দেশে সরকারি খাদ্যশস্য মজুতের সবচেয়ে বড় অংশটি আসে বোরো ধান থেকে। তবে এবার আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এ কারণে নতুন সরকারের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং সংগ্রহ কার্যক্রমে কৃষকদের সম্পৃক্ত করার নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে বোরো ধান-চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে।
এরই মধ্যে চলতি বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ১৮ লাখ টন ধান ও চাল সংগ্রহ কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। নানান পদক্ষেপের মাধ্যমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তৎপর খাদ্য অধিদপ্তর। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে হাওরে আগেভাগেই ধান-চাল কেনা শুরু করা, কৃষক নিবন্ধনের সময় বাড়ানো, নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু, ঈদের ছুটিতেও মাঠ প্রশাসন সচল রাখা এবং কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিলের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, হাওরে ফসলহানি এবং কিছু প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ থাকলেও দেশের সামগ্রিক বোরো উৎপাদন সন্তোষজনক। বাজার পরিস্থিতিও সরকারের অনুকূলে রয়েছে। ফলে, কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি সংগ্রহ, নিবন্ধনের সময় বৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রণ কক্ষ গঠন এবং মাঠ প্রশাসনের নিবিড় তদারকির মাধ্যমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন।
আরও পড়ুন'মনকে সান্ত্বনা দেই ফসল দিয়েছেন আল্লাহ, নিয়েছেনও তিনি'একদিকে ধান সংগ্রহের অভিযান, অন্যদিকে পানিতে ভাসছে কৃষকের স্বপ্নবৃষ্টি-ঢলের পানিতে ৩১৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতিবৃষ্টি-ঢলে ২০ হাজার কৃষকের শতকোটি টাকার ধান পচে নষ্ট
খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের বোরো মৌসুমে মোট ১৮ লাখ টন ধান ও চাল কিনবে সরকার। এরমধ্যে ৫ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ১ লাখ টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫০ হাজার টন গমও কেনা হবে। সরকার প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা, সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা এবং আতপ চাল ৪৮ টাকা দরে সংগ্রহ করছে।
গত ২২ এপ্রিল খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভায় চলতি বোরো মৌসুমের সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ও দাম অনুমোদন দেওয়া হয়। সভা শেষে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ তথ্য জানান।
৩ মে থেকে ধান ও ১৫ মে থেকে চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী। সরকারের নিরাপত্তা মজুত, বাজার পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
খাদ্য বিভাগ বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম বড় সংগ্রহ কর্মসূচি। ফলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মাঠ প্রশাসন, গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নেত্রকোনা সদর উপজেলার আনছাবিলে এবার বুক পানিতে ধান কাটেন শ্রমিকরা, ছবি: জাগো নিউজ
চলতি মৌসুমে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে হাওরাঞ্চলে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেবে, ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮১১ জন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
হাওরের প্রায় ৪৯ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মোট আবাদি জমির প্রায় ১১ শতাংশ। ক্ষতির পরিমাণ চালের হিসাবে প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার টন বলে কৃষি বিভাগের প্রাথমিক মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাওরের বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও অতিবৃষ্টির কারণে ধানের ক্ষতি হয়েছে। যদিও এসব এলাকার পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সহায়তা দিতে সরকার পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি পরিবর্তন করে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী চাল সংগ্রহ ১৫ মে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত ছয় জেলায় ধান ও চাল সংগ্রহ একসঙ্গে ৩ মে থেকেই শুরু হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, এতে কৃষকরা দ্রুত ধান ও চাল বিক্রির সুযোগ পেয়েছেন এবং বাজারে অতিরিক্ত চাপও কমেছে।
আরও পড়ুনহাওরাঞ্চলের ধান-চাল সংগ্রহে নতুন তারিখ নির্ধারণ৩৬ টাকা কেজিতে ধান, ৪৯ টাকায় সিদ্ধ চাল কিনবে সরকারপানির নিচে অর্ধলক্ষ হেক্টর জমির ধান, উৎপাদন নিয়ে শঙ্কাহাওরজুড়ে হাহাকার, ধান কাটছে 'নয়নভাগায়'
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৩ মে পর্যন্ত সরকারের মোট বোরো সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ১৪০ টন। এর মধ্যে ধান সংগ্রহ হয়েছে ৩৭ হাজার ৪১৭ টন, সিদ্ধ চাল ১ লাখ ৮১ হাজার ৪০ টন এবং আতপ চাল ৯ হাজার ৭৭৯ টন।
সংগ্রহ মৌসুমের শুরুতেই চাল সংগ্রহের গতি তুলনামূলক ভালো থাকলেও ধান সংগ্রহ আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
এ বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ বিভাগ) মো. মনিরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, হাওরসহ কয়েকটি এলাকায় বোরো ফসলের কিছু ক্ষতি হলেও তা সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে না। চলতি মৌসুমে সার্বিক উৎপাদন ভালো হয়েছে এবং বাজারও অনুকূলে। ফলে, স্থানীয় পর্যায়ে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম অন্যান্য বছরের তুলনায় আরও ভালোভাবে এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকারের কাছে কৃষকদের ধান বিক্রির আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। সরকারের খাদ্য মজুত বর্তমানে সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে এবং প্রায় দেড় থেকে দুই বছর ধরে মজুত রেকর্ড পর্যায়ে রয়েছে। তাই সরকারি সংগ্রহ বা মজুত নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বোরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলেও মনে করেন এ কর্মকর্তা।
মনিরুজ্জামান আরও বলেন, কৃষি বিভাগের চূড়ান্ত মূল্যায়নে যদি উৎপাদনে কিছু ঘাটতি ধরা পড়ে, সেক্ষেত্রে জাতীয় চাহিদা পূরণে সীমিত পরিসরে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির প্রয়োজন হতে পারে। এ বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। বাজেটও বরাদ্দ করা আছে।
মৌলভীবাজারে পানিতে ডুবে যাওয়া ধান কেটে ডাঙায় নিয়ে যাচ্ছেন একজন কৃষক, ছবি: জাগো নিউজ
ধান সংগ্রহে কৃষকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে 'কৃষকের অ্যাপ'-এর মাধ্যমে নিবন্ধন ও ধান বিক্রির আবেদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে, অনেক কৃষক এখনও অ্যাপ ব্যবহারে পুরোপুরি অভ্যস্ত না হওয়ায় আবেদনকারীর সংখ্যা বাড়াতে নিবন্ধনের সময়সীমা ৫ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল ব্যবস্থার পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেও ধান সংগ্রহ অব্যাহত রাখা হয়েছে, যেন কোনো কৃষক বাদ না পড়েন।
খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে ধান কেনা হচ্ছে, যা তাদের জন্য ভালো মূল্য। মন্ত্রী ও সচিবের নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষক ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে ধান কেনা হবে না। কোনো কৃষক ধান নিয়ে এলে তা নির্ধারিত দরে নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কৃষক ধান নিয়ে এলে তা যে মানেরই হোক নিতে হবে। লক্ষ্যমাত্রার বেশি হলেও ধান নিতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুনকৃষকরা যত খুশি সরাসরি গুদামে ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রি করতে পারবেনআমনের দাম পড়তি, বোরো নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তাঅর্ধেক ধান পানির নিচে, বাকিটুকু তুলতে বাধা 'আকাশছোঁয়া' নৌকার দাম
সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং কৃষকদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য খাদ্য অধিদপ্তরে বিশেষ নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করা হয়েছে।
সংগ্রহ সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান, মাঠ পর্যায়ের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, কৃষকদের অভিযোগ গ্রহণ এবং সংগৃহীত ধান-চালের তথ্য সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে এ নিয়ন্ত্রণকক্ষ।
নিয়ন্ত্রণকক্ষে দায়িত্ব পালন করছেন খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইকবাল বাহার চৌধুরী, সহকারী উপ-পরিচালক আবু সালেহ ইবনে মিজান এবং উচ্চমান সহকারী মো. বায়জিদ খান।
সংগ্রহ সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য আদান-প্রদানের জন্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নির্ধারিত নম্বরে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর।
আরও পড়ুনমৌলভীবাজারে বাড়ছে হাওরের পানি, নতুন করে ডুবছে ধানঅতিবৃষ্টিতে হাওরে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধানকিশোরগঞ্জে পানি নিচে আরও ১ হাজার হেক্টর ধান
সংগ্রহ কার্যক্রমে গতি ধরে রাখতে ঈদুল আজহার ছুটির সময়ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থল ত্যাগ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ঈদের দিন ছাড়া ধান-চাল সংগ্রহ, ওএমএস কার্যক্রম, আমদানিকৃত খাদ্যশস্য খালাস ও পরিবহনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ অব্যাহত রাখতে হবে।
কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘ ছুটির কারণে সংগ্রহ কার্যক্রমে যেন কোনো ধরনের স্থবিরতা না আসে, সে লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ২৩ মে পর্যন্ত দেশে খাদ্যশস্যের মোট সরকারি মজুত দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ১ হাজার ৬৩৯ টন। এর মধ্যে চাল রয়েছে ১২ লাখ ৫৬ হাজার ৩৬ টন, গম ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৭৯৬ টন এবং ধান ৩৭ হাজার ৪১৮ টন। এছাড়া, আমদানিপথে থাকা ফ্লোটিং মজুতে রয়েছে আরও ৬১ হাজার টনের বেশি খাদ্যশস্য।
খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, গুদামে পর্যাপ্ত জায়গা থাকলে ধান সংগ্রহের পরিমাণ আরও বাড়ানোর বিষয়ও সরকার বিবেচনা করতে পারে। এতে বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানির প্রয়োজন কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
আরএমএম/এএমএ/এমএমএআর





মন্তব্য
(০)