সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮+০.০%আদা - আমদানিকৃত১৬৭+০.০%আদা - দেশী১৫৪+০.০%আমন চাল - মাঝারি৫৬+০.০%আমন চাল - মোটা৪৮+০.০%আমন চাল - সরু৭২+০.০%আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২+০.০%কাঁচা মরিচ২১৮+০.০%খামারের মুরগী১৬২+০.০%খাসী৯০০+০.০%চিনি (দেশী)১৩২+০.০%ছোলা - গোটা৮৫+০.০%ডিম ফার্ম - লাল৪৭+০.০%পেঁয়াজ - দেশী৬০+০.০%বোরো চাল - মাঝারি৫৫+০.০%বোরো চাল - মোটা৪৭+০.০%বোরো চাল - সরু৬৬+০.০%মাংসঃ– গরু৭২৯+০.০%মুগ ডাল১২২+০.০%রসুন - আমদানিকৃত১৯২+০.০%রসুন - দেশী১৭৩+০.০%সয়াবিন তেল১৬৩+০.০%
হালনাগাদ ৮ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা৩০°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৫৪%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

হিমসাগর-ল্যাংড়াকে ছাড়িয়ে চাষ ও রপ্তানিতে শীর্ষে এখন আম্রপালি আম

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফজলি, হিমসাগর, ল্যাংড়া ও গোপালভোগকে পেছনে ফেলে বারি উদ্ভাবিত আম্রপালি (বারি আম-৩) এখন দেশে সবচেয়ে বেশি জমিতে চাষ হচ্ছে এবং রপ্তানিতেও শীর্ষে। ২০২৬ সালের জুনের এই প্রতিবেদনে জাতটির উত্থানের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

হিমসাগর-ল্যাংড়াকে ছাড়িয়ে চাষ ও রপ্তানিতে শীর্ষে এখন আম্রপালি আম
ফল

কয়েক বছর আগেও দেশের মানুষের কাছে আমের সেরা জাত বলতে বোঝানো হতো ফজলি, হিমসাগর, ল্যাংড়া কিংবা গোপালভোগকে, যেগুলো মূলত রাজশাহী ও পদ্মা-তীরবর্তী অঞ্চলের পুরোনো অভিজাত জাত। কিন্তু সেই হিসাব এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত আম্রপালি, অর্থাৎ বারি আম-৩, এখন দেশে একক জাত হিসেবে সবচেয়ে বেশি জমিতে চাষ হচ্ছে এবং বিদেশে পাঠানো আমের সবচেয়ে বড় অংশও এই জাতের। ২০২৬ সালের জুনের শেষে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, মাত্র তিন দশক আগে বাজারে আসা একটি হাইব্রিড জাত কীভাবে আবাদ, রপ্তানি ও জনপ্রিয়তায় শীর্ষে উঠে এসেছে এবং এ নিয়ে চাষি ও গবেষকেরা কী বলছেন।

যেভাবে সব হিসাব ওলট-পালট করল আম্রপালি


গাজীপুরের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত এ বারি আম-৩ জাতটি ১৯৯৬ সালে চাষের জন্য সরবরাহ করা হয়। অর্থাৎ অবমুক্ত হওয়ার পর প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি ধীরে ধীরে চাষিদের মধ্যে পরিচিত হয়। ২০০৯-১০ মৌসুম থেকে এটি আম্রপালি নামে বাজারে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে, আর তার পরের মাত্র দেড় দশকের মধ্যেই দেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া জাতে পরিণত হয়। উৎপাদন ও রপ্তানিতেও সর্বোচ্চ হিস্যা এখন এই আমের; ডিএইর তথ্য বলছে, বাংলাদেশ থেকে যত আম রপ্তানি হয়, তার প্রায় ৮০ শতাংশই আম্রপালি জাতের।

এক প্রজন্ম আগেও ফজলি, হিমসাগর, ল্যাংড়া ও গোপালভোগের মতো জাতের পাশে আম্রপালি ছিল নবাগত। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে কলমের চারা থেকে গড়ে ওঠা ওই অভিজাত জাতগুলোই দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের আমের পরিচয় বহন করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রতিবেদনটি বলছে, আম্রপালি পুরোনো সব হিসাব ওলট-পালট করে দিয়ে আবাদ, রপ্তানি ও জনপ্রিয়তায় একসঙ্গে সেরার জায়গা দখল করেছে।

পাকা হিমসাগর আম; আবাদি জমির হিসাবে আম্রপালি যে পুরোনো অভিজাত জাতগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে, হিমসাগর তার অন্যতম। ছবিটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তোলা। ছবি: Salil Kumar Mukherjee / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
পাকা হিমসাগর আম; আবাদি জমির হিসাবে আম্রপালি যে পুরোনো অভিজাত জাতগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে, হিমসাগর তার অন্যতম। ছবিটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তোলা। ছবি: Salil Kumar Mukherjee / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

আমের জমির এক-চতুর্থাংশই আম্রপালি


প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ডিএইর সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, দেশে উৎপাদিত প্রধান জাতগুলোর মধ্যে আম্রপালি মোট জমির প্রায় এক-চতুর্থাংশ একাই দখল করেছে। সর্বশেষ যে বছরের হিসাব দেওয়া হয়েছে, সেই ২০২৫ সালে দেশে দুই লাখ ৭ হাজার (২,০৭,০০০) হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়, যার মধ্যে বাণিজ্যিক চাষাবাদ হয়েছে এক লাখ ৩৯ হাজার ৪৬৬ (১,৩৯,৪৬৬) হেক্টর জমিতে। একক জাত হিসেবে সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ৩৬ হাজার ৪২৫ (৩৬,৪২৫) হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে আম্রপালি।

একই তথ্য অনুযায়ী ওই বছর অন্য জনপ্রিয় জাতগুলো আম্রপালির অনেকটাই পেছনে ছিল: আশ্বিনা চাষ হয়েছে ১৩ হাজার ১২১ হেক্টর, ফজলি ১১ হাজার ৭০২ হেক্টর, ল্যাংড়া ১১ হাজার ৬১৫ হেক্টর, খিরসাপাত ৮ হাজার ৮২৮ হেক্টর, গোপালভোগ ৭ হাজার ৪ হেক্টর এবং হিমসাগর চাষ হয়েছে ৪ হাজার ৯৯৮ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী ল্যাংড়া, ফজলি বা খিরসাপাতের চেয়ে বহুগুণ বেশি জমিতে এখন আম্রপালির চাষ হচ্ছে। এমনকি কাটিমন, মল্লিকা, বানানা ম্যাঙ্গো ও বারি আম-৪-এর মতো নতুন ও আকর্ষণীয় জাতের তুলনায়ও আম্রপালির বিস্তৃতি কয়েকগুণ বেশি। গবেষকদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ৭২টিরও বেশি জাতের আম আছে, যার মধ্যে ১৬ থেকে ১৮টি জাত বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হয়। এসব সংখ্যা ডিএইর নিজস্ব তথ্য এবং এখানে সেভাবেই উপস্থাপন করা হলো, আলাদা কোনো হিসাব কষে নয়।

বাংলাদেশে ধানখেতের পাশে একটি আমবাগান; গাছ ছোট হওয়ায় আম্রপালির মতো জাতে প্রতি হেক্টরে বেশি গাছ রোপণ করা যায়। ছবি: SyedAminul / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশে ধানখেতের পাশে একটি আমবাগান; গাছ ছোট হওয়ায় আম্রপালির মতো জাতে প্রতি হেক্টরে বেশি গাছ রোপণ করা যায়। ছবি: SyedAminul / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

চাষিরা কেন এই আম বেছে নিচ্ছেন


চাষি ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আম্রপালি গাছের গঠন ছোট হওয়ায় প্রতি হেক্টরে বেশি সংখ্যক গাছ রোপণ করা যায়। এই জাতের আম নিয়মিত ফলন দেয় এবং এর রোগবালাই সহ্য করার ক্ষমতা অন্য জাতের চেয়ে তুলনামূলক বেশি। পাশাপাশি এর সংরক্ষণকালও বেশি, পাকা আম অপেক্ষাকৃত বেশিদিন ভালো থাকে। তীব্র মিষ্টি স্বাদ ও চমৎকার সুবাসের কারণে বাজারে এর চাহিদা তুঙ্গে, ফলে চাষিরা এ আম চাষে বেশি লাভবান হচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বারির উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘মূলত তিনটি কারণে এ আম এখন সবচেয়ে এগিয়ে। এর মধ্যে প্রথমটি জনপ্রিয়তা। এ আম খুব দ্রুত সময়ে জনপ্রিয় হয়েছে মানুষের মধ্যে। দ্বিতীয়ত, এটি দীর্ঘদিন স্বাভাবিকভাবে ভালো রাখা যায়, সহজে পচে না। এমনিতেই ১৩-১৪ দিন ভালো থাকে।’

তৃতীয় কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন আমের মিষ্টতা। তাঁর ভাষ্যমতে, আম্রপালির মিষ্টির মাত্রা প্রায় ২৬ শতাংশ, যা সব আমের মধ্যে সর্বোচ্চ। মিষ্টির এই মাত্রা ও স্বাদ-সংক্রান্ত মূল্যায়ন এখানে ওই বিজ্ঞানীর বক্তব্য হিসেবেই তুলে ধরা হলো।

নওগাঁর সাপাহার উপজেলার কৃষক মুনির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের এখানে আমের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয় আম্রপালি জাতের মাধ্যমে। এ আম চাষে ভালো লাভ হয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। গাছ ছোট বলে অল্প জায়গায় ভালো ফলন পাওয়া যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘জনপ্রিয়তার কারণে এ আমের দামও ভালো থাকে প্রতি বছর। আম্রপালি একটি হাইব্রিড জাত, যা রোপণের দ্বিতীয় বছর থেকেই ফল পাওয়া যায়।’

আম্রপালি আসলে কোন জাত


আম্রপালির উৎপত্তি বাংলাদেশে নয়। বিশ্বকোষীয় তথ্য অনুযায়ী, ভারতের দিল্লিতে ভারতীয় কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইএআরআই) বিজ্ঞানী ড. পীযূষ কান্তি মজুমদার এই জাতটি উদ্ভাবন করেন এবং ১৯৭১ সালে এটি অবমুক্ত করা হয়। এটি ‘দশেরি’ ও ‘নীলম’ নামের দুটি জাতের সংকর, অর্থাৎ একটি হাইব্রিড জাত। আম্রপালি গাছ বামন প্রকৃতির ও নিয়মিত ফলনশীল, থোকায় থোকায় ছোট আকারের ফল ধরে। এর শাঁস গাঢ় কমলা-লাল রঙের এবং এতে বিটা-ক্যারোটিনের পরিমাণ অন্য অনেক বাণিজ্যিক জাতের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।

এই বৈশিষ্ট্যগুলোই চাষি ও গবেষকদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। গাছ বামন হওয়ায় অল্প জায়গায় বেশি গাছ লাগিয়ে ঘন বাগান করা যায়, আর নিয়মিত ফলনের গুণ থাকায় প্রায় প্রতি বছরই ফল পাওয়া যায়, যা বড় আকারের ঐতিহ্যবাহী গাছের তুলনায় চাষিদের জন্য সুবিধাজনক। অনেক পুরোনো জাত ‘অল্টারনেট বেয়ারিং’, অর্থাৎ এক বছর বেশি ও পরের বছর কম ফল দেওয়ার প্রবণতায় ভোগে, যেখানে নিয়মিত ফলনশীল জাত চাষিকে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল আয়ের সুযোগ দেয়। বাংলাদেশে এই জাতটিই বারি আম-৩ নামে ১৯৯৬ সালে অবমুক্ত করা হয় এবং পরে বাজারে আম্রপালি নামে পরিচিতি পায়।

হাইব্রিড বা সংকর জাত বলতে দুটি ভিন্ন জাতের মধ্যে পরাগায়ন ঘটিয়ে তৈরি নতুন জাতকে বোঝায়, যেখানে মূল জাত দুটির কাঙ্ক্ষিত গুণ একত্র করার চেষ্টা করা হয়। আম্রপালির ক্ষেত্রে দশেরি ও নীলমের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে একটি বামন, নিয়মিত ফলনশীল ও মিষ্টি স্বাদের জাত। বাংলাদেশে বারি আম-৩সহ বারি উদ্ভাবিত আমের একাধিক জাত রয়েছে, যার মধ্যে বারি আম-৪-এর মতো পরবর্তী জাতও বাজারে এসেছে; তবে প্রতিবেদন অনুযায়ী আবাদি জমির বিস্তৃতিতে আম্রপালিই এখন অনেক এগিয়ে।

জাতটির পেছনের প্রতিষ্ঠান বারি


বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যা ধান, পাট, আখ ও চা ছাড়া বাকি সব ফসল নিয়ে গবেষণা করে। প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু ১৯০৮ সালে ঢাকায় ‘এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি, বেঙ্গল’ হিসেবে, আর ১৯৭৬ সালে এটি বারিতে রূপান্তরিত হয়। এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় গাজীপুরের জয়দেবপুরে, যার আয়তন প্রায় ১৬৫ হেক্টর।

বাংলাপিডিয়া জানায়, বারির রয়েছে ছয়টি আঞ্চলিক কেন্দ্র ও ২৪টি উপকেন্দ্র এবং কন্দাল ফসল, গম, উদ্যানতত্ত্ব, ডাল, তেলবীজ ও মসলা, এই ছয়টি ফসলভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্র। এই কেন্দ্রগুলো মিলিয়ে ১০০টিরও বেশি ফসল নিয়ে কাজ হয় এবং জাত উন্নয়ন ও উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ১৭২টি উন্নত জাত অবমুক্ত করেছে। বারি আম-৩ (আম্রপালি) থেকে শুরু করে বারি আমের নানা জাত উদ্ভাবিত হয়েছে এই উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র থেকেই, যেখানে কাজ করেন প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিজ্ঞানী ড. মো. শরফ উদ্দিন।

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বারির গবেষণা কার্যক্রম কৃষিতত্ত্ব, মৃত্তিকাবিজ্ঞান, কীটতত্ত্ব, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব, কৃষি অর্থনীতি, খামার যন্ত্রপাতি, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, উদ্ভিদ প্রজনন এবং ফসল-পরবর্তী প্রযুক্তিসহ নানা বিভাগে বিভক্ত। জাত উন্নয়ন, রোগ ও পোকা দমন এবং সংরক্ষণ-প্রযুক্তি নিয়ে এই গবেষণাই আম্রপালির মতো নিয়মিত ফলনশীল ও তুলনামূলক সহনশীল জাত চাষিদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয় একটি ১২ সদস্যের ব্যবস্থাপনা বোর্ড, একজন মহাপরিচালক এবং গবেষণা, সহায়তা সেবা ও প্রশিক্ষণ-যোগাযোগ বিষয়ে তিনজন পরিচালকের মাধ্যমে।

বাংলাদেশে আম


বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, আম (বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera indica) অ্যানাকার্ডিয়েসি গোত্রের চিরসবুজ বৃক্ষ, যাকে ‘ফলের রাজা’ বলা হয়। প্রজাতিটি পূর্ব ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় উদ্ভিদ বলে ধরা হয়, যার মধ্যে বাংলাদেশ, ভারতের আসাম ও মিয়ানমার অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত। পর্যাপ্ত জায়গা পেলে গাছ ২০ মিটারের বেশি উঁচু হতে পারে। দেশে আমকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়: কলম করে বংশবিস্তার করা উন্নত বা অভিজাত জাত, এবং বীজ থেকে জন্মানো দেশি বা ‘গুটি’ আম। ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, খিরসাপাত ও আশ্বিনার মতো অভিজাত জাত মূলত রাজশাহী, নবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে জন্মে, আর দেশে প্রায় ১০০টি জাত পাওয়া যায়। বাংলাপিডিয়া জানায়, অভিজাত জাতগুলো ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলে বেশি হলেও সারা দেশেই মূলত বসতবাড়ি-সংলগ্ন বাগান হিসেবে আমগাছ লাগানো হয়।

বাংলাপিডিয়া জানায়, আমের ফুল আসে সাধারণত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে; এ সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া হলে ফল ধারণ ব্যাহত হয়। কলমের গাছ প্রায় চতুর্থ বছর থেকে ফল দিতে শুরু করে এবং প্রায় ৪৫তম বছর পর্যন্ত ফলনক্ষম থাকে; হাজারটি ফুলের মধ্যে সাধারণত এক-দুটি পরিণত ফলে রূপ নেয়। দেশে আমগাছে প্রায় তিন ডজন পোকার আক্রমণ হয়, যার মধ্যে আছে আমের হপার, ফল ছিদ্রকারী পোকা ও ফলের মাছি; অ্যানথ্রাকনোজ, সুটি মোল্ড, পাতার ব্লাইট ও পাউডারি মিলডিউর মতো ছত্রাকজনিত রোগও ক্ষতি করে। আম মূলত পাকা অবস্থায় খাওয়া হয়; কাঁচা আম তরকারি ও ডালে স্বাদ বাড়াতে, আবার জ্যাম, জেলি, স্কোয়াশ, চাটনি ও আচার তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ২০০৫-০৬ সালে দেশে প্রায় ৬ লাখ ৪১ হাজার ৫২৫ একর জমি থেকে প্রায় ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৮২০ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়েছিল।

গ্রাফটিং, বীজের চারা ও ফলনের চ্যালেঞ্জ


বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, উন্নত বা অভিজাত জাতের আম কলম (গ্রাফটিং) করে বংশবিস্তার করা হয়, কারণ বীজ থেকে চারা করলে মাতৃগাছের গুণ সবসময় বজায় থাকে না। কলমের গাছ প্রায় চতুর্থ বছর থেকে ফল দিতে শুরু করে এবং প্রায় ৪৫তম বছর পর্যন্ত ফলনক্ষম থাকে, আর বীজের চারা ফল দিতে আরও কয়েক বছর বেশি সময় নেয়, যদিও সেগুলো ষাট বছরের বেশি বাঁচতে পারে। এ কারণেই বাণিজ্যিক বাগানে নির্দিষ্ট জাতের কলমের চারা ব্যবহার করা হয়, যাতে প্রতিটি গাছে একই মানের ফল পাওয়া যায়। আম্রপালি যে রোপণের দ্বিতীয় বছর থেকেই ফল দেয় বলে চাষক মুনির হোসেন জানিয়েছেন, তা এই বামন ও নিয়মিত ফলনশীল জাতের একটি বড় সুবিধা।

বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, অন্যান্য আম উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে আমের উৎপাদন তুলনামূলক কম; এর পেছনে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পুরোনো ও কম ফলনশীল গাছ, দুর্বল পরিচর্যা, পোকামাকড় ও রোগ অবহেলা করা, বীজ থেকে গাছ জন্মানো এবং জ্বালানি ও নির্মাণকাজের জন্য গাছ কেটে ফেলা। এই প্রেক্ষাপটেই আম্রপালির মতো নিয়মিত ফলনশীল, রোগসহনশীল ও ঘন রোপণযোগ্য উন্নত জাত চাষিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ এগুলো অপেক্ষাকৃত কম জায়গায় ও কম ঝুঁকিতে স্থিতিশীল ফলন দিতে পারে।

তবে প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতাও মনে রাখার মতো। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে দেখা যায়, হাজারটি আমের ফুলের মধ্যে সাধারণত এক-দুটি পরিণত ফলে রূপ নেয়, আর ফুল আসার সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া ফল ধারণ কমিয়ে দেয়; ফল গঠনের সময় ঝড় ও শিলাবৃষ্টি কাঁচা ফল ঝরিয়ে দিতে পারে। ফলে জাত যত ভালোই হোক, আবহাওয়া ও পরিচর্যা শেষ পর্যন্ত ফলনে বড় ভূমিকা রাখে। কোনো নির্দিষ্ট সার বা বালাইনাশকের মাত্রা এখানে উল্লেখ করা হলো না; চাষিদের উচিত জমি ও গাছ বুঝে স্থানীয় উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী এগুলো প্রয়োগ করা।

গাছে ঝুলছে ল্যাংড়া আম; ল্যাংড়া রাজশাহী অঞ্চলের পুরোনো অভিজাত জাতগুলোর একটি। ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
গাছে ঝুলছে ল্যাংড়া আম; ল্যাংড়া রাজশাহী অঞ্চলের পুরোনো অভিজাত জাতগুলোর একটি। ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

রাজশাহী থেকে নওগাঁ ও পার্বত্য জেলায়


একসময় আমের রাজধানী বলতে কেবল রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জকেই বোঝানো হতো। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আম্রপালির হাত ধরে এখন নওগাঁসহ দেশের পার্বত্য জেলাতেও আমের ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদন হচ্ছে। এসব এলাকা ছাড়াও আরও প্রায় ৩০ জেলায় এর বাণিজ্যিক চাষাবাদ হচ্ছে এবং গত এক দশকে অন্য যেকোনো জাতের চেয়ে দ্রুতগতিতে বেড়েছে এই আমের চাষ।

বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ (নবাবগঞ্জ) জেলা রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত এবং এর আয়তন প্রায় ১ হাজার ৭০২.৫৫ বর্গকিলোমিটার। জেলাটির উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্বে রাজশাহী ও নওগাঁ জেলা। এখানকার ভূমি বরেন্দ্র ভূমি, দিয়াড়া ও চরাঞ্চলে বিভক্ত, আর প্রধান নদী পদ্মা, মহানন্দা ও পাগলা। জেলার আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস কৃষি, যা স্থানীয় আয়ের প্রায় ৫৭.১৩ শতাংশ। ১৯৮৪ সালে এটি জেলার মর্যাদা পায়। এই জেলার বরেন্দ্র ও পদ্মা-তীরবর্তী ভূমিই বহুকাল ধরে বাংলাদেশের আম-অর্থনীতির কেন্দ্র, আর প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কৃষক মুনির হোসেন আম চাষ করেন প্রতিবেশী নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলায়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ রাজশাহী অঞ্চলের আম-ঐতিহ্যের পেছনে রয়েছে বরেন্দ্র ভূমি। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, বরেন্দ্র ভূমি বঙ্গীয় অববাহিকার সবচেয়ে বড় প্লাইস্টোসিন ভূ-একক, যার আয়তন প্রায় ৭ হাজার ৭৭০ বর্গকিলোমিটার এবং যা আশপাশের প্লাবনভূমির চেয়ে উঁচুতে অবস্থিত পুরোনো পলিমাটি। এর মাটি মধুপুর (বরেন্দ্র) কাদামাটি, যা লালচে-বাদামি, জারিত ও তুলনামূলক শক্ত এবং প্রায় ১৮ হাজার বছর আগে বা তার পরে জমা হয়েছিল বলে ধরা হয়।

বাংলাপিডিয়া জানায়, এই অঞ্চল উষ্ণ ও আর্দ্র হলেও আধা-শুষ্ক ও খরাপ্রবণ; গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১ হাজার ৯৭১ মিলিমিটার, যদিও তা বছরে বছরে অনেক ওঠানামা করে। বরেন্দ্র ভূমি মূলত দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলায় বিস্তৃত, আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভূমিরও একটি অংশ এই বরেন্দ্র তরফের অন্তর্গত। প্লাবনমুক্ত থাকায় এখানে বৃষ্টির পানিই ভূগর্ভের পানির প্রধান উৎস, আর উঁচু ও নিষ্কাশন-সুবিধাসম্পন্ন এই ভূমি আমের মতো ফল চাষের জন্য উপযোগী হিসেবে পরিচিত। নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের যে বিস্তৃত এলাকায় আম্রপালির বাণিজ্যিক বাগান গড়ে উঠেছে, তা মূলত এই বরেন্দ্রভূমিরই অংশ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি আমগাছ; বহুকাল ধরে এই অঞ্চলই বাংলাদেশের আম উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। ছবি: Mahmudul Karim Farsad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি আমগাছ; বহুকাল ধরে এই অঞ্চলই বাংলাদেশের আম উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। ছবি: Mahmudul Karim Farsad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

রপ্তানিতেও শীর্ষে


প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে দুই হাজার ১৯৪ (২,১৯৪) টন আম রপ্তানি হয়েছে, যার প্রায় ৭৫ শতাংশই ছিল আম্রপালি জাত। এই পরিসংখ্যানও ডিএইর নিজস্ব তথ্য এবং এখানে সেভাবেই উপস্থাপন করা হলো। রপ্তানি নিয়ে কাজ করা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আম্রপালি আম রপ্তানি প্রতিবছর বাড়ছে। প্রতি বছর যা আম রপ্তানি হয় তার প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ আম্রপালি জাতের।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের আম বিদেশি এথনিক মার্কেটে জনপ্রিয়। এ আম সুস্বাদু ও বেশিদিন ভালো থাকে, যা রপ্তানির জন্য উপযোগী।’ রপ্তানি ও আবাদের এই সম্মিলিত হিসাবই প্রতিবেদনের মূল কথা: পুরোনো অভিজাত জাতগুলোকে পেছনে ফেলে আম্রপালি এখন দেশের আম-মানচিত্রে সবচেয়ে বড় জায়গাটি দখল করে আছে, যদিও স্বাদ বা ‘সেরা’ হওয়ার মূল্যায়ন ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং তা এখানে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হিসেবেই উপস্থাপিত।

ছবি: Shahnoor Habib Munmun / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

দিনাজপুরে খেজুর রস সংগ্রহ শুরু, গুড় কেজি ২৫০ টাকাফল

দিনাজপুরে খেজুর রস সংগ্রহ শুরু, গুড় কেজি ২৫০ টাকা

শীতের শুরুতে দিনাজপুরের ১৩ উপজেলায় গাছিরা খেজুর রস সংগ্রহে ব্যস্ত। নবাবগঞ্জে রাজশাহীর বাঘমারা থেকে আসা ছয় গাছি ২৩২টি গাছের রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানাচ্ছেন; পাইকারি কেজি ২৩৫ টাকা, খুচরা ২৫০ টাকা।

ঢাকা ট্রিবিউন৭ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ছাদের ড্রাগন থেকে ১৫ বিঘার কলাবাগান: শ্রীপুরের বাপ্পির আশা ২০ লাখ টাকা আয়ফল

ছাদের ড্রাগন থেকে ১৫ বিঘার কলাবাগান: শ্রীপুরের বাপ্পির আশা ২০ লাখ টাকা আয়

গাজীপুরের শ্রীপুরের উদ্যোক্তা বায়েজিদ আলম বাপ্পি ১৫ বিঘায় প্রায় ১৫ হাজার কলাগাছ লাগিয়েছেন। প্রথম বছরে চার লাখ, পরের বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয়ের পর এবার তাঁর আশা ২০ লাখ।

কৃষি সময়৭ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

সমতলের অশোকনগরে কমলার বাগান, ৭৫ গাছে ফল ধরিয়েছেন নারায়ণ মণ্ডল

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে নারায়ণ মণ্ডলের আট বিঘার বাগানে এবার ৭৫টি গাছে কমলা ধরেছে, রোদ ঠেকাতে গ্রিন নেটে ঢাকা বাগানটি দেখতে ১০ টাকার টিকিটে ভিড় করছেন মানুষ।

সংবাদ প্রতিদিন৭ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)