কেফায়েত শাকিল
ছোটকালে বইতে পড়েছিলাম অন্ধের হাতি দেখার গল্প। আমরা যেহেতু নিজ চোখে হাতি দেখেছিলাম তাই গল্পটা আমাদের কাছে বেশ হাস্যকর ছিল। আমার মনে পড়ে, শিক্ষক যখন বর্ণনা করছিলেন আমরা সবাই খিলখিল করে হাসছিলাম। আজ এক কঠিন বাস্তবতা মনে করিয়ে দিল সেই ঘটনা।
গত তিনদিন ঘুম ভাঙার পর প্রথম চোখে পড়েছে হাতির মৃত্যুর খবর। প্রথমে শুক্রবার কক্সবাজারে টেকনাফে, পরদিন বান্দরবানের লামা তারপর চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে। এভাবে হাতির মৃত্যুর খবর আমরা যারা বন্যপ্রাণী নিয়ে ভাবি তাদের বেশ কষ্ট দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে কথা বলছিলাম, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি আক্ষেপের সুরে জবাব দিলেন, 'আমরাই বোধহয় হাতি দেখা শেষ প্রজন্ম হতে যাচ্ছি।'
কথাটি আমার হৃদয়ে দাগ কেটেছে বেশ। তারপর থেকে অনাবরত ভেবে যাচ্ছি আগামী প্রজন্ম হাতির নাম শুনলে কী ভাববে? চোখ থাকলেও আগামী প্রজন্মও হয়তো সেই অন্ধের মতো ভাববে হাতির উচ্চতা পাহাড়সম, কানটা কুলার মতো, পা গুলো একেকটা পিলারের মতো...ইত্যাদি ইত্যাদি। ভাবাটা অস্বাভাবিকও নয়। কেননা তাদের হয়তো বইয়ের পাতায় দেখা ছাড়া হবে না হাতি দেখার সৌভাগ্য।
বন অধিদফতর এবং আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) বাংলাদেশের ২০১৭ সালে প্রকাশ করা সর্বশেষ জরিপের তথ্য বলছে, দেশে ২৬৮টি হাতির বিচরণ রয়েছে। যার মধ্যে পুরুষ ৬৭, মহিলা ১৭২, বাচ্চা ছিল ২৯টি। এর মধ্যে পোষা ৯৬ ও অভিবাসী ৯৩ (একাধিক দেশে বিচরণকারী) ছাড়া বাকি ৭৯টি হাতি দেশের বনাঞ্চলে নিয়মিত বাস করছে। এর আগে ২০১৬ সালে আইইউসিএন প্রকাশিত আরেক তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১৩ বছরে মানুষের হাতে ৬২টি হাতির মৃত্য হয়েছে। এ সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বনাঞ্চলে হাতি মৃত্যুর সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বন অধিদফতরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের তথ্য বলছে, গত ৯ মাসে শুধু চট্টগ্রাম বিভাগের বনাঞ্চলে ১২টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। পরিসংখ্যান যাচাই করে দেখা যায় এ সময়ে, কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগে ৫টি, কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগে ৩টি, লামা বনবিভাগে ৩টি ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ১টি হাতি মারা যায়। এর মধ্যে ৩টি বাচ্চা হাতিও ছিলো।
এসব হাতি মৃত্যুর অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে প্রকাশ্যে। কিছু ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত ছিল অথচ প্রতিরোধ করতে পারেনি বন বিভাগ। পূর্ব প্রতিরোধ না হয় বুঝলাম গোয়েন্দা তথ্য পায়নি বলে করতে পারেনি। কিন্তু একটি এলাকায় পরপর ৫টি হাতির মৃত্যু হলে সেটাকে কি অনাকাঙ্ক্ষিত বলা যায়?
আমরা থানাগুলোর বাস্তবতার দিকে খেয়াল করলে দেখি পরপর একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে সেই থানার ভাত হারাম হয়ে যায় পুলিশ কর্মকর্তার। কোনোভাবে টিকে থাকলেও এ ঘটনা ঘুম হারাম করে দেয় তাদের। এমনইতো হওয়ার কথা ছিল বন বিভাগের কর্তাদের ক্ষেত্রেও। নিঃসন্দেহে পুলিশের তুলনায় অনেক কম দায়িত্ব তাদের। তবুও এতগুলো প্রাণীর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকাতে ব্যর্থ তারা। মৃত্যুর পর হয় না তেমন তদন্তও। অথচ এরপরও রিল্যাক্সে এসির বাতাস খান এসব বন কর্মকর্তারা।
যদি কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের কথা বলি, সেখানে গত ৯ মাসে ৫টি হাতি মারা গেছে। এসব ঘটনায় দায়সারা ময়নাতদন্ত, হাতিটাকে পুঁতে ফেলা আর খুব বেশি হলে একটি মামলা করা ছাড়া অন্য কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। অথচ স্বপদে বহাল আছেন সেখানকার বন কর্মকর্তারা। নেই তাদের মধ্যে কোনো ভাবনা বা অনুশোচনাও। থাকবেই বা কেন, যদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকে?
বন বিভাগ কি পারে না প্রাণীর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকাতে না পারার দায়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে? কিন্তু পারলেও নেয় না। যার ফলে এসব প্রাণী রক্ষায় দায়িত্ববোধও তৈরি হয় না সরকারি বেতনভোগী এসব কর্মকর্তার। তৈরি হয় না জবাবদিহিতার মানসিকতাও।
বন্যপ্রাণী হত্যার ঘটনা ঘটলেই আমরা দেখি বরাবরই জনসচেতনতার কথা বলে বন বিভাগ। কিন্তু জনসচেতনতা তৈরির দায়িত্ব কার? এখন প্রশ্ন তুলতেই হয় হাতি রক্ষায় পরিচালিত প্রকল্পের ফলাফল কী? যদি এত হাতির অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুই হবে তাহলে কেন এত টাকার প্রকল্প চলছে। বন্যপ্রাণী যদি রক্ষাই করা না যায় তাহলে, বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের শত শত কর্মকর্তাকে কেন পালতে হবে জনগণের টাকায়?
প্রতিটি মাসে এত এত বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর ঘটনায় না চাইলেও আঙুল উঠে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন সংরক্ষকের দিকেও। এখন বলতেই হয়, হয়তো তিনি আন্তরিক নয়, নয়তো তিনি পরিচালনা করতে পারছেন না অধস্তনদের। কিন্তু ব্যর্থতা যারই হোক এর ফলাফলতো ভোগ করতে হচ্ছে প্রাণ-প্রকৃতিকে। শেষ পর্যন্ত ভুগতে হবে পুরো দেশবাসীকেও। তাইতো নিজের স্বার্থে কথা বলতে হবে জনগণকেই। বন বিভাগকে জবাবদিহিতায় বাধ্য করতে হবে জনগণের কাছে।
বন্যপ্রাণী নিয়ে আমার যে কদিনের কাজ করার অভিজ্ঞতা তা বলছে, বন ও বন্যদের এমন অবস্থার জন্য দায় রয়েছে গণমাধ্যমেরও। প্রতিবছর বাজেটে প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় বিশাল বরাদ্দ হলেও তার হিসেব কখনও উঠে আসে না গণমাধ্যমে। অন্য দশটি মন্ত্রণালয় বা অধিদফতরের মতো গণমাধ্যমের জবাবদিহিতার কাটগড়ায় কখনও দাঁড় করানো হয় না বন মন্ত্রণালয়কে। ফলে বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। যার কারণে একদিকে প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে প্রাণ-প্রকৃতি, অপরদিকে এগুলো রক্ষার নামে পকেট কাটছে জনগণের।
এখনই সময় আওয়াজ তোলার। স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হলে ঠিক রাখতে হবে পরিবেশ। আর পরিবেশ রক্ষায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিকল্প পথ একটিও নেই। তাই আসুন নিজের স্বার্থে আওয়াজ তুলি জীববৈচিত্র্য রক্ষায়। 'হাতি দেখা শেষ প্রজন্ম না হয়ে, হাতি সংরক্ষণকারী প্রজন্মের' পরিচয় অর্জন করি আমরা। মনে রাখবেন আমি, আপনি, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হলে রক্ষা পাবে পরিবেশ, রক্ষা পাবে দেশ।
লেখক : প্রাণ-প্রকৃতি বিষয়ক প্রতিবেদক, সময় টেলিভিশন।ইমেইল: [email protected]
এইচআর/বিএ/জেআইএম





মন্তব্য
(০)