উপমহাদেশের কৃষকের কাছে শীত মৌসুম বছরের ব্যস্ততম সময়। এ সময়েই বোরো ধান, গম, আলু, সরিষা, ডাল, শীতকালীন নানা সবজি ও বিভিন্ন ফলের চাষ হয়, আর একটি পরিবারের সারা বছরের আয়ের বড় অংশ এবং একটি দেশের খাদ্যের জোগান অনেকটাই নির্ভর করে এই কয়েকটি শীতল মাসের ওপর। ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এ লেখা এক নিবন্ধে কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সমীরণ বিশ্বাস সতর্ক করে বলেন, শীতকালজুড়ে মাঠে যে ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা জমে থাকে, তা নীরবে এসব ফসলকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে; সেই সঙ্গে তিনি তুলে ধরেন কৃষকের করণীয় কী। তাঁর মতে, কুয়াশা কেবল রাস্তায় দৃষ্টিসীমা কমায় না, বরং সূর্যালোক আটকে দিয়ে ও বাতাসকে জলীয় বাষ্পে পরিপূর্ণ রেখে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা ফসলের বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ফলন ও গুণগত মানের ওপর সরাসরি আঘাত হানে।
শীত, কুয়াশা ও ফসলের মৌসুম
বাংলাদেশে শীত হলো নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা শীতল ও শুষ্ক মৌসুম, আর জানুয়ারি এর মধ্যে সবচেয়ে ঠান্ডা মাস। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, জানুয়ারিতে দেশের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গড় তাপমাত্রা নেমে আসে প্রায় ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, আর ডিসেম্বরের শেষ ও জানুয়ারির শুরুর সবচেয়ে ঠান্ডা রাতগুলোতে অতি উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হিমাঙ্কের মাত্র চার থেকে সাত ডিগ্রি ওপরে পর্যন্ত নামতে পারে। এ মৌসুম ভীষণ শুষ্কও; সারা বছরের বৃষ্টিপাতের মাত্র দুই থেকে চার শতাংশ হয় এ সময়ে, আর উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম থেকে ঘণ্টায় প্রায় তিন থেকে ছয় কিলোমিটার বেগে দুর্বল বাতাস বয়। আকাশ থাকে বেশির ভাগই মেঘমুক্ত, প্রায় গোটা দেশে মেঘের গড় আচ্ছাদন মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ, ফলে দীর্ঘ রাতজুড়ে মাটি তার তাপ বিকিরণ করে হারিয়ে ফেলতে পারে। শান্ত, মেঘমুক্ত, ঠান্ডা রাত আর ভেজা মাটি, ঠিক এমন পরিবেশেই ঘন বিকিরণ-কুয়াশা জমে এবং সকাল গড়িয়ে যাওয়ার পরও থেকে যায়।
এই সময়েই দেশের সবচেয়ে মূল্যবান ফসলগুলো মাঠে থাকে। বোরো ধান থাকে বীজতলা ও জমিতে, নভেম্বরের প্রথমার্ধে লাগানো আলু ফেব্রুয়ারি-মার্চের ফসল তুলতে মোটা হতে থাকে, সরিষায় ফুল আসে, আর গম, মসুরসহ ডাল এবং টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও লাউ-কুমড়ার মতো শীতকালীন সবজি সবই জমিতে থাকে। এদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বোরোর জীবন শুরু হয় এই শীতল সপ্তাহগুলোতে তৈরি বীজতলায়, আর মূল জমিতে চারা রোপণের আগে সেই বীজতলার কচি চারা হঠাৎ শীত ও তার সঙ্গী কুয়াশার মুখে সবচেয়ে অরক্ষিত গাছগুলোর একটি। ফলে অস্বাভাবিক ঘন বা দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা কৃষিবর্ষের সবচেয়ে স্পর্শকাতর মুহূর্তেই হানা দেয়, যখন বৃদ্ধিতে সামান্য বাধা বা রোগের সামান্য প্রাদুর্ভাবও শেষ ফসলে সঙ্গে সঙ্গে টের পাওয়া যায়।

কুয়াশা আসলে কী
কুয়াশা হলো মাটির কাছাকাছি বাতাসে অসংখ্য ক্ষুদ্র জলকণার ঘন উপস্থিতি, যে জলীয় বাষ্প সাধারণত চোখে দেখা যায় না, তা-ই ঘনীভূত হয়ে দৃশ্যমান মেঘে পরিণত হয়। বিশ্বাস ব্যাখ্যা করেছেন, কুয়াশা ওপর থেকে সূর্যের আলো আটকে দেয় এবং আশপাশের বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। ফসলের জন্য এই দুটি পরিবর্তন, গভীর ছায়া আর বাতাসের প্রায়-পূর্ণ আর্দ্রতা, পরবর্তী প্রায় সব সমস্যার মূলে। কেন এগুলো ক্ষতিকর তা বুঝলে দীর্ঘ কুয়াশার সময় কৃষক কোথায় শ্রম দেবেন তা স্থির করা সহজ হয়, ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হয় না।
আলো কম, আলোকসংশ্লেষ কম
আলোকসংশ্লেষই প্রতিটি ফসলের চালিকাশক্তি। সূর্যের আলো, পানি ও কার্বন ডাই-অক্সাইড কাজে লাগিয়ে সবুজ পাতা এমন শর্করা তৈরি করে, যা দিয়ে কাণ্ড, শেকড়, দানা ও ফল গড়ে ওঠে। কিন্তু দিনের পর দিন মাঠে ঘন কুয়াশা ঝুলে থাকলে সূর্যের আলো পুরো মাত্রায় পাতায় পৌঁছাতে পারে না, আলোর তীব্রতা অনেকটা কমে যায় এবং তার সঙ্গে কমে আলোকসংশ্লেষের হার। ফলে গাছ স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট শর্করা ও শক্তি তৈরি করতে পারে না। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে গাছ দুর্বল ও লিকলিকে হয়ে পড়ে, কুশি, শাখা-প্রশাখা কম হয় এবং ফুল ও ফল ধারণ ব্যাহত হয়। ধান, গম ও সরিষার মতো দানাদার ফসলে দানা গঠনের সময় আলোর এই ঘাটতি সবচেয়ে ব্যয়বহুল, কারণ এটি সরাসরি শীষ বা ফল ভরাট হওয়ার প্রক্রিয়ায় আঘাত করে। পরিণতিতে একই জমি ও একই পরিশ্রমে ফলন কমে যায়।
ভেজা পাতা ও রোগের বিস্তার
কুয়াশার দ্বিতীয় বড় বিপদ হলো যে পানি কিছুতেই শুকাতে চায় না। স্বাভাবিক শীতের সকালে সূর্য ও সামান্য বাতাস ঘণ্টা দু-একের মধ্যেই পাতার শিশির শুকিয়ে দেয়। কিন্তু ঘন কুয়াশায় পাতা ও কাণ্ড অনেক বেশি সময় ভেজা থাকে, আর গাছের ভেতরে তৈরি হয় উষ্ণ, স্থির ও আর্দ্র বাতাসের এক ছোট্ট পরিবেশ বা মাইক্রোক্লাইমেট। ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের জন্য এটি প্রায় আদর্শ আঁতুড়ঘর। শুকনো পাতায় পড়া স্পোর কিছুই করতে পারে না; কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেজা পাতায় সেই একই স্পোর অঙ্কুরিত হয়ে গাছে ঢুকে পড়ে, আর কয়েকটি গাছ আক্রান্ত হলেই কয়েক দিনের মধ্যে পুরো জমিতে রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শীতের মাঠে এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ নাবি ধসা বা লেট ব্লাইট, যে রোগ আলু ও টমেটোর ফসল শেষ করে দেয়। এটি ঘটায় ফাইটোফথোরা ইনফেস্টান্স নামের একটি জীব, যা প্রকৃত ছত্রাক নয় বরং একধরনের জলছত্রাক বা উমাইসিট; ১৮৪৫ থেকে ১৮৫২ সালের আইরিশ আলু-দুর্ভিক্ষের পেছনেও ছিল এই একই জীব, যে দুর্ভিক্ষে নানা কারণের একটি হিসেবে দশ লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। আজও সারা বিশ্বে এটি বছরে প্রায় ছয়শ কোটি ডলারের ফসল নষ্ট করে। জীবাণুটি কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার জন্য একেবারে উপযোগী: প্রায় ১২ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস শীতল তাপমাত্রায় পরিপূর্ণ বা প্রায় পরিপূর্ণ আর্দ্র বাতাসে এর স্পোর সবচেয়ে ভালো তৈরি হয়, ১৫ ডিগ্রির নিচে এর সাঁতারু জুস্পোর বেশি জন্মায়, আর তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির ওপরে এবং আর্দ্রতা প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশের ওপরে টানা দুই দিন বা তার বেশি থাকলেই এটি ছড়ায়। ঠিক যেখানে পানি বা শিশির জমে, অর্থাৎ পাতার আগা ও কিনারায় প্রথম দাগ দেখা দেয়, আর অনুকূল পরিবেশে মাত্র পাঁচ দিনেই পাতায় জীবাণুটির একটি গোটা নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়ে যায়। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শীতকালীন সবজি আলুর ক্ষেত অরক্ষিত থাকলে স্যাঁতসেঁতে, মৃদু কুয়াশার এক সপ্তাহেই তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
আবহাওয়া ও রোগের এই সম্পর্ক এতটাই নির্ভরযোগ্য যে উদ্ভিদ রোগবিজ্ঞানীরা বাতাস দেখেই নাবি ধসার প্রাদুর্ভাবের পূর্বাভাস দেন। টানা প্রায় দুই দিন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি বা তার ওপরে এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতা প্রায় ৭৫ শতাংশের ওপরে, দিনের বহু ঘণ্টা ৯০ শতাংশের ওপরে থাকলে ধরে নেওয়া হয় নাবি ধসা হানা দিতে পারে, যা আলুর জমির ওপর দীর্ঘ শীতের কুয়াশা তৈরি করা উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশই। কৃষকের জন্য শিক্ষাটি সহজ: কয়েক দিন ধরে কুয়াশাঘেরা, মৃদু আবহাওয়াই নিজেই সতর্কসংকেত, আর ঠিক এমন আবহাওয়াতেই ফসলকে সবচেয়ে কাছ থেকে নজরে রাখা উচিত।

আলু ও টমেটোই একমাত্র শিকার নয়। ধানে একই রকম দীর্ঘ পাতা-ভেজাভাব ও উচ্চ আর্দ্রতা ব্লাস্ট ও শীথ ব্লাইটকে উৎসাহিত করে; শসা, কুমড়া, মিষ্টিকুমড়া ও তরমুজে হানা দেয় ডাউনি মিলডিউ; আর শাকজাতীয় সবজিতে দেখা দেয় লিফ স্পট ও সফট রট। এদের প্রত্যেকেরই দরকার সেই একটি জিনিস, যা কুয়াশা উদারভাবে জুগিয়ে দেয়, অর্থাৎ ভেজা থাকা পাতার উপরিভাগ। রোগ ধরলে কৃষককে দমনে বাড়তি খরচ করতে হয়, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় এবং রাসায়নিক অতিরিক্ত ব্যবহার করলে জমির মাটি, পানি ও উপকারী পোকামাকড়েরও ক্ষতি হয়।
তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ভারসাম্যে বিপর্যয়
কুয়াশা গাছ ও তার চারপাশের বাতাসের স্বাভাবিক ভারসাম্যও নষ্ট করে। বাতাস যখন আগে থেকেই আর্দ্রতায় প্রায় পরিপূর্ণ, গাছ তখন ঠিকমতো বাষ্পোৎসর্জন করতে পারে না, অর্থাৎ পাতার সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে পানি বের করে দিতে পারে না। যেহেতু এই বাষ্পোৎসর্জনই সেই পাম্প, যা শেকড় থেকে পানি ও দ্রবীভূত পুষ্টি ওপরে টেনে তোলে, তাই এটি ধীর হয়ে গেলে গাছের ভেতরের গোটা চলাচলই ধীর হয়ে পড়ে। পানি ও খনিজ শ্লথ গতিতে চলে, পাতা ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে থাকে এবং দীর্ঘ কুয়াশার পর গাছের মৌলিক শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম কার্যত নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এভাবে দুর্বল হয়ে পড়া ফসল একই আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা রোগ ও পোকার বিরুদ্ধে অনেক কম প্রতিরোধী হয়, ফলে ক্ষতি ক্রমেই জমে ওঠে।
পরাগায়নে বিঘ্ন, ফল কম
যেসব ফসলকে ফুল ফুটিয়ে বীজ বাঁধতে হয়, তাদের জন্য কুয়াশা দ্বিগুণ ক্ষতিকর। সরিষা, ডাল, ফলগাছ ও বহু সবজি নির্ভর করে এমন পরাগের ওপর, যা যথেষ্ট শুকনো থেকে চলাচল করতে পারে, এবং এমন পোকার ওপর, যারা সক্রিয় থেকে তা বয়ে নিয়ে যায়। ঘন কুয়াশায় পরাগ শুকাতে পারে না, আঠালো হয়ে দলা পাকিয়ে যায়, আর মৌমাছিসহ পরাগবাহী পোকারা ফুলে না এসে আশ্রয়েই বসে থাকে। ফলে পরাগায়ন ব্যর্থ হয়, ফুল না বেঁধে ঝরে যায়, কম সংখ্যক ফল ও শুঁটি তৈরি হয় এবং তার ভেতরের বীজ কখনো পূর্ণ হয় না। সরিষার জন্য বিষয়টি জাতীয় গুরুত্ব বহন করে: বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশে প্রায় ০.২৪ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে এর চাষ হয় এবং বছরে প্রায় ০.১৯ মিলিয়ন টন তেল উৎপন্ন হয়, যার সবচেয়ে বেশি আবাদ টাঙ্গাইল, যশোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনার মতো জেলায়। মাত্র কয়েক দশক আগেও সরিষার তেলই ছিল সারা দেশের একমাত্র রান্নার তেল, যা বলদে টানা ঘানিতে ভাঙা হতো; সস্তা আমদানি করা সয়াবিন তেল এর আবাদ কিছুটা কমিয়ে দিলেও সরিষা আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ শীতকালীন তেলবীজ এবং মৌমাছির অন্যতম প্রধান মধুর উৎস। এসব জেলায় কুয়াশাঘেরা ফুল আসার মৌসুম মানে পাতলা শুঁটি, দুর্বল তেলবীজের ফসল আর ফুলের ওপর নির্ভরশীল মৌমাছিদের কম কাজ।

স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বেড়ে ওঠা পোকা
রোগ ছড়ায় যে স্থির, স্যাঁতসেঁতে ও কুয়াশাচ্ছন্ন বাতাস, তা বহু ক্ষতিকর পোকার জন্যও উপযোগী। এফিড বা জাবপোকা, থ্রিপস ও মাইট এমন পরিবেশে দ্রুত বংশবিস্তার করে, আর এদের ক্ষতি কেবল রস শোষণেই সীমাবদ্ধ নয়: বিশেষ করে জাবপোকা উদ্ভিদের ভাইরাস বহনে কুখ্যাত, খাওয়ার সময় যা তারা গাছে ঢুকিয়ে দেয়। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ছায়া ও জলভরা বাতাসে কাহিল হয়ে পড়া গাছ এদের সহজ শিকার, তাই দুর্বল ফসলে পোকার সংখ্যা সুস্থ ফসলের চেয়ে দ্রুত বাড়ে এবং একটি জমিতে একই সঙ্গে রোগ ও পোকার সম্মিলিত চাপ এসে পড়তে পারে। কৃষকের জন্য এর অর্থ প্রায়ই দমনে দ্বিতীয় দফা খরচ, ঠিক যখন ফসল তা পুষিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থায় সবচেয়ে কম থাকে।

ফল ও সবজির গুণগত মান হ্রাস
ফসল টিকে গেলেও কুয়াশা তার মূল্য কেড়ে নিতে পারে। দীর্ঘ কুয়াশার মধ্যে বেড়ে ওঠা ফল ও সবজিতে অনেক সময় স্বাভাবিক রং আসে না, শর্করা ও শুষ্ক পদার্থের পরিমাণ কমে যায়, ফলে স্বাদ ফিকে হয় ও ওজন কমে। এমন পরিবেশে উৎপন্ন পণ্য ভালোভাবে সংরক্ষণও করা যায় না: সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সময় তা দ্রুত পচে, অর্থাৎ ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর পথে বেশি অপচয় হয়। কৃষকের জন্য এর ফল দ্বিগুণ ক্ষতি, ফসল একদিকে কম, অন্যদিকে ন্যায্য দামে বিক্রি করাও কঠিন; আর বাজারের জন্য এর অর্থ ঠিক সেই মৌসুমেই শীতকালীন সবজির কম নির্ভরযোগ্য জোগান, যখন এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
ঝুঁকিতে থাকা ফসল ও জেলা
কুয়াশা কতটা হুমকি, তা বোঝা যায় বাংলাদেশের কৃষিতে এসব শীতকালীন ফসলের অবস্থান থেকে। বোরো দেশের ধান উৎপাদনের মেরুদণ্ড: বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশের ধানি জমির প্রায় ৪১ শতাংশ বোরোর দখলে, আর ২০০৯-১০ সালে প্রায় ১১.৬ মিলিয়ন একর জমি থেকে প্রায় ১৮ মিলিয়ন টন ধান উৎপন্ন হয়, যা তিন মৌসুমের মধ্যে একক সর্ববৃহৎ ধানের ফসল। আলু শীতজুড়ে দেশের প্রতিটি জেলায় চাষ হয়; রোপণ আদর্শভাবে শুরু হয় নভেম্বরের প্রথমার্ধে, যদিও উত্তর-পশ্চিমের কিছু কৃষক আগাম ফসলের জন্য অক্টোবরেই লাগিয়ে দেন, আর বেশির ভাগ জাত তোলা হয় ফেব্রুয়ারি ও মার্চে। ২০০৭-০৮ সালের মধ্যেই আলুর জাতীয় উৎপাদন প্রায় ৮.২ মিলিয়ন টনে পৌঁছায় এবং এ ফসল সংরক্ষণ করা হয় দেশের প্রায় ১৯৩টি হিমাগারে, যাদের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ২২ লাখ টন। টমেটো চাষ হয় প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে, নভেম্বর-ডিসেম্বরে ২৫ থেকে ৩০ দিন বয়সী চারা রোপণ করে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ দিন পর, ঠিক যখন নাবি ধসার আবহাওয়া সবচেয়ে প্রতিকূল, আর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টন। অর্থাৎ দীর্ঘ কুয়াশা কোনো গৌণ ফসলকে নয়, বরং দেশের মূল খাদ্যশস্য আর শীতের বাজার ভরিয়ে রাখা তেলবীজ ও সবজিকেই হুমকিতে ফেলে।
কৃষকের করণীয়
ঘন কুয়াশার ক্ষতি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়, তবে বিশ্বাস জোর দিয়ে বলেন, যত্নশীল ব্যবস্থাপনায় তা অনেকটাই কমানো যায় এবং বেশির ভাগ ব্যবস্থাই সহজ ও কম খরচের। মূল ভাবনা হলো ফসলের ভেতর দিয়ে আবার বাতাস ও আলো চলাচল করানো, আবহাওয়া যতটা অনুমতি দেয় পাতা ততটা শুকনো রাখা, আর গাছকে রোগ ঝেড়ে ফেলার মতো শক্ত রাখা:
- গাছের চাঁদোয়া খোলা রাখুন যাতে ভেতর দিয়ে বাতাস চলাচল করতে পারে: জমি নিড়িয়ে আগাছা দমন করুন এবং গাছ ঘন না রেখে নির্ধারিত দূরত্বে রাখুন, কারণ ঘন ও ঠাসা ফসল পাতার চারপাশে আর্দ্র বাতাস আটকে রাখে।
- জমিতে পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা রাখুন এবং কুয়াশার সময় অপ্রয়োজনীয় সেচ এড়িয়ে চলুন, যাতে মাটি ও নিচের পাতা অকারণে ভেজা না থাকে।
- যেখানে সম্ভব পাতার শিশির ঝরিয়ে দিন, যেমন সকালে ধানের বীজতলা বা জমির ওপর দিয়ে আলতো করে দড়ি টেনে, যাতে পাতা দ্রুত শুকায়।
- যেখানে সুযোগ আছে, রোগসহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি জাত বেছে নিন, যাতে ফসল জীবনের কম সময় কুয়াশার মুখে থাকে।
- ফসলকে তার জন্য নির্ধারিত সুষম মাত্রায় সার দিন, কারণ ভালোভাবে পুষ্ট গাছ ক্ষুধার্ত গাছের চেয়ে অনেক ভালো রোগ প্রতিরোধ করে; বাড়তি নাইট্রোজেন চাপিয়ে দেবেন না, কারণ তা নরম ও রোগপ্রবণ বৃদ্ধি ঘটায়।
- প্রতিদিন ফসল পর্যবেক্ষণ করুন এবং রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর নয়, বরং প্রথম লক্ষণেই ব্যবস্থা নিন, কারণ এ আবহাওয়ায় প্রতিরোধ প্রতিকারের চেয়ে অনেক সহজ।
যেখানে সত্যিই ছত্রাকনাশক বা কীটনাশক দরকার, সেখানে কোন ওষুধ ও কতটা মাত্রায় দিতে হবে তা অনুমান করে বা দোকানির কথায় নয়, বরং স্থানীয় উপজেলা কৃষি অফিস বা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ থেকে নেওয়া উচিত, কারণ সঠিক রাসায়নিক, সময় ও মাত্রা নির্ভর করে নির্দিষ্ট ফসল ও রোগের ওপর, আর অতিরিক্ত ব্যবহার অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি জমিরও ক্ষতি করে। যে জলবায়ুতে দীর্ঘ ও ঘন শীতের কুয়াশা ক্রমেই বেশি দেখা দিচ্ছে, সেখানে কৃষকের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার আজও সেই পুরোনো কৌশলগুলোই: জমিতে নিয়মিত চোখ রাখা, তা পরিষ্কার ও নিষ্কাশিত রাখা, আর কুয়াশার এক সপ্তাহ যেন হারানো ফসলে পরিণত না হয়, সে জন্য আগেভাগেই স্থানীয় সম্প্রসারণ কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া।
ছবি: মুহাম্মদ আমদাদ হোসেন / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১৯ জানুয়ারি ২০২৬); বাংলাপিডিয়া (ধান, আলু, সরিষা, টমেটো ও জলবায়ু ভুক্তি); উইকিপিডিয়া (ফাইটোফথোরা ইনফেস্টান্স)।





মন্তব্য
(০)