খুলনার আমন ধানের খেতে ক্ষতিকর পোকা দমনে ‘পার্চিং’ নামের একটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। প্রথম আলো ২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর জানায়, জেলার বেশির ভাগ কৃষক খেতে বাঁশের আগা, কঞ্চি ও গাছের ডাল পুঁতে দিচ্ছিলেন। সেখানে ফিঙে, শালিকের মতো পাখি বসে পোকা ধরে খাচ্ছিল, তাতে কীটনাশক কম লাগছিল।
ডুমুরিয়া ও দাকোপের কৃষকের অভিজ্ঞতা
ডুমুরিয়া উপজেলার শরাফপুর ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের কৃষক মো. জাকির হোসেন সেবার তিন বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেন। চারা লাগানোর মাসখানেকের মধ্যে তিনি খেতে নির্দিষ্ট ব্যবধানে ৪২টি বাঁশের কঞ্চি ও গাছের ডাল পুঁতে দেন। তিনি প্রথম আলোকে জানান, অন্য বছর যেখানে তিন-চার দফা কীটনাশক দিতে হতো, সেবার দিতে হয়েছে মাত্র একবার।
দাকোপের চালনা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক জীবন মণ্ডল চার বিঘা জমির আমন খেতে ৩০টি ছোট ডাল ও বাঁশের কঞ্চি পুঁতে পুরো খেতে পার্চিং করেন। তাঁর ভাষ্য, ফিঙে ও শালিক ওই ডালে বসে ক্ষতিকর পোকা, বিশেষ করে মাজরা পোকার মথ ধরে খাচ্ছিল এবং কীটনাশকের ব্যবহার অনেক কমেছিল। ওই এলাকার কৃষক মিহির মণ্ডল জানান, রাতে পার্চিংয়ে পেঁচা বসে খেতের ইঁদুর ধরছিল; আলের ওপর প্রায় প্রতিদিন পেঁচায় খাওয়া ইঁদুরের মাথা পাওয়া যাচ্ছিল।
ডুমুরিয়া, দাকোপ ও বটিয়াঘাটার আমন খেতে তখন কিছু দূর পরপর ডাল ও কঞ্চি পোঁতা দেখা যায়, অনেকে তখনো ডাল পুঁতছিলেন। অনেক খেতে আলের পাশে ও জমির মাঝখানে ধঞ্চে লাগানো ছিল, আর এসব পার্চিংয়ে ফিঙে ও শালিক বসে থাকতে দেখা যায়।

পার্চিং কী এবং কীভাবে করতে হয়
কৃষি কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যায়, পার্চিং মানে খেতে পাখি বসার জন্য ডাল, কঞ্চি বা বাঁশের খুঁটি পুঁতে দেওয়া। পাখি সেখানে বসে ক্ষতিকর পোকার মথ, বাচ্চা ও ডিম খেয়ে ফেলে। ফিঙে, শালিক, বুলবুলি, শ্যামা, দোয়েল ও সাত ভায়রা এভাবে পোকা ধরে খায়। পদ্ধতিটি প্রায় খরচহীন ও পরিবেশবান্ধব। পার্চিং দুই রকম, আর বসানোর নিয়মও নির্দিষ্ট:
- ডেড পার্চিং: মরা ডালপালা, কঞ্চি বা বাঁশের আগা পুঁতে দেওয়া।
- লাইভ পার্চিং: ধঞ্চে বা অড়হরের মতো জীবন্ত গাছ জমিতে নির্দিষ্ট দূরত্বে লাগানো।
- প্রতি শতকে অন্তত একটি বাঁশের আগা, কঞ্চি বা ডাল পুঁততে হয়।
- ফসল রোপণের পরপরই পার্চিং বসাতে হয়, ফসলের সর্বোচ্চ উচ্চতার চেয়ে অন্তত এক ফুট উঁচু করে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) কীটতত্ত্ব বিভাগ ধানখেতে পোকাখেকো পাখি বসার জন্য ডাল স্থাপনের এই প্রযুক্তি উদ্ভাবনকে তাদের সাফল্যের তালিকায় রেখেছে এবং পার্চিংয়ের মাধ্যমে পোকা দমনের ওপর লিফলেট তৈরি করে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করেছে। ২০১৬ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত বরিশাল অঞ্চলের এক গবেষণায় (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্রির গবেষকেরা যুক্ত ছিলেন) হলুদ মাজরা পোকার বিরুদ্ধে পার্চিং ব্যবহার করা হয়; সেখানে পার্চিংয়ের খুঁটির মানক দূরত্ব ধরা হয় ১০ মিটার × ১০ মিটার।
ফিঙে (ব্ল্যাক ড্রংগো) মূলত ফড়িং, উইপোকা, মথ ও গুবরে পোকার মতো পোকামাকড় খেয়ে বাঁচে এবং খাড়া হয়ে ঝোপ, খালি ডাল বা বিদ্যুতের তারে বসে থাকে। কৃষকেরা খেতে কৃত্রিম বসার জায়গা বানিয়ে এই পাখিকে টেনে আনেন, যাতে এটি ফসলের ক্ষতিকর পোকা খায়।

জেলায় পার্চিংয়ের বিস্তার
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খুলনা কার্যালয়ের তথ্যে, সেবার জেলায় ৯১ হাজার ৮৮০ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয় এবং তখন পর্যন্ত ৬০ শতাংশ আমন খেতে পার্চিং হয়ে গিয়েছিল; শতভাগ জমি পার্চিংয়ের আওতায় আনার চেষ্টা চলছিল। আগে চাষিরা ধান লাগানোর পর বিলে গিয়ে পার্চিং করতে চাইতেন না এবং ডেড পার্চিংই বেশি করতেন; খরচ বাঁচায় বলে পার্চিংয়ের ব্যবহার বাড়ছিল, লাইভ পার্চিংয়েও আগ্রহ দেখা দিচ্ছিল। অধিদপ্তরের খুলনা কার্যালয়ের উপপরিচালক পঙ্কজ কান্তি মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ক্ষতিকর পোকা দমনে পার্চিং পদ্ধতি খুব কার্যকর। এই পদ্ধতি কাজে লাগালে কীটনাশকের ব্যবহার কমে যায়।’
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছাদ্দেক হোসেন জানান, সেবার উপজেলায় ১৫ হাজার ২১৩ হেক্টর জমিতে আমন লাগানো হয়, যার ৯০ শতাংশ পার্চিংয়ের আওতায় আনা হয়েছিল এবং প্রায় ১০০ হেক্টরে লাইভ পার্চিং হয়েছিল। তাঁর মতে, লাইভ পার্চিংয়ে পোকা দমনের পাশাপাশি গাছের পাতা জমিতে পড়ে নাইট্রোজেনের মাত্রা বাড়ায়। ধঞ্চে শিম গোত্রের উদ্ভিদ; অন্য শিম জাতীয় গাছের মতো এটি নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে মাটির উন্নতি ঘটায় এবং সবুজ সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আমন খেতে পোকার উপস্থিতি যাচাইয়ে পরিবেশবান্ধব ‘আলোক ফাঁদ’ও বসানো হচ্ছিল।
দাকোপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মেহেদী হাসান খান জানান, সেবার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ১৮ হাজার ৮২৫ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয় দাকোপে, যার ৭০ ভাগ জমি তখন পার্চিংয়ের আওতায় এসেছিল এবং কাজ চলছিল। ডুমুরিয়া খুলনা জেলার একটি উপজেলা, আয়তন ৪৫৪ দশমিক ২৩ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ১৪টি।

ছবি: Mdvipbabu / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: প্রথম আলো, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স (আলম ও সহকর্মী, ২০১৬), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)