সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮আদা - আমদানিকৃত১৬৭আদা - দেশী১৫৪আমন চাল - মাঝারি৫৬আমন চাল - মোটা৪৮আমন চাল - সরু৭২আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২কাঁচা মরিচ২১৮খামারের মুরগী১৬২খাসী৯০০চিনি (দেশী)১৩২ছোলা - গোটা৮৫ডিম ফার্ম - লাল৪৭পেঁয়াজ - দেশী৬০বোরো চাল - মাঝারি৫৫বোরো চাল - মোটা৪৭বোরো চাল - সরু৬৬মাংসঃ– গরু৭২৯মুগ ডাল১২২রসুন - আমদানিকৃত১৯২রসুন - দেশী১৭৩সয়াবিন তেল১৬৩
হালনাগাদ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা২৮°আংশিক মেঘলাআর্দ্রতা ৮৬%বাতাস কিমি/ঘ

অসুস্থ মাটি, বেশি সার ও কীটনাশক কৃষির জন্য চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের কৃষি আজ নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি; অন্যদিকে অসুস্থ মাটি, অতিমাত্রায় রাসায়নিক সারের ব্যবহার এবং অযাচিত কীটনাশকের প্রয়োগ, এ তিনটি সংকট দেশের কৃষি ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দিচ্ছে। কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় আমরা অ

পরিবেশ

বাংলাদেশের কৃষি আজ নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি; অন্যদিকে অসুস্থ মাটি, অতিমাত্রায় রাসায়নিক সারের ব্যবহার এবং অযাচিত কীটনাশকের প্রয়োগ, এ তিনটি সংকট দেশের কৃষি ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দিচ্ছে। কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় আমরা অনেক সময় ভুলে যাচ্ছি যে, উৎপাদনের মূল ভিত্তি হলো সুস্থ মাটি। মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হলে কৃষি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং খাদ্যনিরাপত্তা, সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়ে।

গত কয়েক দশকে খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু এ সাফল্যের একটি বড় অংশ এসেছে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে। শুরুতে এটি ফলন বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও দীর্ঘদিন ধরে বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা ছাড়া একই পদ্ধতির ব্যবহার এখন উল্টো কৃষির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাটির জৈব পদার্থ কমে যাচ্ছে, উপকারী অণুজীব ধ্বংস হচ্ছে, মাটির পিএইচ ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং পুষ্টি উপাদানের স্বাভাবিক চক্র ভেঙে পড়ছে। ফলে একই জমিতে আগের মতো ফলন পেতে কৃষকদের আরও বেশি সার ব্যবহার করতে হচ্ছে। এটি এক ধরনের দুষ্টচক্র, যা কৃষিকে ক্রমেই ব্যয়বহুল ও অনিরাপদ করে তুলছে।

অতিমাত্রায় নাইট্রোজেনভিত্তিক সার, বিশেষ করে ইউরিয়ার ব্যবহার বাংলাদেশে একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। অনেক কৃষক মনে করেন, বেশি সার মানেই বেশি ফলন। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। ফসলের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার শুধু অর্থের অপচয়ই নয় বরং মাটির রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে, অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি সৃষ্টি করে এবং ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানিকে দূষিত করে। জলাশয়ে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ও ফসফরাস প্রবেশ করে শৈবালের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটায়, ফলে জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মাছসহ অন্যান্য প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে।

একইভাবে অযাচিত ও নির্বিচার কীটনাশক ব্যবহারের প্রবণতা আজ আরেকটি বড় উদ্বেগের কারণ। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত রোগ বা পোকার উপস্থিতি নিশ্চিত না হয়েই আগাম কীটনাশক ছিটানো হয়। এতে উপকারী পোকামাকড়, মৌমাছি, মাকড়সা, পরাগায়নকারী পতঙ্গ এবং মাটির অণুজীব ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিকর পোকার প্রতিরোধক্ষমতা আরও বেড়ে যায়। তখন একই কীটনাশক আর কার্যকর থাকে না; কৃষককে আরও শক্তিশালী ও ব্যয়বহুল কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ে, তেমনি খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থেকে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।

মাটির স্বাস্থ্য অবনতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো জৈব পদার্থের ঘাটতি। বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষিজমিতে মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রার নিচে। অথচ জৈব পদার্থই মাটির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে, পুষ্টি ধরে রাখে এবং অণুজীবের কার্যক্রম সচল রাখে। কৃষকেরা যদি গোবর, কম্পোস্ট, সবুজ সার, ফসলের অবশিষ্টাংশ এবং অন্যান্য জৈব উপাদানের ব্যবহার বাড়ান, তাহলে মাটির স্বাস্থ্য অনেকাংশে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

এখন প্রশ্ন হলো, এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী? প্রথমত, মাটি পরীক্ষা-ভিত্তিক সুষম সার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। মাটির প্রকৃত পুষ্টি অবস্থা না জেনে সার প্রয়োগ করলে কখনোই সঠিক ফল পাওয়া যাবে না। প্রতিটি জমির জন্য মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট মাত্রায় ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সমন্বিত পোকা ব্যবস্থাপনা আরও বিস্তৃত করতে হবে। শুধু রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভর না করে জৈবিক, যান্ত্রিক এবং সাংস্কৃতিক পদ্ধতির সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এতে কীটনাশকের ব্যবহার কমবে এবং পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, রিমোট সেন্সিং, ড্রোন প্রযুক্তি এবং বিগ ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে জমির পুষ্টি, রোগ-পোকার আক্রমণ এবং সারের চাহিদা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব। এতে অপচয় কমবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়বে।

চতুর্থত, কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে, যাতে কৃষক সহজেই সঠিক পরামর্শ পান। একই সঙ্গে ভেজাল সার ও কীটনাশক নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি সংস্থা এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অঞ্চলভিত্তিক মাটির স্বাস্থ্য মানচিত্র, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

সবশেষে, কৃষিকে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে নয়; বরং মাটির স্বাস্থ্য, পরিবেশগত ভারসাম্য, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্যনিরাপত্তার সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের একটি খাত নয়, এটি একটি দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের সুস্থ জীবনের ভিত্তি। আজ যদি আমরা মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হই, তবে আগামী দিনের কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, আয় কমে যাবে, পরিবেশ দূষণ আরও তীব্র হবে এবং নিরাপদ খাদ্যের সংকট গভীরতর হবে।

বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করছে সুস্থ মাটি, সুষম সার ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ ও দায়িত্বশীল কীটনাশক ব্যবহারের ওপর। দীর্ঘদিন ধরে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগের ফলে মাটির জৈব পদার্থ, উপকারী অণুজীব এবং প্রাকৃতিক উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ (রেসিডিউ) থেকে জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তাই উৎপাদন বাড়ানোর নামে এমন কোনো কৃষি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নয়, যা দীর্ঘমেয়াদে মাটি, পরিবেশ এবং মানুষের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

বর্তমানে টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক ও তথ্যনির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। প্রতিটি জমির মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সারের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রদান, সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, জৈব সার ও জৈব পদার্থের ব্যবহার বৃদ্ধি, সমন্বিত পোকা ব্যবস্থাপনা, আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আইওটি, রিমোট সেন্সিং এবং বিগ ডেটা বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগ কৃষিকে আরও দক্ষ, লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সহজলভ্য কৃষি পরামর্শ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

এ ছাড়া সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি খাত এবং কৃষকদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। কৃষিবান্ধব নীতি, কার্যকর সম্প্রসারণ সেবা, মানসম্মত কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং ডিজিটাল কৃষি সেবার সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

এখনই সময় জাতীয়ভাবে একটি দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করার 'মাটি বাঁচাও, কৃষি বাঁচাও, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করো'। সুস্থ মাটি রক্ষা করা মানে শুধু বর্তমানের উৎপাদন নিশ্চিত করা নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ খাদ্য, সুস্থ পরিবেশ এবং একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণ করা। তাই মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহার এবং বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষিচর্চাই হতে পারে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই কৃষি উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকর পথ। সুস্থ মাটিই নিরাপদ খাদ্যের ভিত্তি, আর নিরাপদ খাদ্যই একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও টেকসই জাতির ভবিষ্যৎ।

জাগো নিউজ ২৪দা এগ্রো নিউজ

পরিবেশ

সম্পর্কিত খবর

পরিবেশ

পদ্মার পানি নামছে, দৌলতপুরে শুরু হয়েছে খাওয়ার পানির সংকট

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে তিন দিনে পদ্মার পানি ১৫ সেন্টিমিটার কমলেও প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এখনও পানিবন্দি, আর হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।

সমকাল১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

বাঁশের ওপর টিকে থাকা পান্ডা কেন কেবল চীনেই মেলে

একটি পূর্ণবয়স্ক জায়ান্ট পান্ডাকে দিনে ১২ থেকে ৩৮ কেজি পর্যন্ত বাঁশ খেতে হয়, আর বাঁশবন ধ্বংস হলেই তার অস্তিত্ব সরাসরি হুমকিতে পড়ে।

বিবিসি বাংলা১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

()