আমন খেতের আলে দাঁড়িয়ে একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, সবুজ ধানের মাঝে মাঝে পোঁতা আছে বাঁশের কঞ্চি বা গাছের শুকনো ডাল। কোনোটার মাথায় বসে আছে কালো লেজচেরা ফিঙে, কোনোটায় শালিক। হঠাৎ ফিঙেটি ঝাঁপ দিয়ে ধানের ওপর থেকে একটি মথ ধরে আবার ফিরে এল নিজের ডালে। এই ছোট্ট দৃশ্যের নামই পার্চিং। ইংরেজি পার্চ শব্দের অর্থ পাখির বসার দাঁড়। পার্চিং হলো প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব একটি কৃষি পদ্ধতি, যাতে জমির মাঝখানে বা কিনারে কাঠি বা বাঁশের টুকরো পুঁতে পাখিদের বসার ব্যবস্থা করা হয়, যাতে তারা ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফেলে। খরচ প্রায় নেই, অথচ ফসলের সুরক্ষা আর ফলন দুটোই বাড়ে। দেশের বহু এলাকায় এখন এটি কৃষকের অতি পরিচিত কৌশল।
পাখি কেন কাঠি চায়
ধানখেতে পোকা আছে, পাখিরও খিদে আছে। তাহলে পাখি নিজে থেকেই কেন সব পোকা খেয়ে ফেলে না? কারণ খোলা মাঠে বসার জায়গা নেই। ফিঙে, শালিক বা বকের মতো পাখি সাধারণত উঁচু কোনো জায়গায় বসে চারপাশে নজর রাখে, তারপর শিকার দেখলে ঝাঁপ দেয়। বিস্তীর্ণ ধানখেতে গাছ বা খুঁটি না থাকলে পাখি মাঠের কিনারার গাছেই বসে থাকে, খেতের মাঝখানে বেশি আসে না। পার্চিং ঠিক এই অভাবটি পূরণ করে। মাঠের ভেতরে বসার জায়গা পেলে পাখি সেখানে ঘাঁটি গাড়ে, আর আশপাশের পোকা হয়ে ওঠে তার খাবার।
ধানের সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকাগুলোর একটি মাজরা পোকা। কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে তিন প্রজাতির মাজরা পোকা ধানের ক্ষতি করে: হলুদ, কালো মাথা ও গোলাপি মাজরা, যার মধ্যে হলুদ মাজরার আক্রমণই বেশি। এর কীড়া ধানগাছের কাণ্ডের ভেতরে ঢুকে খেতে থাকে। কুশি অবস্থায় আক্রমণ হলে মাঝের পাতা শুকিয়ে মরে যায়, যাকে বলে মরা ডিগ। শিষ আসার পর আক্রমণ হলে পুরো শিষ সাদা হয়ে শুকিয়ে যায়, দানা থাকে না; একে বলে সাদা শিষ। এই পোকার মথ রাতে ওড়ে, দিনে ধানগাছে বসে থাকে, আর তখনই পাখির চোখে পড়ে। লেদা পোকা, পাতা কাটা বা পাতা মোড়ানো পোকার কীড়াও পাখির প্রিয় খাবার।
কাঠি বসানো থেকে পোকা দমন: পদ্ধতিটি যেভাবে কাজ করে
পুরো ব্যবস্থাটি কয়েকটি ধাপে দাঁড়ায়। প্রথমে জমির বিভিন্ন জায়গায় ৪ থেকে ৫ ফুট লম্বা কাঠি বা বাঁশের ডগা মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়। প্রতিটি কাঠির মধ্যে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ মিটার দূরত্ব রাখা হয়। কাঠি বা বাঁশের মাথায় একটি হালকা ডাল বা আড়াআড়ি দণ্ড বেঁধে দেওয়া হয়, যাতে পাখি আরাম করে বসতে পারে। ধানগাছ বড় হলে যেন কাঠির মাথা ঢাকা না পড়ে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হয়; কৃষি বিশেষজ্ঞরা ফসলের উচ্চতার চেয়ে কাঠি বেশ খানিকটা উঁচু রাখার পরামর্শ দেন।
এরপর কাজটি করে পাখিরা। তারা কাঠিতে বসে জমির লেদা পোকা, মাজরা পোকা আর অন্যান্য ক্ষতিকর পোকা ধরে খায়। ফলে রাসায়নিক কীটনাশকের প্রয়োজন কমে আসে। আর বিষাক্ত রাসায়নিক কম লাগে বলে পদ্ধতিটি পরিবেশের জন্যও নিরাপদ।
মাঠে পার্চিংয়ের দুটি ধরন দেখা যায়। একটিকে বলা হয় মরা পার্চিং: বাঁশের কঞ্চি, খুঁটি বা গাছের শুকনো ডাল পুঁতে দেওয়া। অন্যটি জীবন্ত পার্চিং: জমিতে ধইঞ্চার মতো গাছ লাগিয়ে দেওয়া, যা বেড়ে উঠে নিজেই পাখির বসার জায়গা হয়। দুটোতেই উদ্দেশ্য এক, মাঠের ভেতরে পাখির জন্য বসার জায়গা তৈরি করা। ধইঞ্চা বাড়তি একটি সুবিধাও দেয়। এটি শিমজাতীয় গাছ, যার শিকড়ে বাতাস থেকে নাইট্রোজেন ধরে রাখার ক্ষমতা আছে; তাই দেশে বহুদিন ধরে এটি সবুজ সার হিসেবে চাষ হয়ে আসছে। আলের ধারে বা জমির ভেতরে কয়েকটি ধইঞ্চা গাছ তাই একসঙ্গে দুই কাজ করে: পাখির বসার জায়গা দেয়, আবার পরে মাটিতে মিশিয়ে দিলে জমির উর্বরতা বাড়ায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মাঠপর্যায়ে দুই ধরনের পার্চিংই ব্যবহার করতে কৃষকদের উৎসাহিত করছে।
খেতের পাহারাদারেরা
পার্চিংয়ে যে পাখিরা আসে, তাদের প্রত্যেকের শিকারের ধরন আলাদা, আর সেই কারণেই তারা একসঙ্গে ভালো দল গড়ে। সবচেয়ে পরিচিত পাহারাদার ফিঙে। কুচকুচে কালো শরীর, লম্বা চেরা লেজ, আর উঁচু জায়গায় বসে থাকার অভ্যাস। ফিঙে প্রায় পুরোপুরি পোকাখেকো পাখি। সে বসে থাকে, চারপাশ দেখে, তারপর উড়ন্ত মথ বা ফড়িং ধরে আবার ফিরে আসে একই জায়গায়। খোলা মাঠে একটি কাঠি তাই ফিঙের কাছে আদর্শ শিকারঘাঁটি। গ্রামবাংলায় ফিঙেকে কৃষকের বন্ধু বলা হয় এমনি এমনি নয়।
শালিক খাবারের ব্যাপারে অতটা খুঁতখুঁতে নয়; দানা, ফল, পোকা সবই খায়। তবে খেতে নেমে হেঁটে হেঁটে ঘাসফড়িং, কীড়া আর মাটির পোকা খুঁটে খেতে সে ওস্তাদ। বক আবার আরেক রকম শিকারি। পানিতে বা কাদায় দাঁড়িয়ে ধীরে পা ফেলে, আর পায়ের শব্দে লাফিয়ে ওঠা পোকা, ফড়িং বা ছোট প্রাণী ধরে। চাষের সময় লাঙল বা ট্রাক্টরের পেছনে পেছনে বকের সারি যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন, মাটি থেকে বেরিয়ে আসা পোকা ধরতে বক কতটা তৎপর।
এই তিন ধরনের শিকারি মিলে খেতের ওপরে, গাছের গায়ে আর গোড়ার কাছে, তিন স্তরেই পোকার ওপর চাপ তৈরি করে। কাঠি তাদের ডেকে আনে, আর খাবারের প্রাচুর্য তাদের ধরে রাখে।
উপকারিতার হিসাব
প্রথম উপকার পরিবেশের। রাসায়নিক কীটনাশক ছাড়াই পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা যায়, ফলে মাটি, পানি ও পরিবেশের দূষণ কমে। ধানখেতের পানিতে থাকা মাছ, শামুক, ব্যাঙ আর উপকারী পোকারাও বাঁচে।
দ্বিতীয় উপকার খরচে। এই পদ্ধতিতে তেমন কোনো খরচ নেই; কয়েকটি কাঠি বা বাঁশ হলেই চলে, যা গ্রামে প্রায় সবার বাড়িতেই থাকে। কীটনাশক কেনা ও ছিটানোর খরচ, শ্রমিকের মজুরি, সবই বাঁচে।
তৃতীয় উপকার ফলনে। ক্ষতিকর পোকা কমে গেলে গাছ সুস্থ থাকে, মরা ডিগ আর সাদা শিষ কম হয়, ফলে ফলন বাড়ে।
চতুর্থ উপকার পাখিদের। পার্চিংয়ের মাধ্যমে পাখিরা খাবার পায়, যা প্রাকৃতিক খাদ্যচক্র বজায় রাখতে সাহায্য করে। আর জমিতে পাখির উপস্থিতি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। কৃষক আর পাখির মধ্যে এক ধরনের নীরব চুক্তি তৈরি হয়: কৃষক বসার জায়গা দেন, পাখি ফসল পাহারা দেয়।
মাঠের অভিজ্ঞতাও এই হিসাবকে সমর্থন করে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার ২০২২ সালের নভেম্বরের এক প্রতিবেদনে পটুয়াখালীর কৃষকদের কথা উঠে এসেছে। সেখানে জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ আমন জমিতে পার্চিং করা হয়েছিল বলে জানানো হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একটি পাখি দিনে অন্তত ২০০টি মাজরা পোকা খায়, আর একজন কৃষক জানান, আগে যেখানে মৌসুমে তিন থেকে চারবার কীটনাশক দিতে হতো, পার্চিংয়ের পর সেখানে একবারেই চলছে।
কোন ফসলে কাজে আসে
পার্চিং বহুল ব্যবহৃত একটি কৃষি কৌশল, তবে সব ধরনের ফসলে একভাবে কাজ করে না। ঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হলে ফসল ও জমির ধরন বোঝা দরকার।
ধানখেতেই পার্চিং সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়। মাজরা পোকা, লেদা পোকা ও পাতা কাটা পোকা দমনে এটি বিশেষভাবে কার্যকর। বোরো, আমন ও আউশ, তিন মৌসুমেই পার্চিং করা হয়। পাখিরা ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফেলায় ধানের ফলন বাড়ে।
শাকসবজির খেতেও পার্চিং কাজে আসে। লাউ, কুমড়া, টমেটো ও বেগুনের খেতে এটি ফল ছিদ্রকারী পোকা ও লেদা পোকার আক্রমণ কমায়। ফলে রাসায়নিক কীটনাশক কম লাগে, আর সবজির মান ভালো থাকে। সবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ নিয়ে ভোক্তাদের যে উদ্বেগ, পার্চিং তা কমাতেও সাহায্য করে।
ডাল জাতীয় ফসল, যেমন মসুর, ছোলা ও মুগের খেতে পোকা দমনে পার্চিং ব্যবহার করা হয়। এটি দানায় ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ ঠেকায় এবং ডালের মান উন্নত করে।
তেলজাতীয় ফসল, যেমন সরিষা, সূর্যমুখী ও তিলের খেতেও ক্ষতিকর পোকা দমনে পার্চিং করা হয়। এতে ফুলের ক্ষতি কমে এবং ফলন বাড়ে।
ভুট্টা ও গমের খেতে পাতা ছিদ্রকারী পোকা আর লেদা পোকা দমনে পার্চিং কার্যকর। জমিতে বসানো কাঠিতে বসে পাখিরা পোকা ধরে খায়।
কখন বসাতে হবে
পার্চিংয়ের সুফল পেতে সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। পোকার আক্রমণ শুরু হলে, ফসল বড় ক্ষতির মুখে পড়ার আগেই কাঠি বসানো উচিত। ভালো হয় চারা রোপণের প্রথম দিকেই শুরু করা, কারণ তখন থেকেই মাজরা পোকার মথ ডিম পাড়তে আসে। চারা রোপণের শুরু থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত পুরো সময়জুড়েই পদ্ধতিটি চালু রাখা যায়। পোকার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পর শুরু করলে পাখির একার পক্ষে তা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। আমন মৌসুমে যেমন বর্ষায় চারা রোয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই কাঠি পুঁতে ফেলা ভালো, তেমনি বোরো মৌসুমে শীতের শেষে রোপণের পরপরই কাজটি সেরে নেওয়া উচিত। চারা রোয়ার দিনই কাঠি জোগাড় করে জমির আলে রেখে দিলে পরে আর আলাদা করে সময় বের করতে হয় না।
মাঠে নেমে ধাপে ধাপে
পার্চিং সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব কৌশল, আর এটি বাস্তবায়নে খুব বেশি সময় বা খরচ লাগে না। তবে সফল হতে হলে একটু পরিকল্পনা দরকার।
প্রথম কাজ জমি পর্যবেক্ষণ। কোন পোকা ফসলের ক্ষতি করছে, তার ধরন ও সংখ্যা দেখে নিন। জমির আকার আর ফসলের ধরন অনুযায়ী কোথায় কয়টি কাঠি বসবে, তার পরিকল্পনা করুন।
দ্বিতীয় কাজ কাঠি বা বাঁশ সংগ্রহ। ৪ থেকে ৫ ফুট লম্বা কাঠি, বাঁশ বা লাঠি জোগাড় করুন। প্রতিটি কাঠি মজবুত হওয়া দরকার, যাতে ঝড়ো হাওয়া বা বৃষ্টিতে পড়ে না যায়।
তৃতীয় কাজ কাঠি পোঁতা। জমির মাঝখানে এবং চারদিকে সমান দূরত্বে কাঠি পুঁতুন। প্রতিটি কাঠির মধ্যে ১০ থেকে ১৫ মিটার দূরত্ব রাখুন। জমি যত বড়, কাঠির সংখ্যা তত বেশি হবে। একটা মোটা হিসাব করা যায়। দেশের প্রচলিত এক বিঘা, অর্থাৎ ৩৩ শতাংশ জমির আয়তন প্রায় ১,৩৩৮ বর্গমিটার। প্রতি ১৫ মিটার পর পর কাঠি বসালে এমন জমিতে মোটামুটি ৬টি, আর ১০ মিটার পর পর বসালে প্রায় ১৩টি কাঠি লাগে। অর্থাৎ এক বিঘা জমি পাহারা দিতে এক আঁটি বাঁশের কঞ্চিই যথেষ্ট।
চতুর্থ কাজ বসার জায়গা তৈরি। কাঠির মাথায় একটি হালকা ডাল বা আড়াআড়ি দণ্ড লাগান, যাতে পাখি বসতে পারে। কাঠির ওপরে আলকাতরা বা তেল লাগাবেন না, তাতে পাখির বসতে সমস্যা হয়।
পঞ্চম কাজ পাখিদের আকৃষ্ট করা। জমির পরিবেশ শান্ত রাখুন, আশপাশে পাখির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কিছু রাখবেন না। জমিতে পাখির পছন্দের কিছু খাবার, যেমন ধান বা শস্যদানা ছড়িয়ে রাখলে শুরুতে তাদের আনাগোনা বাড়ে।
ষষ্ঠ কাজ নিয়মিত নজরদারি। প্রতিদিন জমিতে গিয়ে দেখুন কাঠিতে পাখি বসছে কি না। পাখি না এলে কাঠির জায়গা বা সংখ্যা বদলে দেখুন। পোকার আক্রমণ বেশি হলে কাঠির সংখ্যা বাড়িয়ে জমিকে আরও সুরক্ষিত করুন।
সপ্তম কাজ জমির যত্ন। জমি পরিষ্কার রাখুন, কাঠিগুলো পড়ে গেল কি না নিয়মিত দেখুন। পোকার আক্রমণ কমে এলে বুঝবেন পদ্ধতিটি কাজ করছে।
শেষ কাজ ফসল কাটার সময় কাঠি তুলে নেওয়া। ফসল কাটার পর কাঠিগুলো তুলে শুকনো জায়গায় রেখে দিন, যাতে পরের মৌসুমে আবার ব্যবহার করা যায়।
- পোকার সংখ্যা বাড়ার আগেই পার্চিং শুরু করুন।
- পাখিদের কোনোভাবেই বিরক্ত করবেন না; তারাই আপনার খেতের পাহারাদার।
- প্রকৃতি রক্ষায় পাখির ভূমিকা বুঝুন, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হোন।
একা নয়, আরও কৌশলের সঙ্গে
পার্চিং সবচেয়ে ভালো কাজ করে যখন একে অন্য প্রাকৃতিক কৌশলের সঙ্গে মেলানো হয়। কৃষি তথ্য সার্ভিস মাজরা পোকা দমনে যেসব যান্ত্রিক উপায়ের কথা বলে, তার মধ্যে আছে হাতজাল দিয়ে মথ ধরে মেরে ফেলা, আলোর ফাঁদ বসিয়ে রাতে মথ সংগ্রহ করে ধ্বংস করা এবং খুঁটি পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করা। অর্থাৎ পার্চিং সরকারি পরামর্শেরই অংশ। এই সব উপায় একসঙ্গে কাজে লাগানোকেই বলে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা: আগে প্রকৃতির নিজস্ব উপায়, আর রাসায়নিক কেবল প্রয়োজন হলে, শেষ ভরসা হিসেবে। পার্চিং থাকার মানে এই নয় যে কখনোই কীটনাশক লাগবে না; মানে হলো, অপ্রয়োজনে, আগাম ভয়ে বারবার বিষ ছিটানোর দরকার পড়ে না।
ডিমের গাদা থেকে আলোর ফাঁদ
মাজরা পোকার জীবনচক্র বুঝলে পার্চিংয়ের সঙ্গে আর কী করা যায়, তা পরিষ্কার হয়। স্ত্রী মথ ধানের পাতার ওপরের দিকে গাদা করে ডিম পাড়ে, আর সেই গাদা ঢাকা থাকে হালকা বাদামি লোমের আস্তরণে। ডিম ফুটে বের হওয়া কীড়া পাতা বেয়ে নেমে কাণ্ডের ভেতরে ঢুকে যায়, আর একবার ভেতরে ঢুকলে তাকে ধরা কঠিন। তাই সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়, খেত ঘুরে পাতার ডিমের গাদা হাতে তুলে নষ্ট করতে। কীড়া কাণ্ডে ঢোকার আগেই যত ডিম নষ্ট করা যায়, ক্ষতি তত কমে।
মথ যখন ওড়ে, তখন কাজে আসে পাখি আর আলোর ফাঁদ। দিনের বেলায় ধানগাছে বসে থাকা মথ ধরে ফিঙে আর শালিক, আর রাতে যে মথ আলোর দিকে ছুটে আসে, সেগুলো ধরা পড়ে আলোর ফাঁদে। একটি বাতির নিচে পানিভরা পাত্র রাখলেই সাধারণ আলোর ফাঁদ তৈরি হয়। আলোর ফাঁদে কী ধরনের আর কত পোকা পড়ছে, তা দেখে বোঝা যায় খেতে পোকার চাপ বাড়ছে কি না। অর্থাৎ ফাঁদটি একসঙ্গে দমন আর নজরদারি দুই কাজই করে। দিনে পাখি, রাতে আলো, আর মাঝে কৃষকের নিজের চোখ, এই তিনে মিলে মাজরা পোকার বিরুদ্ধে একটি পূর্ণ প্রতিরক্ষা গড়ে ওঠে।
দেশের মাঠে পার্চিং: অঞ্চলভিত্তিক চিত্র
বাংলাদেশে ধান চাষের প্রধান এলাকাগুলো, যেমন ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা ও যশোরে পার্চিং ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়। আমন ও বোরো মৌসুমে মাজরা ও লেদা পোকা দমনে এটি খুব কার্যকর, আর পাখিরা পোকা খেয়ে ফেলায় কীটনাশকের প্রয়োজন কমে।
উত্তরাঞ্চলের চিত্রও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের বোরো মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ৫,০৮,৯৭৮ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ৪,৬৮,৪২৮ হেক্টরে পার্চিংয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। একই অঞ্চলে ২০২৫ সালের আমন মৌসুমে ৬,২১,৫০৫ হেক্টরের মধ্যে ৩,৬৯,১৬০ হেক্টর জমিতে পার্চিং করা হয় বলে বাসস নভেম্বরে জানায়। আরও আগে, ২০১৮ সালে মাগুরা জেলার কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানিয়েছিলেন, জেলার শতভাগ আমন জমি পার্চিংয়ের আওতায় আনা গেছে।
সবজিতে সাভার, গাজীপুর ও বগুড়ার মতো উৎপাদনকারী এলাকায় লাউ, কুমড়া, করলা, টমেটো ও বেগুনের খেতে ফল ছিদ্রকারী পোকা নিয়ন্ত্রণে পার্চিং কাজে আসে। এতে সবজির মান রক্ষা পায়, কীটনাশকও কম লাগে।
তেলজাতীয় ফসলে পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও ফরিদপুরের সরিষা খেতে পার্চিং ব্যবহার হয়। সরিষা ও সূর্যমুখীর ফুলে ক্ষতিকর পোকা দমনে এটি সাহায্য করে, আর পোকা নিয়ন্ত্রণে থাকায় ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
ডালে ময়মনসিংহ ও রাজশাহী অঞ্চলে মসুর ও মুগের খেতে দানা ছিদ্রকারী পোকা নিয়ন্ত্রণে পার্চিং ব্যবহার হয়। এতে ডালের মান ভালো হয়, উৎপাদন খরচও কমে।
গম ও ভুট্টায় রাজশাহী, নওগাঁ ও দিনাজপুরে পার্চিং ব্যবহার হয়। গমে পাতা ছিদ্রকারী পোকা নিয়ন্ত্রণে আর ভুট্টাখেতে পোকার আক্রমণ কমাতে এটি কার্যকর।
ফলের বাগানেও পার্চিংয়ের ব্যবহার আছে। নাটোর, সাতক্ষীরা ও দিনাজপুরে আম, পেঁপে ও কলার বাগানে পোকার আক্রমণ কমাতে এটি কাজে লাগানো হয়। পাখির মাধ্যমে ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে থাকায় ফলের মানও ভালো হয়।
আর দেশের যেসব এলাকায় জৈব বা প্রাকৃতিক চাষাবাদ চলে, সেখানে রাসায়নিকমুক্ত চাষে পোকা দমনে পার্চিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি কৃষিজমির প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখতেও সাহায্য করে।
মাঠ থেকে শেখা
কিছু সাধারণ ভুলও অভিজ্ঞতা থেকে চেনা যায়। কাঠি খুব নিচু হলে ধানগাছ বড় হয়ে তা ঢেকে ফেলে, পাখি আর বসে না। কাঠি শুধু আলের ধারে পুঁতলে খেতের মাঝখান অরক্ষিত থাকে। আবার পোকার আক্রমণ চরমে পৌঁছানোর পর কাঠি বসালে ফল মেলে দেরিতে। আর কাঠির পাশে দাঁড়িয়ে বারবার কীটনাশক ছিটালে পাখির খাবারই বিষাক্ত হয়ে যায়, পাখিও খেত ছেড়ে চলে যায়। পার্চিংয়ের সুফল পেতে তাই ধৈর্য আর নিয়ম দুটোই দরকার।
দেশজুড়ে পার্চিংয়ের অভিজ্ঞতা থেকে তিনটি শিক্ষা পরিষ্কার। এক, এটি পরিবেশবান্ধব; রাসায়নিক ছাড়াই পোকা দমন সম্ভব। দুই, এটি সাশ্রয়ী; প্রায় বিনা খরচে কার্যকর করা যায়। তিন, এতে ফলন বাড়ে, কারণ জমিতে ক্ষতিকর পোকার সংখ্যা কমে যায়।
কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে দেশে উদ্বেগ অনেক দিনের। বিষ ছিটালে ক্ষতিকর পোকার সঙ্গে মারা পড়ে মাকড়সা, লেডিবার্ড বিটলের মতো উপকারী পোকাও, যারা নিজেরাই ক্ষতিকর পোকা খায়। তখন পরের বার পোকার আক্রমণ আরও বেশি হয়, আর কৃষক আরও বেশি বিষ দিতে বাধ্য হন। পার্চিং এই চক্র ভাঙতে সাহায্য করে। পাখি, মাকড়সা আর উপকারী পোকারা মিলে খেতে যে প্রাকৃতিক ভারসাম্য গড়ে তোলে, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে সস্তা আর নিরাপদ সুরক্ষা।
কৃষকের স্বাস্থ্যের প্রশ্নও এখানে জড়িত। যিনি পিঠে স্প্রেয়ার নিয়ে খেতে নামেন, বিষের সবচেয়ে কাছের মানুষ তিনিই। অনেক সময় মাস্ক, দস্তানা ছাড়াই স্প্রে করা হয়, আর বাতাসে উড়ে আসা ওষুধ শ্বাসের সঙ্গে ঢোকে। পার্চিংয়ের কারণে প্রতিটি স্প্রে কম মানে কৃষকের শরীরে বিষের সংস্পর্শও একবার কম। এই লাভ টাকায় মাপা যায় না, কিন্তু সবচেয়ে বড় লাভগুলোর একটি।
বাঁশের কাঠিতে বড় সাশ্রয়
পার্চিং একটি অনাড়ম্বর, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব কৃষি কৌশল। এটি পোকা দমনের পাশাপাশি উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যে কৃষক রাসায়নিক কীটনাশক কমাতে চান এবং ফসলের মান ভালো করতে চান, তাঁর জন্য পার্চিং ভালো বিকল্প। কয়েকটি বাঁশের কঞ্চি আর একটু মনোযোগ, এর বিনিময়ে খেতে আসে ফিঙে, শালিক আর বক; আর তাদের পাহারায় নিরাপদ থাকে কৃষকের ফসল। মৌসুমের শুরুতেই নিজের জমিতে কয়েকটি কাঠি পুঁতে দেখার মতো সস্তা পরীক্ষা কৃষিতে খুব কমই আছে।
ছবি: বাংলাদেশে ফিঙে (Dicrurus macrocercus), R trisha / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)





মন্তব্য
(০)