মাছ, চিংড়ি, ঝিনুক-শামুক ও জলজ উদ্ভিদ একসঙ্গে চাষ করলে একই পানি থেকে বেশি খাবার মেলে। ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূলে খুলনা ও কক্সবাজারের ১৩১ জন চাষিকে নিয়ে এশিয়া-আফ্রিকা ব্লুটেক সুপারহাইওয়ে প্রকল্পের আওতায় ওয়ার্ল্ডফিশ এই ধারণাটি পরীক্ষা করেছে — সমন্বিত বহুস্তর মাছ চাষের (আইএমটিএ) সাতটি মডেলে, যার চারটি পুকুরভিত্তিক আর তিনটি উপকূলের কাছাকাছি সামুদ্রিক।
নীতিটি সহজ: ভিন্ন ভিন্ন প্রাণী ব্যবস্থার ভিন্ন অংশ কাজে লাগায়। চিংড়ি ও মাছের সঙ্গে রাখা হয় পুষ্টি শোষণকারী প্রাণী ও উদ্ভিদ — ঝিনুক, শামুক, সামুদ্রিক শৈবাল, জলজ গাছ — যাতে এক প্রজাতির ছাড়া পুষ্টি অন্যটি নিতে পারে এবং চাষি একই পুকুর বা একই জলাশয় থেকে একাধিক পণ্য পান।
মডেলভেদে ফল হয়েছে আলাদা। পুকুরভিত্তিক মডেলগুলোর মধ্যে গলদা চিংড়ি (ম্যাক্রোব্র্যাকিয়াম রোজেনবার্জি) ও রুইয়ের (লাবিও রোহিতা) মডেলে প্রতি চক্রে হেক্টরপ্রতি সর্বোচ্চ ফলন মিলেছে — ৪ হাজার ১৯০ কেজি। সবচেয়ে ভালো আয় দিয়েছে বাগদা চিংড়ি (পেনিয়াস মনোডন), নোনা টেংরা (মিস্টাস গুলিও) ও পারশের (লিজা পারসিয়া) মডেল — সুবিধা-ব্যয় অনুপাত ২.৮১ এবং বিনিয়োগের ওপর মুনাফা ১৮১ শতাংশ। মূল্যায়ন করা পুকুর ব্যবস্থাগুলোতে চিংড়ি ও মাছের জৈববস্তু প্রচলিত ব্যবস্থার চেয়ে ২.৭ থেকে ৯.৫ গুণ বেশি হয়েছে, আর কিছু মডেলে বেঁচে থাকার হার দ্বিগুণেরও বেশি।
সামুদ্রিক মডেলগুলোর মধ্যে পারশে-শৈবাল-ঝিনুক-অয়েস্টার সমন্বয়ে সর্বোচ্চ নিট মুনাফা এসেছে — প্রতি ঘনমিটারে ১ হাজার ৯৪৫ টাকা।
পরীক্ষায় অসুবিধার জায়গাগুলোও স্পষ্ট হয়েছে, আর তা মূলত সমুদ্রে। সামুদ্রিক সমন্বিত চাষে বড় বিনিয়োগ লাগে, আর ভিন্ন প্রজাতির মৌসুম সব সময় মেলে না। কয়েকটি সামুদ্রিক প্রজাতির মানসম্মত পোনা দুষ্প্রাপ্য — ভেটকি, নোনা টেংরা, শৈবাল ও ঝিনুকের জন্য চাষিদের এখনও প্রাকৃতিক উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয় — আর সামুদ্রিক মাছের বিশেষায়িত খাবার দেশে ব্যাপকভাবে তৈরি হয় না।
উৎপাদনের বাইরে বাজারও সংকীর্ণ। শৈবাল ও ঝিনুক-জাতীয় পণ্যের চাহিদা সীমিত, আর ব্যাপক ব্যবহারের জন্য দরকার আরও শক্ত খাদ্য নিরাপত্তা ও সংরক্ষণব্যবস্থা — এর মধ্যে আছে জীবন্ত ঝিনুক পরিষ্কার পানিতে রেখে দূষণ কমানোর নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া, অর্থাৎ ডিপিউরেশনের প্রমিত পদ্ধতি।
প্রকল্পটি পুকুরভিত্তিক চর্চায় প্রশিক্ষণ দিয়েছে ১ হাজার ১২৭ জন চাষিকে, আর কক্সবাজারে ৪০০ জন উপকূলীয় নারী অংশ নিয়েছেন পুষ্টিবিষয়ক কার্যক্রমে, যার মধ্যে ছিল শৈবাল ও ঝিনুক দিয়ে রান্নার প্রদর্শনী। এ থেকে তৈরি হয়েছে পাঁচটি পিয়ার-রিভিউড গবেষণা নিবন্ধ, মৎস্য অধিদপ্তরের সংকলনে তিনটি প্রকাশনা এবং বাংলা ভাষায় আইএমটিএ ম্যানুয়াল ও শিক্ষামূলক ব্যানার।
গবেষকদের ভাষায় সবচেয়ে স্পষ্ট শিক্ষা হলো, "সব উপকূলীয় এলাকার জন্য একটিমাত্র আইএমটিএ মডেল নেই" — কোন ব্যবস্থা কেমন চলবে তা নির্ভর করে স্থানীয় পরিস্থিতি, প্রজাতির সমন্বয়, উৎপাদন খরচ, পোনা ও খাবারের সহজলভ্যতা, চাষির সক্ষমতা ও বাজারের ওপর। ফলাফল উপস্থাপন করা হয়েছে গত ২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মৎস্য অধিদপ্তরে আয়োজিত সমাপনী কর্মশালায়।
সূত্র: সিজিআইএআর (CGIAR)





মন্তব্য
(০)