নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের ফুরিন্দা গ্রামে বাতিল সুতা রং করে মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পান শ্রমিকেরা; রাসায়নিকের রং তাঁদের হাত-পায়ে স্থায়ী হয়ে গেছে, সঙ্গে শ্বাসকষ্টসহ নানা অসুখ।
২০২১ সালের অক্টোবরে প্রথম আলো নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার কাঁঠালতলার ফুরিন্দা গ্রামের সুতা রং করার শ্রমিকদের নিয়ে একটি আলোকচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ছবিগুলো তোলেন মানসুরা হোসাইন। বছরের পর বছর রঙের কাজ করতে করতে এই শ্রমিকদের হাত, পা ও মুখ রঙে রাঙা হয়ে গেছে, কিন্তু তাঁদের জীবন সেই অর্থে রঙিন নয়।
বাতিল সুতা থেকে গামছা, লুঙ্গি ও থ্রিপিস
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারখানায় নানা কাজে ব্যবহারের জন্য কেনা সুতার যে অংশ বেঁচে যায় বা বাতিল হয়, নারায়ণগঞ্জের কারখানার মালিকেরা তা মহাজনদের দিয়ে দেন। সেই সুতা নতুন করে নানা রঙে রাঙিয়ে বোনা হয় গামছা, লুঙ্গি ও থ্রিপিস। মহাজনেরা বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শ্রমিকদের এ কাজে লাগান। থাকা ও খাওয়ার খরচ বহন করেন মহাজন, আর শ্রমিকেরা মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পান।
কারখানার মালিকের চাহিদা অনুযায়ী শ্রমিকেরা রাসায়নিক মিশিয়ে চুলায় জ্বাল দিয়ে সুতা রং করেন, তারপর রোদে শুকিয়ে সুতার মালিকের কাছে পাঠিয়ে দেন। প্রথম আলোর ছবিগুলোতে দেখা যায়, একই চুলার পাশে রান্না আর রঙের জ্বাল চলছে, রং থেকে পা বাঁচাতে কেউ কেউ প্লাস্টিক জড়িয়ে নিয়েছেন, আর মহাসড়কের পাশে রোদে শুকানো হচ্ছে রঙিন সুতা। বয়স্ক শ্রমিকদের জন্য কাজের সুযোগ যে কমে আসছে, সে কথাও ছবির বর্ণনায় উঠে এসেছে।
রঙের দাম দিচ্ছে শরীর
প্রথম আলো জানায়, দীর্ঘদিন এ কাজ করায় শ্রমিকদের হাত-পায়ে রং লেগেই থাকে, খাওয়ার সময় মুখে কটু স্বাদ লাগে। শ্বাসকষ্টসহ নানা অসুখ তো আছেই, রাসায়নিকে চোখ জ্বালা করার কথাও ছবির বর্ণনায় এসেছে।
২০২২ সালের আগস্টে আরব নিউজ আড়াইহাজারের পুরিন্দা গ্রামের রং কারখানাগুলো নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ঢাকা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে শ্রমিক মোহাম্মদ হাসান দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা রাসায়নিক রঙের মিশ্রণে হাত ডুবিয়ে কাজ করে মাসে প্রায় ২২ হাজার টাকা পেতেন। কৈশোর থেকে ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এ কাজ করা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামের ত্বকে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত দেখা দিয়েছে। প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জের সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা ডা. এ এস এম মুশিউর রহমান বলেন, ফুসফুসের সংক্রমণ দিয়ে শুরু হয়ে তা ফুসফুসের ক্যানসার পর্যন্ত গড়াতে পারে; এসব শ্রমিকের মধ্যে যক্ষ্মা, ব্রংকাইটিস ও দীর্ঘমেয়াদি কাশি বেশি দেখা যায়।
আরব নিউজের তথ্যমতে, এসব রং কারখানার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই বলে শিল্প তদারকির বাইরে থেকে যায়, আর শ্রমিকদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা পোশাকও নেই। আড়াইহাজারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, এ ধরনের ব্যবসার কথা প্রশাসন আগে জানত না এবং অভিযোগ পেলেই কেবল পরিদর্শন হয়। গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি সেলিম মাহমুদ বলেন, কর্মস্থলে এই শ্রমিকদের কোনো নিরাপত্তা নেই।
আড়াইহাজার ও সংকুচিত তাঁতের বাজার
আড়াইহাজার ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা। এর আয়তন ১৮১.০৭ বর্গকিলোমিটার, ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৫৪৭। দুটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত উপজেলাটি তাঁতের কাপড়ের জন্য পরিচিত। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনার প্রাদুর্ভাবসহ নানা কারণে কলকারখানা বন্ধ হতে থাকায় সুতা রং করার কারিগরদের চাহিদাও কমে আসছিল।
দেশের তাঁতশিল্প সামগ্রিকভাবেই সংকুচিত হচ্ছে। ২০১৯ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত তাঁত শুমারি ২০১৮ অনুযায়ী, ২০০৩ সালে দেশে তাঁত ইউনিট ছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫১২টি, ২০১৮ সালে তা নেমে আসে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬টিতে, অর্থাৎ কমেছে ৩৬.৭৯ শতাংশ। ২০১৮ সালে এ খাতে কাজ করতেন ৩ লাখ ১ হাজার ১৫৭ জন। শুমারিতে যন্ত্রায়ণ বৃদ্ধি, কম আয়, পুঁজির অভাব ও বাজারজাতকরণের সমস্যাকে এই পতনের কারণ বলা হয়েছে।
ছবি: Pinu Rahman / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: প্রথম আলো, আরব নিউজ, দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া (আড়াইহাজার উপজেলা)
মন্তব্য
(০)