সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ২ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা৩৩°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৫০%বাতাস ৮ কিমি/ঘ

ফল বাগানে সঠিক স্প্রে যন্ত্রের ব্যবহার: ফলনের মান ও পরিমাণ বাড়ানোর কার্যকর উপায়

হ্যান্ড স্প্রেয়ার, ব্যাকপ্যাক না পাওয়ার স্প্রেয়ার, কোন নোজল, কখন ছিটাতে হবে, কতটা ওষুধ মেশাতে হবে আর কাজ শেষে যন্ত্রের যত্ন কীভাবে নিতে হবে। ফল বাগানে সঠিক স্প্রে যন্ত্র বেছে নেওয়া ও ঠিকভাবে ব্যবহার করার খুঁটিনাটি, যাতে গাছ সুস্থ থাকে আর ফলন বাড়ে।

ফল বাগানে সঠিক স্প্রে যন্ত্রের ব্যবহার: ফলনের মান ও পরিমাণ বাড়ানোর কার্যকর উপায়
এগ্রোটেক

ভোরের আলো তখনো পুরো ফোটেনি। আমবাগানের এক কোণে দাঁড়িয়ে একজন চাষি পিঠে ঝোলানো স্প্রেয়ারের হাতল চাপছেন, আর নোজলের মুখ থেকে বেরোনো সূক্ষ্ম কুয়াশা ধীরে ধীরে ঢেকে দিচ্ছে গাছের পাতা। দৃশ্যটা আমাদের গ্রামবাংলায় খুব চেনা। কিন্তু এই চেনা কাজের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটি বাগানের সারা বছরের হিসাব। ফল বাগানের যত্ন নেওয়া মানে কেবল ফল তোলা নয়; গাছ যেন সুস্থ থাকে, রোগ আর পোকা যেন বাসা না বাঁধে, সেটাই আসল কাজ। আর সেই কাজে সঠিক স্প্রে যন্ত্র, ঠিক সময়ে ও ঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে পারলে কীটপতঙ্গ, ছত্রাক ও অন্যান্য রোগ থেকে গাছকে রক্ষা করা অনেক কম ঝামেলার হয়ে যায়। এর ফলে ফলের গুণগত মান যেমন ভালো হয়, তেমনি ফলনের পরিমাণও বাড়ে।

একই ওষুধ, ভিন্ন ফল: কেন যন্ত্রটাই বড় কথা


অনেক চাষি অভিযোগ করেন, দোকান থেকে ভালো ওষুধ কিনে এনে ছিটিয়েছেন, তবু পোকা যায়নি। এর পেছনে প্রায়ই ওষুধের দোষ থাকে না, দোষ থাকে ছিটানোর ধরনে। স্প্রে যন্ত্রের কাজ হলো তরল ওষুধকে ছোট ছোট ফোঁটায় ভেঙে গাছের যেখানে দরকার সেখানে পৌঁছে দেওয়া। ফোঁটা যদি বেশি বড় হয়, তা পাতায় না আটকে গড়িয়ে মাটিতে পড়ে যায়। আবার ফোঁটা যদি অতিরিক্ত ছোট হয়, বাতাসে ভেসে পাশের পুকুর, ঘরবাড়ি বা প্রতিবেশীর খেতে চলে যায়। দুই ক্ষেত্রেই টাকা খরচ হয়, কিন্তু গাছ সুরক্ষা পায় না।

ফলগাছের সমস্যা আরও একটু জটিল। ধান বা সবজির মতো নিচু ফসলে স্প্রে পৌঁছানো তুলনামূলক কম কষ্টের, কিন্তু আম, লিচু, পেয়ারা বা কাঁঠালের মতো গাছের ডালপালা ঘন, উঁচু আর চারদিকে ছড়ানো। বাইরের পাতায় ওষুধ লাগলেও ভেতরের দিকের পাতা, মুকুল আর কচি ফল অনেক সময় বাদ পড়ে যায়। আর ঠিক সেখানেই পোকা ও ছত্রাক লুকিয়ে থাকে। তাই ফল বাগানে যন্ত্র বাছাইয়ের সময় ভাবতে হয় গাছের উচ্চতা, ডালপালার ঘনত্ব আর বাগানের আয়তন নিয়ে।

বাগানের মাপ দেখে যন্ত্র বাছাই


বাজারে মোটামুটি তিন ধরনের স্প্রে যন্ত্র পাওয়া যায়, আর প্রতিটির জায়গা আলাদা। বাগানের আকার ও ধরন অনুযায়ী হ্যান্ড স্প্রে, ব্যাকপ্যাক স্প্রে বা পাওয়ার স্প্রে বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

হ্যান্ড স্প্রেয়ার হলো ছোট, হাতে ধরা বোতলের মতো যন্ত্র। কয়েকটি গাছ, বাড়ির উঠানের দু একটি লেবু বা পেয়ারা গাছ কিংবা ছাদবাগানের টবের ফলগাছের জন্য এটি যথেষ্ট। শহরে যাঁরা ছাদে মাল্টা, কমলা, ডালিম বা আমের টব রেখেছেন, তাঁদের জন্য হ্যান্ড স্প্রেয়ারই সবচেয়ে উপযোগী। কম দামে পাওয়া যায়, রাখতে জায়গা লাগে না, আর অল্প পরিমাণ ওষুধ মেশানো যায় বলে অপচয়ও কম।

ছাদবাগানে হ্যান্ড স্প্রেয়ার ব্যবহারের আলাদা কিছু সতর্কতা আছে। ছাদ খোলা জায়গা, সেখানে বাতাস বেশি থাকে, আর পাশেই থাকে প্রতিবেশীর জানালা, শুকাতে দেওয়া কাপড় বা পানির ট্যাংক। তাই ছাদে স্প্রে করার সময় বাতাস শান্ত আছে কি না দেখে নেওয়া, টবের গাছ সম্ভব হলে এক কোণে সরিয়ে নিয়ে স্প্রে করা এবং নিমতেল বা সাবান পানির মতো কম ঝুঁকির উপকরণ আগে চেষ্টা করা ভালো। একই বোতল দিয়ে কখনো কীটনাশক, কখনো পানি ছিটানো ঠিক নয়; ওষুধের জন্য আলাদা বোতল রাখুন এবং তার গায়ে লিখে দিন।

ব্যাকপ্যাক বা ন্যাপস্যাক স্প্রেয়ার পিঠে ঝুলিয়ে ব্যবহার করতে হয়। এক হাতে হাতল চেপে ট্যাংকে চাপ তৈরি করা হয়, অন্য হাতে লম্বা নল ধরে গাছের দিকে তাক করা হয়। ছোট ও মাঝারি বাগানের জন্য এটি সবচেয়ে প্রচলিত যন্ত্র। দেশের গ্রামাঞ্চলে যে স্প্রেয়ার সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, সেটি এই ব্যাকপ্যাক ধরনেরই। নলের সঙ্গে বাড়তি লম্বা দণ্ড জুড়ে নিলে মাঝারি উচ্চতার গাছের ওপরের দিকেও পৌঁছানো যায়।

পাওয়ার স্প্রেয়ার চলে ইঞ্জিন বা মোটরে। এতে চাপ অনেক বেশি তৈরি হয়, ফলে ওষুধ বহু দূর ও উঁচুতে ছোড়া যায়। বড় বাণিজ্যিক বাগান, যেখানে শত শত পুরোনো আমগাছ আছে, সেখানে হাতে চাপা যন্ত্র দিয়ে সময়মতো সব গাছ শেষ করা প্রায় অসম্ভব। পাওয়ার স্প্রেয়ার সেখানে সময় আর শ্রম দুটোই বাঁচায়। তবে এর দাম বেশি, জ্বালানি লাগে, আর চালাতে প্রশিক্ষিত হাত দরকার।

  • কয়েকটি গাছ বা ছাদবাগান: হ্যান্ড স্প্রেয়ার
  • ছোট থেকে মাঝারি বাগান: ব্যাকপ্যাক স্প্রেয়ার
  • বড় বাণিজ্যিক বাগান ও উঁচু পুরোনো গাছ: পাওয়ার স্প্রেয়ার

যন্ত্র কেনার সময়ও কয়েকটি বিষয় দেখে নেওয়া ভালো। ট্যাংক মজবুত কি না, ঢাকনা শক্ত করে আটকায় কি না, ভরা অবস্থায় কোথাও চুইয়ে পড়ে কি না, তা দোকানেই পানি ভরে পরীক্ষা করা যায়। ট্যাংকের মুখে ও নলের ভেতরে ছাঁকনি আছে কি না দেখুন, কারণ ছাঁকনি না থাকলে ময়লা ঢুকে নোজল বারবার বন্ধ হয়। পিঠের ফিতা চওড়া ও নরম হলে দীর্ঘ সময় কাজ করতে কষ্ট কম হয়। সঙ্গে বাড়তি নোজল ও ওয়াশার পাওয়া যায় কি না, আর পরে যন্ত্রাংশ মিলবে কি না, সেটিও জেনে নিন। কম দামের নিম্নমানের যন্ত্র প্রথমে সাশ্রয়ী মনে হলেও চুইয়ে পড়া ওষুধে শরীরের ক্ষতি আর অসমান ছিটানোয় ফসলের ক্ষতি মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত বেশি খরচ হয়।

নোজল: ছোট্ট মুখের বড় ভূমিকা


স্প্রে যন্ত্রের সবচেয়ে ছোট অংশটিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নোজল হলো নলের মাথার সেই মুখ, যেখান দিয়ে তরল বেরিয়ে ফোঁটায় ভাঙে। নোজলের ধরন আর যন্ত্রের ছিটানোর ক্ষমতা মিলেই ঠিক হয় ওষুধ গাছের কোথায় কতটা পৌঁছাবে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কৃষি স্প্রে যন্ত্র নিয়ে যে নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে নোজলের ধরন অনুযায়ী ব্যবহারের পার্থক্য পরিষ্কার করে বলা আছে। ফাঁপা শঙ্কু বা হলো কোন নোজল গোল ঘূর্ণি তৈরি করে সূক্ষ্ম ফোঁটা ছড়ায়, যা গাছের পাতার চারপাশে ভালোভাবে লেগে যায়। কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক দেওয়ার জন্য এই ধরনের নোজল বেশি উপযোগী। অন্যদিকে চ্যাপ্টা পাখার মতো ছড়ানো ফ্ল্যাট ফ্যান নোজল তুলনামূলক বড় ফোঁটা দেয় এবং সমতল জায়গায় সমানভাবে ছড়ায়; মাটির ওপর বা আগাছায় আগাছানাশক দেওয়ার জন্য এটি বেশি ব্যবহার হয়। এফএওর নির্দেশিকায় এও বলা আছে, ব্যাকপ্যাক স্প্রেয়ারের সঙ্গে অন্তত একটি আগাছানাশক দেওয়ার উপযোগী নোজল এবং একটি কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক দেওয়ার উপযোগী নোজল থাকা উচিত।

এর মানে দাঁড়ায়, একটি নোজল দিয়ে সব কাজ চালানো ঠিক নয়। ছত্রাকনাশকের জন্য সূক্ষ্ম কুয়াশার মতো ছিটানো দরকার, পাতায় তরল সার দেওয়ার জন্য একটু মোটা ফোঁটাও চলে। বিভিন্ন গাছের জন্য, এমনকি একই গাছের বিভিন্ন কাজের জন্য আলাদা নোজল রাখা ভালো অভ্যাস। নোজলের মুখ ক্ষয়ে গেলে বা আংশিক বন্ধ হয়ে গেলে ফোঁটার আকার বদলে যায়, ছিটানো অসমান হয়। তাই নোজল নিয়মিত খুলে দেখা এবং নষ্ট হলে বদলে ফেলা দরকার। মনে রাখা ভালো, সূক্ষ্ম ফোঁটা বাতাসে বেশি দূর ভেসে যায়, তাই সূক্ষ্ম নোজল ব্যবহারের দিনে বাতাসের দিকে বাড়তি নজর রাখতে হয়।

কখন ছিটাবেন: সকাল আর বিকেলের হিসাব


স্প্রে করার জন্য সকাল বা সন্ধ্যার আগের সময়টি বেছে নিতে হয়, যখন তাপমাত্রা কম থাকে। ভরদুপুরের রোদে ছিটানো ওষুধের ফোঁটা পাতায় পৌঁছানোর আগেই অনেকটা বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। গরমে পাতার ছিদ্র বা পত্ররন্ধ্র বন্ধ থাকে বলে পাতায় দেওয়া তরল সারও ঠিকমতো শোষিত হয় না। কিছু ওষুধ কড়া রোদে পাতায় পোড়া দাগও ফেলতে পারে। অন্যদিকে ভোরে ও বিকেলে বাতাস সাধারণত শান্ত থাকে, ফলে ওষুধ ভেসে অন্যত্র চলে যাওয়ার ঝুঁকিও কমে।

সময় বাছাইয়ের সঙ্গে আবহাওয়ার খবরও দেখা জরুরি। জোরালো বাতাসের দিনে স্প্রে করলে ওষুধের বড় অংশ গাছে না লেগে উড়ে যায়। আবার স্প্রে করার কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি নামলে পাতার ওষুধ ধুয়ে যায়, পুরো খরচটাই বৃথা হয়। তাই আকাশে বৃষ্টির আভাস থাকলে কাজ পিছিয়ে দেওয়াই ভালো।

ফলগাছের ক্ষেত্রে আরেকটি সময়ের হিসাব আছে, সেটি গাছের নিজের জীবনচক্র। আমের কথাই ধরা যাক। দেশের কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী আমের হপার পোকা দমনে স্প্রে করতে হয় মুকুল আসার পর, কিন্তু ফুল ফোটার আগে। মুকুল পুরো ফুটে গেলে স্প্রে করা একেবারেই ঠিক নয়, কারণ তখন মৌমাছিসহ বহু উপকারী পোকা বাগানে আসে এবং পরাগায়নে সাহায্য করে। ভুল সময়ে ওষুধ দিলে এই উপকারী পোকারাই মারা পড়ে, আর ফল ধরা কমে যায়। অর্থাৎ ঠিক যন্ত্র যেমন দরকার, ঠিক সময়ও তেমনি দরকার।

মাত্রা মেপে মেশানো


কীটনাশক, ছত্রাকনাশক বা পাতায় দেওয়ার সার মেশানোর সময় প্যাকেটের নির্দেশনা হুবহু মেনে চলতে হয়। অনেকের ধারণা, একটু বেশি ওষুধ দিলে কাজ বেশি হবে। বাস্তবে এর উল্টোটাই ঘটে। মাত্রার চেয়ে বেশি ওষুধ গাছের পাতা পুড়িয়ে দিতে পারে, ফলে বিষের অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে, আর বারবার বেশি মাত্রায় দিলে পোকার শরীরে ওষুধ সহ্য করার ক্ষমতা তৈরি হয়। আবার কম মাত্রায় দিলে পোকা পুরো মরে না, টাকা নষ্ট হয়।

মাত্রা ঠিক রাখতে কয়েকটি অভ্যাস কাজে আসে। মাপার কাপ বা চামচ আলাদা রাখুন, রান্নাঘরের পাত্র কখনো নয়। প্রথমে ট্যাংকে অর্ধেক পানি নিন, তারপর মাপা ওষুধ দিন, শেষে বাকি পানি দিয়ে ভালো করে নাড়ুন। একসঙ্গে একাধিক ওষুধ মেশানোর আগে লেবেল দেখে নিন সেগুলো একসঙ্গে মেশানো যায় কি না।

যন্ত্রটি কতটা তরল ছাড়ছে, সেটিও জানা দরকার। একে বলে ক্যালিব্রেশন বা মাপজোখ। একটি কাজের উপায় হলো, ট্যাংকে মাপা পানি নিয়ে স্বাভাবিক গতিতে কয়েকটি গাছে ছিটিয়ে দেখা, কতটুকু পানি লাগল। তাহলে পুরো বাগানে কত লিটার মিশ্রণ তৈরি করতে হবে, তা আগেই হিসাব করা যায়। এতে মিশ্রণ বেঁচে গিয়ে ফেলে দেওয়ার ঝামেলাও থাকে না।

আরেকটি বিষয় প্রায়ই ভুলে যাওয়া হয়: ফল তোলার আগের অপেক্ষার সময়। প্রতিটি রাসায়নিক ওষুধের লেবেলে লেখা থাকে, শেষবার স্প্রে করার কত দিন পর ফল তোলা নিরাপদ। বাজারে তাড়াতাড়ি ফল পাঠানোর চাপে এই সময় না মানলে ভোক্তার পাতে বিষ পৌঁছে যায়। নিরাপদ ফল উৎপাদনের জন্য এই অপেক্ষাটুকু মানা চাষির দায়িত্ব।

গাছের প্রতিটি কোণে সমানভাবে


স্প্রে যেন গাছের প্রতিটি অংশে সঠিকভাবে পৌঁছায়, সেটিই সমানভাবে ছিটানোর মূল কৌশল। পাতার ওপরের পিঠে যেমন, তেমনি নিচের পিঠেও ওষুধ লাগা দরকার, কারণ অনেক পোকা ও ছত্রাক পাতার নিচের দিকেই থাকে। গাছের চারপাশ ঘুরে ঘুরে স্প্রে করতে হয়, শুধু এক দিক থেকে নয়।

ঘন ডালপালার গাছে বাইরের পাতা ভেদ করে ভেতরে পৌঁছানো কঠিন। এ জন্য নোজল একটু ভেতরের দিকে ঢুকিয়ে ওপর থেকে নিচে ধীরে ধীরে সরাতে হয়। একই জায়গায় বেশিক্ষণ ধরে রাখলে পাতা থেকে তরল টপটপ করে ঝরতে থাকে, সেটি অপচয়। পাতা ভিজে চকচকে হলেই যথেষ্ট; গড়িয়ে পড়ার আগে থেমে যাওয়া ভালো।

এখানে ছাঁটাইয়েরও একটা ভূমিকা আছে। নিয়মিত ছাঁটাই করা গাছের ভেতরে আলো-বাতাস ঢোকে, স্প্রেও অনেক কম পরিশ্রমে ভেতরে পৌঁছায়। ফলে একই পরিমাণ ওষুধে বেশি কাজ হয়।

কোন সমস্যায় স্প্রে, কোথায় বিকল্প


ফল বাগানে স্প্রে যন্ত্রের প্রয়োজন পড়ে মূলত কয়েক ধরনের সমস্যায়। আমের কথা ধরলে মুকুলের সময় হপার পোকা মুকুলের রস শুষে নেয়, ফলে মুকুল শুকিয়ে ঝরে যায়। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় অ্যানথ্রাকনোজ নামের ছত্রাক রোগে পাতা, মুকুল ও ফলে কালো দাগ পড়ে; কখনো মুকুলে সাদা পাউডারের মতো আস্তরণ দেখা যায়, যাকে পাউডারি মিলডিউ বলে। পেয়ারা, কুল বা লিচুতেও ফল ছিদ্রকারী পোকা আর ছত্রাকের আক্রমণ হয়। এসব ক্ষেত্রে ঠিক সময়ে ঠিক ওষুধ, ঠিক যন্ত্রে দিতে পারলে ক্ষতি অনেকটা ঠেকানো যায়।

তবে স্প্রেই একমাত্র উপায় নয়। কৃষি বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার কথা বলে আসছে, যার মূল ভাবনা হলো আগে কম ক্ষতিকর উপায়গুলো কাজে লাগানো, আর রাসায়নিক ব্যবহার করা শেষ ধাপ হিসেবে, প্রয়োজন বুঝে। ফলের মাছি দমনে ফেরোমন ফাঁদ, বাগান পরিষ্কার রাখা, ঝরে পড়া পচা ফল কুড়িয়ে পুঁতে ফেলা, আর আমের ক্ষেত্রে ফল বড় হওয়ার পর কাগজের বিশেষ ব্যাগে মুড়ে দেওয়া, এসব কৌশল দেশের আমচাষিদের মধ্যে ছড়িয়েছে। এতে স্প্রের সংখ্যা কমে। আর যখন স্প্রে করতেই হয়, তখন ঠিক যন্ত্রে ঠিকভাবে করাটা আরও জরুরি হয়ে ওঠে, কারণ প্রতিটি স্প্রেকে তখন কাজে লাগতে হয়।

নিজের সুরক্ষা আগে


স্প্রে যন্ত্রের সঠিক ব্যবহারের আলোচনায় যিনি যন্ত্রটি চালান, তাঁর নিরাপত্তার কথা বাদ দেওয়া যায় না। কীটনাশক শ্বাসের সঙ্গে, ত্বকের মাধ্যমে বা চোখে ঢুকে শরীরের ক্ষতি করতে পারে। তাই স্প্রে করার সময় কয়েকটি নিয়ম মানা দরকার।

  • নাক-মুখ ঢাকার মাস্ক, হাতে রাবারের দস্তানা, চোখে চশমা এবং লম্বা হাতার জামা ও লম্বা প্যান্ট পরুন।
  • বাতাসের দিকের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে স্প্রে করবেন না; বাতাস যেন ওষুধ আপনার দিক থেকে দূরে নিয়ে যায়।
  • স্প্রে করার সময় খাওয়া, পান করা বা ধূমপান করবেন না।
  • নোজল বন্ধ হলে মুখ দিয়ে ফুঁ দিয়ে পরিষ্কার করবেন না; পানি বা নরম ব্রাশ ব্যবহার করুন।
  • কাজ শেষে সাবান দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে কাপড় বদলে নিন।
  • শিশু ও গবাদিপশুকে স্প্রে করা এলাকা থেকে দূরে রাখুন।

দেশে কীটনাশকের আমদানি, বিক্রি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য বালাইনাশক আইন ২০১৮ রয়েছে, যেখানে নিবন্ধন, লেবেল ও নিরাপদ ব্যবহারের কথা বলা আছে। আইন যা-ই বলুক, মাঠে নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে যিনি স্প্রে করছেন তাঁর সচেতনতার ওপর।

কাজ শেষে যন্ত্রের যত্ন


প্রতিবার ব্যবহারের পর যন্ত্র পরিষ্কার করা এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা দরকার, যাতে এটি দীর্ঘদিন টেকে। স্প্রে শেষে ট্যাংকে পরিষ্কার পানি নিয়ে কয়েকবার ছিটিয়ে নল ও নোজল ধুয়ে ফেলুন। ট্যাংকের তলায় জমে থাকা ওষুধ পরের বার অন্য ফসলে গেলে ক্ষতি করতে পারে, বিশেষ করে আগাছানাশকের অবশিষ্টাংশ ফলগাছের পাতায় পড়লে। ধোয়া পানি পুকুর, খাল বা নলকূপের কাছে না ফেলে ফাঁকা জমির এক কোণে ফেলুন।

পরিষ্কার করার পর যন্ত্রটি উল্টো করে শুকাতে দিন। রাবারের ওয়াশার, ছাঁকনি আর নোজল আলাদা করে দেখে নিন; ফাটা বা ক্ষয়ে যাওয়া অংশ বদলে দিন। যন্ত্র রাখুন ছায়ায়, শুকনো জায়গায়, শিশুদের নাগালের বাইরে। কড়া রোদে ফেলে রাখলে প্লাস্টিকের ট্যাংক ও নল দ্রুত ভঙ্গুর হয়ে যায়। খালি ওষুধের বোতল অন্য কাজে ব্যবহার করা বিপজ্জনক; ধুয়ে ছিদ্র করে নিরাপদ জায়গায় ফেলে দিন।

সঠিক যন্ত্রে কী পাওয়া যায়


প্রথম লাভ গাছের রোগ প্রতিরোধ। কীটপতঙ্গ ও ছত্রাক থেকে গাছ সুরক্ষা পায়, আর ফলের গুণগত মান বজায় থাকে। দাগহীন, সুগঠিত ফল বাজারে ভালো দাম পায়; দাগি বা পোকায় খাওয়া ফল বিক্রি করতে হয় কম দামে।

দ্বিতীয় লাভ ফলন। সময়মতো সুরক্ষা আর পাতায় দেওয়া সারের মাধ্যমে পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় ফলনের পরিমাণ বাড়ে। মুকুল ঝরে কম, কচি ফল টিকে থাকে বেশি। মাত্রা ঠিক থাকায় ওষুধ কম লাগে, ফলে কম খরচে বেশি উৎপাদন সম্ভব হয়।

তৃতীয় লাভ শ্রম ও সময়। উন্নত স্প্রে যন্ত্রে কম সময়ে পুরো বাগানে স্প্রে করা যায়, আর গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী কোথায় কতটা দিতে হবে, তা নিয়ন্ত্রণ করাও অনেক কম পরিশ্রমের হয়। মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে যখন শ্রমিক পাওয়া কঠিন, তখন এই সাশ্রয় চোখে পড়ার মতো।

চতুর্থ লাভ পরিবেশের। সঠিক মাত্রা ব্যবহারে রাসায়নিকের অপচয় রোধ হয়, বাতাসে ভেসে যাওয়া ও মাটিতে গড়িয়ে পড়া ওষুধ কমে। বাগানের মাটি, আশপাশের পানি আর উপকারী পোকামাকড়, পাখি সবই তুলনামূলক নিরাপদ থাকে। ফলে বাগানের পরিবেশ স্বাস্থ্যকর থাকে।

বাগানিদের জন্য কয়েকটি কাজের পরামর্শ


  • বিভিন্ন গাছের জন্য আলাদা স্প্রে নোজল ব্যবহার করুন।
  • সম্ভব হলে প্রাকৃতিক বা জৈব কীটনাশক এবং জৈব তরল সার স্প্রে করার চেষ্টা করুন।
  • বছরে একাধিকবার স্প্রে যন্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করুন: চাপ ঠিক আছে কি না, কোথাও চুইয়ে পড়ছে কি না, নোজল সমানভাবে ছিটাচ্ছে কি না।
  • যাঁরা যন্ত্র চালান, সেই কর্মীদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিন, যাতে তাঁরা দক্ষতার সঙ্গে ও নিরাপদে কাজ করতে পারেন।
  • একটি খাতায় লিখে রাখুন কোন দিন কোন গাছে কোন ওষুধ কত মাত্রায় দেওয়া হলো; পরের মৌসুমে এটি বড় সহায়ক হবে।

প্রশিক্ষণ ও পরামর্শের জন্য চাষিরা নিজের উপজেলা কৃষি অফিস বা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠকর্মীরা কোন রোগে কোন ওষুধ, কোন সময়ে দিতে হবে, সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

যন্ত্রের পরের প্রজন্ম: স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও ড্রোন


উন্নত প্রযুক্তির স্প্রে যন্ত্র কৃষিতে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। স্বয়ংক্রিয় স্প্রেয়ার এবং ড্রোন দিয়ে স্প্রে ভবিষ্যতে কৃষি খাতকে আরও এগিয়ে নেবে বলে আশা করা হয়, যা ফল উৎপাদনের খরচ কমিয়ে মান বাড়াবে। কিছু আধুনিক যন্ত্র গাছের অবস্থান বুঝে কেবল গাছের দিকেই ওষুধ ছাড়ে, ফাঁকা জায়গায় নয়। ড্রোন দিয়ে উঁচু গাছের মাথায় বা দুর্গম ঢালু বাগানে অল্প সময়ে পৌঁছানো যায়।

তবে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, মূল নিয়মগুলো বদলায় না। ঠিক ফোঁটা, ঠিক মাত্রা, ঠিক সময় আর ঠিক জায়গা, এই চারটি মেনে চললে একটি সাধারণ ব্যাকপ্যাক স্প্রেয়ারও দারুণ কাজ দেয়। আর এগুলো না মানলে সবচেয়ে দামি যন্ত্রও টাকার অপচয় ছাড়া কিছু নয়।

সুস্থ গাছ, লাভজনক বাগান


ফল বাগানে সঠিক স্প্রে যন্ত্রের ব্যবহার গাছকে রোগমুক্ত রাখে, ফলকে পুষ্ট ও উন্নত মানের করে তোলে। বাগানের মাপ দেখে যন্ত্র বেছে নেওয়া, কাজ অনুযায়ী নোজল বদলানো, ঠান্ডা সময়ে মাপা মাত্রায় সমানভাবে ছিটানো, নিজের সুরক্ষা আর কাজ শেষে যন্ত্রের যত্ন, এসব অভ্যাস একবার গড়ে উঠলে বাগানের খরচ কমে, আয় বাড়ে। ভোরের সেই আমবাগানে যে চাষি স্প্রেয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর হাতে আসলে পুরো মৌসুমের ফলনের চাবি।

ছবি: ব্যাকপ্যাক স্প্রেয়ারে স্প্রে করছেন এক চাষি, Doyanmoto / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

এগ্রোটেক

সম্পর্কিত খবর

এগ্রোটেক

নিজে চলে খামারঘর ধোয়া-জীবাণুমুক্ত করবে রোবট, কানাডার শূকর খামারে আসছে

নেদারল্যান্ডসের এমএস শিপারসের স্মার্ট ক্লিনিং রোবট একবারে ফোম দেওয়া, উচ্চচাপে ধোয়া ও জীবাণুনাশ করে। থ্রিডি লিডার সেন্সরে পথ চিনে নেয় বলে আগে থেকে প্রোগ্রাম করতে হয় না।

Farms.com২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোবিজ

কানাডায় খামার ও কৃষিপ্রযুক্তির বিনিয়োগে পুরো খরচ একবারে করছাড়

প্রোডাক্টিভিটি মেগা ডিডাকশন নামের নতুন কর সুবিধায় তাৎক্ষণিক খরচ হিসেবে বাদ দেওয়া যাবে এমন সম্পদের ভাগ প্রায় ১৫ থেকে বেড়ে ৬৫ শতাংশের বেশি হচ্ছে, যার মধ্যে আছে গ্রিনহাউস, সফটওয়্যার, যানবাহন ও গবেষণা।

Farms.com২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোবিজ

বাজেট চাপের মধ্যে কৃষি গবেষণা দ্রুত মাঠে পৌঁছাতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন

ব্রাসেলসে এগ্রি ২০৪০ সম্মেলনে ইউরোপীয় কর্মকর্তা ও কৃষকেরা বলেছেন, কৃষি গবেষণাকে আরও দ্রুত খামারে পৌঁছাতে হবে: কম আমলাতন্ত্র, বেশি অংশীদারত্ব আর নতুন পণ্যের চাহিদা তৈরি করে।

এজিফান্ডনিউজ২ অক্টোবর ২০২৬৩ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)