছেন।

সামনের চ্যালেঞ্জ: কম জমি, বদলে যাওয়া আবহাওয়া


জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের ধানচাষের সামনে নতুন প্রশ্ন দাঁড় করাচ্ছে। উপকূলে লবণাক্ততা বাড়ছে, উত্তরাঞ্চলে কোনো কোনো বছর খরা দেখা দেয়, হাওরে আগাম ঢল আর নদীতীরে হঠাৎ বন্যা ফসল তলিয়ে দেয়। এসব ঝুঁকি মাথায় রেখে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট লবণসহিষ্ণু, খরাসহিষ্ণু, জলমগ্নতাসহিষ্ণু ও স্বল্প জীবনকালের জাত উদ্ভাবন করছে, যাতে প্রতিকূল সময়েও কৃষক কিছু ফসল ঘরে তুলতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটির দেশের বিভিন্ন কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো স্থানীয় সমস্যা নিয়ে কাজ করে।

গাজীপুরের প্রধান কার্যালয়ের বাইরে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ১৭টি আঞ্চলিক কার্যালয় আছে কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, রাজশাহী, রংপুর, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলায়। উপকূলের লবণাক্ত মাটি, উত্তরের খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চল কিংবা পূর্বের হাওর, প্রতিটি অঞ্চলের সমস্যা আলাদা, তাই সমাধানও খোঁজা হয় সেই মাটিতে দাঁড়িয়েই। নতুন কোনো জাত কৃষকের হাতে পৌঁছানোর আগে কয়েক বছর ধরে এসব কেন্দ্রে ও কৃষকের মাঠে তার পরীক্ষা চলে।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো সেচের পানি। বোরো ধান ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অনেকটা নির্ভরশীল, আর কিছু এলাকায় পানির স্তর নেমে যাওয়ার উদ্বেগ আছে। কৃষি বিজ্ঞানীরা তাই পর্যায়ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানোর মতো পানি সাশ্রয়ী পদ্ধতির কথা বলেন, যাতে ফলন না কমিয়েও কম পানিতে বোরো চাষ করা যায়।

শ্রমিকসংকটও এখন বাস্তবতা। ধান কাটার মৌসুমে গ্রামে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, মজুরিও বাড়ে। এ কারণে কম্বাইন হারভেস্টার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। সরকারের ভর্তুকিতে কৃষকেরা এসব যন্ত্র কিনতে পারছেন, যদিও ছোট ও খণ্ডিত জমিতে বড় যন্ত্র চালানো সবসময় সুবিধাজনক নয়।

পুষ্টির প্রশ্নও সামনে আসছে। শুধু বেশি চাল নয়, পুষ্টিকর চালও দরকার। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট জিংকসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, আর আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে ভিটামিন এ সমৃদ্ধ গোল্ডেন রাইস নিয়ে গবেষণা করছে। সঙ্গে জিন সম্পাদনার মতো আধুনিক পদ্ধতিতে রোগ প্রতিরোধী ও লবণসহিষ্ণু জাত তৈরির কাজও চলছে।

থালার প্রতিটি ভাতের পেছনে কৃষকের শ্রম


রসিকতার সেই চীন আজও শীর্ষে, আর বাংলাদেশ তার কয়েক ধাপ পেছনে দাঁড়িয়ে আছে গর্বের সঙ্গে। যে দেশ একসময় খাদ্য সাহায্যের জাহাজের অপেক্ষায় থাকত, সেই দেশ এখন বিশ্বের বড় চাল উৎপাদকদের একটি। এই অর্জন কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা নীতির নয়; এটি গবেষকের পরীক্ষাগার, সম্প্রসারণকর্মীর মাঠ পরিদর্শন আর সবচেয়ে বেশি কৃষকের কাদামাখা হাতের যৌথ ফসল।

বাঙালির জীবনে ধান শুধু একটা ফসল নয়। 'মাছে-ভাতে বাঙালি' কথাটা এমনি এমনি আসেনি। জন্ম থেকে বিয়ে, নবান্ন থেকে পিঠা-পুলির উৎসব, সবখানেই চাল আর ধানের উপস্থিতি। কালিজিরা, চিনিগুড়ার মতো দেশি সুগন্ধি ধান আজও পোলাও আর পায়েসের জন্য কদর পায়, যদিও ফলন কম বলে এসব জাতের আবাদ সীমিত। উচ্চফলনশীল জাত পেট ভরানোর লড়াই জিতিয়েছে, আর দেশি জাতগুলো ধরে রেখেছে স্বাদ আর ঐতিহ্য। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের জিন ব্যাংকে হাজারো দেশি জাতের নমুনা সংরক্ষিত আছে, যাতে ভবিষ্যতের গবেষণায় সেগুলোর গুণ কাজে লাগানো যায়।

পরের বার যখন থালায় গরম ভাত আসবে, তখন মনে পড়তে পারে সুনামগঞ্জের হাওরে ঢলের আগে ধান কাটার সেই তাড়া, কিংবা শীতের ভোরে বোরো খেতে সেচের পানি দেওয়ার দৃশ্য। তিন মৌসুম, তিন রকম ঝুঁকি আর কোটি মানুষের শ্রম মিলে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের এই চতুর্থ স্থান, যা এখন আরও এক ধাপ এগিয়েছে।

ছবি: সুনামগঞ্জের হাওরে ধান কাটা, Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

ফসল

সম্পর্কিত খবর

পরিবেশ

সুন্দরবনের ডিমের চরে আপনাআপনি জন্মানো 'ধানসী': পাখির খাবার, নাকি মানুষেরও?

সাগরমোহনার লবণাক্ত ডিমের চরে প্রায় চার কিলোমিটারজুড়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ধানের মতো গাছ নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ নিয়েছে বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর; কেউ কেউ বলছেন, এটি স্পার্টিনা জাতের বুনো ঘাসও হতে পারে।

বাংলা ট্রিবিউন৯ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

চীনের পশুখাদ্যে ভুট্টার ভাগ ৪৭% থেকে নেমে ২৯%, জায়গা নিচ্ছে গম, যব ও সরগাম

বেইজিংয়ে ইউএসডিএর দপ্তর জানিয়েছে, শূকর খামারের লোকসানে সস্তা খাদ্যের খোঁজে চীনের ফিড মিলগুলো ভুট্টার বদলে গম, যব ও সরগাম ব্যবহার করছে।

All Ag News৯ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফসল

ভারতের চিনি উৎপাদনের পূর্বাভাস ১৪% কমিয়ে ২ কোটি ৯৫ লাখ টন করল ইউএসডিএ

নয়াদিল্লিতে ইউএসডিএর দপ্তর বলছে, ২০২৬-২৭ মৌসুমে ভারতে চিনি হবে ২ কোটি ৯৫ লাখ টন, আগের পূর্বাভাস ছিল ৩ কোটি ৩৬ লাখ; বৃষ্টির ঘাটতি, জলাবদ্ধতা ও লাল মাজরা পোকায় আখের ফলন ও চিনি আহরণ কমবে।

Rural Voice৯ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)